সমাজতন্ত্র ও লেনিন
Posted: 28 জানুয়ারী, 2024
মার্কস-এঙ্গেলস সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও সমাজ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাননি, কারণ এতে বিষয়টি হয়ে যেতো কাল্পনিক। তবে তাঁরা সমাজতন্ত্রের কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে কথা বলেছেন। যেমন- উৎপাদনের উপকরণের ওপর থাকবে সামাজিক মালিকানা। উৎপাদনের উপকরণসমূহের হবে পরিকল্পিত ব্যবহার। সাম্যবাদের হবে দুই স্তর, সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ। সমাজতন্ত্রে হবে কাজ অনুসারে প্রাপ্তি আর সাম্যবাদে হবে– প্রয়োজন অনুসারে প্রাপ্তি। সাম্যবাদে কায়িক ও মানসিক শ্রমের বিরোধের অবসান হবে, গ্রাম ও শহরের ব্যবধানের অবসান হবে এবং ব্যক্তিবিচ্ছিন্নতা ও রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটবে।
সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ বিষয়ে মার্কস-এঙ্গেলসের আলোচনা বিমূর্ত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকৃতির। এছাড়া রয়েছে আশু মেয়াদে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার অভাব, যে বিষয়গুলোর সমাধানের দায়িত্ব পড়ে মহামতি লেনিনের ওপর। লেনিন ছিলেন রুশ বিপ্লবের সংগঠক, নেতা। সমাজতন্ত্র বিষয়ে তার থেকে নির্দেশনা পাওয়া ছিলো স্বাভাবিক। তবে বাস্তবে আগাম তেমন কিছু নির্দেশনা তাঁর থেকে পাওয়া যায়নি। তিনি বিপ্লব সংঘটিত করতে সর্বাধিক ব্যস্ত ছিলেন। তবে বিপ্লব হয়ে গেলে সমাজতন্ত্র নির্মাণের বিষয়টি এসে গেলো সামনে।
লেনিন বিপ্লবের পর মনে করেছিলেন উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোতে বিপ্লব হয়ে যাবে। তখন সেসব দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নকে সাহায্য করবে। কিন্তু লেনিন ও বলশেভিকদের এই অনুমান দ্রুত ভুল প্রমাণিত হলো। লেনিন অনুধাবন করলেন নিজেদেরই সমাজতন্ত্র গড়তে হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সেসময় আশু করণীয় ঠিক করেছিলেন। সেগুলো হচ্ছে- জাতীয়করণে বিরতি দিতে হবে, যুদ্ধকালীন পদ্ধতির জায়গায় প্রশাসনিক পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে, দক্ষ ব্যবস্থার সাথে হিসাব নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, প্রয়োজনে অধিক বেতন দিয়ে বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগাতে হবে। ব্যাংকগুলোকে গণ হিসাবরক্ষক রূপে গড়ে তুলতে হবে, ব্যাংকের সংখ্যা বৃদ্ধি করে জনগণের সঞ্চয় জমা ও তা উঠানো সহজ করতে হবে। শৃঙ্খলা বিধানের লক্ষ্যে সংগঠন গড়ে তুলতে হবে, বিশৃঙ্খলা দমন করতে প্রয়োগ করতে হবে আইনভিত্তিক বিচার ব্যবস্থার। উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনে এক ব্যক্তির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শ্রম সংগঠনে বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তার প্রয়োগ ঘটাতে হবে। উৎপাদনশীলতার সাথে মজুরির সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে, প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে। আমলাতন্ত্র