বাংলা সাহিত্যে অক্টোবর বিপ্লবের প্রভাব

Posted: 20 নভেম্বর, 2022

১৭৮৯ সালে সাম্য মৈত্রী ও স্বাধীনতার বাণী নিয়ে সংঘটিত ফরাসি বিপ্লব যেমন ইউরোপীয় সাহিত্য বিশেষ করে ইংরেজি সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল, তেমনই অক্টোবর বিপ্লব আমাদের দেশসহ বিশ্ব সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ভাবাদর্শগতভাবে পাল্টে দিয়েছে। অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব শুধুমাত্র একটি দলের নেতৃত্বে সমাজের নিপীড়িত মানুষের সশস্ত্র অভ্যুত্থান ছিল না, তা ছিল প্রচলিত বিশ্বজনীন বৈষম্যভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে সম্পূর্ণ নতুন, অদৃষ্টপূর্ব ও তখন পর্যন্ত অনেকটা ধারণানির্ভর একটি বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার এক সাহসী প্রচেষ্টা। বস্তুজগতের দ্বান্দ্বিক বিকাশ ও বিবর্তনের ধারণা থেকে উদ্ভূত প্রগতিশীল পরিবর্তনের বস্তুবাদী প্রত্যয়কে ধারণ করে লেনিন নিজস্ব বোধ ও চিন্তা থেকে স্থানীয় বৈশিষ্ট্যকে মাথায় রেখে রাশিয়াতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি বিপ্লবের পরিকল্পনা করেন। জার শাসকদের সামন্তবাদী শোষণে নিপীড়িত রাশিয়াতে ভূমি সংস্কার ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় দাবি। বলশেভিক পার্টি ক্ষমতা দখল করেই বিশাল রাশিয়ার কৃষিভিত্তিক সমাজের বিপ্লবী পরিবর্তনের জন্য ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে জমির সুষম বণ্টনের বহুল প্রতিশ্রুত কাজ শুরু করেন ভূমি সংক্রান্ত ডিক্রি জারির মাধ্যমে। উৎপাদনের উপায়সমূহের ওপর ব্যক্তি মালিকানার অবসান ঘটিয়ে ইতিহাসে সর্বপ্রথম চালু করেন সামাজিক মালিকানার ব্যবস্থা। আতঙ্কিত শিল্পোন্নত ও শক্তিশালী প্রতিবেশী পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ রাশিয়ার আভ্যন্তরীণ শ্রেণিশত্রুদের সহায়তায় ঝাঁপিয়ে পড়ল নতুন এই মানবিক রাষ্ট্রযন্ত্রকে অংকুরে ধ্বংস করে দিতে। শুরু হল গৃহযুদ্ধ। চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও সেই যুদ্ধে লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টি বিজয়ী হল ১৯২১ সালের দিকে। ১৯২২ এ গঠিত হল পৃথিবীর এক ষষ্ঠাংশ ভূভাগ জুড়ে বিশাল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন। শুরু হল নবতর এক সভ্যতা ও সমাজ বিনির্মাণের মহাযজ্ঞ, যা না দেখলে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন তাঁর তীর্থদর্শন অপূর্ণ থাকতো। অক্টোবর বিপ্লব সারা পৃথিবীর মানুষের বোধ, বুদ্ধি ও ভাবনা-চিন্তার জগতে নিয়ে আসে এক আমূল পরিবর্তন। অক্টোবর বিপ্লবের পরে দুনিয়ার দেশে দেশে গড়ে উঠে কমিউনিস্ট পার্টি। বৈরী বেষ্টনীর লৌহ যবনিকার আড়ালে থেকে কঠোর বিধিনিষেধ ও দ্বাররুদ্ধ বাস্তবতায় সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি সমতাভিত্তিক নতুন সমাজব্যবস্থা নির্মাণের কঠিন কাজে অগ্রসর হয়। নেতৃত্বের মধ্যে পথ ও পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ স্বাভাবিকভাবেই ছিল এবং তা লেনিনের মৃত্যুর পর কখনো কখনো হয়তো বিকৃতি ও নৃশংসতার পর্যায়ে গেছে। কিন্তু সেদিন পৃথিবীর মানুষ সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের ছিদ্রান্বেষণের চাইতেও অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখেছে বিরুদ্ধ পরিবেশে বাইরের কোন সাহায্য ছাড়াই সীমিত সম্পদে কি দ্রুত গতিতে সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্র সব সামলে নিয়ে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-বাসস্থানের