খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ‘এক যুগে সর্বোচ্চ’ দাম বেঁধে কাজ হবে?

Posted: 10 সেপ্টেম্বর, 2023

একতা প্রতিবেদক : বাজারে বাড়তে থাকা দামের লাগাম টানতে নতুন করে তিনটি পণ্যের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য বেঁধে দিয়েছে সরকার। গত সপ্তাহে পেঁয়াজ, আলু ও ডিম-এই তিন পণ্যের দাম ঠিক করে দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বেশ কিছুদিন ধরে এই তিন পণ্যের দামে বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। অবশ্য আগে কয়েক দফায় ভোজ্যতেল ও চিনির দাম বেঁধে দিয়ে তা কার্যকর করতে পারেনি সরকার। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, কীভাবে নতুন দাম কার্যকর করা হবে, তার কোনো কৌশল সরকারের নেই। সরকার বলছে, বেঁধে দেওয়া দাম কার্যকর করতে নিয়মিত বাজার তদারকি করা হবে। সরকার বলছে, এখন থেকে খুচরা পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের দাম হবে সর্বোচ্চ ১২ টাকা, প্রতি কেজি আলু ৩৬ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজ ৬৫ টাকা। দাম বেঁধে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘কোনো কারণ ছাড়াই বাজারে অনেক পণ্যের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে আলু, পেঁয়াজ ও ডিমের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যও রয়েছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এখন ন্যায্য দাম কার্যকর করব।’ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তিন পণ্যের যে দাম ঘোষণা করেছে, তা কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করেই নির্ধারণ করা হয়েছে বলেন জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। কৃষি বিপণন আইন, ২০১৮–এর ক্ষমতাবলে দাম বেঁধে দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এত দিন আমরা কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণ করে দিইনি। আজই (বৃহস্পতিবার) প্রথম তা করে দিলাম। সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই তা করা হয়েছে। আশা করছি এটা বাস্তবায়ন করতে পারব।’ সরকার এর আগে ভোজ্যতেল ও চিনির দাম বেঁধে দিয়েছিল। কিন্তু বেঁধে দেওয়া সেই দাম কার্যকর করতে পারেনি। এই ব্যর্থতার জন্য বেশ অনেকবারই বাজার সিন্ডিকেটকে দায়ী করা হয়েছিল। এদিকে একটি গণমাধ্যমকে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেছেন, ‘সরকারের উদ্দেশ্য হয়তো মহৎ, তবে বাস্তবায়ন পদ্ধতি বাস্তবসম্মত নয়। সরকারের এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে নিশ্চয়তা কোথায় যে ব্যবসায়ীরা সরবরাহ পরিস্থিতি ঠিক রাখবেন? পণ্য যে হঠাৎ উধাও হয়ে যাবে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে? স্থানীয় ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থাপনা বলতে কি কিছু আছে?’ আলু, ডিম আর পেঁয়াজের এই তেলেসমাতির মধ্যে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে বোতলজাত এক লিটার সয়াবিন তেলের দাম হবে ১৬৯ টাকা। পাশাপাশি লিটারে খোলা পাম তেলের দামও ৪ টাকা কমিয়ে ১২৪ টাকা করা হয়েছে। এই সপ্তাহ থেকেএ দাম কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। বোতলজাত ৫ লিটার সয়াবিনের দামও কমেছে একই হারে। ৮৫০ টাকার পরিবর্তে ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি হবে ৮২৫ টাকায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে যে সব জিনিসের দাম বাড়তি, সরকারি হিসাবই তা বলে দিচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, গত মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১১ বছর ৭ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ, ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। তিন পণ্যের দাম বেঁধে দেওয়ার বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মূল দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের। হয়তো বাংলাদেশ ব্যাংকের সে স্বাধীনতা নেই। তাই এদিক-ওদিক করে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তিনটি পণ্য অতিপ্রয়োজনীয় বলে সরকার দাম ঠিক করে দিয়েছে-এ খবরকে এক ধরনের সাধুবাদ জানাই। ‘তবে মুক্তবাজার ব্যবস্থায় তা কার্যকর করা সহজ হবে না। আর হুমকি যত কম দেওয়া যায়, ততই ভালো। সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে দরকার হচ্ছে নজরদারি বৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থা ঠিক রাখা। নইলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে অভিযান চালানোর অর্থ হবে ক্ষতস্থানে মলম লাগানোর মতো, যাতে মূল রোগ সারবে না।’