ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত লাখো মানুষ

Posted: 19 জুন, 2022

একতা প্রতিবেদক : বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের কারণে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধায়ও পরিস্থিতি নাজুক। এসব জেলার লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বেশ কয়েকটি উপজেলা। উদ্ভ’ত এই বন্যা পরিস্থিতির কারণে এসএসসি পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণ কাজ পরিচালনায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। সিলেটের সংবাদদাতা গত ১৭ জুন পর্যন্ত বন্যায় সিলেটের পাঁচ উপজেলার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন। আড়াইশর বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে; বন্ধ রয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট উপজেলার বেশিরভাগ এলাকাই পানিতে তলিয়ে গেছে। জৈন্তাপুর ও কানাইঘাট উপজেলারও বিস্তীর্ণ এলাকাও পানিবন্দি। পানি বাড়ছে সিলেট সদর, দক্ষিণ সুরমা, জকিগঞ্জ ও বিশ্বনাথ উপজেলায়। নগরীর অনেক এলাকা এখন পানির নিচে। ১৭ জুন সকাল ৯টায় সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১ দশমিক ৮ সেন্টিমিটার এবং সিলেট পয়েন্টে ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড। সেসময় সারি নদীর পানিও বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার উপরে ছিল। পানির উচ্চতা বেড়েছে কুশিয়ারা ও লোভা নদীরও। কুশিয়ারা নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৪০ সেন্টিমিটার উপরে বইছে। বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে সিলেটের কুমারগাওয়ের বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রেও। এই উপকেন্দ্র দিয়ে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। ইতোমধ্যে সিলেটের পুরো কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর ও গোয়ইঘাট উপজেলা এবং নগরীর উপশহরসহ কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। নগরীর ঘাসিটুলা, কলাপাড়া, শামীমাবাদ, ডহর, তালতলা, কালিঘাট, সোবহানীঘাট, শাহজালাল উপশহর, তেররতন, হবিনন্দি, সাদিপুর, বোরহানবাগ, শিবগঞ্জ ও দক্ষিণ সুরমার কদমতলিসহ বিভিন্ন এলাকার সড়ক পানিতে ডুবে গেছে। এসব এলাকার অনেক বাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সিলেট নগরে ৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে সিলেট সিটি করপোরেশন। সুনামগঞ্জ শহরের একতলা কোনো বাড়িতে পানি উঠতে বাকি নেই। ভারতের মেঘালয়-আসামে প্রবল বৃষ্টিপাতের মধ্যে উজান থেকে নেমে আসা পানিতে ১ জুন বিকালে তলিয়ে যায় সুনামগঞ্জ পৌর শহর। দুর্ঘটনা এড়াতে তখন থেকেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। সুনামগঞ্জের সঙ্গে সারাদেশের যানবাহন চলাচলও বন্ধ রাখা হয়। ছিল না মোবাইল নেটওয়ার্কও। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের ফেইসবুক পেইজে জানানো হয়েছে, বন্যার পানি ছাতক ও সুনামগঞ্জ গ্রিড উপকেন্দ্রে প্রবেশ করায় নিরাপত্তার স্বার্থে ওই উপকেন্দ্র বন্ধ রাখা হয়েছে। সে কারণেই ওই এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, শুক্রবার সকাল ৯টায় সুরমা নদীর পানি সিলেটের কানাইঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমার ১০৮ সেন্টিমিটার, সিলেটে ৭০ সেন্টিমিটার এবং সুনামগঞ্জে ১২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বইছিল। একইদিন সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপৎসীমার ৪০ সেন্টিমিটার, উব্ধাখালি নদীর পানি বিপৎসীমার ৬০ সেন্টিমিটার ও ধনু নদীর পানি বিপৎসীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সেদিন ভোর থেকে জেলার কলমাকান্দা, দুর্গাপুর ও বারহাট্রা উপজেলায় বন্যার পানি ঢুকে প্লাবিত হয়। নেত্রকোণার জেলা প্রশাসক সাংবাদিকদের জানান, বারহাট্টার একাংশ প্লাবিত হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে কতগুলো ইউনিয়নে কতজন মানুষ পানিবন্দি হয়েছে তার হিসেব এখনও করা যায়নি। তবে দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলার বেশিরভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সিপিবির উদ্বেগ, বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান: সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা-পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মোহাম্মদ শাহ্ আলম ও সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বন্যা-দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ১৭ জুন দেওয়া এক বিবৃতিতে সিপিবির নেতৃবৃন্দ বলেছেন, জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধার অভিযান, আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন, লঙ্গরখানা চালু ও পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। পর্যাপ্ত ত্রাণ-সামগ্রী নিয়ে দুর্গম এলাকা পর্যন্ত সহায়তা-কার্যক্রম পরিচালনা ও ত্রাণ বণ্টনে বিন্দুমাত্র দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বন্যার আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধার, চিকিৎসা-সেবা প্রদান, পানীয় জল সরবরাহ নিশ্চিতকরণ ও ত্রাণ সামগ্রী সংগ্রহ করে তা দুর্গতদের মধ্যে বিতরণ ইত্যাদি মানবিক কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য নেতৃবৃন্দ সিপিবির নেতা-কর্মীদের নির্দেশনা দেন। নেতৃবৃন্দ একইসঙ্গে সব দেশপ্রেমিক, প্রগতিশীল, মানবদরদী শক্তি ও ব্যক্তিকে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আহ্বান জানান।