উপমহাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা ও চিন্তার দাসত্ব
Posted: 01 অক্টোবর, 2023
শিক্ষা ও দাসত্ব মানব সমাজের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো মানুষকে জীবনের জন্য প্রস্তুত করা, একটি সমৃদ্ধ সমাজে অবদান রাখার জন্য জ্ঞান ও দক্ষতা দিয়ে সজ্জিত করা। দাসত্ব মানব সমাজের একটি প্রাচীন ব্যাধি যা দীর্ঘসময় মানুষকে শারীরিকভাবে শৃঙ্খলিত থাকতে বাধ্য করেছে। উৎপাদন যন্ত্র বিবর্তিত হওয়ায় সমাজ থেকে শারীরিক দাসত্ব লুপ্ত হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক প্রয়োজনে মানুষকে শৃঙ্খলিত রাখা ও তাকে শ্রমের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি। আর এ কারণে নতুন ধরণের দাসত্ব সমাজে তৈরি হয়েছে। শারীরিককভাবে স্বাধীন মানুষকে চিন্তা ও মননে শৃঙ্খলিত করার প্রচেষ্টা দীর্ঘদিনের। শিক্ষা, শিল্পকলা, মিডিয়া ইত্যাদি এক্ষেত্রে পালন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
ইতালির প্রখ্যাত সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদ অ্যান্থনি গ্রামসি তাঁর লেখায় ‘হেজিমনি (hegemoû)’ ও ‘ডমিনানস (dominans)’ নামক শব্দযুগল ব্যবহার করেছেন। শব্দ দুটির বাংলা অর্থ যথাক্রমে আধিপত্য ও প্রাধান্য। যেকোনো শ্রেণি ক্ষমতা লাভ করতে জোর খাটায়, জোর খাটিয়ে সেই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। এই ক্ষমতা বা জোরকে গ্রামসি বলেছেন ‘প্রাধান্য’। এই প্রাধান্যকে টিকিয়ে রাখতে, তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে ঐ শ্রেণিকে ক্ষমতায় যাওয়ার আগে ও পরে জনসমাজের মাঝে ‘আধিপত্য’ প্রতিষ্ঠা করতে হয়। প্রাধান্য ও আধিপত্য একে অপরের পরিপূরক। বস্তুত যে শ্রেণির প্রাধান্যকে উৎখাত করে নতুন শ্রেণি ক্ষমতায় আসে, তার আধিপত্য এমনি এমনি ভেঙে পড়েনা, তাকে নতুন শ্রেণির চিন্তা ও আদর্শ দিয়ে সংযত করতে হয়। নইলে নতুন শ্রেণির প্রাধান্য ভেঙে পড়ে। আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করতে হয় জনসমাজের মনোজগতে। ১৯২২ সালের অক্টোবরে বেনিতো মুসোলিনি ইতালিতে ফ্যাসিস্ট সরকার কায়েম করার সাথে সাথেই শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে নজর দেন। জাতির মূল্যবোধকে প্রভাবিত করে শাসনকে বৈধ করতে জনগণকে ফ্যাসিস্ট আদর্শে মোহাছন্ন করার চেষ্টায় নামেন। ১৯২৩ সালের ডিসেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের সমাবেশে তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রয়োজন এক শাসক শ্রেণির। রাষ্ট্র শাসনের জন্য আবশ্যক কর্মকর্তাদের আমি শূন্য থেকে সৃষ্টি করতে পারব না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকেই তা ক্রমে ক্রমে গঠন করে দিতে হবে আমাদের জন্য।’