প্রতিহত করতে হবে, শ্রমজীবীদের রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত করতে হবে। এভাবে ধীরগতিতে এগিয়ে সংস্কারের মাধ্যমে শুরুর সময়টাতে সমাজতন্ত্র নির্মাণ করতে হবে বলে লেনিন মত প্রকাশ করেছিলেন। তিনি এ-ও মনে করতেন, তা না হলে পুঁজিবাদের পুনরুত্থান প্রতিহত করা কঠিন হবে। কিন্তু বিপ্লবের পর পরিবেশ পাল্টে যায়, প্রতিক্রিয়াশীলরা শুরু করে গৃহযুদ্ধ। সুযোগ নেয় চারপাশের উন্নত চৌদ্দটি পুঁজিবাদী দেশ, শিশু সোভিয়েতের ওপর আক্রমণ জোরদার হয়। তখন গৃহযুদ্ধে জয়লাভই মূল করণীয় হয়ে দাঁড়ায়। লেনিনের চিন্তার উল্টোগতি দেখা দেয়।
জাতীয়করণ দ্রুত হতে থাকে এই ভয় থেকে যে এসব সম্পদ সাদা বাহিনীর হাতে পড়লে প্রতিষ্ঠানগুলো হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। মুদ্রা, ব্যাংক ঋণ ইত্যাদি ধারার পরিবর্তে অর্থনীতি মুদ্রাহীনতার ধারায় এগুতে শুরু করে; শেষে সরাসরি বিনিময় বা বার্টার পদ্ধতিতে রূপ নেয়। এই অবস্থায় লাল বাহিনী ও শহরের অবশিষ্ট শ্রমিকশ্রেণির খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য কৃষকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক খাদ্য আহরণ না করে উপায় থাকে না। শস্যলেভি আহরণে কৃষকদের উদ্বৃত্ত শস্যের জন্য কিছু না দেয়ায় এবং শিল্প পণ্যের অভাবে বাজার সংকুচিত হয়ে পড়ে। অর্থনীতিতে পণ্য-সম্পর্ক থাকে না এবং এর জায়গা দখল করে নিজেকে রক্ষা করার উৎপাদন, আদেশ-নির্ভর উৎপাদন, রেশন ও কুপন ভিত্তিক বিতরণ, সরাসরি বিনিময় ইত্যাদি।
যুদ্ধ-পদ্ধতি সর্বব্যাপী হয়, প্রশাসনিক পদ্ধতিতে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ব্যক্তির একক কর্তৃত্ব অভ্যাসে রূপ নেয়। ১৯১৮ সালের গ্রীষ্মে সোশ্যালিস্ট রেভ্যুলুশনারিদের সাথে ঐক্য ভেঙে যায়, কারণ ওরা লেনিনকে হত্যার চেষ্টা করে। এসব কারণে সাদা সন্ত্রাস মোকাবিলার জন্য লাল সন্ত্রাসের সূচনা হয়। ফলে অর্থনীতিতে যেমন বাজার সম্পর্ক সংকুচিত হয় তেমনই রাজনীতি ও প্রশাসনে গণতন্ত্র সংকুচিত হয়, যার পরিণতি শুভ হয় না।
অচিরেই যুদ্ধ-পদ্ধতি, পরে যা যুদ্ধ-কমিউনিজম নামে পরিচিতি পায়, এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। ধারণা করা হয় যে এটা কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা হতে পারে না। কৃষকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, কর্নস্তাদ নৌঘাঁটিতে বিদ্রোহ হয়। ফলে ১৯২১ সনের দশম কংগ্রেসে ‘শস্য-লেভি’ বাতিল করা হয়। New Economic Policy (NEP) প্রবর্তন শুরু হয়। ফলে পুনরায় বাজারের উৎপত্তি হয়। ব্যক্তি বাণিজ্য চালু হয়। শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি মালিকানার সুযোগ খোলে দেওয়া হয়। এছাড়া বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের জন্যও অনুমতি দেয়া হয়। এসব পদক্ষেপের কারণে সোভিয়েত অর্থনীতি ১৯১৪-১৮ সালের বিশ্বযুদ্ধ এবং ১৯১৮-১৯২০ সালের গৃহযুদ্ধকে মোকাবিলা করে পুনরুজ্জীত হতে সক্ষম হয়।