মত মানুষের মৌলিক অধিকারকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাস্তবায়িত করেছে। মানুষের মুক্তির চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের এই অভূতপূর্ব সামষ্টিক কর্মকান্ড ব্রার্টান্ড রাসেল, রোমাঁরোলা, আইনষ্টাইন, আঁদ্রে জিদ, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বিশ্বখ্যাত মনীষীদের বিস্ময় বিমুগ্ধ জয়গানে তখন ধন্য হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’ আইনস্টাইনের ‘কেন চাই সমাজতন্ত্র’, রোঁলার ‘ও রিষষ হড়ঃ ৎবংঃ’ প্রভৃতি সাড়া জাগানো বই সমূহে সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে আবেগাপ্লুত বর্ণনা ও সমাজতন্ত্রের জয়গান সারা পৃথিবীর কবি-সাহিত্যিকদের অভিভূত করে। মার্কসীয় নন্দনতাত্ত্বিক ক্রিস্টোফার কডওয়েলের ‘ওষষঁংরড়হ ধহফ জবধষরঃু’, ‘ঝঃঁফরবং রহ ধ ফুরহম পঁষঃঁৎব’ রালফ ফক্সের ‘ঞযব হড়াবষ ধহফ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব’ সারা পৃথিবীর কবি-সাহিত্যিকদের পাশাপাশি বাংলার কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করে। সামাজিক বৈষম্য ও অসাম্যের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলামসহ অনেকেই নিপীড়িত মানুষকে নিয়ে কবিতা, গল্প, উপন্যাস লিখলেও মার্কসীয় নন্দনতত্ত্বের ধারণা ১৯৩০ দশকের আগে বাংলা সাহিত্যে ব্যাপকতা লাভ করেনি। বাংলা সাহিত্যে অক্টোবর বিপ্লবের প্রথম প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ্য করা যায় নজরুলের কবিতায়। ১৯২১ সালের কমরেড মুজাফফর আহমদের প্রেরণায় তিনি শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও বঞ্চনা নিয়ে লিখতে শুরু করেন। তাঁর লেখা ‘বিদ্রোহী’, শেকল ছেঁড়ার গান’ ও ‘কুলি ও মজুর’ নামে বিখ্যাত সব শিহরণ জাগানো কবিতা মানুষকে সংগ্রামে উদ্দীপ্ত করে। ‘কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল’ বাংলায় রূপান্তর করে তিনি লেখেন “জাগো অনশন বন্দী ওঠরে যত/জগতের লাঞ্চিত ভাগ্যাহত জাগো। ” কমিউনিস্ট রাজনীতি প্রসারের পাশাপাশি ১৯৩০ এর দশকের শুরু থেকেই বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে সূচিত হয় এক বিপ্লবী রেনেঁসার কালপর্ব। ঐ তিরিশের দশকেই হিটলার ক্ষমতায় আসার পর কিন্তু ইউরোপ জুড়ে শুরু হয়ে যায় ফ্যাসিবাদী অভ্যুত্থানের প্রস্তুতির কালো অধ্যায়। ১৯৩৬ সালে ফ্রাঙ্কোর আক্রমণ থেকে স্পেনের প্রজাতন্ত্রী সরকারকে রক্ষা করতে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের ডাকে গঠিত ইন্টারন্যাশনাল বিগ্রেডে যোগ দিতে কমিউনিস্টদের পাশাপাশি সারা পৃথিবী থেকে হাজার হাজার শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী স্পেনে সমবেত হতে লাগলেন। সেই স্পেনের যুদ্ধ চিলির নোবেল জয়ী কবি নেরুদাকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। কলাকৈবল্যবাদী শিল্পী থেকে তিনি পরিণত হন গণমানুষের কবিতে। স্পেনের যুদ্ধে ক্রিস্টেফার কডওয়েল, রালফ ফক্স শহীদ হলেন। আন্দালুসিয়ার পর্বত মালার অরণ্যে হারিয়ে গেলেন যুদ্ধরত স্পেনের লোক কবি গার্সিয়া লোরকা। ইউরোপের এই টালমাটাল পরিস্থিতি এবং পাশাপাশি সোভিয়েতের অসামান্য অগ্রগতিতে সৃষ্ট এক অনাবিল শিহরণে কাঁপতে লাগলেন বাংলার কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পী সমাজ। ১৯৩০ এর দশক থেকে বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে লাগল পরিবর্তনের হাওয়া। অবশ্য সংবেদশীল মনীষী ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক্ষেত্রেও