নজরুলের রাষ্ট্রচিন্তা

Posted: 19 নভেম্বর, 2023

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্য ও লোকসমাজে ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে পরিচিত ও জনপ্রিয়। আমরা নজরুলকে ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে আমাদের প্রয়োজনে ভূষিত করেছি। ঔপনিবেশিক শাসকের বিরুদ্ধে নজরুল যেভাবে বিদ্রোহের আঙুল তুলেছেন সেটা অনন্য। তেমন সাহস আর নির্ভীকতা সমসাময়িক আর কোনো কবির মধ্যে দেখা যায় না। পরাধীন, ভগ্নস্বাস্থ্য, খণ্ডিত, অসহায় বাংলার প্রতি নজরুলের যে দায়বোধ ছিলো, নজরুলের যে মমত্ব ছিলো সেটার উৎস বা ভিত্তিভূমি কি? যে দায়বোধ থেকে নজরুল আমরণ শুধু ভাঙা-গড়ার খেলা আর উন্মাদনায় নিজেকে মাতিয়ে রাখলেন! কাজী নজরুল ইসলামের জীবন যেন জন্ম থেকেই সংগ্রাম মুখর। শৈশব থেকেই দরিদ্রতার সাথে কঠোর সংগ্রাম করে যার বেড়ে জীবনের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত যিনি দুটো পয়সার জন্য প্রকাশকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। রোগে-শোকে জীবন যার সদা জর্জরিত। কিন্তু নজরুলের বেলায় এটাই অসীম শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একারণেই দ্বিধাহীন চিত্তে নজরুল বলেছেন, ‘হে দারিদ্র তুমি মোরে করেছো মহান, তুমি মোরে দানিয়াছো খ্রিস্টের সম্মান’। মক্তবে আরবি-ফারসি মিশ্রিত কবিতা রচনা থেকে শুরু করে, লেটো গানের দল, পালাগান রচনা, কবিগানে লড়াই, সৈনিক জীবন, সাহিত্যে বিদ্রোহ আর প্রেমে যার অবসান- তিনি ঈশ্বরের বুকে পদাঘাতকারী নির্ভীক নজরুল। নজরুলকে কবি হিসেবে তৈরি করেছে তার সমকাল। ভারত ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ শতক রাজনৈতিকভাবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিশ শতকের প্রথমার্ধ। এই অর্ধশতকের রাজনৈতিক উত্তাল ঘটনা প্রবাহ আমাদের সকলের জানা। নজরুলের রাজনৈতিক দর্শন ছিলো সমাজতন্ত্র থেকে উৎসারিত। আর সোভিয়েত ইউনিয়নের শ্রমিক শ্রেণির জাগরণ ছিলো তার প্রেরণা ও শক্তির মূল উৎস। পৃথিবীর ইতিহাসের দীর্ঘতর সময় ধরে শ্রমজীবী মানুষ শোষিত হবার পর এই প্রথম সামষ্টিকভাবে শ্রমজীবীরা জেগে ওঠে, বিদ্রোহ করে এবং তাদের কাঙিক্ষত রাষ্ট্র প্রবর্তন করে। ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনকারী এই জাগরণকে পুঁজী করেই নজরুল আমরণ বিদ্রোহ করেছেন রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে। নজরুলের মানসপটে বিশ্বের বঞ্চিত, শোষিত, শ্রমজীবী মানুষের শক্তি যেন একীভূত হয়েছিলো। কুলি-মজুর কবিতায় দেখা যায় সেই দৃষ্টান্ত- “দেখিনু সেদিন রেলে, কুলি বলে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে! চোখ ফেটে এল জল, এমনি করে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?” হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির স্মারক হিসেবে অসাম্প্রদায়িক নজরুলের বয়ান পাওয়া যায়- “মোরা একই বৃন্তে দুটী কুসুম হিন্দু-মুসলমান, মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।”