বিপ্লবের পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা লেনিনকে নতুন করে ভাবায়। তিনি জীবনের শেষ অংশে কতিপয় নির্দেশনা দেন। সেগুলো হচ্ছে-সমবায় ও কৃষক-শ্রমিক মৈত্রী, হিসাব ও নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানো ও আমলাতন্ত্র রুখে দেয়া, লেনিনের চিন্তা ছিলো গণতান্ত্রিক বিপ্লবে গোটা কৃষককুলকে পাওয়া গেলেও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে তা সম্ভব হবে না। এই বিপ্লবে শ্রমিকশ্রেণির সাথে থাকবে শুধু গরিব কৃষক। ধনী কৃষক হবে শত্রু এবং মধ্য কৃষক হবে দোদুল্যমান। অক্টোবর বিপ্লবের সাথে সাথে জোতদারদের জমি অধিগ্রহণ করে কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। ফলস্বরূপ গরিব কৃষকের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে মধ্য কৃষকের সংখ্যা বাড়ে। আর থাকে কিছু ধনী কৃষক। ফলে লেনিনের বক্তব্য অনুসারে গ্রামের কৃষকসমাজ আর সমাজতন্ত্রের পক্ষে থাকে না। এছাড়া নেপ’র অধীনে কৃষকরা তাদের উদ্বৃত্ত ফসল অবাধে বাজারজাত করার সুযোগ পাচ্ছিলো। লেনিন তখন এই ভেবে উদ্বিগ্ন ছিলেন ব্যক্তি বাণিজ্যের সুযোগ নিয়ে কৃষকরা কি না আবার পুঁজিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তিনি ১৯২৩ সালে তাঁর ‘সমবায় সম্পর্কে’ প্রবন্ধে একটি নতুন চিন্তা করেন। তিনি দেখান যে, সমবায়ের মাধ্যমে মধ্য কৃষকের ব্যক্তিস্বার্থ ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মাঝে মিল করা যাবে। ফলে কৃষকদের পুঁজিবাদের দিকে গমন রোধ করা যাবে। এভাবে মধ্য কৃষককে সমাজতন্ত্রের পক্ষের শক্তিতে রূপান্তরিত করা সম্ভব, যা কৃষক-শ্রমিকের অপরিহার্য মৈত্রী ঘটাবে।
লেনিনের প্রস্তাবিত সমবায় উৎপাদন-সমবায় ছিলো না। এটা ছিলো বাণিজ্য-সমবায়। তিনি তখন লক্ষ্য করেন যে এই বাণিজ্য-সমবায় গঠনের জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে। এজন্য পুঁজিবাদী সংস্কৃতি থেকে আলাদা ধরনের এক উন্নত সংস্কৃতির প্রয়োজন। সে উদ্দেশ্যে লেনিন শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আয়োজনের ভেতর দিয়ে সকল কৃষককে সমবায়ে নিয়ে আসার কর্মসূচি গ্রহণের ডাক দেন।
হিসাব ও নিয়ন্ত্রণ: হিসাব ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়টি হচ্ছে, অর্থনৈতিক বিষয়গত নিয়মাবলি মেনে চলা। লেনিন সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির শুরুর সময়টাকে মুদ্রাহীন সরাসরি বিনিময়ভিত্তিক অর্থনীতি হিসেবে দেখেননি। তিনি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রতিযোগিতা সংগঠন, শ্রম-শৃঙ্খলা বজায়, প্রণোদনা দেয়ার ব্যাপারে জোর দেন। তিনি ধীরগতিতে সংস্কারের দিকে এগুনোর আহ্বান জানান।
