খেলা হবে : আর কত খেলবেন

Posted: 20 নভেম্বর, 2022

খেলা হবে, আমরা পত্রিকায় প্রতিনিয়ত দেখছি ক্ষমতাসীন সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক একথা বলছেন। স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের পর গত ৩২ বছর ধরে আপনাদের বহু খেলা জনগণ দেখেছে-দেখছে। এই খেলা রাষ্ট্রীয় নীতি-আদর্শ-বদলের খেলা নয়, ক্ষমতায় যাওয়া-আসার খেলা, জাতীয় সম্পদ লুটপাট, জনগণের করের টাকা, দেশ-বিদেশের কষ্টার্জিত টাকা, লুটপাট ও পাচারের খেলা। খেলা ছিল-আছে। দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিক খেলা। আসামের সশস্ত্র গোষ্ঠী উলফাকে আশ্রয় দেয়া ও ১০ ট্রাক অস্ত্র পাচারের খেলা। তার বিপরীতে বড় প্রতিবেশি দেশকে দেয়া আর নেয়ার খেলা। ২১ আগস্ট ২০০৪ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে নির্মম গ্রেনেড হামলার খেলা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল ও বিএনপির মহাসচিব মান্নান ভূঁঞার দীর্ঘ সংলাপ ও বৈঠকের খেলা। আওয়ামী লীগের ৩৬, ৪৮ ও ৯৬ ঘণ্টা হরতাল-অবরোধের খেলা। তারেক জিয়ার হাওয়া ভবন ও সচিবালয়ের মধ্যে দ্বৈত ক্ষমতা কেন্দ্রের খেলা, হাওয়া ভবনের পার্সেন্টেসের খেলা, পুলিশি নির্যাতন, হার্ট অ্যাটাক ও ক্রসফায়ারের খেলা। গণগ্রেপ্তার-মিথ্যা মামলার খেলা, ভারত-আমেরিকা-ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘের দূতায়ালির খেলা। ৯০-এর গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো ও রূপকে খেয়ে ফেলার খেলা। ২০১৪-এর ভোটারবিহীন-প্রতিযোগিতাহীন সংসদ নির্বাচনের খেলা, পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াতের জ্বালাও-পোড়াও-প্রিসাইডিং অফিসার মেরে ফেলার খেলা। খেলা দেখল মানুষ, ২০১৫ সালে জামায়াত-বিএনপির অনির্দিষ্টকালের অবরোধ, পেট্রোল বোমা-গাছ কেটে রাস্তায় ফেলে দেয়ার খেলা, ২০১৮ সালে নির্বাচনের পূর্বে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক দলগুলির সাথে সংলাপের খেলা, ডা. কামালের বিএনপির সাথে জাতীয় যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলার খেলা, ডা. কামালের ধানের শীষের মার্কা নিয়ে নির্বাচন অবতরণের খেলা, সরকারি দলের খেলা দেখলো জনগণ ২০১৮’র ৩০ ডিসেম্বরের ভোট ২৯ ডিসেম্বর রাত্রে করে ফেলার খেলা। মানুষের ভোট গিলে খাওয়ার খেলা, গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়ার খেলা। শিশু-কিশোরদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে সরকারি দলের হেলমেট-মুগর বাহিনীর নির্মম আক্রমণের খেলা দেখলো মানুষ। করোনাকালে লুটেরা ব্যবসায়ীদের শ্রমিকদের জিম্মি করা, মানুষের চিকিৎসা, খাদ্য ও চাকরি নিয়ে খেলা দেখলে দেশবাসী। খেলা দেখালেন-দেখাচ্ছেন অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্ট (অঈঞ) ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খেলা। খেলা দেখছে জনগণ, দুই পরিবারতন্ত্রের খেলা, দুই পরিবারের হাতে দেশের মানুষ ও গণতন্ত্র আজ জিম্মি। চলমান এ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ৫২, ৬২, ৬৯, ৭০’র গণআন্দোলন-গণঅভ্যুত্থান ও ৭১’র সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হওয়া এই জাতির জন্য বড়ই অপমানজনক। মানুষ দেখছে, ফুঁসছে ও বিকল্প খুঁজছে। কিন্তু বিকল্প পাচ্ছে না। বামপন্থিরাও রাজনীতির নীতি-কৌশলে দেউলিয়াত্বের পরিচয় দিচ্ছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপি একই অর্থনীতির অনুসারী। তার চালক-বাহক দুই পার্র্টিই অবাধ মুক্তবাজারে বিশ্বাসী। তারা মনে করে এবং বলে সরকার কেন ব্যবসা করবে, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবে-বাজার সবকিছু নির্ধারণ করবে। পৃথিবীব্যাপী যে নব্য উদার পুঁজিবাদী অর্থনীতি চলছে তারা এই নীতির অনুসারী। রাষ্ট্রীয় খাত, ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হওয়ার