মুসোলিনির অনেক আগে থেকেই উপমহাদেশে চলমান ছিল জনসমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার শিক্ষা ব্যবস্থা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি উপমহাদেশের শাসন ক্ষমতা পোক্ত করার আগ পর্যন্ত সেটা চলছিল ধর্মের নামে। ধর্মের নামে প্রচলিত যে শিক্ষা ব্যবস্থা তা অনেকটাই দেশজ ছিল। শিক্ষিত মানুষের সাথে সমাজের যোগ ছিল। ফলে গড়ে উঠেছিলো লোকায়ত দার্শনিকগণ, সৃষ্টি হয়েছিল বস্তুবাদী বৌদ্ধ ধর্ম, বর্ণহীন বৈষ্ণববাদ, সুফিবাদ, হালে গৌড়ীয় বৈষ্ণববাদ, মরমীবাদ, বাউলবাদ এর মত মানবপ্রেমী মতবাদ সমূহ। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্ষমতা দখলের পর তাদের মত করে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে। কোম্পানি বাংলা তথা উপমহাদেশ দখলের পর তাদের দখলকে স্থায়ী করতে এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে নজর দেয়। পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে এদেশের দেশজ শিক্ষার ধারা। জনমানসে প্রোথিত করে দেশজ শিক্ষা পদ্ধতি বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা। দেশজ শিক্ষা ব্যবস্থার বিপরীতে গড়ে তোলে নতুন ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থা। যে শিক্ষা ব্যবস্থা দেশজ ছিলনা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বহিরাগত আর্যদের বৈদিক শিক্ষাব্যবস্থা, বহিরাগত মুসলমানদের ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা যদি দেশজ হয় তবে বহিরাগত ব্রিটিশদের শিক্ষা ব্যবস্থা কেন দেশজ নয়? এই শিক্ষা ব্যবস্থা কেন অগ্রহণযোগ্য?
একটা সময় পর্যন্ত ধারণা করা হত আর্যদের আগমনের ফলে আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থার শুরু। কিন্তু আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে আর্যদের আগমনের পূর্ব থেকেই শিক্ষা ব্যবস্থা চালু ছিল। যার প্রমাণ হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতার প্রত্যেক পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। আমরা যদি মহাভারতের আদিকাণ্ডে নজর দিই তাহলে দেখতে পাই, ময়দানব যুধিষ্ঠিরের সভাগৃহ নির্মাণ করেছিল। স্থাপত্যবিদ্যায় পারদর্শী ছিল দানবেরা অর্থাৎ প্রাক আর্য বাসিন্দারা। আর্যরা বিভিন্ন সময়ে দলে দলে ভারতের ভৌগলিক সীমার বাইরে থেকে এসে স্থানীয় শাসকদের পরাজিত করে বসতি স্থাপন করেছিল। তাদের পূর্বতন বাসস্থানের সাথে আর কোন সম্পর্ক রক্ষা করেনি। তারা সাথে করে যে শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে এসেছিলো সেটা আর মৌলিক থাকেনি। আর্য সাহিত্যে সুন্দরভাবে স্থান করে নেয় দেশজ গণদেবতারা। আর্যদের সামনেও কোন উপায় ছিলনা। কারণ যাযাবর আর্য উপজাতি উপমহাদেশে এসেছিলো কিন্তু সাথে পর্যাপ্ত সংখ্যক নারীকে আনতে পারেনি। ফলে বংশবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক প্রয়োজনেই তাদেরকে স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে মিশতে হয়েছিল। ফলে শিক্ষাও হয়ে উঠে দেশজ। শাসনকে বিস্তৃত করতে, বর্ণপ্রথাকে সমাজে প্রোথিত করতে সেই সময়ের শাসকগণ ধর্মের নামে তাদের মতাদর্শের শিক্ষা ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়। জনগণ স্রষ্টার অমোঘ নিয়ম বলে মানতে থাকে চর্তুবর্ণ। শুদ্ররা লাঞ্ছিত, অপমানিত হয়েও স্রষ্টার বিধান বলে নিজেকে সমর্পন করে শাসকের বেদিমূলে।
ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মক্তব ও মাদ্রাসার উদ্ভব হয়েছিল আরব দেশে ইসলাম অভ্যুদয়ের সাথে সাথেই। এদেশ জয় করবার পর মুসলমান শাসকেরা এদেশে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে। এ অর্থে ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থা যা ব্রিটিশরা এদেশে চালু করেছিল সেটি দেশজ না হলে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থাকে দেশজ বলা যায় কিনা এ প্রশ্নটি মৌলিক। আসলে উপমহাদেশে ইসলামী আমল ও ব্রিটিশ আমলের মধ্যে বিরাট গুণগত পার্থক্য আছে। ব্রিটিশরা এদেশ জয় করে একে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন তাদের উপনিবেশে পরিণত করে। উদ্দেশ্য এদেশ থেকে সম্পদ আহরণ করে নিজ দেশে প্রেরণ। অপরদিকে মুসলমান শাসকেরা কিন্তু আরব, পারস্য, তুর্কি বা অন্য কোনো দেশের অধীনে এদেশকে শাসন করেনি। তাঁরা ভারতে এসে স্থানীয় বাসিন্দাদের পরাজিত করে শাসনক্ষমতা দখল করেন এবং এদেশের বাসিন্দা হিসেবে থেকে যান। বিরাট সংখ্যক ভারতবাসী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করায় মুসলমান শাসন স্বাভাবিক রূপ নেয়। বিরাট সংখ্যক মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করায় ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন হয়। প্রথম দিকে এ শিক্ষা শাসকদের উদ্যোগে বিস্তার ঘটলেও পরবর্তীতে এর উপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছিলনা। এ শিক্ষা ব্যবস্থা তখন দেশে প্রচলিত অন্যান্য শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে পাশাপাশি চলছিল। ফলে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা দেশীয় বৈশিষ্ট্য অর্জন করে।
আর্য শাসন এবং ইসলামী শাসন দুটি শাসন ব্যবস্থাই স্থানীয় শাসনব্যবস্থা হিসেবে রূপ নেয়। উভয় গোষ্ঠীর শাসনব্যবস্থাতেই ভারতের স্বাধীন সত্ত্বা বজায় থাকে। এজন্য তাদের শিক্ষা ব্যবস্থাও ছিলো দেশজ। তবে উভয় গোষ্ঠীই তাঁদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে জনমানসে তাদের আধিপত্য (হেজিমনি) প্রতিষ্ঠায় তাত্ত্বিক ভিত্তি স্থাপনে রত ছিল। জনসমাজ দুইগোষ্ঠীর শাসক দ্বারা শোষিত হলেও সে শোষণকে নিজের অজান্তেই ধর্মের আবরণে বৈধ শাসন বলে বৈধতা দিয়েছিলো। এই দুই শিক্ষা ও শাসন ব্যবস্থার অনুসারীদের মধ্যে প্রাধান্য ও হেজিমনি প্রতিষ্ঠার যে ক্ষমতাগত ও তত্ত্বগত লড়াই তা আজও বিদ্যমান।
দুইগোষ্ঠীর এই লড়াই এর মাঝেই ব্রিটিশরা সুকৌশলে তাদের জায়গা করে নেয় এবং তাদের ক্ষমতাকে সুরক্ষিত রাখতে জনমানসে আধিপত্য (হেজিমনি) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। আর এ কারণেই প্রয়োজন হয় তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। তারা এদেশে বহিরাগত এবং এদেশকে তাদের উপনিবেশে পরিণত করে। এ কারণে তাদের শিক্ষার উদ্দেশ্য থাকে তাদের উপনিবেশিক শাসন ও শোষণকে বৈধতা