বাংলা সাহিত্যে তাঁর নিখাদ মানবিক শ্রেয়োবোধ নিয়ে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। রাশিয়া ভ্রমণ, অক্টোবর বিপ্লবের ফসল সোভিয়েত ইউনিয়নে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মত মানুষের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন ও অত্যাশ্চর্য সামাজিক অগ্রগতি দেখে রবীন্দ্রনাথ চিন্তা ও মননে একেবারেই পাল্টে যান। সমাজে চিরদিন কিছু মানুষ পিলসুজের আলোটুকু পাবে আর বাকীদের গা বেয়ে শুধু তেল পড়বে, আজন্ম লালিত সভ্যতার এই চিরন্তন চরম বৈষ্যমূলক মূল্যবোধ তিনি ঝেড়ে ফেললেন। সোভিয়েত ভ্রমণ শেষে যে জিনিসটি তাঁর ভাষায় সবচেয়ে ভাল লেগেছে তা হল সেখানে ‘ধন গরিমার ইতরতার সম্পূর্ণ তিরোভাব’ হয়েছে। অক্টোবর বিপ্লবের কথা বলতে গিয়ে বলছেন ‘এ বিপ্লব মানুষের সব চেয়ে নিষ্ঠুর ও প্রবল রিপুর বিরুদ্ধে বিপ্লব- এ বিপ্লব অনেক দিনের পাপের প্রায়শ্চিত্তের বিধান। নব্য রাশিয়া মানব সভ্যতার পাঁজর থেকে একটা বড়ো মৃত্যুশেল তোলবার সাধনা করছে যেটাকে বলে লোভ।’ কবি এরপরে আর পেছনে ফিরে তাকাননি। কবি জীবনের শেষ দশকটি যেন তিনি মাটির মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছেন। কৃষাণের জীবনের শরিক হতে চেয়েছেন, কর্মে ও কথায় সত্য সম্বন্ধ স্থাপন করতে চেয়েছেন। ‘ঐক্যতান’, ‘ওরা কাজ করে’ ইত্যাদি কবিতায় কবির শেষ জীবনের কাব্যিক প্রতীতি ও জীবনবোধ স্পষ্ট হয়। ১৯৩৬ সালে অমিয় চক্রবর্তীর অনুরোধে আফ্রিকাকে নিয়ে লেখা বিখ্যাত ‘আফ্রিকা’ কবিতায় তিনি সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের নগ্ন রূপকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে বললেন ‘সভ্যের বর্বর লোভ/নগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা।’ এ সময়েই স্পেনের ফ্যাসিস্ট বর্বরতার সংবাদ পেয়ে রবীন্দ্রনাথ বিচলিত হয়ে পড়েন। ১৯৩৬ সালের ১৮ জুন গোর্কির মৃত্যু সংবাদে আলবার্ট হলে আয়োজিত শোক সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘ’ গড়ে উঠে। ১৯৩৮-৩৯ সালের দিকে কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েন সদ্য কারামুক্ত লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মী গোপাল হালদার, ভবানী সেন, বিনয় ঘোষ, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, অনিল কাঞ্জিলাল, সমর সেন, সুধী প্রধান, সরোজ দত্ত ও চিন্মোহন সেহানবীশ প্রমুখ। এ সময়েই বাংলা শিল্প-সাহিত্য ক্রমেই প্রগতিশীল মোড় নিতে শুরু করে। ১৯৩৮ সালের ডিসেম্বরে কলকাতার আশুতোষ কলেজ হলে অনুষ্ঠিত হল প্রগতি লেখক সংঘের দ্বিতীয় সম্মেলন। সারা ভারত থেকে অনেক খ্যাতনামা শিল্পী সাহিত্যিক এতে যোগ দেন। সভাপতিমণ্ডলীতে ছিলেন মূলকরাজ আনন্দ, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু প্রমুখ। সেই সম্মেলনে রবীন্দ্রনাথের একটি বাণী পাঠ করা হয়। এর পরপরই প্রকাশিত হয় কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থিত ‘অগ্রণী’ নামে মাসিক সাহিত্য পত্রিকা। এর আগেই সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত ‘পরিচয়’ কে ঘিরে বাংলার সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদের তুমুল আড্ডা জমে উঠে। অক্টোবর বিপ্লব মানব মুক্তির সংগ্রামে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভাবজগতে যে প্রবল উদ্দীপনা সৃষ্টি করে “অগ্রণী’র প্রতিটি সংখ্যায় তার প্রতিফলন ঘটেছিল। সোমনাথ লাহিড়ী, গোপাল হালদার, ভবানী সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সমর সেন চিন্মোহন সেহানবীশ প্রমুখের লেখার পাশাপাশি রোঁলা, জিঁদ, কডওয়েল, রালফ ফক্স প্রমুখ বিশ্ব সাহিত্যের খ্যাতিমান লেখকদের লেখায় সমৃদ্ধ থাকত ‘অগ্রণী’র পাতা। এ সময়েই প্রকাশিত গোপাল হালদারের ‘সংস্কৃতির রূপান্তর’ ‘বাঙালি সংস্কৃতির রূপ’ বাংলার সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির জগতে এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী সংযোজন। বিনয় ঘোষের ‘শিল্প সংস্কৃতি ও সমাজ’ এ সময়ে প্রকাশিত হয়। ১৯৩৪ সালে সোভিয়েত লেখক কংগ্রেসে গৃহীত ‘সমাজতান্ত্রিক সাহিত্যিক আদর্শ বা ঝড়পরধষরংঃ ৎবধষরংস, ইউরোপের ঘবি ডৎরঃরহম আন্দোলন, বাংলার সাহিত্য জগতকে প্রচন্ডভাবে উদ্দীপ্ত ও আলোড়িত করে। এভাবেই বাংলার সাহিত্য জগতে সোশ্যালিস্ট রিয়ালিজমের প্রকাশ ও বিকাশ ঘটে। ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ফ্যাসিবাদী তা-বে সারা ইউরোপ কেঁপে ওঠে। ১৯৪১ সালে ২২ জুন আক্রান্ত হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর শেষ জন্মদিনের আগে লিখলেন জীবনের শেষ প্রবন্ধ ‘সভ্যতার সংকট’। ফ্যাসিবাদকে আক্রমণ করে তীব্র ভাষায় তিনি এতে লিখলেন ‘সমস্ত ইউরোপে বর্বরতা কী রকম নখদন্ত বিকাশ করে বিভীষিকা বিস্তার করতে উদ্যত। এই মানব পীড়নের মহামারী পাশ্চাত্য সভ্যতার মজ্জার ভেতর থেকে জাগ্রত হয়ে ওঠে আজ মানবাত্মার অপমানে দিগন্ত থেকে দিগন্ত পর্যন্ত বাতাস কলুষিত করে দিয়েছে।’ এ কথা আজকের দিনেও কতই না প্রাসঙ্গিক। এসময় ঢাকার তরুণ মার্কসবাদী শিল্পী সাহিত্যিকরা পার্টির ফ্যাসিবিরোধী জনযুদ্ধের ডাকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এঁদের উদ্যোগে ঢাকা থেকে ‘ক্রান্তি’ নামে একটি প্রগতিশীল সাহিত্য সংকলন বের হয়। রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যের সেন প্রমুখ এ নতুন ধারার সাহিত্য আন্দোলনে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪২ সালের ৮ মার্চ ঢাকায় ফ্যাসি বিরোধী মিছিলে গুণ্ডাদের আক্রমণে তরুণ কমিউনিস্ট লেখক সোমেন চন্দ্র নিহত হন। এ হত্যাকাণ্ডে বিচলিত হয়ে উঠেন বাংলার সব মত ও পথের শিল্পী সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী। বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তীর মতো দল নিরপেক্ষ কবি লেখকরা সেদিন এ হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা করে বিবৃতি দেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪২ সালের ২৮ মার্চ ‘ফ্যাসিস্ট বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’ গঠিত হয়। সংঘের পক্ষ থেকে এক আবেদনে শিল্পী সাহিত্যিকদের পক্ষ থেকে ফ্যাসিবাদের বিপদ সম্পর্কে উদ্বেগ ও তা প্রতিরোধে সচেষ্ট থাকতে বলা হয়। এ সময় সাংষ্কৃতিক আন্দোলনের ব্যাপক ব্যাপ্তি ঘটতে থাকাতে অনেক প্রতিভাবান কবি সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী এসে এ আন্দোলনে যোগ দিলেন। ‘গণনাট্য সংঘ’ ও ওচঞঅ -কে কেন্দ্র করে দেবব্রত বিশ্বাস, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, জোতিরিন্দ্র মৈত্র, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র প্রমুখ গানে গানে মানুষকে উদ্দীপ্ত ও অভিভূত করতে লাগলেন। বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ নাটক এসময় এক নতুন নাট্য আন্দোলনের সূচনা করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ ইত্যাদি উপন্যাস বাংলা সাহিত্যকে এক ভিন্ন নন্দনতাত্ত্বিক উচ্চতায় নিয়ে যায়। মানিক ১৯৪৪ সালে পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। বস্তুত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, গোপাল