চিরঞ্জীব বিপ্লবী কমরেড মনিরুজ্জামান

পুর্ণেন্দু দে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বামপন্থি চিন্তাবিদ শহীদ সাবের’র একটি কথা মনে পড়ছে। বাবার এক পত্রের উত্তরে শহীদ সাবের বাবাকে লিখেছিলেন, ‘আমি শুধু পরিবারের সন্তান নই, সমাজেরও সন্তান’। কথাটি বললাম এ কারণে, যে মানুষ চিন্তায়-মনষ্কতায় নিজেকে পরিবারের ঊর্ধ্বে, সমাজের ঊর্ধ্বে, সমাজ থেকে বিশ্বমানবের মহান মুক্তির মন্ত্রে উত্তরণ ঘটাতে পারেন, সমর্পিত করতে পারেন তিনিই তো হয়ে ওঠেন নমস্য, শ্রদ্ধেয়, পূজ্য। সবাই তা পারেন না, কেউ কেউ পারেন। কমরেড শেখ মনিরুজ্জামান তাদেরই একজন, মানবমুক্তির সংগ্রামে যিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন পরম একনিষ্ঠতায়। পাকিস্তান নামক একটি অলীক ভ্রান্ত রাষ্ট্রের জন্মের সূচনা সময়ে ১৯৪৯ এ পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন কমরেড মনিরুজ্জামান। জন্ম সালটা তাই তাৎপর্যময়। পাকিস্তানি নয়া উপনিবেশিক শোষণের শৃঙ্খল ভেঙে মুক্ত পাগল বাঙালির যে ধারাবাহিক সংগ্রাম, তারুণ্যে যৌবনে কর্মে–মনিরুজ্জামান সে সংগ্রামে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছিলেন–তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের একজন সক্রিয় সংগঠক হিসেবে। মার্কসবাদী তাত্ত্বিক কমরেড রতন সেনের বড় ভাই বিপ্লবী মোহিত সেনগুপ্ত’র সুহৃদ শেখ শফিউদ্দীন শেখ মনিরুজ্জামানের পিতা। পারিবারিক পরিমণ্ডল যুগ ও সময়ের বিবেচনায় যথেষ্ট মুক্তমনা ও প্রগতিশীল। শেখ শফিউদ্দীন আহমেদ ছিলেন তদানীন্তন দৌলতপুর ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট। অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল এ পরিবারে বেড়ে ওঠা কমরেড মনিরুজ্জামান ছাত্র হিসেবে মেধাবী, দর্শনে সুঠামদেহী প্রাণোচ্ছল তরুণ। একটি স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান, পারিবারিক স্বচ্ছলতা, মেধা, সামাজিক পরিচয়ের পরিব্যাপ্তিকে ব্যবহার করে খুব সহজেই গড্ডালিকার স্রোতে নিজেকে ভাসাতে পারতেন। কিন্তু না, ব্রজলাল কলেজ থেকে স্নাতক উত্তীর্ণ হয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত রসায়নে ভর্তি হওয়া সত্ত্বেও পড়াশোনাকে অসমাপ্ত রেখে শুধুমাত্র রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে, যে সমাজ ও রাজনীতি ছিলো কমরেড মনিরুজ্জামানের জীবনের ব্রত, ফিরে এসেছিলেন খুলনায়। মত ও বিশ্বাসের প্রতি আস্থাটা কত গভীর হলে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব তা ভেবে দেখা দরকার। চিন্তা ও চিন্তনের এ গভীর বিশ্বাসের থেকেই কমরেড মনিরুজ্জামান ব্যক্তিকেন্দ্রিক, ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে নিজেকে সমষ্টির অংশ করতে পেরেছিলেন। তিলে তিলে সংকটটা কিন্তু এখানে গ্রথিত হয়েছে, ব্যক্তিজীবনের