কমরেড প্রসাদ রায় গণমানুষের নেতা

Posted: 11 ফেব্রুয়ারী, 2024

৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ কমরেড প্রসাদ রায়ের ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। খাপড়া ওয়ার্ডের লড়াকু যোদ্ধা, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, শ্রমিক-মেহনতি মানুষের বন্ধু, আজীবন বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির এই নেতা জন্মেছিলেন ৫ আগস্ট ১৯২৮ সালে পাবনার প্রতাপ ভবনে। সেসময়ে পাবনা শহরে এই পরিবারটির স্বপরিচিতি ছিল তার অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক আবহের কারণে। পরবর্তীতে অবশ্য প্রতাপ ভবনকে সর্বস্তরের মানুষ চিনতো তৎকালীন মডারেট ও লিবারেল আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল হিসেবে। প্রসাদ রায়সহ পাঁচ ভাই-ই যুক্ত ছিলেন সক্রিয় কমিউনিস্ট রাজনীতির সাথে। পরিবারে অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ ও সাম্যবাদী চিন্তার পথিকৃত ছিলেন তাঁর মা শবাসনা দেবী। দীর্ঘ কারাজীবনে নিজেকে আরোও শাণিত করে মুক্তি পাওয়ামাত্র নিজেকে শামিল রেখেছেন মেহনতি মানুষের লড়াইয়ের পুরোভাগে। সর্বমোট ১৯ বছর ৬ মাস কেটেছে জেলে। ১৯৪৮ সালের নিকষ কালো অন্ধকার যুগে জীবন বাজি রেখে বরফ ভাঙ্গার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বেরিয়েছিলেন ঘর থেকে। আমৃত্যু দমন-পীড়ন আর আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে নিজেকে অবিচল রেখেছিলেন কমিউনিস্ট আদর্শে। প্রথম কারাবরণ ১৯৪৯ সালের আগস্ট মাসে, রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে পোস্টার লাগাতে গিয়ে গ্রেফতার হন। ১৯৫৩ পর্যন্ত টানা জেলে ছিলেন। ১৯৫৪ সালে দুবার গ্রেফতার হন। ’৫৫ সালের শুরুর দিকে নভেম্বরে পুলিশ স্ট্রাইকের মামলায় পুনর্বার কারাবরণ। ১৯৫৬’র সেপ্টেম্বরে মুক্তি লাভের পর আয়ুব সরকারের সামরিক শাসন জারির পর আবারও কারাবাস, ১৯৬২ সালে মুক্তিলাভের পর পাক-ভারত যুদ্ধের শুরুতে জেলে গিয়ে ১৯৬৮ সালে মুক্তি পান। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে উত্তাল হয়ে ওঠে পূর্ববাংলা। তার ঢেউ আছড়ে পড়ে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার পাবনাতে। মিছিল থেকে গ্রেফতার হন প্রসাদ রায়। এরপর মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কারারুদ্ধ হন ১৯৭৫ এর পট পরিবর্তনের পর। ১৯৭৮ এ কারামুক্ত হয়ে ১৯৮৪ সালে আবারও গ্রেফতার হন স্বৈরশাসকের শাসনামলে। মুক্ত হন সে বছরই। দীর্ঘ জেল জীবনের ফাঁকে ফাঁকে যুক্ত থেকেছেন পার্টি গড়ার কাজে, শ্রমিক আন্দোলনে, বিশেষত: হোসিয়ারী ও বিড়ি শ্রমিক ইউনিয়নে। ১৯৪৭ এ দেশবিভাগের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিপুল সংখ্যক চলে গেলেন ভারতে। কমিউনিস্ট কর্মীরাও বাদ রইলেন না। যারাও ছিলেন তাদের অনেকেই ১৯৫০ এর দাঙ্গার পর চলে গেলেন। সে সময়ে কমিউনিস্ট কর্মীদের বেশিরভাগই ছিলেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে আগত। তাই যাদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজন ওপারে পাড়ি জমালেন, তারাও বাধ্য হলেন তাদের অনুগামী হতে। কেউ কেউ রয়ে গেলেন মাটি কামড়ে, আদর্শ আঁকড়ে। প্রসাদ রায় তাদের একজন। পারিবারিক সিদ্ধান্তের ঊর্ধ্বে পার্টির সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে রয়ে গেলেন স্বদেশে। কাঁধে তুলে নিলেন পাটিঁ গড়ার কাজ। বিভাগ পরবর্তী বাংলায় তখন বেশ কিছু এলাকায় কৃষক- জনতার মধ্যে কমিউনিস্টদের ভিত্তি গড়ে উঠেছে। সদ্য শেষ হয়েছে তেভাগার আন্দোলন, নানকার আন্দোলনের ঢেউ বয়ে গেছে বৃহত্তর ময়মনসিং ও সিলেট