মাটির সুরক্ষাকবচ কেঁচো

Posted: 05 নভেম্বর, 2023

হাসিনা বেগম : কৃষিজমি ও কৃষকের বন্ধু নামে পরিচিত কেঁচো প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম শস্য এবং ডাল জাতীয় রবিশস্য উৎপাদনকারী। এক গবেষণায় দেখা গেছে, কেঁচোর উপস্থিতির কারণে প্রতি বছর পৃথিবীর শস্যভাণ্ডারে যোগ হয় ১৪ কোটি টন চাল, গম, ভুট্টা, যব। শতকরা হিসেবে এই হার এ বছরে বিশ্বের মোট উৎপাদিত শস্যের ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এছাড়া প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে যে পরিমাণ শিম, বাদাম, বিভিন্ন ধরনের ডাল ও ছোলা উৎপাদিত হয়, তার ২ দশমিক ৩ শতাংশের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে কেঁচো। যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভেন ফন্টের নেতৃত্বাধীন একটি গবেষক দল সম্প্রতি এক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষিজমির মাটির নিচে কেঁচোদের বসবাস, চলাচল, খাদ্যগ্রহণ, মলমূত্র ত্যাগ এবং বংশবিস্তারের জেরে মাটিতে বিদ্যমান জৈব উপদানগুলোর গুণগত পরিবর্তন ঘটে। এতে একদিকে মাটির ভেতরে বায়ু চলাচল এবং উর্বরতা, ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ে; অন্যদিকে ফসলের জন্য ক্ষতিকর কার্বন আলাদা হয়ে যায়। কৃষিজমির এসব গুণগত পরিবর্তনের প্রভাবে ফসলের উৎপাদনও বাড়ে। গবেষক দলের প্রধান স্টিভেন ফন্টে ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা সবাই জানি কেঁচো কৃষি এবং কৃষকের বন্ধু; কিন্তু কেঁচো যে আসলে কৃষিজমির জীববৈচিত্র রক্ষার ক্ষেত্রে কত বড় ইঞ্জিনিয়ার এবং কেবলমাত্র কেঁচোর কারণে প্রতি বছর এই বৈশ্বিক খাদ্যের বাজার কী পরিমাণে সমৃদ্ধ হচ্ছে সে সম্পর্কে এতদিন স্পষ্ট ধারণা ছিল না আমাদের। গবেষণায় আমরা এই জায়গাটিতে আলো ফেলতে চেয়েছি।’ ফন্টে আরও বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের প্রচলিত ধারণা হলো মাটিতে বেশি বেশি সার, কীটনাশক ও সেচ দিলেই বেশি ফসল ফলে। কিন্তু এটি পুরোপুরি সঠিক নয়। আপনি যদি প্রাকৃতিকভাবে মাটির উর্বরাশক্তি বাড়াতে পারেন, একটি সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র গড়ে উঠতে দেন সেক্ষেত্রে জমিতে স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত সার-কীটনাশক-সেচের প্রয়োজন নেই।’ ফন্টে জানিয়েছেন, বিশ্বের কৃষিপ্রধান বিভিন্ন অঞ্চলের জমিতে কেঁচোর উপস্থিতি এবং সেসব জমির গুণগত মান পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, বিশেষ করে আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার কৃষি উৎপাদনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছে কেঁচো। যদি কেঁচো না থাকতো সেক্ষেত্রে আফ্রিকার সাব সাহারা অঞ্চল ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর বাৎসরিক কৃষি উৎপাদন ৮ থেকে ১০ শতাংশ কমে যেতো। তবে এ ব্যাপারে আরও উচ্চতর ও গভীর বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান প্রয়োজন উল্লেখ করে স্টিভেন ফন্টে বলেন, ‘আসলে এখন পর্যন্ত মাটি আমাদের কাছে একটি বিশাল আকৃতির ব্ল্যাকবক্সের মতো। আমরা এখনও মাটিকে সম্পূর্ণ বুঝে উঠতে পারিনি। আমরা এই গবেষণার মধ্যে দিয়ে এই বার্তা দিতে চেয়েছি যে মাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো কিছুই ফেলনা নয়।’ বাংলাদেশে চালানো এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, এদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষি জমির জৈব উপাদান কমে গেছে, যার ফলে ফসল উৎপাদনে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হচ্ছে। এই গবেষণায় বলা হয়েছে, ফসলি জমিতে যেখানে ৫ শতাংশ জৈব উপাদান থাকা দরকার সেখানে দেশের বেশিরভাগ কৃষি জমিতে জৈব উপাদান দুই শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। বাংলাদেশের মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন গবেষণা ইন্সটিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট আয়তনের ৫৬ শতাংশ জমিতে ফসলের আবাদ হয়। দেশটির আবাদি জমি, বনভূমি, নদী, লেক, বনাঞ্চল মিলিয়ে মোট জমির পরিমাণ এক কোটি ৪৭ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে প্রায় ৮০ ভাগ জমিতেই জৈব উপাদানের ঘাটতি রয়েছে। কৃষি জমির অবক্ষয় নিয়ে ২০০০ সালে একটি গবেষণা করা হয়েছিল। এর পর চলতি বছর একই ধরণের আরেকটি গবেষণা চালালে দেখা যায় যে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। জৈব উপাদানকে মাটির প্রাণ বলে অভিহিত করেন কৃষিবিদ এবং বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, মাটিতে যেসব পচনশীল দ্রব্য বা উপাদান থাকে যা বেশি পরিমাণে গাছ ও উদ্ভিদ শোষণ করে থাকে সেগুলোকেই জৈব উপাদান বলা হয়। তবে এর মধ্যে অনেক ক্ষুদ্র অণু উপাদানও রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নানা ধরণের অণুজীব। পুষ্টিবিদরা বলছেন, মাটিতে জৈব উপাদানের ঘাটতি হলে মানুষের উপরও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। কারণ মাটির গুণাগুণ কমে গেলে ফসল উৎপাদন করতে গিয়ে বেশি পরিমাণে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। এর ফলে ফসলের খাদ্যগুণ যেমন কমে যাচ্ছে, তেমনি এগুলো খাবারের মাধ্যমে মানুষের দেহেও প্রবেশ করছে। বাংলাদেশ ডায়েট কাউন্সিলের প্রিন্সিপাল নিউট্রিশনিস্ট সৈয়দা শারমিন আক্তার বলেন, “দেখতে বড়, পচেও না, অনেক দিন থাকছে, কিন্তু পুষ্টিগুণ কম। খেতেও আর আগের মতো স্বাদ-গন্ধ নাই।” তিনি বলেন, ‘এখন অনেক নতুন নতুন রোগ হচ্ছে। আগে যেগুলো ছিল না। তার মানে কি? মানে হচ্ছে পুষ্টি উপাদান নষ্ট হচ্ছে, যার কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে।’ বাংলা ভাষার খুব প্রসিদ্ধ এক প্রবাদ হচ্ছে, ‘কেঁচো খুড়তে সাপ বের হওয়া’। এখন সময় এসেছে নতুন প্রবাদ সৃষ্টির যেমন, ‘কেঁচো বাঁচলে বাঁচবে প্রাণ’। কেঁচো ছাড়াও এমন অসংখ্য অনুজীব রয়েছে যাদের খালি চোখে দেখাই যায়না, অথচ তারা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় মুনাফাই যেখানে একমাত্র লক্ষ্য, যেখানে মানুষের কাছে মানুষের প্রাণও গুরুত্বপূর্ণ নয়; সেখানে কেঁচো কিংবা অদেখা অনুজীবের প্রাণ রক্ষার আলোচনা হয়তো বিলাসিতা মাত্র। মানুষ প্রকৃতির এক ক্ষুদ্র অংশ, তাই তাকে বেঁচে থাকতে গেলে প্রকৃতি থেকে খাবার, পানি ও বাতাস গ্রহণ করতে হয়। এসব প্রকৃতির এমন এক অংশ, যা চর্মচক্ষে বিচ্ছিন্ন মনে হলেও বাস্তবে এক ও অভিন্ন স্বত্তার নানা রূপ। তাই মানুষকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে গেলে পৃথিবীর সকল প্রাণকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। সুরক্ষিত রাখতে হবে ভূমিবন্ধু কেঁচোকেও।