দুঃশাসন অবসানের প্রত্যয়ে সফল হোক দ্বাদশ কংগ্রেস

Posted: 21 নভেম্বর, 2021

সিপিবির দ্বাদশ কংগ্রেস ঘনিয়ে আসছে। বর্তমান সময়ে সামাজিক-অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আসন্ন কংগ্রেসে বিস্তারিত আলোচনা করে পার্টি তার রণনীতি ও রণকৌশল চূড়ান্ত করবে। এ লক্ষ্যে পার্টির শাখায় শাখায় সিপিবির রাজনৈতিক প্রস্তাবের খসড়া নিয়েও আলোচনা চলছে। এমন এক সময়ে সিপিবি দ্বাদশ কংগ্রেস আয়োজন করছে, যখন বাংলাদেশ চলছে স্বৈরাচারী দুঃশাসন, কায়েম আছে বেপরোয়া লুটপাটতন্ত্র এবং বাড়ছে সাম্প্রদায়িকতার বিপদ। এই মুহূর্তে সুনির্দিষ্ট এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে জনগণের সামনে উপস্থিত হওয়ার জন্য এই কংগ্রেসের গুরুত্ব অনেক। আমরা লক্ষ্য করছি, ক্ষমতাসীন সরকার একদিকে যেমন লুটেরা শ্রেণি ও বৈশি^ক কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থ রক্ষার্থে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে ক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছে, অন্যদিকে নানা কৌশলে মধ্যবিত্তের মধ্যে তারা সামাজিক সম্মতি আদায় করতেও তৎপর। ক্ষমতাসীন দলের দমন পীড়ন, শোষণ-লুটপাট, ফ্যাসিস্ট প্রবণতা ইত্যাদিকে আড়াল করতে না পেরে, তাদের পেইড বুদ্ধিজীবীরা ধারাবাহিকভাবে প্রচারণার যে কৌশল নিচ্ছে তা হলো, বর্তমান সরকার আর যাই হোক, অন্তত ‘মন্দের ভালো’। তাদের বয়ানের মর্মার্থ হলো, এই সরকার নানা অপকর্মের মাধ্যমে স্বৈরাচারী একনায়কত্ব কায়েম করলেও ‘উগ্র সাম্প্রদায়িক স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি’ থেকে রক্ষা পাওয়ার দাওয়াই হিসেবে এ শাসন আমাদের মেনে নিতে হবে। “আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ‘আরো খারাপ’ শক্তি ক্ষমতা দখল করবে”– এই জুজু হলো সুপরিচিত আওয়ামী রাজনৈতিক কৌশল, যা বর্তমান শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে কার্যকর গণআন্দোলন তৈরি করতে মনস্তাত্ত্বিক দ্বিধা তৈরি করে। এই ‘মন্দের ভালো’ কিংবা ‘বিকল্প নেই’ তত্ত্ব নানা চোরাগোপ্তা কায়দায় সমাজে প্রচার করা হচ্ছে। আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনদের এই বয়ান এবং ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নামে সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র ও তার জোটের বিশে^ দখল প্রক্রিয়া চালানোর বয়ানে খুব একটা পার্থক্য নেই। এই রাজনৈতিক বয়ানকে প্রাসঙ্গিক রাখতেই দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থেকেও সাম্প্রদায়িক শক্তির মূলোৎপাটন না করে বরং তাদের ‘নিয়ন্ত্রিত উত্থান’ এর ক্ষেত্র তৈরি করে, সরকার তার নিজের ক্ষমতা সংহত করতে চেষ্টা করছে। সাম্প্রদায়িক শক্তিকে মাঝেমধ্যেই শোডাউনের সুযোগ করে দিয়ে, সরকার এমনভাবে পরিস্থিতিকে উপস্থাপন করছে, যাতে দেশে বিদেশে বোঝানো যায় যে, এই সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া মানে হলো আরো দক্ষিণপন্থী শক্তির আগমনকে ত্বরান্বিত করা। আওয়ামী লীগের পতন ঘটলে অবধারিতভাবে ‘ইসলামপন্থী ফ্যাসিস্ট’দের ক্ষমতায় আগমন ঘটবে, সুতরাং ‘ডোন্ট ডিস্টার্ব আওয়ামী লীগ’–এই প্রচারের বাস্তব জমিন এভাবেই তৈরি হচ্ছে। এই কারণেই আমরা হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের সাথে সরকারের ‘নরম-গরম’ আচরণের নানা উদাহরণ দেখি। সরকার তাদের নানাভাবে সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে, ইসলামপন্থি দল হিসেবে বিকল্পরূপে তাদের উত্থানের সুযোগ করে দিচ্ছে, বামপন্থি প্রগতিশীল কর্মসূচির বিরুদ্ধে উস্্কে দিচ্ছে। অন্যদিকে একের পর এক সাম্প্রদায়িক হামলা হলেও তার বিচার হচ্ছে না, এমনকি ক্ষমতাসীন দলের লোকজনও সোৎসাহে সাম্প্রদায়িক হামলায় অংশ নিচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, গণতান্ত্রিক পরিবেশের ঘাটতি, ভোটাধিকার হরণ, মানুষের মত প্রকাশের জায়গাকে সংকুচিত করে ফেলা, সমাজে অন্যায়-অবিচার-অসাম্য ইত্যাদি মানুষের মধ্যে যে হতাশা তৈরি করছে, তার মূলোৎপাটন না করা গেলে সাম্প্রদায়িকতার বিপদ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। সে অর্থে লুটেরা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্বার্থ রক্ষাকারী অগণতান্ত্রিক শক্তি এবং সাম্প্রদায়িক শক্তি পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং পরিপূরক হিসেবেই কাজ করছে । অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী শাসন টিকিয়ে রাখতে সাম্প্রদায়িকতা প্রশ্নে সরকারের এই ‘সর্প হয়ে দংশন করে ওঝা হয়ে ঝাড়া’ নীতির বাস্তবায়ন দেশকে এক ভয়াবহ বিপদের মুখে ফেলেছে। বাংলাদেশের সমাজে যেমন সাম্প্রদায়িকতার প্রসার ঘটেছে, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবেও সাম্প্রদায়িক শক্তি সংহত হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক শক্তি বা ধর্মীয় লেবাসে ফ্যাসিবাদ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ও আশা আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী এবং সমাজের প্রগতিমুখী রূপান্তরের শত্রু। ফ্যাসিস্ট সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে সিপিবি বরাবরই আপোসহীন সংগ্রাম চালিয়ে গেছে এবং ভবিষ্যতেও নির্দ্বিধায় আপোসহীনভাবে তা চালিয়ে যাবে। মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্র ও রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতিসহ মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনার পক্ষে সিপিবির নীতিনিষ্ঠ অবস্থান নতুন করে প্রমাণ করার নেই। তবে রাষ্ট্রের বর্তমান ফ্যাসিস্ট প্রবণতাকে পাশ কাটিয়ে এবং তাকে চিহ্নিত করে কার্যকর গণআন্দোলনের রাজনৈতিক স্পৃহা তৈরি না করে, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ‘ইসলামপন্থি ফ্যাসিস্ট’দের ক্ষমতায় আসার বিপদকে একপাক্ষিকভাবে দৃশ্যমান করা হলে তাতে দিনশেষে নানা মোড়কের ফ্যাসিবাদই আরো শক্তিশালী হয়। আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার প্রগতিমুখী পরিবর্তন না করে, জনগণের সমর্থন ব্যতীত জোর করে ক্ষমতায় থেকে, লুটপাট-দুর্নীতি করে ও বহিঃশক্তির উপর নির্ভরশীল থেকে ‘মন্দের ভালো’ শাসন কায়েম করে যে পশ্চাদপদ সাম্প্রদায়িক শক্তিকে মোকাবেলা করা যায় না, সম্প্রতি আফগানিস্তানের পরিস্থিতিও সেই শিক্ষা দেয়। এ কারণেই ৫ বছর আগে সিপিবির একাদশ কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রস্তাবে রাষ্ট্রের ফ্যাসিস্ট প্রবণতার বৃদ্ধি সম্পর্কে বারবার সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিলো এবং কর্তব্য হিসেবে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে সমান গুরুত্ব দিয়ে সংগ্রামের কথা বলা হয়েছিলো। আমাদের মনে রাখা দরকার, রাষ্ট্র পরিচালনা করে যে সরকার, ফ্যাসিবাদী প্রবণতাগুলো তার দ্বারাই চর্চিত হয়, সুতরাং রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম হলো ক্ষমতাসীন শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে সংগ্রাম। আমরা অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, ‘সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী চেতনা’, ‘জাতীয় মুক্তি ও উন্নয়ন’, ‘সুন্দর আগামী’ ইত্যাদি মিথের মধ্য দিয়েও ফ্যাসিবাদ প্রাথমিকভাবে জনসম্মতি আদায় করতে পারে। পুঁজিবাদ যখন তার লোকদেখানো গণতান্ত্রিক চরিত্র বজায় রেখে শোষণকে নিরঙ্কুশ করতে পারে না, তখন কর্তৃত্ববাদী কায়দায়, মেহনতি শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামকে বিনষ্ট করে, জনগণের মতপ্রকাশের সুযোগ সংকুচিত করে নিরঙ্কুশ শোষণ ও লুটপাট চালায়। তা চালাতে গিয়ে জনগণকে তারা বিভিন্ন মিথের বুলিতে বিভ্রান্ত করে ও বিভাজিত করে। ফ্যাসিবাদ কোনো পশ্চাদপদ সামন্তীয় মধ্যযুগীয় শাসন নয়, বরং পুঁজিবাদেরই বিকৃততম রূপ হিসেবে গত শতাব্দীতে উপস্থিত হয়েছিলো। বর্তমান শতাব্দীতে নিওলিবারেল ইকোনমির যুগে তা নতুন নতুন চেহারা লাভ করবে, কেন্দ্র ও প্রান্তের দেশগুলোতে তা নানাভাবে হাজির হবে, সেটাই স্বাভাবিক। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগানের নামে ‘হোয়াইট সুপ্রিমেসি’র নীতি কিংবা মোদীর ‘হিন্দুত্ববাদ’ ইত্যাদি আলাদা আলাদা নাম ও মতাদর্শ বলে মনে হলেও এর ভেতরের মূল চালিকাশক্তি হলো তাদের নিজ নিজ দেশের কর্পোরেট শ্রেণি ও তাদের স্বার্থ, এ বাস্তবতাকে উপেক্ষা করলে আজকের নিওলিবারেল যুগে রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী প্রবণতাকে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। একটি রাষ্ট্র বর্তমান বিশ্বপরিপ্রেক্ষিতে কী কারণে ফ্যাসিবাদী চরিত্র লাভ করে, আজকের যুগে ফ্যাসিবাদের আর্থ-সামাজিক ভিত্তি কী, বর্তমানের আধিপত্যশীল পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা কীভাবে ক্রমশ দেশে দেশে জাতিগত, বর্ণগত ও ধর্মীয় বয়ান ব্যবহার করে মানুষে মানুষে বিভাজন সৃষ্টি করছে, কর্পোরেট পুঁজি ও তার স্থানীয় দোসরদের স্বার্থ রক্ষা করতে দেশে দেশে রাষ্ট্র কীভাবে নিপীড়নমূলক চেহারায় হাজির হচ্ছে, এ প্রসঙ্গগুলো গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। আমাদের দেশে শাসকশ্রেণির রাজনৈতিক দলগুলো, যারা বিগত সময়ে ক্ষমতায় এসেছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ধারার বিপরীতে নিওলিবারেল মতাদর্শের অনুসারী হওয়ায় এবং বৈদেশিক পুঁজি ও দেশের লুটেরা শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করায়, রাষ্ট্রের ফ্যাসিস্ট প্রবণতাগুলো যেমন ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের জমিনে বাড়ছে সাম্প্রদায়িকতার বিপদ। সিপিবিসহ বামপন্থি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল একযোগে বর্তমান দুঃশাসন, লুটপাটতন্ত্র, ফ্যাসিবাদী প্রবণতা, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে লড়াই করে চলেছে। তবে এসময় বামপন্থি মহলে কেউ কেউ বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে নিজস্ব শক্তিতে শ্রেণি-পেশার মানুষকে সংগঠিত করে শ্রেণি ও গণসংগ্রামের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়ার বদলে, সরকারকে ‘ফ্যাসিবাদী’ আখ্যা দিয়ে আওয়ামী বলয় ব্যতীত সকলকে নিয়ে ‘বৃহত্তর ঐক্য’ করার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী। তারাও ফ্যাসিবাদকে একপাক্ষিকভাবেই বর্ণনা করেন, রাষ্ট্রের ক্রমশ ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার পেছনের যে আর্থ-সামাজিক বিষয়গত অবস্থা তাকে বিশ্লেষণ করেন না এবং ফ্যাসিবাদকে কেবল উপরিকাঠামোগতভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা চর্চার মাপকাঠিতে দেখেন। শাসকশ্রেণির মধ্যে যে বিভিন্ন অংশ রয়েছে, এবং প্রয়োজন হলে যে শাসকশ্রেণির অপর অংশ রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী চরিত্রকে অক্ষুণ্ন রেখেই ক্ষমতা দখল করবে সে ব্যাপারে তারা যথেষ্ট সচেতন থাকার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না। বরং শাসকশ্রেণির এক অংশ দিয়ে আরেক অংশকে পরাভূত করার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ বেশি। সিপিবি শুরু থেকেই এই প্রবণতার বিরোধিতা করেছে এবং আওয়ামী ও বিএনপি বলয়ের বাইরে বিকল্প শক্তি সমাবেশ করার কথা বলেছে, যে বিকল্প গড়ে উঠবে বিকল্প নীতির উপর দাঁড়িয়ে। এক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হলো, একদিকে সরকারপক্ষীয় বুদ্ধিজীবীরা সরকারের বিরুদ্ধে যেকোনো সংগ্রামকে ‘স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি’র ‘ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যা দিয়ে সরকারের ‘ফ্যাসিবাদী প্রবণতা’ আড়াল করেন, তেমনি বামপন্থি মহলের কেউ কেউ যেমন ‘ফ্যাসিবাদ’ ঠেকাতে ‘বৃহত্তর ঐক্য’ দরকার বলে শাসকশ্রেণির অপর অংশ এবং সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ছাড় দিতে প্রস্তুত থাকেন। সিপিবি এই দুই প্রবণতা ও প্রোপাগাণ্ডার বিরুদ্ধেই নিজস্ব অবস্থান নিয়ে লড়াই করছে এবং ফ্যাসিবাদী ধরনের শাসনের অবসান ঘটাতে শাসকশ্রেণির দ্বিদলীয় মেরুকরণের বাইরে থেকেই বিকল্প শক্তি সমাবেশ করতে সাধ্যমতো চেষ্টা করছে। এটা ইতিহাসের শিক্ষা যে, কোন শাসনই চিরস্থায়ী নয়। ক্ষমতারও পরিবর্তন ভবিষ্যতে ঘটবে। তবে আগামী দিনে ক্ষমতার পরিবর্তন জনগণের সক্রিয় উত্থানের মধ্য দিয়ে হবে, নাকি অন্য কোনো উপায়ে হবে, তা বিষয়ীগত শক্তিগুলোর শক্তি ভারসাম্য, জনগণের সচেতনতার মাত্রা, জাতীয় আন্তর্জাতিক অনেকগুলো উপাদান ও শক্তি ভারসাম্যসহ বিভিন্ন উপর ফ্যাক্টরের নির্ভর করছে। জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা কোন উপায়ে মূর্ত হবে, সে পরিবর্তনের চরিত্র কেমন হবে, মানুষের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে ডাইভার্ট করে শাসকশ্রেণি নিজেদের কর্তৃত্ব অটুট রেখে অন্য কোনো ফর্মুলা প্রয়োগ করবে কি না, তা এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে কল্পনাপ্রসূত অনুমানের মাধ্যমে ‘অনিবার্যভাবে’ নির্ধারণ করা কঠিন। ‘কংক্রিট সিচুয়েশন’-এর ‘কংক্রিট এনালাইসিস’ করে, নীতিতে অটল ও কৌশলে নমনীয় থেকে, বর্তমানের