জুড়ে। এসব মিলিয়ে ধারণা ছিল উপমহাদেশের অন্যান্য এলাকার আগে পূর্ববাংলায় বিপ্লব সংঘটিত হবে। প্রসাদ রায়দের মতো তরুণ কমিউনিস্টদের মধ্যে তখন বিপ্লবের নেশা। সেখানে ততোদিনে হার মেনে গেছে সকল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক স্বার্থ। কারা জীবনে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হন ১৯৫০ সালে, রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে। বন্দিদের অমানুষিক কারা শাস্তির বিরুদ্ধে রাজশাহী জেলে সোচ্চার হয়েছিল দেশবিভাগের পর এটিই ছিল কমিউনিস্টদের প্রথম প্রকাশ্য বিদ্রোহ। আর এ বিদ্রোহকে দমন করতে রাজশাহী জেলের সকল কমিউনিস্ট বন্দিদের খাপড়া ওয়ার্ডে নিয়ে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। হাতের কাছে যা ছিল তাই নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে কমিউনিস্টরা। সাতজন কমরেড শহীদ হন, মারাত্মক জখমের তালিকায় প্রথমজন প্রসাদ রায়। বেপরোয়া গুলির পর ২ ঘন্টা ধরে চলেছিল বিরামহীন লাঠিচার্জ। প্রসাদ রায়ের বাম উরুতে গুলি লেগেছিল সাতটি, লাঠিচার্জে উড়ে গিয়েছিল সামনের পাটির দাঁত, মাথা ফেটে অস্বাভাবিক রক্তপাত হয়েছিল। গভীর রাতে ঘটে যাওয়া হত্যাযজ্ঞের পর আহত কমরেডদের হাসপাতারে নেয়া হয় পরদির দুপুরের পর। সময়মতো চিকিৎসা পেলে হয়তো শহীদের তালিকা কিছু সংক্ষিপ্ত হতো। আশ্চর্যজনক ভাবেই বেঁচে যান প্রসাদ রায়। যতোবার তাঁর কাছে খাপড়া ওয়ার্ডের গল্প শুনেছি, প্রতিবারই শুনেছি-বেঁচে আছি এটাইতো বোনাস! ২২ বছর বয়সে যেমন বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন গুলির মুখে, আমৃত্যু দেখেছি তেমনই বিরূদ্ধ বাতাসে রুখে দাঁড়াতে। ’৭১ এ মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনীর অন্যতম সংগঠক ছিলেন। করিমপুর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে স্থির ও অবিচলভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। ‘না’ বলতে পারতেন খুব স্পষ্টভাবে। যখনই অন্যায় তখনই প্রতিরোধ। একবার পাবনা জেলা প্রশাসনের ডাকা এক সভায় স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি দেখে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করেছিলেন, স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে কোনোভাবেই একসাথে আলোচনা হতে পারেনা, কোন ইস্যুতেই না। একবার প্রশাসন প্রস্তাব করেছিল সভাটি বাতিল করার। কিন্তু তার ধমকের মুখে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েছিল জামাতের প্রতিনিধিদের বের করে দিয়ে সভা চালাতে। নিজস্ব স্বভাবসুলভ দৃঢ়তার কারণেই পরিণত হয়েছিলেন পাবনার রাজনৈতিক অভিভাবকে। সকল রাজনৈতিক সংকটে তাঁর বাড়িই ছিল সভাস্থল। শেষ সিদ্ধান্তের জন্য তাঁর দিকেই দৃষ্টি সবার। আর সরল সমাধান আসতো তার কাছ থেকেই, যা মানতে কারোরই কোনো দ্বিধা কাজ করতো না। বোনাসে পাওয়া জীবন নিয়ে তার সাহসের অন্ত ছিল না। আচরণে ছিল একটা তোয়াক্কা না করা ভাব। এজন্যই শাসনযন্ত্র ভয় পেতো তাঁকে। বিষয়টা ঠিক উল্টো ছিল সাধারণ মানুষের বেলায়। মানুষ তাকে বন্ধু ভাবতে পারতো অনায়াসে, ভালোবাসতো প্রাণ দিয়ে। সাহসের মতোই অনন্য আরেক হাতিয়ার ছিল তাঁর, তা হলো কণ্ঠ। ভরাট উদাত্ত কণ্ঠ ছিল তাঁর। কোনো অনুষঙ্গ দরকার হতোনা, খালি গলায়ই গাইতেন। জেলখানায় প্রসাদ রায়ের উদাত্ত গণসঙ্গীতই ছিল প্রতিবাদের হাতিয়ার। জেলখানায় রাজনৈতিক ক্লাসের পাশাপাশি গলা ছেড়ে গাইতেন- ইসবার লড়াই লানেওয়ালে বাঁচকে না জানে পায়েগা। যো চাল্ চলেগী হিটলারকী ও হিটলারকী তরহ্ মিট যায়েগা। নবীন কমরেডরা প্রাণে উদ্দীপনা পেতেন তাঁর গানে। আর অমন দরাজ কণ্ঠে কণ্ঠ মেলালে