লেনিন তাঁর মেধা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে দেখতে পান প্রশাসনিক অদক্ষতার বিষয়টি এবং আমলাতন্ত্রের বিপদকে। সোভিয়েত রাষ্ট্র ও পার্টির মধ্যে তিনি আমলাতন্ত্রকে শনাক্ত করেন। তিনি লক্ষ্য করেন পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত এবং ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তিনি পার্টির কন্ট্রোল কমিশনকে কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় উপস্থিত থাকার ও সকল কাগজপত্র ও দলিলের সঠিকতা পরীক্ষা করার প্রস্তাব করেন। পার্টির সাধারণ সম্পাদককে পর্যন্ত এর থেকে বাদ রাখেননি। বাস্তবে তিনি সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে স্ট্যালিনকে বাদ দেয়ার কথা বলেন। স্বাস্থ্যগত কারণে লেনিন পার্টির দ্বাদশ কংগ্রেসে থাকতে না পারায় প্রতিনিধিদের কাছে স্ট্যালিনকে বাদ দেয়ার জন্য চিঠি লেখেন। বাস্তবে ঘটে উল্টোটি, স্ট্যালিন তার ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হন। তিনি কৃষিতে বাণিজ্য-সমবায়ের পরিবর্তে বলপূর্বক যৌথায়নের পদক্ষেপ নেন। এর ফলে দ্রুত শিল্পায়নের জন্য কৃষকের উদ্বৃত্ত নিয়ে আসা সম্ভব হলেও কৃষক-শ্রমিকের মৈত্রীতে ফাটল ধরে। উৎপাদন কমে যায়, ক্ষতি হয় গবাদি পশুর। নিজের ভোগের জন্য কৃষকের সামান্যই অবশিষ্ট থাকে। ফলে দুর্ভিক্ষে প্রায় ত্রিশ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে নিম্ন উৎপাদনশীলতা সোভিয়েত কৃষির একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে রূপ নেয়।
শিল্পায়নে বলপূর্বক দ্রুততা আরোপিত হয়। অর্থনীতির বিষয়গত নিয়মাবলিকে মানা হয় না। মুদ্রা, পণ্য-সম্পর্ক, বাজারের মৌলিক প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করা হয়। ব্যবস্থাপনা আদেশভিত্তিক হয়। অর্থনীতি নিরঙ্কুশ পরিকল্পনার রূপ নেয়। এতে দ্রুত ভারী শিল্পের বিকাশ হলেও সম্পদের বিপুল অপচয় ঘটে। অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। স্বতঃস্ফূর্ত প্রযুক্তির বিকাশ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে অর্থনীতিতে অদক্ষতা বাসা বাঁধে।
লেনিনের মৃত্যুর পর সমাজতন্ত্র সংকটে পড়ে। নানা সমস্যা ও বিচ্যুতি দেখা দেয়। ফলে পরবর্তীতে নানা কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নে এক পশ্চাৎপদ ধরনের সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তা ৭০ বছর অতিক্রম করার আগেই ধসে পড়ে। যদি লেনিনের চিন্তাকে বাস্তবসম্মতভাবে অনুসরণ করা হতো তাহলে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের এমন বিপর্যয় হয়তো হতো না। আজকে অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেন, তাহলে সমাজতন্ত্র-ভাবনা শেষ হয়ে গেলো কি?
সমাজতন্ত্র কারো ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। এটা নিছক নৈতিকতার বিষয়ও না। সমাজতন্ত্র ইতিহাস বিবর্তনের ফল। এটি মার্কস-এঙ্গেলসের স্পষ্ট বিজ্ঞানভিত্তিক বক্তব্য। শত্রুর মুখে চুনকালি মেখে ভালোই চলছিলো লেনিন প্রতিষ্ঠিত সমাজতন্ত্রের অগ্রযাত্রা। কিন্তু সত্তরের দশকের শেষাংশে এসে এই ব্যবস্থাটির ওপর সমালোচনার ঝড় ওঠে, বিশেষ করে পশ্চিমের দেশগুলোতে। তখনকার সমাজতান্ত্রিক নেতৃত্ব এর সন্তোষজনক কোনো জবাব দেয়নি। অনেকেই মনে করেন এই নেতৃত্বের মধ্যে আদর্শগত স্খলন ঘটেছিলো এবং এর সাথে মিশে ছিলো অন্যান্য কারণসমূহ। আর ১৯৯০ সালে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছিলো প্রচণ্ড প্রতাপশালী সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো। এতে উল্লাসে ফেটে পড়েছিলো পুঁজিবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদ। দাবি ওঠে পুঁজিবাদ চিরস্থায়ী এবং এরপর আর কোনো সমাজ নাই, এটাই শেষ কথা। তাহলে একটা প্রশ্ন পৃথিবীর খেটেখাওয়া মানুষের সামনে এসে যায়- মুক্তির স্বপ্ন, ন্যায়ের প্রত্যাশা, একটি শোষণহীন সাম্যের সমাজ গড়ার কামনা কি শেষ হয়ে গেলো? না। মানুষের মুক্তির স্বপ্ন চিরজাগ্রত, চলমান এবং সাফল্য অবশ্যম্ভাবী। কারণ পৃথিবী ও মানুষের সমাজ পরিবর্তনশীল এবং গতি সামনের দিকে, মার্কসবাদ-লেনিনবাদ সে কথাই বলে। সুতরাং পুঁজিবাদই শেষ কথা দাবিটি ভ্রান্ত এবং উদ্দেশ্যপূর্ণ। পুঁজিবাদে সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতি মানুষের সমস্যার সমাধান নেই এবং সে নিজে তার সৃষ্ট সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। বর্তমান পৃথিবী এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ, উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- ১৯৯৫-এর মেক্সিকো সংকট, ১৯৯৭-এর পূর্ব এশীয় সংকট, ২০০২-এর আর্জেন্টিনা সংকট এবং ২০০৮ থেকে দুনিয়াব্যাপী অর্থায়ন সংকট। ২০২২-২৩-এ এসে ইউক্রেন ও ফিলিস্তিনে যুদ্ধ বাঁধিয়ে সাম্রজ্যবাদ তার নানা সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। স্পেন ও গ্রিসসহ পৃথিবীর বহু দেশে ব্যাপক বেকারত্ব, বৈষম্যের বৃদ্ধি, প্রকৃত মজুরি হ্রাস, বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন, যেমন- আমেরিকার ‘ওয়াল স্ট্রিট দখল কর’ আন্দোলন। তাছাড়া বর্তমান রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর আর্থ-সামাজিক অবস্থা পুঁজিবাদে এসে আগের চেয়ে ভালো হয়ে যায় নি। ফলে ‘পুঁজিবাদই শেষ কথা’ এই অভিমত টেকে না। তাই একটি বিকল্প সমাজ প্রতিষ্ঠায় মানুষের প্রাত্যহিক লড়াই ক্রমশ বেগবান হচ্ছে। মানুষ সে জায়গাটায় পৌঁছাতে নতুন পথেরও সন্ধান করে চলেছে। ল্যাটিন আমেরিকার মানুষ বামপন্থিদের ক্ষমতায় নিয়ে আসছে, মধ্য আমেরিকায়ও একই ঘটনা ঘটছে। পুঁজিবাদী সংকটের মাঝে টিকে থাকতে ‘সামাজিক ও সংহতি অর্থনীতি’ নামক নতুন আর্থ-সামাজিক খাতের সৃষ্টি হয়েছে, যা এখন উন্নত পুঁজিবাদী দেশ স্পেন ও ফ্রান্সে পর্যন্ত বিস্তার লাভ করছে, যার সূত্রপাত ল্যাটিন আমেরিকায়। আরব দেশের মানুষ স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্তি চাচ্ছে, নেপালে কমিউনিস্টরা ভোটে নির্বাচিত হয়ে যাচ্ছে। এমনকি ইরাকে কমিউনিস্টরা নির্বাচনে চমক দেখিয়েছে। চীন একটা আঁকাবাঁকা পথে এগুচ্ছে। কিউবা বাজার ও ব্যক্তিমালিকানা বিষয়ে সংস্কার করছে। সবই শোষণহীন সমাজ কায়েমের লক্ষ্যে নানা পথ, লেনিন যেমন দেখিয়েছিলেন। সুতরাং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ভাবনা তিরোহিত হয়নি, যা সূত্রায়িত করেছিলেন মার্কস-এঙ্গেলস এবং বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করে দেখিয়েছিলেন লেনিন। তাই নির্যাতিত মানুষ আজো বুক চিতিয়ে উচ্চারণ করে, ‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন’।
লেখক : কলামিস্ট