মণিপুরিদের রাস উৎসব
Posted: 31 জুলাই, 2022
মণিপুরিদের প্রধান উৎসব রাসপূর্ণিমা বা রাস উৎসব। শরতের পূর্ণিমায় এই রাস হয়। তার আবেদন আজ ধর্মের সীমানা ভেঙে সব সম্প্রদায়ের মানুষকে কাছে টেনে নিয়েছে। বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জে মাধবপুরের শিববাজারে ১৭৯ বছর এবং আদমপুরের তেতইগাঁওয়ে ৩৬ বছর ধরে মণিপুরিদের রাস উৎসব উদ্যাপিত হয়ে আসছে।
রাস উৎসবের আবার দুটি পর্ব। দিনের বেলায় রাখালরাস, আর রাতে মহারাস।
রাখালরাসের শুরুতে বালক কৃষ্ণ, বলরাম আর সখাদের গোচারণে যাবার অনুমতি দিতে গিয়ে মায়েদের অশ্রুমাখা বিলাপ গীতমুদ্রায় রূপায়িত হয়। এরপর উপস্থাপিত হয় বাল্যকালে রাখালরূপে বৃন্দাবনে গরু চড়ানো কৃষ্ণের নানান বিচিত্র কীর্তি। বকাসুরসহ নানা অসুরকে দমন করে কৃষ্ণবাহিনী। সেসব কাহিনি গীত-নৃত্য-বাদ্য-মুদ্রায় প্রায় ৫ ঘণ্টা সময় ধরে রূপায়িত হয়। রাখাল বালকদের পরনে থাকে বিচিত্র রঙের ধুতি, গায়ে নানা রকমের অঙ্গহার, মাথায় থাকে ময়ূরপুচ্ছে তৈরি ‘চূড়া’ আর হাতে রঙিন বাঁশি।
রাখালরাসের মণ্ডলী বা মঞ্চে মাঠের মাঝখানে ভূমিসমতলে হয়ে থাকে, যাকে ঘিরে বৃত্তাকারে কলাগাছের বেষ্টনী। চারদিকে বসে মেলা। দেশের নানা জায়গা থেকে সওদাগরের দল এই একদিনের জন্য আগের দিন থেকে এসে পসরা সাজায়। সঙ্গে থাকে মণিপুরিদের পোশাক, হস্তশিল্প, বইপুস্তক। রাখালরাস শেষ হয় গোধূলিবেলায়। রাখালরাস শেষে কৃষ্ণ তার গোপসখাদের নিয়ে গরুর পায়ের খুরে রাঙা আলোয় ধূলি ওড়াতে ওড়াতে ঘরে ফিরে আসে। রাখালরাসের গল্পটিও এই এতটুকু সময়ের মধ্যে প্রতীকীভাবে সূচিত।
রাখালরাস শেষ হলেও দিনের মেলা শেষ হয় না। লোকজনের কেনাকাটা, গল্পগুজব, খাওয়াদাওয়া চলতে থাকে। তারপর উন্মুক্ত মঞ্চে, সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয়। রাসের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা হয়, আধুনিক গান-নাচ-নাটক এসবের কিছুই বাদ যায় না।
রাত ১১টার দিকে শিববাজারের জোড়ামণ্ডপে এবং তেতইগাঁওয়ে সানা ঠাকুরের মণ্ডপে শুরু হয় ওই উৎসবের মূল পর্ব–মহারাস। মণিপুরিদের রাসলীলার অনেক ধরন। নিত্যরাস, কুঞ্জরাস, বসন্তরাস, মহারাস, বেনিরাস বা দিবারাস। শারদীয় পূর্ণিমা তিথিতে হয় বলে মহারাসকে মণিপুরিরা পূর্ণিমারাসও বলে থাকে।