প্রদান। এজন্য এদেশে ব্রিটিশ শিক্ষার ভূমিকা অন্য দুটি শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন এমন এক কেন্দ্রীয় কাঠামোর আওতায় শিক্ষাকে আনা হয় যার ফলে দেশজ শিক্ষাব্যবস্থার অপমৃত্যু ঘটে। দেশজ সাধারণ ব্যবহারিক শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রারম্ভিক স্তর হিসেবে কেতাবী শিক্ষার যে প্রাথমিক স্কুল গড়ে ওঠে তার সঙ্গে কায়িক শ্রমের সাধারণ মানুষের কোনো যোগ থাকেনা। ফলে বেশিরভাগেরই শিক্ষার আঙ্গিনা থেকে বিদায় নিতে হয়। সাধারণের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার পর উপরতলার একটি বিশেষ শ্রেণি শিক্ষা লাভের সুযোগ পায়।
ব্রিটিশ শিক্ষানীতির প্রণেতা মেকলে আর বেন্টিংক চেয়েছিলেন ইংরেজিভাবে ভাবিত ও অনুগত এক শ্রেণির প্রজা তৈরি করতে। অনুগত এসব প্রজা এদেশে ব্রিটিশ স্বার্থরক্ষা করতে ভূমিকা নেবে। দ্বারকানাথ-রামমোহন-বিদ্যাসাগর ব্রিটিশ প্রজার সমকক্ষ ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কার্যত তাদের আর ব্রিটিশ উদ্দেশ্যের মধ্যে কোন বিরোধ ছিল না। ইংজেদের এই শিক্ষানীতির ফলে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত কিছু ব্যক্তি আর বাদবাকি আপামর জনসাধারণের মধ্যে গড়ে ওঠে এক বিরাট ব্যবধান। ইংরেজি জানা লোকেরা নিজেদেরকে অন্যদের থেকে শ্রেষ্ঠ ভাবতে শুরু করে। তারা নিজেদেরকে সাধারণ জনগণ থেকে আলাদা করে ফেলেন। সাধারণ মানুষের সাথে মেলামেশা, আত্মীয়তা করা নোংরা কাজ বলে মনে করতে থাকেন। নিজেরা তৈরি হন মেকলের মানস পুত্ররূপে। তাদের মনোজগতে রচিত হয় ইংরেজি শ্রেষ্ঠ অর্থাৎ ইংরেজ শ্রেষ্ঠ। এদেশীয়দের মনোজগতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা সফল হয় ব্রিটিশদের। বাঙালিরা কেরাণি জন্মকে শ্রেষ্ঠ জন্ম ভাবতে শুরু করেন।
দেশভাগ কিংবা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর উত্তরাধিকার সুত্রে আমরা পেয়েছি ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থা। পাকিস্তান আমল থেকে আজ পর্যন্ত সমস্ত সরকার ওই শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঘষে মেজে শাসকগোষ্ঠির অনুকুলে করার চেষ্টা করেছে মাত্র। ব্রিটিশ বিদায় হওয়ার পর থেকে সমস্ত শাসকগোষ্ঠীর কাছেই ব্রিটিশ প্রদত্ত শিক্ষানীতি সমাদৃত। কারণ সমাজ বিচ্ছিন্ন এই শিক্ষানীতির ফলে যে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে তাদের সমাজের প্রতি কোন দায়বদ্ধতা থাকছেনা। তাদের সমস্ত দায়বদ্ধতা শাসক শ্রেণির জন্য। শাসকশ্রেণির মনোরঞ্জন করে আখের গোছানোর যে ধারা ব্রিটিশরা শুরু করেছিল আজও তা বহমান। নিজের অজান্তেই শিক্ষিত শ্রেণির মনোজগতে এখনও ব্রিটিশ রাজ। ফলে রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে সমাজ ব্যবস্থা সব জায়গাতেই চালু হয়েছে সেলফি সংস্কৃতি। শিক্ষা ব্যবস্থার বিপ্লবী পরিবর্তন ছাড়া শিক্ষিত গোষ্ঠীর মনোজগত পরিবর্তিত হওয়ার কোন সুযোগ নেই।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, ঝিনাইদহ জেলা কমিটি, সিপিবি।