সব চাহিদা পূরণ করতে হবে, জীবন সংসারে ভোগের উপাদানগুলো জীবনে অনুসঙ্গ হবে, উদ্বৃত্ত সময় যতটুকু পাওয়া যায়, সেটুকুকে কতকটা রাজনৈতিক চিন্তার সংগঠক হিসেবে প্রকাশিত করা। সমাজ ও মানুষের নিরন্তন জীবন সংগ্রামে যুক্ত না থেকে উদ্ধৃতি আর বাকস্বর্বস্ব বিপ্লবীপনার বাল্যব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে বিল্পবী বা বিল্পবী পার্টির নেতা হওয়া যাবে না। কমরেড মনিরুজ্জামানের জীবন শিক্ষা তা-ই। আধুনিকতম দর্শন মার্কসবাদ সমাজ বিল্পবের বিজ্ঞানও বটে। মার্কসবাদে বিশ্বাসী প্রতিটি সমাজ বিল্পবের কর্মীর উচিত এ দর্শনকে নিয়ত গভীরভাবে চর্চা করা, অনুশীলন করা এবং আত্মস্থ করা। এক্ষেত্রে গভীর পর্যবেক্ষণ থাকা দরকার শুধুমাত্র মার্কসবাদকে চর্চা, অনুশীলন আর আত্মস্থ করে তাত্ত্বিক হলে চলবে না। প্রয়োজনে সমাজ পরিবর্তনের এ বিজ্ঞানকে সৃজনশীলভাবে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োগহীন তত্ত্ব যেমন অসাড়, আবার কাজ করছি কিন্তু মার্কসবাদের তত্ত্ব সম্পর্কে নূন্যতম ধারণা নেই, চর্চা নেই, সেটিও যথার্থ নয়। কমরেড মনিরুজ্জামান বিজ্ঞান নিয়ে লেখাপড়া করতেন, মার্কসবাদকে তিনি আত্মস্থ করেছিলেন গভীরভাবে। ছাত্রজীবনের উত্তরকালে মার্কসবাদের তাত্ত্বিক শিক্ষাকে বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন শ্রমিক আন্দোলনকে। নিজেকে সমর্পিত, সম্পৃক্ত করেছিলেন বৃহত্তর খুলনার পাটশিল্প শ্রমিকদের আন্দোলনে। তত্ত্ব এবং তত্ত্ব প্রয়োগের যে দৃষ্টান্ত তিনি সৃষ্টি করলেন তা অনবদ্যই নয়, অনুকরণীয়। তিনি হয়ে উঠলেন বিল্পবী পার্টির ক্যাডারদের নেতা। আজকের সময়ে, পার্টির এ প্রজন্মের ক্যাডারদের এ শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত, নিজেকে পরিশুদ্ধ করবার জন্য, সমাজ বিল্পবের কর্মী হিসেবে আরো আরো বেশি করে নিজের আত্মবিশ্বাসের জায়গাটাকে দৃঢ় করবার জন্য মার্কসবাদের মৌলিক গ্রন্থসমূহ নিয়মিত পড়াশোনা করা, চর্চা করা, ঠিক তেমনই আত্মস্থ মার্কসবাদী জ্ঞানকে বাস্তবে প্রয়োগের জন্য শ্রেণি আন্দোলনের কোনো না কোনো ক্ষেত্রে নিজেকে সম্পৃক্ত করা। একটা জিনিস মনে রাখা জরুরি, মার্কসবাদ কোনো কেতাব গ্রন্থ নয়। নিয়মিত সময় নির্দিষ্ট করে পাঠ করলাম আর পরম শ্রদ্ধায় ওষ্ঠ চুম্বনে সিক্ত করে লালসালুতে মুড়িয়ে পবিত্র স্থানে রেখে দিলাম- এটি তেমন নয়। এটি কোনোভাবেই কাম্যও নয়। প্রয়োজন সমাজে ক্রিয়াশীল শ্রেণিদ্বন্দ্বে নিজের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় এবং সঞ্চিত অভিজ্ঞতার সাথে মার্কসবাদী তত্ত্বের সমন্বয়। কমরেড মনিরুজ্জামান এ কাজটি করেছেন নিরন্তন, আমৃত্যু। ১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের আবহেই ব্যক্তি মুনিরুজ্জামানের পুনর্জন্ম হয়। মনিরুজ্জামান লাভ করেন কমিউনিস্ট পার্টি’র গৌরবের সদস্যপদ। জন্ম