পরম আরাধ্য এক সত্তার সঙ্গে মানুষে প্রেমাকুল আত্মার মিলনকে গীত-নৃত্য-বাদ্য-মুদ্রাসহযোগে প্রকাশ করার এক পরিবেশনাশিল্প রাস। শ্রীমদ্ভাগবত, চৈতন্যদর্শন অথবা বৈষ্ণবীয় সহজিয়া ধারার দর্শনের সীমা ছাড়িয়ে যা মণিপুরি জনপদের নিজস্ব শিল্পপ্রকাশরীতির সঙ্গে মিলেমিশে নতুন এক অবয়ব নিয়েছে।
আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে যাপিত জীবনের বেদনা ও অনুভূতি যেখানে স্পন্দিত হয়ে ওঠে। কৃত্যমূলক অন্যান্য পরিবেশনার মতো মানত বা মঙ্গলাকাঙ্ক্ষা রাস আয়োজনের মূল কারণ, তবে তার শৈল্পিক আকাঙ্ক্ষাটিও কম নয়। তাই রাসে অংশগ্রহণের জন্যে অনেকদিন ধরে সুযোগ্য ওস্তাদের কাছে সুচারুরূপে তামিল নিতে হয়। রাসের পরিবেশনায় রসভঙ্গের ভয়ও আছে। কোনো গোপিনী কিংবা বাদক যদি তার তাল ভঙ্গ করে, তাহলে আয়োজকের মনে শিল্পের প্রশ্নের ঊর্ধ্বে গিয়ে বাস্তব জীবনে কোনো অশুভের ভীতিও হয়তো জাগে।
রাসলীলার আয়োজনে আধুনিকায়ন ঘটেছে, আগে হ্যাজাকের আলোয় হতো–তারও আগে মশাল জ্বালিয়ে–তবে সেই প্রতিবেশ একই। রাসে যে পোশাক পরা হবে, সেগুলো আগের দিন বাড়ির দেবতার সামনে নিবেদন করা হয়। তারপর সেগুলো গায়ে দেবার জন্যে স্বীকৃত হয়। শ্রীমদ্ভাগবত গ্রন্থের একটি ছোট্ট বর্ণনাকে আকর ধরে এই রাসের গ্রন্থনা বলে গবেষকেরা মত প্রকাশ করেছেন। শাস্ত্রীয় মুদ্রার নৃত্য এবং উচ্চাঙ্গের গান আর বোলের সঙ্গে সঙ্গে এটি তার শরীরে লোক সংযোগের সহজ আভরণও জড়িয়ে নিয়েছে। মণিপুরিদের নিজস্ব গায়কি, অভিব্যক্তির সংবেদনশীল সরলতা এখানে পরিবেশনাটির লোকায়তকরণে ভূমিকা রেখেছে।
বৃন্দাবস দাস তার শ্রীচৈতন্যভাগবত এর প্রথম অধ্যায়ে বলেছেন, রাস=রস+ষ্ণ। অর্থাৎ যত রকমের রস আছে তাদের সমষ্টির নাম রাস। কথাটিকে উপমা হিসেবে নিলেও বোঝা যাবে আসলেই রাসলীলা শিল্পের সব রসের এক গভীর সংশ্লেষ।
মণিপুরে রাসলীলা প্রবর্তনের একটি গল্প প্রচলিত আছে। মণিপুরের মহারাজা ভাগ্যচন্দ্র যখন কাঞ্চিপুর নামের এক অঞ্চলে বাস করতেন–তখন এক রজনীতে তিনি স্বপ্ন দেখলেন, শ্রীকৃষ্ণ নিকটবর্তী ভানুমুখ পাহাড়ে কাঁঠালগাছ হয়ে রাজার জন্যে অপেক্ষা করছেন। পরদিনই রাজা সেই পাহাড়ে গিয়ে কাঁঠালগাছ খুঁজে পেলেন। গাছটি কেটে রাজধানীতে আনা হলো। রাজধানীর খ্যাতনামা শিল্পীকে রাজা তার স্বপ্নে দেখা কৃষ্ণমূর্তির অনুকরণে কাঠের মূর্তি গড়তে আদেশ দিলেন। ওই