সদিচ্ছা থাকলে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা সম্ভব
Posted: 24 সেপ্টেম্বর, 2023
বর্ষার শুরু থেকেই নদীর ভাঙন শুরু হয়েছে বিভিন্ন জেলায় এবং এখনও চলছে। প্রতি বছর প্রধান প্রধান নদীর তীরে বিভিন্ন স্থানে ভাঙন শুরু হয় জুন মাস থেকে, চলে আগস্ট-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এই কয়েক মাসে নদীগর্ভে চলে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা। বহু গ্রাম, জনপদ, ফসলের জমি হারিয়ে যায় নদীর ভাঙনে। হাজার হাজার মানুষ গৃহহারা হয়, নিঃস্ব হয়।
বছরের এই সময়টা নদীতীরের ভাঙন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেন এটা দেশবাসীর ভাগ্যের লিখন। সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলে নদীভাঙনের খবর প্রচার হচ্ছে শুরু থেকেই। নদীভাঙনের শিকার মানুষগুলো সব কিছু হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নেয় অথবা শহরাঞ্চলে ভিড় জমায় জীবন-জীবিকার তাগিদে। নদীভাঙনের মতো নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে, ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাতীয় অর্থনীতি।
নদীভাঙন রোধ সম্ভব
নদীভাঙন রোধের কি কোনো উপায় নেই? নাকি এই প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ভাগ্যের লিখন বলেই মেনে নিতে হবে? এ প্রসঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-এর একজন সাবেক মহাপরিচালক তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, “নদীভাঙন অবশ্যই রোধ করা সম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা নিয়েই তা করা যায়। এজন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর ও জোরদার সমন্বয়, ভাঙন ঠেকানোর উপযোগী নকশা প্রণয়ন, পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ, সময়মতো প্রকল্পের কাজ শুরু করা এবং দ্রুত শেষ করা।”
নদীভাঙন রোধের জন্য বাঁধ দেয়া ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মূল দায়িত্ব পালন করে পাউবো। এজন্য প্রতি জেলায় পাউবোর অফিস রয়েছে। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর অধীনে প্রয়োজনীয় জনবল থাকে। তারা সংশ্লিষ্ট এলাকায় নদীর গতিবিধি ও ভাঙন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সংস্থার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিয়মিত রিপোর্ট পাঠান। পাউবো ছাড়াও পানিসম্পদ মন্ত্রনালয়ের অধীনে আরও কয়েকটি সংস্থা রয়েছে যারা নদীভাঙন সম্পর্কিত পূর্বাভাস দেয়, গবেষণা করে, নদী ব্যবস্থাপনার উপযোগী মডেল ও নকশা তৈরি করে। এসব সংস্থার রিপোর্ট এবং মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীদের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে পাউবো নদীভাঙন রোধের পরিকল্পনা ও প্রকল্প তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠায় অনুমোদন ও বাজেট বরাদ্দের জন্য। অনুমোদন ও বরাদ্দ পাওয়া গেলেই কাজে হাত দেয়া হয়।
সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) নামে একটি গবেষণা সংস্থা রয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে। উপগ্রহের মাধ্যমে প্রাপ্ত ছবি ও তথ্যের ভিত্তিতে এই সংস্থা নদীভাঙনের পূর্বাভাস দিচ্ছে ২০০৪ সাল থেকে। মূলত দেশের প্রধান নদী যমুনা, গঙ্গা ও পদ্মার তীরের কোন কোন স্থানে ভাঙন হতে পারে এবং নদীর গতিপথ বা স্রোতধারা কোথাও পরিবর্তিত হতে পারে কি না সে সম্পর্কেই সংস্থাটি পূর্বাভাস দিয়ে থাকে। এই সংস্থার পূর্বাভাস ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সঠিক বলে দাবি করা হয়।
সমন্বয়ের অভাব
সিইজিআইএস ছাড়া আরও যেসব প্রতিষ্ঠান নদী সম্পর্কিত গবেষণা করে, তার মধ্যে ফরিদপুরের নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডাব্লিউএম) অন্যতম। এ দু’টি প্রতিষ্ঠান বন্যার পূর্বাভাস, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে এবং সরকারকে রিপোর্ট ও সুপারিশ প্রদান করে। সবকটি সংস্থার পূর্বাভাস ও রিপোর্ট এবং নিজস্ব প্রকৌশলীদের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে পাউবো নদীভাঙন রোধের কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান নদীভাঙন নিয়ে গবেষণা ও সুপারিশ করলেও ভাঙনরোধের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পাউবোর। কিন্তু এক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাব লক্ষ করা যায়।