বুকে সত্যিই বেড়ে যায় সাহস, মস্তিষ্কে ব্যাপৃত হয় বিপ্লবের স্বপ্ন। প্রসাদ রায় প্রান থেকে প্রাণে স্বপ্ন ছড়িয়ে দিতে জানতেন, জানতেন প্রাণে প্রাণে মিশে যেতে। চমৎকার দোতারা বাজাতে পারতেন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ছিল অনায়াস দখল। দিনব্যাপী পার্টির জটিল তাত্ত্বিক সভার পর মধ্যরাতে তাঁর ঘর থেকে ভেসে আসতো ভরাট কণ্ঠে মিয়াকিঁ মল্লার বা মালকোষের তান। আছন্ন ডুবে আছেন সুরে, একাকী। বিস্ময় জাগতো, মাঝে মাঝে কিছুটা যেন অচেনাও লাগতো। ব্যক্তিজীবনে তার সন্তান হিসেবে তাকে দু’ভাবে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। প্রথমত, বাবা হিসেবে; দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক নেতা হিসেবে। খুব ছোটবেলায় যখন বানান করে ‘সবুজসাথী’ পড়া চলছে আমার, তখন পার্টির নানা কর্মকাণ্ডে ঢাকায় এলে দু’হাত ভরে নিয়ে যেতেন বই। কৈশোরেই নিকোলাই অস্ত্রভস্কি তার হাত ধরে ঢুকে পড়েছিলেন আমাদের পড়ার ঘরে। আশৈশব আমাদের সাথি ছিল পিতার জেলজীবন। আমি ঠিক মনে করতে পারি না কবে প্রথম পুলিশ এলো আমাদের বাড়িতে। কবে প্রথম মায়ের হাত ধরে আমরা দাঁড়ালাম সেন্ট্রাল জেলের শিক ছুঁয়ে! কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি তখন প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ ছিল। হয় জেল, নয় আত্মগোপনে থেকে পার্টির কাজ। মনে পড়ছে, আমরা দুই ভাইবোন মায়ের সঙ্গে সন্ধ্যার পর অনেক দূরের রাস্তা পাড়ি দিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। অদ্ভুতরকম গা ছমছমে ছিল সেসব রিকশাযাত্রা। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে শেষে যখন পৌঁছাতাম অচেনা কোনো কৃষকের বাড়িতে, কুপির টিমটিমে আলোয় বাবার কোলে বসে তামাকের ঘন গন্ধ নিতে নিতে আমরা ভুলে যেতাম সব অনিশ্চয়তা। আর যখন প্রসাদ রায়ের মুক্তি চেয়ে রাজপথে ঝাঁঝালো মিছিল নামতো, আমরা দুই ভাইবোন জানালা দিয়ে দেখতাম আর ঠিক করে ফেলতাম বড় হয়ে আমরাও রাজবন্দি হবো। তিনি জানতেন জীবন সংগ্রামের। তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সংগ্রাম ছিল তার। আদর্শের সাথে জীবনাচারণকে মেলানোর আশ্চর্য শক্তি ছিল। যা বলছেন তা বিশ্বাস করছেন এবং জীবনে তার চর্চা করে চলেছেন। এ এক জটিল সংগ্রামেরই নাম। এ লড়াই সবাই পারে না, তিনি পেরেছিলেন। বাড়িতে যখন দিনব্যাপী মিটিং চলতো তখন দেখেছি, শুনতেন খুন মনোযোগ দিয়ে, যেন প্রথমবার শুনছেন। বোঝাতেন আরোও মনোযোগ দিয়ে, আরোও সরল করে। বহুমত ধারণ করতে পারতেন। প্রভাবিত করতে পারতেন আরো বেশি। শ্রমিক থেকে শুরু করে বিদগ্ধ বুদ্ধিজীবী প্রসাদ রায় সবার বোধগম্য করে বলতে পারতেন। এ এক অসাধারণ ক্ষমতা। বিশাল হৃদয় না হলে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠা যায় না, বহুমত ধারণ করা যায় না। মিশে যাওয়া যায় না সাধারণ মানুষের কাতারে, সামিল হওয়া যায় না তার যুদ্ধে। হয়ে ওঠা হয় না সাচ্চা কমিউনিস্ট। প্রসাদ রায় ছিলেন সাচ্চা কমিউনিস্ট। কৃষক শ্রমজীবী মানুষের লড়াইয়ের সাথী, কমরেড। ‘কমরেড মানে মজুর পার্টির লোক, কমরেড মানে কিষাণ পার্টির লোক, কমরেড মানে বিশাল হৃদয়, অগ্নিগর্ভ চোখ।’ পাহাড়ের গায়ে জন্ম নেয়া গুল্ম যেমন বুঝতে পারে না পাহাড়ের বিশালতা, তেমনই এই বিশাল মানুষটির খুব কাছ থেকেও তাকে জানা হয়নি ভালো করে। সেই না জানার বেদনা আজ বড়ো বেশি আছন্ন করে। প্রতি মুহূর্তে অনুভব করি, শোষিত মানুষের রাজ কায়েম করতে তার মতো বিরাট হৃদয় কমিউনিস্টের আজ বড়ো দরকার। বিশাল হৃদয় আর অগ্নিগর্ভ চোখ আজ বড় দরকার–স্বপ্ন ধারণ করতে আর বিপ্লব গড়ে তুলতে। লেখক : কমরেড প্রসাদ রায়ের কন্যা