আমরা চর্মচক্ষুতে নজরুলকে বিচার করার সময় এক ভুল সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করে বসি। ইউরোপীয় নবজাগরণের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে নজরুল মানসের এই অসাম্প্রদায়িকতা বোধ জাগ্রত হয়নি। নজরুল-বোধের বিচরণ এতো ক্ষণকালব্যাপী নয়। বাংলার শ্রেষ্ঠ মরমী কবি লালন শাহ্ অসাম্প্রদায়িকতাবোধের শিরোমণি। আর তা যেন উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন নজরুল। এই ভূখণ্ডে সম্প্রদায়গত বিদ্বেষ ব্রিটিশদের নিজ হাতে তৈরি। সেই প্রেক্ষাপটে অসাম্প্রদায়িকতা হলো নজরুল মানসের সুপ্ত বীজ। আর হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির প্রচেষ্টা তারই মহীরুহ। তিনি একহাতে লিখেছেন ইসলামী গান ও গজল। আরেকহাতে লিখেছেন শ্যামা সংগীত। সকল ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, পেশার মানুষের সহাবস্থানে এক সহিষ্ণু ও সুন্দর রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা করতেন নজরুল। কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন সমাজতান্ত্রিক আদর্শের সৈনিক। বিশেষ করে রুশ বিপ্লবের মাধ্যমে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠার পর বিশ্বব্যাপী এক আলোড়ন তৈরি হয়। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা গড়ে উঠতে থাকে। ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে মুজাফফর আহমদের সাথে কাজী নজরুল ইসলামের ওতপ্রোত ভূমিকা ছিলো। সাম্যবাদী ভাবধারাপুষ্ট নজরুল লিখেন, “বন্ধু, এখানে রাজা-প্রজা নাই, নাই দরিদ্র-ধনী, হেথা পায় নাকো কেহ খুদ-ঘাঁটা, কেহ দুধ-সর-ননী।” সাহিত্যিক অঙ্গনের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও সক্রিয় ছিলেন সমানভাবে। নির্বাচনী প্রচার ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে সশস্ত্র আন্দোলনের সাথেও তিনি যোগসূত্র রাখতেন। ভারতে ঔপনিবেশিক শাসকের হাত থেকে উৎপাদনের উপকরণের মালিকানা যতোক্ষণ পর্যন্ত শ্রমজীবী মানুষের হাতে না আসবে, ততোক্ষণ সাম্যবাদের মৌলিক বিষয়টি কার্যকর হবে না বলে মনে করতেন নজরুল। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তিই জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের মূল নিয়ামক বলে মনে করতেন নজরুল। তিনি ভাবতেন সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমেই ভারতবর্ষকে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত করা সম্ভব। আর সশস্ত্র আন্দোলনের জন্য চাই বোধের জাগরণ। সাহিত্যে তিনি সব সময় সর্বহারা শ্রেণিকে জাগানোর জন্য তৎপর থাকতেন । সর্বাহারা শ্রেণির জাগরণেই আসবে জাতীয় মুক্তি। আর জাতীয় মুক্তির পথের শেষেই স্বাধীন রাষ্ট্রের সাক্ষাৎ । নজরুল প্রকৃত অর্থেই ‘বিদ্রেহী’। জীবন, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধ স্রোতেই যার আমরণ পথচলা। স্রোতের বিপক্ষে দাঁড়ানোর যে বুদ্ধিবৃত্তিক দায়, সেটি নজরুলের মধ্যে শতভাগ ছিলো। বাঙালির জাতীয় জীবনে নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা চিরন্তন। বাঙালি মননের চিরায়ত বৈশিষ্ট্যের ধারক ও বাহক হলেন নজরুল। আমাদের কাছে নজরুল যতোটা দায়সাড়া অধ্যয়নের বিষয় হয়ে উঠেছে তা খুবই মর্মান্তিক। নজরুল আসলে ধারণ করবার বিষয়। চর্চা করবার বিষয়। চর্মচক্ষুতে নজরুলকে না দেখে গভীরভাবে তার জীবন ও দর্শনকে তলিয়ে দেখতে হবে। তবেই নজরুলের স্বরূপ উন্মোচিত হবে আমাদের কাছে।