শ্রেণিসংগ্রাম-গণসংগ্রামের রাজনৈতিক কর্তব্যকে অগ্রসর করার মধ্য দিয়ে বর্তমান দুঃশাসনের অবসান ঘটানোর পথ খুঁজতে হবে। পার্টিকে যেমন অদূর ভবিষ্যতে জনগণের সক্রিয় অভ্যুত্থানের সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিতে হবে এবং তার নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে চেষ্টা করতে হবে, তেমনি অন্যান্য ক্ষেত্রে করণীয়ও নির্ধারণ করতে হবে। শাসকশ্রেণির যেকোনো ষড়যন্ত্র, সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের দ্বারা অগণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা দখল, উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতার বিরুদ্ধেও পার্টিকে সচেতন ও সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে হবে। ‘বামপন্থিদের নেতৃত্বে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি ও গণশক্তির সচেতন সংগঠিত উত্থান’– যা বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন সাধন করবে, তা সিপিবির বর্তমান রণনীতি ও কর্তব্য। তবে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন এবং তার ক্ষেত্র প্রস্তুতিতে শ্রেণিসংগ্রাম, গণসংগ্রামকে বহুমাত্রিক ধারায় পরিচালনা করা দরকার। বস্তুত বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন ও তাতে পার্টির নেতৃত্বমূলক ভূমিকা রাখা কেবলমাত্র ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষার উপর নির্ভর করে না, লড়াইয়ের ময়দানে প্রতিটি পর্বে রাজনৈতিক কর্তব্য পালনের মাধ্যমে বাস্তব উপায়ে সেই শক্তি সমাবেশকে মূর্ত করে তুলতে হয়। বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন তখনই সম্ভব হবে যখন পার্টির নেতৃত্বে বিকল্প শক্তি সমাবেশ সম্ভবপর হবে। সে লক্ষ্যে পার্টিকে সাংগঠনিক ও মতাদর্শিকভাবে শক্তিশালী করে, বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প ও প্রয়োজনমাফিক বৃহত্তর বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি বলয় গড়বার কাজটি এই সময়ে আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বর্তমান রাষ্ট্র ও তাকে কব্জায় রাখা রাজনৈতিক দল ও শ্রেণির ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রাম ব্যতীত সেই শক্তি সমাবেশ করা সম্ভবপর নয়। একথা সত্যি যে, বাংলাদেশে জনগণের ক্ষোভ ও দুর্দশা বাড়তে থাকলেও, রাষ্ট্রের দমন-পীড়নের ফলে এবং বিভিন্ন মতাদর্শিক বিভ্রান্তি ও বিভাজনের কারণে জনগণের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ গণসংগ্রাম বা গণআন্দোলনের সম্ভাবনা সংগঠিতভাবে মূর্ত হয়ে উঠছে না, সেভাবে বিকল্প শক্তিও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে না। ফলশ্রুতিতে, সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ ও হতাশা। কোভিড পরিস্থিতি, কর্মসংস্থানের অভাব মানুষকে দিশেহারা করে ফেলছে। তা সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রবল। রাজনৈতিকভাবে সেই আকাঙ্ক্ষাকে মূর্ত করে তোলা এখন পার্টির সামনে কর্তব্য। বর্তমানের এই বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতাকে আমলে নিয়ে, আগামী দ্বাদশ কংগ্রেস আরো সুস্পষ্টভাবে পার্টির রাজনৈতিক কর্তব্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করাই যায়।