মূর্তি প্রতিষ্ঠা উপলক্ষেই তিনি ওই বছর অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লা পূর্ণিমাতে মহারাসলীলা উৎসব প্রবর্তন করেন। রাজকন্যা বিস্বাবতীও সেই রাসে অংশ নেন। ১৭৭৯ সালে রাসলীলা উৎসবের প্রবর্তন হয়। রাসলীলার গানগুলো বিখ্যাত বৈষ্ণব পদকর্তা জয়দেব, বিদ্যাপতি, চ-ীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস প্রমুখের পদাবলি থেকে সংগৃহীত। বাংলা, ব্রজবুলি মৈথিলি ও সংস্কৃত ভাষার পদ সংকলিত হলেও সাম্প্রতিককালে মণিপুরি ভাষাতেও রাসলীলার পদ বা গান রচিত হচ্ছে।
মণিপুরে মৃদঙ্গ ও মন্দিরার পাশাপাশি বীনা, পাখোয়াজ, পেনা, বেহালা ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মণিপুরিরা সাধারণত মৃদঙ্গ, মন্দিরা, শেলপুং, বাঁশি, হারমোনিয়াম, মইবং বা শঙ্খ, মাংকাং ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকেন।
রাসের পোশাক ও অঙ্গহারে রয়েছে পশোয়াল, লেইত্রেং, কতনাম, খাংচেৎ, মেইখুন্বি, কুমিন, খবাকয়েং ইত্যাদি। গোপীরা গলায় মণিপুরি ঐতিহ্যবাহী সোনার হার পরে থাকেন।
মণ্ডপের মাঝখানে বৃত্তাকারে ভূমিসমতল কুঞ্জ বা মণ্ডলী স্থাপন করা হয়। মাটিতে আঁকা হয় নানান আলপনা। তার কেন্দ্রে একটি পট এঁকে তার মধ্যে কলসি, ধান, দূর্বা নারকেল, কলা, খই, নাড়ু, ফুল, কীর্তনের গামছাসহ ঘট তৈরি করা হয়। সেই কেন্দ্র থেকে দুই কিংবা আড়াই ফুট ব্যাসার্ধ নিয়ে একটি গোলাকার মণ্ডরী তৈরি করে বাঁশ দিয়ে খুঁটি এবং ছোট বেড়া দেওয়া হয়। সেই বেড়ার চতুর্দিকে সজ্জিত করা হয় রঙিন কাগজের আল্পনা দিয়ে।
রাসলীলার শুরুতে থাকে সূত্রধারী বা নেপথ্য শিল্পীদের রাগালাপ, সঙ্গে মৃদঙ্গবাদন।
রাগালাপের পর কুঞ্জে প্রবেশ করে ‘বৃন্দা’। রৃন্দা প্রথমে গীত ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে বৃন্দাবনকে সজ্জিত ও ‘পবিত্র’ করে। সাধারণভাবে যাকে মানত করে রাস আয়োজন করা হয়, তাকেই বলা হয় বৃন্দা। বৃন্দাবন সাজায় বলে তার নাম বৃন্দা, নাকি বৃন্দার নামেই বৃন্দাবন–এ বিষয়ে তথ্য মেলে না।
বৈষ্ণবশাস্ত্রের বাইরে বৃন্দা মণিপুরিদের নিজস্ব সংযোজন। গানে গানে বৃন্দা জানায়, “আমি কৃষ্ণের প্রেমে কাঙ্গালিনী, বৃন্দাবনে বৃন্দা দুর্ভাগিনী।” দুর্ভাগিনী বৃন্দা কারণ সে কোনোদিনই কৃষ্ণের দর্শন পায়নি। বিরহান্ত কাহিনিতেও রাধা পায় কৃষ্ণের সাক্ষাৎ আর প্রেম। তবে বৃন্দা যেন কৃষ্ণপ্রেমে ব্যাকুল মনুষ্যসমাজের এক প্রতীকী চরিত্র। যার অশ্রু আর আত্মনিবেদনের মধ্য দিয়ে রাধাকৃষ্ণের প্রেম মর্ত্যরে পৃথিবীতে মূর্ত হয়ে ওঠে।