ফলে অর্থনীতি ব্যবসায়ীদের হাতে, ফলে রাজনীতিও ক্রমান্বয়ে ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে। দেশপ্রেম, মানুষের মুক্তির জন্য যে রাজনীতি ছিল তা পিছু হটে গেছে। রাজনীতি যখন ব্যবসায়ীদের হাতে যেয়ে ব্যবসায় পরিণত হয়েছে–রাজনীতিবিদরাও এখন রাজনীতিকে ব্যবসা হিসাবে নিয়েছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এখন ধন অর্জন ও ধনবান হওয়ার বড় হাতিয়ার। তাই লুটেরা ব্যবসায়ী, লুটেরা আমলা, লুটেরা রাজনীতিবিদ ও সোশ্যাল ক্রিমিন্যালদের এক শক্তিশালী পাপচক্র সৃষ্টি হয়েছে। যারা দেশের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষমতার মালিক। এরা সমাজের মাত্র ৫ ভাগ। এই পাঁচ ভাগ বাকি ৯৫ ভাগের উপর শাসন-শোষণ চালাচ্ছে। খেলাপীঋণ ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা, ১১ লাখ কোটি টাকা গত ৯ বছরে বিদেশে পাচার হয়েছে। এলএনজির ওপর নির্ভর করে গ্যাস অনুসন্ধান ঠিকভাবে না করা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ভয়াবহ রূপ নেওয়া, এর ফলে মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমে যাওয়া, বিক্রিতে মন্দা, উৎপাদন কমতে থাকা এবং রিজার্ভ কমতে থাকার কারণে আইএমএফের দ্বারস্থ হওয়া। এ হলো দেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা। বর্তমানে দেশে ডলার সংকট তীব্র, সরকার আইএমএফ এর দ্বারস্থ হয়েছে। আইএমএফ ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ দেবে। কিন্তু প্রতিটি কিস্তি দেওয়ার আগে আইএমএফের একটি মিশন আসবে ঢাকায়, এটাই তাদের নিয়ম, কিস্তি ছাড়ের আগে সফরে এসে তারা দেখবে শর্তগুলো ঠিকভাবে পূরণ হচ্ছে কিনা! ফিরে গিয়ে আইএমএফ পর্ষদে আবার প্রতিবেদন দাখিল করা হবে মিশনের পক্ষ থেকে। শর্তপূরণ না হলে তখন পরের কিস্তির অর্থ আটকেও দিতে পারে। আইএমএফ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়া যাবে চার বছরে। প্রতি মাসে ১০০ কোটি ডলার রিজার্ভ কমছে। কিস্তিতে পূরণ হবে ১৫-২০ ভাগ। আইএমএফ-এর শর্তের কারণে অর্থনীতি-রাজনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে আইএমএফ। নব্য উদার অর্থনীতির বাহক আইএমএফ বহুজাতিক কোম্পানির উপর আমাদের অর্থনীতি-বাজারকে নির্ভরশীল করে তুলবে। এর জন্য দায়ী কে? বর্তমানে জনবিচ্ছিন্ন সরকার হামলা-মামলা-নিপীড়ন-নানা ধরনের অপকৌশল নিচ্ছে। বর্তমান সরকার সময়ে সময়ে সামনে আনে জঙ্গিবাদের রাজনীতি, জঙ্গিবাদের আর্থ-সামাজিক ভিত্তিকে দূর করার কাজে হাত না দিয়ে সরকার তার নানা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তাকে পুষ্ট করছে। হেফাজতের ১৩ দফা দাবির কাছে মাথা নত করে শিক্ষা কারিকুলাম পাল্টিয়ে দিয়েছে, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-শরৎ চন্দ্র ও প্রগতিশীল লেখকদের কবিতা ও প্রবন্ধ বাদ দিয়েছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপি শাসক শ্রেণির দুইদলই হেফাজত-জামায়াতকে ব্যবহার করেছে, ব্যবহার করছে। স্বৈরাচার এরশাদের জাতীয় পার্টিকেও ব্যবহার করেছে, করছে। সামনে নির্বাচন। খেলা শুরু হয়ে গেছে, বিএনপির সমাবেশে লোক বাড়ছে। সরকার যানবাহন মালিকদের দিয়ে সমাবেশ আটকানোর জন্য এলাকায় এলাকায় যানবাহন ধর্মঘট করাচ্ছে। এর ফল হচ্ছে বিপরীত। পরিস্কার হচ্ছে আওয়ামী লীগের রাজনীতির দেউলিয়াত্ব। এই অবস্থায় বিদেশিরা আবার তৎপর হয়েছে। যা জনগণ বারবার দেখেছে। দুই তথাকথিত বড় দলের নীতিহীন ক্ষমতার লড়াই বিদেশিদের আমাদের রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ করে দিচ্ছে। এই দুই দলের কর্মকাণ্ড আমাদের দেশে মান-মর্যাদা-স্বাধীন সত্ত্বা ও সার্বভৌমত্বের ক্ষতি করছে। সুযোগ করে দিচ্ছে এবং অবস্থা তৈরি করছে অসাংবিধানিক শক্তির রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার। যা দেশবাসী ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনের সময়ে দেখেছে। এই হচ্ছে দেশের রাজনীতির হাল-হকিকত। সামনে নির্বাচন। নানা দৌড়ঝাপ চলছে। লক্ষ্য গণতন্ত্র না, ক্ষমতা। নির্বাচন গণতন্ত্রের অংশ। ঐক্যের প্রকৃত ভিত্তি যদি গণতন্ত্র হয় তার ফলাফল হবে একরকম, আর শুধু নির্বাচন যদি হয় তার ফলাফল হবে ভিন্ন। কেউ কেউ বা কোনো কোনো দল নির্বাচন আসলে দৌড়ঝাপ করেন, সারাবছর কোনো লড়াই সংগ্রামে থাকেন না। ক্ষমতার ছিটে ফোঁটা চায় যা আমরা ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮-তে দেখেছি। নির্বাচনের সময় আসলে যারা দৌড়ঝাপ করেন তারা দুই দলের দ্বন্দ্বে কোনো না কোনো দলের দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছেন বা হন। এর থেকে কিছু বাম শক্তিও বাদ যায়নি। ফলে ৬০, ৭০, ও ৮০-র দশকে বাম শক্তির যে শক্তি-সামর্থ্য ছিল তা আজ প্রান্তিক অবস্থানে চলে গেছে। এই সুবিধাবাদ থেকে বাম শক্তির মুক্ত থাকা সময়ের দাবি। বর্তমানে সমাজে যে শ্রেণি বৈষম্য, ধন বৈষম্য এবং মানুষ যেভাবে শোষিত-বঞ্চিত-প্রতারিত হচ্ছে তার কারণে বাম শক্তি সমাবেশ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা যেকোনো সময়ের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই কমিউনিস্ট বাম শক্তিকে এই কথা মাথায় রেখে বর্তমান ও ভবিষ্যতের কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে হবে। শাসকশ্রেণির ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে কাজে লাগাতে হবে। তাদের ক্ষমতার রাজনীতির দ্বন্দ্বে ব্যবহার হওয়া হবে আত্মঘাতি। বর্তমান সরকারের আওতায় বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হবে বলে মানুষ মনে করে না। তাই আওয়াজ উঠেছে, আওয়াজ তুলতে হবে- দল নিরপেক্ষ তদারকি সরকারের আওতায় নির্বাচন দিতে হবে। বামপন্থিদের শুধু এই দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সাথে সাথে আওয়াজ তুলতে হবে- সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন, মানি-মাসেল, সাম্প্রদায়িকতামুক্ত নির্বাচনের দাবি। আওয়াজ তুলতে হবে ‘না ভোট’ দেওয়ার, প্রার্থী প্রত্যাহারের বিধান চালুর দাবি। বিএনপি আওয়াজ তুলেছে জাতীয় সরকারের। তার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য কী? তার কাজ কী হবে? এই জাতীয় সরকার কোন শ্রেণির স্বার্থরক্ষা করবে? আমরা দেখেছি তিন জোটের রূপরেখার সাথে বিএনপি-আওয়ামী লীগের বিশ্বাসঘাতকতা করতে। আওয়ামী লীগ বলছে, আমি ক্ষমতায় না থাকলে কে আসবে? বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসলে দেশের কি হবে? মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ থাকবে কি-না? মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষকে এই কথা বলে আওয়ামী লীগ বিভ্রান্ত করছে। যদি তাই হয় আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধী দল তাহলে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করল না কেন? কেন হেফাজতের ১৩ দফা মেনে নিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম পাল্টিয়ে দিল। দেশের সাম্প্রদায়িকতার যে সামাজিকরণ হয়েছে আওয়ামী লীগের নানা কর্মকাণ্ডে তা আরও পুষ্ট হচ্ছে। বর্তমান অবস্থায় যা দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ সাম্প্রদায়িকতার যে সমস্যা তাকে প্রকৃত অর্থে সমাধান না করে তার ক্ষমতার স্বার্থে তাকে ব্যবহার করছে। বামপন্থিদের বক্তব্য হলো, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লড়াই, গণতন্ত্র ও মেহনতি মানুষের সামাজিক মুক্তির লড়াইকে জোরদার করা। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ব্যবহৃত না হওয়া। কাউকে ক্ষমতায় রাখা ও কাউকে ক্ষমতায় নেওয়ার বাহন না হওয়া। শাসকশ্রেণির দ্বি-দলীয় ধারার বিকল্প গড়ে তোলা। বর্তমানের মধ্যে ভবিষ্যতকে দেখা। সুনির্দিষ্ট বাস্তবতায় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া।