হালদার, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য্য, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, শম্ভু মিত্র, বিজন ভট্টাচার্য প্রমুখ “ফ্যাসিস্ট বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের কর্মকাণ্ড ছাড়াও পার্টির নানা দায়িত্বে ছিলেন। সংঘের প্রাদেশিক দপ্তর ৪৬ ধর্মতলা স্ট্রিটকে ঘিরে তখন চলছিল বাংলার প্রথম সারির কবি সাহিত্যিক শিল্পীদের সৃজনশীল কর্মযজ্ঞের এক মিলন মেলা। উপরোক্ত সাহিত্যিক ছাড়াও এতে আরো ছিলেন মনীন্দ্র রায়, গোলাম কুদ্দুস, নরহরি কবিরাজ, দেবী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, শওকত ওসমান, আহসান হাবীব প্রমুখ অসংখ্য কবি সাহিত্যিক। চট্টগ্রামের সোমনাথ হোর ও জয়নুলের দুর্ভিক্ষের ছবি সারা বাংলায় আলোড়ন তুলে। ’৪০ এর দশকে বিশ্বযুদ্ধের প্রলংকরী রণদামামার মধ্যে বাংলার সাংস্কৃতিক জগত অক্টোবর বিপ্লবের ভাবাদর্শে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠে এবং এর এক গুণগত উত্তরণ ঘটে। এসময় বুদ্ধদেব বসু লিখলেন ‘সভ্যতা ও ফ্যাসিজম’ নামে বিখ্যাত প্রবন্ধ। বিষ্ণু দে’র কাব্য ‘বাইশে জুন’, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘পদাতিক’ সুকান্তের ‘ছাড়পত্র’ অক্টোবর বিপ্লব ও সমাজতন্ত্রের ভাবাদর্শকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে এবং এসব সাহিত্যকর্ম উন্নত সাহিত্যিক সৃষ্টি হিসেবে বুদ্ধিজীবীও সাধারণ্যে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের অপরিমেয় আদর্শিক প্রভাব ও শক্তি বাংলার সাহিত্য জগতকে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মাতিয়ে তুলে। ফ্যাশিষ্ট বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের কাজ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। চট্টগ্রামের লোককবি রমেশশীল কবিগান পরিবেশন করে এ সময় কলকাতার সর্বস্তরের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। ইতোমধ্যে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ ও ‘আইপিটিএ’ নানাধর্মী নাটক পরিবেশন করে দর্শকদের মাতিয়ে তুলে। বাংলা সাহিত্যের প্রগতির এই ধারা কিন্তু বাংলা ভাগের পরে বর্তমান বাংলাদেশে অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। সাম্প্রদায়িকতার প্রচণ্ড বৈরী আবহে বিভক্ত বাংলার রাজনৈতিক বিপর্যয় দেশের সামাজিক সাংস্কৃতিক জীবনকে বিষিয়ে তুলে। ১৯৪৬ ও ’৫০- এর দাঙ্গা বিধ্বস্ত করে দেয় গ্রামীণ জীবন ও লোক সংস্কৃতির সংগ্রামী ঐতিহ্য। ব্যাপক সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামার মুখেও সত্যেন সেন, রনেশ দাশগুপ্ত এ দেশে পড়ে থেকে আবারো সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন। ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন বাঙালির রাজনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মরা গাঙে জোয়ারের সূচনা করে। চল্লিশের দশকেই সরদার ফজলুল করিম, শওকত ওসমান, আবু জাফর শামসুদ্দিন প্রমুখ কবি সাহিত্যিক সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন প্রগতিশীল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে। তৎকালীন ছাত্র ফেডারেশনের বেশ কিছু মুসলিম ছাত্র-যুব কর্মী এগিয়ে আসে প্রগতিশীল শিল্প-সাহিত্য চর্চায়। ভাষা আন্দোলন তাঁদের সম্মুখ সারিতে নিয়ে আসে। মুনির চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার এঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। ভাষা আন্দোলন নিয়ে জেলখানার