বৃন্দার নৃত্যগীত সমাপ্ত হলে কুঞ্জে প্রবেশ করেন কৃষ্ণরূপী বালক। কৃষ্ণের নানান ভাবের রূপায়ন ঘটে এই পর্বে। সেই ভাবের মধ্যে বিশেষভাবে প্রকাশ পায় রাধাঅনুরাগ। “উঠিতে কিশোরী, বসিতে কিশোরী, কিশোরী নয়নতারা...।” এই কিশোরীই রাধা। নৃত্য শেষে কৃষ্ণ মণ্ডপের পূর্ব দিকে বৃন্দাদেবীর সাজানো আসনে তৃভঙ্গ-ভঙ্গিমায় দাঁড়ায়। কৃষ্ণের নৃত্য শেষে শুরু হয় রাধাকীর্তন।
কৃষ্ণের বংশীধ্বনি শুনে ব্যাকুল রাধা গায়, “বাঁশি বাজল, বাজল গো সখী, বিজন বিপিনে...”। পরে মণ্ডপমাঝে গোপীদের প্রবেশ ঘটে। রাধা এবার কৃষ্ণের কাছে অভিসারে যাওয়ার জন্যে বিভিন্ন সাজে সজ্জিত হতে শুরু করে। বৃন্দাবনে কৃষ্ণকে খুঁজতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে রাধা, সখীদের কাছে বলে নিজের অসাড়তার কথা। কৃষ্ণ রাধা ও সখীদের ডাকে সাড়া দিয়ে রাসকুঞ্জে দেখা দেনএবং তাদের সঙ্গে নৃত্যগীতলীলায় মগ্ন হন। পর্যায়ক্রমে আসে রাধা ও সখী অভিসার, যুগলরূপ প্রার্থনা, মণ্ডলীসজিন, গোপীদের বিশিষ্ট রাগালাপ, ভঙ্গীপারেং, কষ্ণনর্তন, রাধানর্তন, আত্মসমর্পণ, পুষ্পাঞ্জলি, প্রার্থনা, আরতি, গৃহগমন ইত্যাদি পর্ব।
সবশেষে রাধা-কৃষ্ণের যুগলরূপের আরতি করা হয়। তবে পরমাত্মা কৃষ্ণ তো জীবাত্মা রাধার সঙ্গে চির-একাত্ম হতে পারেন না। “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি”র মতো তার আসা-যাওয়ার লীলা। তাই নিশান্তে কৃষ্ণের বচনানুসারে রাধা ও গোপিনীরা নিজ নিজ গৃহে ফিরে যায়। ওই প্রত্যাবর্তন গভীর বেদনাবহ, পরমপুরুষের বিচ্ছেদের সুরে ঘেরা। রাধার পোখরাজ চোখের জলে ফেরার সে পথ ধোয়া রাসলীলায় কৃষ্ণসঙ্গ লাভের ওই একটি রজনী রাধার জীবনে একটি কালেরই প্রতীক, যার আধারে প্রতিটি বৈষ্ণব খুঁজে চলে পরমসত্তাকে অনুভবের স্পন্দন। আর তার আঁচ নিয়ে ভোরবেলা ভক্তবৃন্দ ফিরতে থাকে নিজ নিজ ঘরে।
আমি স্কুল জীবনে কবিগান শুনতাম। একদিন কবিগান শুনতেছিলাম। তখন কবি বললেন, “এদিক দেখি ফাঁক–অদিক দেখি ফাঁক। ” তখন মহিলারা ঠিকঠাক হয়ে বসলেন। তখন কবি আবার বললেন, “এই ফাঁক তো আর সেই ফাঁক নয়। রাধা-কৃষ্ণের ফাঁক।”
লেখক : কলামিস্ট