ও পুনর্জন্মে এক অদ্ভূদ সাদৃশ্য। ৪৯’-এ জন্মেছিলেন নিজেদের পাকিস্তানের শৃঙ্খলমুক্ত করবার একজন হিসেবে আর ৭২’-এ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে যে পুনর্জন্ম তা ৭১’-এ অর্জিত মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা এবং ধারাকে সমুন্নত রাখবার এক বিল্পবী যোদ্ধা হিসেবে। কমিউনিস্ট পার্টি শ্রেণি সংগ্রামের পার্টি। যদি শ্রেণি আন্দোলনে পার্টি সম্পৃক্ত ও সক্রিয় না থাকে তাতে পার্টির মধ্যে নানা দক্ষিণপন্থি ঝোঁক ও প্রবণতা বাড়তে থাকে। পার্টির ক্যাডারদের ক্ষেত্রেও এটা সত্য। প্রকৃত অর্থে আপনার যে পরিবারেই জন্ম হোক বা আপনি যে পরিবার থেকেই আসেন, সেটি বড় কথা নয়। কথা হচ্ছে, আপনি শ্রেণিচ্যুত কি না? একজন কমিউনিস্ট কর্মী হিসেবে আপনি আপনার জীবনচর্যা এবং জীবনচর্চায় শ্রমিক শ্রেণির আদর্শকে, তার শ্রেণিগত অবস্থানকে আপনি ধারণ করেন কি-না? কমরেড মনিরুজ্জামন যখন কমিউনিস্ট পার্টিতে যুক্ত হন, তার নেতা, তার শিক্ষক ছিলেন কমরেড রতন সেন। মার্কসবাদী তত্ত্ব ও তত্ত্ব প্রয়োগের অভিজ্ঞতালব্ধ প্রকৃত শিক্ষক কমরেড রতন সেনের প্রত্যক্ষ পরিচর্যায় মনিরুজ্জামান নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। না ‘বুকিশ’ না নিছক ‘মেঠো কর্মী’, এমনটিও নয়। শ্রমিকের কলোনিতে, তার ঝুঁপড়িতে, তাঁত চালাতে চালাতে ঘামার্ত শ্রমিকের জীবনের কষ্টের সাথে ঘনিষ্টভাবে যুক্ত ছিলেন মনিরুজ্জামান। ফলে তত্ত্বগত জ্ঞান আর বাস্তব ক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতা, মনিরুজ্জামানের কমিউনিস্ট জীবনকে, কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শের প্রতি আস্থাকে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করেছে। নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েট ইউনিয়নের বিদ্যমান সমাজতন্ত্রে যখন ভয়ঙ্কর ভূমিধস নেমে এলো, চারিদিকে বুর্জুয়া বুদ্ধিজীবীরা ‘ইতিহাসের শেষ’ (ঊ.ঙ.ঐ) বলে উল্লাস করতে লাগলো, আমাদের দেশের কিন্তু তার আঁচ আছড়ে পড়লো। দুই পাতা মার্কসবাদের চটি বই পড়ে যারা দিস্তা দিস্তা কাগজে লিখে মেকী মার্কসবাদী তাত্ত্বিকের ভড়ং ধরেছিলেন, হৃদয় তাদের ভেঙে খান খান। আর হবে না। ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাচি’ . . . . কমিউনিস্ট পার্টির ৭৭ জন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যের মধ্যে ৬৪ জন সদস্যই কমিউনিস্ট পার্টিকে বিলোপ করতে, ধ্বংস করতে উঠে পড়ে লাগলো। তখন মার্কসবাদের প্রাসঙ্গিকতাকে ধারণ করে এ বিলোপবাদী প্রবণতা থেকে পার্টি, পার্টির রক্তলাল পতাকাকে রক্ষা করেছেন যে ১৩ জন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, কমরেড মনিরুজ্জামান তাদের একজন। তার এই যে ভূমিকা, সেটি আবেগপ্রসূত নয়, কমিউনিস্ট হিসেবে, সমাজের বিকাশমান ধারার একজন বিশ্লেষক