মধ্যে রণেশ দাশগুপ্তের প্রেরণায় মুনির চৌধুরীর ‘কবর’ সম্ভবত’৪৭ পরবর্তী সময়ের প্রথম রাজনৈতিক ও গণমুখী কোন নাটক। এ সময়ে রচিত সত্যেন সেনের ‘মহাবিদ্রোহের কাহিনী’, ‘গ্রাম বাংলার পথে পথে’ ইত্যাদি ইতিহাস ও জীবনভিত্তিক উপন্যাস অক্টোবর বিপ্লবের ভাবাদর্শ ভিত্তিক চিন্তা চেতনাকে সমুন্নত করে তুলে। তাঁর বিজ্ঞানভিত্তিক লেখা- মানব চিন্তার আধুনিকতম উপাদানে ছিল সমৃদ্ধ। রনেশ দাশগুপ্তের ‘আলো দিয়ে আলো জ্বালা’ (১৯৭০) শিল্পীর স্বাাধীনতার প্রশ্নে (১৯৬৬) প্রভৃতি গ্রন্থ অবশ্যই তৎকালীন পূর্ব বাংলা ও পরবর্তীতে বাংলাদেশের সাহিত্যিকে প্রগতিশীল ভাবধারায় উজ্জীবিত কেেছ। রালফ ফক্সের “ঞযব হড়াবষ ধহফ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব”-কে ভিত্তি করে তাঁর লেখা “উপন্যাসের শিল্পরূপ” বাংলাদেশের সাহিত্য ভাবনার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য মৌলিক গ্রন্থ। এই ’৫০ এর দশকে প্রগতিশীল আদর্শে উজ্জীবিত এক ঝাঁক তরুণ কবি লেখক বাংলা সাহিত্য ও সংষ্কৃতি চর্চায় মেতে উঠেন। শামসুর রহমান, সৈয়দ সামশুল হক, হাসান হাফিজুর রহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আনিসুজ্জামান, আরো অনেকে এঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। সরকারের নির্যাতনের মুখেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে শিক্ষক ছাত্রদের মধ্যে এ সময় বাম প্রগতিশীল রাজনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা ক্রমে বাড়তে থাকে। এরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির টানাপোড়েনের মধ্যে ক্রমেই নাগরিক ও কলাকৈবল্যবাদী ভাবনা-চিন্তার আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে থাকেন। ষাটের দশককে এদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বিকাশের দিক থেকে স্বর্ণযুগ বলা যায়। এ সময়ে শামসুর রহমান, মোহাম্মদ রফিক, নির্মলেন্দু গুণসহ অনেকের কবিতায় সমাজতন্ত্র ও মানুষের মুক্তির আর্তি শুনতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের প্রধান কবি শামসুর রহমানের কাব্য সৃষ্টির ক্রমবিবর্তন দেখলেই তা স্পষ্ট হয়। প্রথম দিকের নাগরিক জীবনের কাব্যচর্চা পেরিয়ে তিনি উত্তীর্ণ হচ্ছেন “বন্দী শিবির থেকে” কাব্যগ্রন্থ হয়ে “উদ্ভট উঠের পিঠে চলেছে স্বদেশ”, “বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়”- প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ। এ সব কাব্যের অমর কবিতাগুলি দেখলে বোঝা যায় অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিকতা, জীবন ও সাম্যের জয়গান কি গভীরভাবে তাঁর কবিতায় স্থান নিয়েছে। নির্মলেন্দু গুণের “হুলিয়া” কবিতা তো আসলেই আত্মগোপনে থাকা এক কমিউনিস্ট বিপ্লবীর জীবনের শিহরণ জাগানো রোজনামচা। সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে দশকের পর দশক ধরে আত্মোৎসর্গকারী এদেশের মানুষ আন্দোলনের মধ্যেই নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে ক্রমে সমাজতন্ত্রের পথে ঝুঁকেছে, বুঝেছে অক্টোবর বিপ্লবের পরিচিত পথই মানবমুক্তির পথ। “ভলগা ও লেনিন” কবিতায় নির্মলেন্দু গুণের উচ্চারনে তার প্রতিধ্বনি শুনতে পাই- “কবির অমূর্ত স্বপ্ন বন্দী সমকাল/লেনিনে পেয়েছে মুক্তি। /.........../তাই প্রতিদিন অবিচ্ছিন্ন সূত্রে গাঁথা দুই নাম/অবিচ্ছিন্ন মনে হয় ভলগা ও লেনিন। ” বিংশ শতাব্দিতে অক্টোবর বিপ্লবের প্রভাবে বাংলা সাহিত্যে সাধারণের জীবন সংগ্রামের যে জয়গান শুরু হয়েছিল একবিংশ শতাব্দিতে এসেও মানুষের সেই জয়গান অব্যাহত আছে।