মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি
নারীমুক্তির স্মরণীয় ঐতিহ্য
Posted: 14 মে, 2023
একতা বিশেষ ফিচার :
আজ থেকে ৮০ বছর পূর্বে ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং বিদেশি শাসক দ্বারা সৃষ্ট বিধ্বংসী মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে বাংলার নারীসমাজ জন্ম দিয়েছিলেন এক নতুন ধরনের নারী সংগঠন। যার নাম ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’।
বাংলা তথা ভারতের নারী আন্দোলনকে এক নতুন স্তরে উন্নীত করেছিল এই সংগঠন–তার ব্যাপকতা, কর্মপ্রণালী এবং আদর্শ ও লক্ষ্য সম্পর্কে স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে; তার কর্মী ও সংগঠিকাদের দেশপ্রেম, সততা ও নিঃস্বার্থ কর্মতৎপরতা দিয়ে। প্রকৃত অর্থেই নারীদের নিজস্ব প্রয়োজনে, নিজস্ব উদ্যোগে তৈরি এই প্রথম নারী গণসংগঠন তাই আজও নারী আন্দোলনের বিষয়ে আগ্রহী নানা মতের বহু দেশি-বিদেশি গবেষকদের কাছে অধ্যয়নের বিষয়। অন্যদিকে নারী আন্দোলনের বর্তমান প্রজন্মের কর্মীদের কাছে তা এক অমূল্য অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার, যা আজও আমাদের পথপ্রদর্শন করতে পারে।
মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির ডাকে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন গ্রাম-শহরের হাজার হাজার মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত কৃষক ও মজুর মেয়েদের পাশাপাশি বহুবরেণ্য দেশনেত্রী এবং বিশিষ্ট সমাজসেবী ও সাহিত্যিগণ। প্রবল কমিউনিস্ট বিরোধিতার মধ্যেও কমিউনিস্ট নারীদেরই প্রাথমিক উদ্যোগে তৈরি ঐ সংগঠন আকৃষ্ট করতে সমর্থন হয়েছিল কংগ্রেসসহ অন্যান্য রাজনৈতিক মতেরও বেশ কিছু অনুগামীদের। যে সময় অধিকাংশ মধ্যবিত্ত গৃহিণীরা ঘরের চার দেয়ালের বাইরে কমই বেরোতেন তখন এক বছরের মধ্যেই সমিতির তিন শতাধিক শাখা গঠন ও পয়তাল্লিশ হাজার সদস্য সংগ্রহ তার ব্যাপকতার কিছু ধারণা দেয়।
এই নতুন সমিতি বাংলার মেয়েদের সামনে তুলে ধরেছিল অনেকগুলি নতুন ধ্যান-ধারণা, যা পরবর্তী যুগে দেশের নারী আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছে। সমিতি শিখিয়েছিল, লঙ্গরখানা বা দুস্থ মেয়েদের জন্য কর্মকেন্দ্র পরিচালনা কিছু অবস্থাপন্ন নারীদের দ্বারা গরিবদের প্রতি দয়ার দান নয়, সকলের যৌথ প্রয়াসে সকলে মিলে বাঁচার লড়াই-এরই অঙ্গ। মেয়েদেরই নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। আবার এ-ও শিখিয়েছিল যে সমাজে নারীর অসম অবস্থান ও বঞ্চনার জন্য দায়ী শোষণভিত্তিক সমাজব্যবস্থা। তাকে বদলাতে নারীকেও পুরুষের পাশে তার স্থান করে নিতে হবে মেহনতি মানুষের দাবি ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রামে। সারা পৃথিবীর মেয়েদের সমান অধিকারের দাবি, বিশ্বে সন্তানদের সুখী ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা সারা পৃথিবীর মেয়েদের আন্দোলনকে একই ধারায় প্রবাহিত করছে, তাও এই সমিতিই প্রথম আমাদের দেশের মেয়েদের জোরের সঙ্গে তুলে ধরে।
অর্ধ শতাব্দি পূর্বের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের দেশে ও সমাজে নারীর অবস্থানে অনেক পরিবর্তন ও অগ্রগতি এসেছে, তা অস্বীকার করা যায় না। তবু বলতে হয় আমাদের সংবিধানে যাই লেখা থাক না কেন, আজও নারী-পুরুষের সমান অধিকার, সমান সুযোগ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বীকার হয়নি। আজও আমাদের পুরুষশাসিত সমাজে নারী দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য হয়। আজও তার পূর্ণ কর্মক্ষমতা, দক্ষতা, মেধা, দেশ ও সমাজের অগ্রগতির জন্য ব্যবহারের সুযোগ থেকে সে বঞ্চিত। এতে গোটা দেশেরই সমূহ ক্ষতি হচ্ছে।
অন্যদিকে সাম্প্রতিককালে নারীর আরও সামাজিক অবমূল্যায়নের বিপজ্জনক ইঙ্গিত আমরা দেখতে পাই ক্রমবর্ধমান নারী নির্যাতনের ঘটনাবলির মধ্যে। একদিকে সরকারের মুক্তবাজারমুখী সাম্রাজ্যবাদনির্ভর পুঁজিবাদী অর্থনীতি মেয়েদের তীব্র শোষণ নিপীড়নমূলক শ্রমের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার পরিপ্রেক্ষিতে মৌলবাদী শক্তি নারীকে ঠেলে দিতে চাইছে মধ্যযুগীয় অন্ধকারে।
সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশের অর্থনীতি রাজনীতিতে যা ঘটে চলেছে তাকে স্বাধীনতা উত্তর কালের গভীরতম সংকট ছাড়া কোনো আখ্যা দেওয়া যায় না। দুঃসহ অপশাসন, গণতন্ত্রহীনতা, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, লুটপাট-দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িক হামলা, রাজনীতিতে সমাজবিরোধীদের অনুপ্রবেশ–এ সবই এই গভীর সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ। এই সকল ঘটনায় সরাসরি যারা ক্ষতিগ্রস্ত তাদের বড় অংশ নারী ও শিশু এবং শ্রমজীবী মেহনতি মানুষ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এমন বিপদের সময় আজকের নারী আন্দোলন স্থবির এবং নিছক কিছু সংস্কারধর্মী সীমিত কর্মকাণ্ডের মধ্যে আটকা পড়ে আছে। তাই দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে আট দশক আগে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি যে পথ দেখিয়েছিল তা অনুসরণ করে বাংলাদেশের সংগ্রামী নারীমুক্তি আন্দোলন আবার সুসংবদ্ধ ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশে সমর্থ হবে–সেই আন্তরিক প্রচেষ্টাই আমাদের চালাতে হবে।