হিসেবে, বিজ্ঞানের সূত্রকে বুঝে নিয়েই হৃদয় দিয়ে এ ভূমিকা পালন করেছিলেন, আর এ হৃদয় বোধটিতো আর হাওয়া থেকে হয়নি, হয়েছে অর্জিত জ্ঞান আর অভিজ্ঞতার ফলে। ব্যক্তির ঊর্ধ্বে সমষ্টির কল্যাণে কাজ করা, দেশ ও জনগণের স্বার্থকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরাই কমিউনিস্টদের সংকল্প। কমরেড মনিরুজ্জামান ভোগবাদী জীবনলাভের সব সম্ভাবনা ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, দু’পায়ে দলেছেন সে সম্ভাবনাকে। হয়ে উঠেছিলেন পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী। এ সত্য হয়তো মেনে নিতে হয়, নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে সবাই হয়তো পাটির্র সার্বক্ষণিক হতে পারবেন না বা অধিক সার্বক্ষণিককে ধারণেও কিছু সীমাবদ্ধতা হয়তো আছে এই মুহূর্তে। কিন্তু বিল্পবী পেশাদারিত্ব, সেটা কিন্তু না থাকলে চলবে না। এ প্রজন্মের কমিউনিস্টদের বিল্পবী পেশাদারিত্বে মনোযোগী হতে হবে। কমিউনিস্ট হিসেবে প্রচলিত ধর্মসমূহের রাজনৈতিক ব্যবহারের যেমন ঘোর বিরোধী ছিলেন কমরেড মনিরুজ্জামান। মার্কসবাদী বস্তুবাদী হিসেবে ব্যক্তিজীবনে ও ধর্মের আচার প্রতিপালনে তিনি ছিলেন সীমাবদ্ধ। প্রকৃত শ্রেণি আন্দোলনকে শক্তিশালী করা গেলে, ধর্মেও যে সুবিধাবাদী রাজনৈতিক ব্যবহার তা বহুলাংশেই প্রতিহত সম্ভব। আজকের প্রজন্মের কমিউনিস্টদের সতর্কতার সাথে বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে। সমাজ সম্পৃক্ততার নামে মধ্যবিত্ত সুবিধাবাদী ঝোঁকের প্রবণতা থেকে ব্যক্তিজীবনে ধর্মের বাড়াবাড়ি যেন না হয়ে যায়। ক্ষেত্রবিশেষে গ্রহণ করা কৌশল যে ব্যক্তিজীবনকে আক্রান্ত না করে ফেলে। মানবমুক্তির মহোত্তম সংগ্রামের কঠিন, বন্ধুর পথ হেঁটে চলেছে কমিউনিস্টরা। কমিউনিস্টরাই শৃঙ্খল ভেঙে মানুষকে দিতে পারে ‘মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজ’। কমিউনিস্টরাই সকল অসত্য, অসুন্দর, অকল্যাণ থেকে দিতে পারে মানুষের মুক্তি। সকল জুলুম, অত্যাচার, অবিচার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কমিউনিস্টরাই প্রতিবাদী। কমিউনিস্টরাই প্রকৃত মনুষ্যত্ত্বের পক্ষে মানবতাবাদী। যারা কমিউনিস্ট নামাবলি গায়ে জড়িয়ে কমিউনিস্টদের আদর্শকে বিক্রি করে দেন, বিক্রি করে দেন কমিউনিস্টদের স্বপ্নকে, কমরেড মনিরুজ্জামানদের জীবনকর্ম সেসব তষ্কর, কথিত কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট শব্দের বিশুদ্ধ উচ্চারণ। প্রতিবাদে ও শুদ্ধতায় সমার্থক। আমাদের শিক্ষা নিতে হবে, নিজেদের আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে নিরন্তন কমিউনিস্ট হিসেবে গড়ে উঠবার প্রয়াস নিতে হবে। কমরেড মনিরুজ্জামান আমাদের পথ দেখাবেন। এই চিরঞ্জীব বিপ্লবীর প্রতি লাল সালাম।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..