সিইজিআইএস নদীভাঙনের পূর্বাভাস দেয় জুনের প্রথম সপ্তাহে। কিন্তু নদীর ভাঙন তখনই শুরু হয়ে গেছে বিভিন্ন স্থানে। এই পূর্বাভাস যদি আরও আগে, অন্তত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে দেয়া হয়, তাহলে পাউবো তখনই জরুরী ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে পারে, নদীভাঙনও ঠেকানো সম্ভব হয় কার্যকরভাবে। ভাঙন যেখানে চলতে থাকে, সেখানে তখনই বালুর বস্তা ফেললে তা কার্যকর হবে বা ভাঙন বন্ধ হবে, তা আশা করা যায় না। সময়মতো কাজ শুরু করলে, এবং তা দ্রুত শেষ করলে নদীভাঙন অবশ্যই রোধ করা যায়।
পাউবো এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার দায়িত্ব উচ্চতর কর্তৃপক্ষ তথা মন্ত্রণালয়ের। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সার্বক্ষণিক নজরদারি পাউবো ও অন্যান্য সংস্থার মধ্যে কার্যকর ও জোরদার সমন্বয় সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে নদীভাঙন রোধের কার্যক্রম ফলপ্রসূ করা সম্ভব। নদীভাঙন রোধের জন্য পাউবো প্রকল্প তৈরি করে, কিন্তু তার বাস্তবায়ন অনেক বিলম্বিত হয়। প্রায় সব প্রকল্প বাস্তবায়নেই এক বছর বা দু’বছর লেগে যায়। এজন্য পাউবো প্রকল্প অনুমোদনে মন্ত্রণালয়ের বিলম্ব এবং পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ না পাওয়ার কথা বলে থাকে।
মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্প অনুমোদন ও বাজেট বরাদ্দে দীর্ঘসূত্রতা একটি সাধারণ নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রেই এই অভিযোগটি পাওয়া যায়। নদীতীরের ভাঙন রোধের জন্য যথাসময়ে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। নদীভাঙন রোধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বাঁধ তৈরির কাজ জনস্বার্থে অতি গুরুত্বপূর্ণ। একাজের জন্য কোনো পর্যায়েই দীর্ঘসূত্রতা বা বিলম্ব কাম্য নয়। বরং এ ধরনের প্রকল্পকে জরুরি ভিত্তিতে অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ করা উচিত। কারণ এর সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা এবং জাতীয় অর্থনীতির প্রশ্ন জড়িত।
নদী ভাঙন রোধে পাউবোকে সিজিআইএসের পূর্বাভাসের জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়। নদীতীরের মানুষরা, বিশেষ করে যারা প্রবীন ও অভিজ্ঞ তারা কিন্তু ঠিকই বুঝতে পারেন, নদীরভাঙন আসন্ন কি না। নদীর পাড়ে দীর্ঘকাল বসবাসের কারণে তারা নদীর গতিধারা, নদীর স্রোতের তীব্রতা থেকেই ধারণা করতে পারেন, নদীর ভাঙন কখন কোথায় শুরু হবে। পাউবোর প্রকৌশলীরাও শিক্ষিত ও দক্ষ। তাদেরও বোঝা উচিত ঠিক কোন জায়গায় নদীভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে। নদীপাড়ের প্রবীণ মানুষদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে আমলে নিয়ে নিজেদের দক্ষতায় প্রকৌশলীরা ভাঙনের সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করে কাজ শুরু করে দিতে পারেন জরুরি ভিত্তিতে। এ ধরনের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ বিস্তীর্ণ এলাকা রক্ষা করতে পারে ভাঙনের কবল থেকে, হাজার হাজার মানুষকেও আর গৃহহারা হতে হয় না। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নদীর ভাঙন রোধে আগাম ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। শুধু উপগ্রহের পূর্বাভাসের অপেক্ষায় বসে থাকলে সবকিছু তলিয়ে যাবে নদীগর্ভে।
স্থায়ী ব্যবস্থা প্রয়োজন
ভাঙন রোধের জন্য নদীতীরের দুর্বল স্থানগুলিতে স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। স্থায়ী ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন ভাঙন-প্রবণ স্থানগুলিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সিমেন্ট কংক্রিট ব্লক (সিসিব্লক) ফেলে নদীতীরকে মজবুত করা, যাতে নদীর তীব্র স্রোতকে ঠেকানো যায়। এছাড়া বালুর বস্তা তথা জিও ব্যাগ, বাঁশের তৈরি খাঁচা (পারকুপাইন) ফেলেও নদীতীরকে শক্ত রাখা যায়।
যা বলা হলো, তার সব কিছুই পাউবো কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় জানে। সদিচ্ছা থাকলে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়া কঠিন কিছু নয়। নদীভাঙন বন্ধ করা গেলে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকা বাঁচবে। আশ্রয় ও জীবিকার সন্ধানে তারা শহরাঞ্চলে ছুটে আসবে না। বিস্তীর্ণ ফসলের জমি নদীতে তলিয়ে যাবে না, জনপদ, অবকাঠামো বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে। একইসঙ্গে তা জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী রাখতে অবদান রাখবে।
লেখক : সাংবাদিক, সাবেক ছাত্রনেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা