শ্রমিক শ্রেণি জেগে উঠুন

Posted: 11 ফেব্রুয়ারী, 2024

উন্নয়নের জোয়ার? দেশে নাকি উন্নয়নের জোয়ার বইছে। প্রমাণ কি? বলা হচ্ছে গড় প্রবৃদ্ধির হার দীর্ঘকাল ধরে ৬-৭ শতাংশ হচ্ছে। গড় আয় বাড়ছে। গড় প্রাথমিক শিক্ষার ভর্তি হার বাড়ছে। মাতৃমৃত্যুর হার, শিশুমৃত্যুর হার, ইত্যাদি গড় সূচকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারত-পাকিস্তান উভয়কে অতিক্রম করে গেছে। এমনকি নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনও বাংলাদেশের উন্নয়নকে অনেক উচুঁতে স্থান দিয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ করুন পদ্মা সেতু, টানেল, মেট্রো ইত্যাদি অবিরাম প্রচারিত গৌরবগাঁথা। কিন্তু যারা এটা বলছেন বা ভাবছেন তারা অন্য কথাগুলো বলছেন না। আমরা সবাই জানি যে এগুলো নিছক গড় উন্নয়নের ইতিবাচক চিহ্ন হলেও এর প্রত্যেকটির সঙ্গে এর বিপরীত বৈশিষ্ট্যগুলিও বিজড়িত হয়ে আছে। কথায় বলে, ‘গড়’ হচ্ছে সবসময় একধরনের ফাঁকি। আমার অর্ধেক শরীর চুল্লিতে আছে আর অর্ধেক শরীর পানিতে আছে। গড়ে আমি নাতিশীতোষ্ণ আছি– এ কথাটা যেমন গড়ে সত্য হলেও আসলে এটা হাস্যকর বটে। কোনো দেশের ৫০ শতাংশ লোক যদি ৫০ শতাংশ আয় নিয়ে মধ্যবিত্ত জীবনযাপন করেন, আর বাকি ৫০ শতাংশ আয়ের ৪০ শতাংশই যদি উপরের ১০ শতাংশের পকেটে চলে যায় এবং নিচের ৪০ শতাংশ লোককে যদি মাত্র তার থেকে অবশিষ্ট মাত্র ১০ শতাংশ আয় নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাহলে অবস্থাটি কি খুব সুষম বলা যাবে। গড় বৃদ্ধি পেলেও তার বণ্টন যদি অসম হয়, যদি দরিদ্রদের আয় বাড়ে শামুকের গতিতে তাহলে সেটা কি ক্রমাগত একটি বৈষম্যপূর্ণ অমানবিক অর্থনীতি ও সমাজের জন্ম দেবে না? ন্যূনতম মজুরির দাবি সম্প্রতি শ্রমিক শ্রেণি বিশেষত: সংগঠিত খাত পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা এবং চা বাগানের শ্রমিকরা গর্জে উঠেছিল ন্যূনতম মজুরির দাবিতে। উন্নয়নের ছোয়া তাদের সংসারে আসে নি। প্রথমে আত্মসন্তুষ্ট মালিকপক্ষ অবশ্য এই দাবিতে কান দেয় নি। কিন্তু পাঁচ বছর পর ন্যূনতম মজুরি সংশোধনের প্রয়োজন অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। মুদ্রাস্ফীতির ফলে শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি গত পাঁচ বছরে প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। তার ওপর পাটকল, ট্যানারি, চিনিকল এসব কারখানাগুলিও সংকটে পরে একে একে বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। এসব বন্ধ কারখানার শ্রমিকরা নিয়মানুযায়ী তাদের বকেয়া বেতন থেকেও বঞ্চিত থাকেন দীর্ঘদিন। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় শ্রমিক সংগঠনসমূহের সমন্বয়ে গঠিত স্কপ (শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ) ২০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি, অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার ও গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রণয়নের দাবিতে আন্দোলনের ঘোষণা দেন। স্কপের অন্যতম সদস্য সংগঠন টিইউসি ন্যূনতম মজুরির দাবির সঙ্গে পাশাপাশি মহার্ঘ্য ভাতা ও শ্রমিকদের জন্য রেশনের দাবি যুক্ত করে আন্দোলন চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। এছাড়া পোশাক খাতের শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরির দাবি পুনর্নির্ধারণ করে ঘোষণা দেন মাসিক ২৩ হাজার টাকা। সেটা নিয়ে কেউ কেউ আরো উচুঁতে দাবি করেন। এরপর শ্রমিকদের ওপর গুলি চালানো হয়। কমপক্ষে ৩ জন শ্রমিক শহীদ হন। এতদিনে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে শ্রমিকদের ভোগ্যপণ্য বা চাল-ডাল-ভোজ্যতেল-জ্বালানির দাম ও বাড়ি ভাড়া যদি বেড়ে যায় তাহলে মহার্ঘ্য ভাতা না দিলে শ্রমিকদের প্রকৃত আয় অনিবার্যভাবে কমে যাবে। তাই তাদের নতুন করে চিন্তা করতে হবে। তাদের এই বাজার মৌলবাদী নীতির অনুসারী ও সিণ্ডিকেটের কাছে অসহায়। সরকার যদি তাদের রেশনের ব্যবস্থা করে না দেয় তাহলে তাদের পক্ষে জান বাঁচানোই কষ্টকর হয়ে পড়বে। জান বাঁচানো ফরজ। তাই তারা আজ রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন। জান বাঁচাও - রেশন দাও সম্প্রতি বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতের অন্যতম সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি সকালে প্রধানমন্ত্রীকে এইসব দাবিতে একটি স্মারকলিপি প্রদান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ঐ দিন বেলা ১১টায় প্রেসক্লাবে থেকে এই অভিযাত্রা শুরু করার কর্মসূচি তারা ঘোষণা করেছেন। তাদের স্মারকলিপির শিরোনাম হচ্ছে ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ এর একটু নিচেই তারা লিখেছেন, ‘রেশন দাও - জান বাঁচাও’। এটা এখন তাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রাণের দাবি। তাদের অন্যান্য সংযোজিত দাবিগুলি হচ্ছে– কারখানায় কারখানায় চাল, ডাল, তেল, আটা ও শিশুখাদ্য রেশনের মাধ্যমে প্রদান করতে হবে। গ্রেড কারচুপি করে মালিকরা পরবর্তীতে সরকারিভাবে নির্ধারিত ও প্রতিশ্রুত নিম্নতম মজুরিটুকুও (সেটা ২৩০০০ টাকা না হয়ে নির্ধারিত হয়েছে মাত্র ১২৫০০ টাকা) এখন সর্বত্র গ্রেড অনুযায়ী যার যেটা প্রাপ্য তা দিচ্ছে না। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের এই কারচুপি বন্ধ করে ভদ্রলোকের মতো প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে মালিকদের। এছাড়া চাকুরিচ্যুতি, নির্যাতন, গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি ও শ্রমিক হত্যার বিচারের দাবিগুলিও তাদের স্মারকলিপিতে উল্লেখিত হয়েছে। আমরা সকল শ্রমিককে আজ আহ্বান জানাই, আপনারা জেগে উঠুন, পোশাক শ্রমিকদের মিছিলের কাফেলায় যোগ দিন। আমাদেরও হয়তো এই বাজারে আন্দোলন করলে চাকরি হারানোর ভয় আছে। কিন্তু একথাও আমরা জানি এমনিতেই আমরা সবকিছু হারাতে বসেছি। সুতরাং, সর্বহারার শৃঙ্খল ছাড়া আর কিছু হারাবার নেই– সেই কথা আরেকবার প্রমাণ করুক বাংলাদেশ।