ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

ঐক্যবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে পরাজিত করতে হবে

একতা ভাষ্যকার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিজয় রথে চড়ে ক্ষমতাসীন অধ্যাপক ইউনুস সরকার কর্তৃক নানা গড়িমসির পর ঘোষিত হয়েছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল। বহু আকাক্সিক্ষত সেই নির্বাচন সঠিক সময়ে হবে কিনা তা নিয়েও সংশয় ছিল জনগণের। তবে সংশয় কাটিয়ে এখন পর্যন্ত তফসিল ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে নির্বাচনী যাত্রা। তফসিল অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মনোয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন ছিল গত ২৯ ডিসেম্বর। নির্ধারিত এ সময়সীমার মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৫১টি রাজনৈতিক দলের ২ হাজার ৯০ জন প্রার্থী। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সারা দেশে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৪৭৮ জন। অর্থাৎ দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৫৬৯ প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র বাছাই চলবে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ আগামী ২০ জানুয়ারি। ভোট গ্রহণ হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচনে নবগঠিত গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের শরিক সিপিবির ৬৫ জন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ৪১ জন, বাসদ (মার্কসবাদী)র ৩২ জন ও বাংলাদেশ জাসদ-এর ১৫ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। এছাড়া বিএনপির নেতৃত্বাধীন একটি ও ইসলামী দলসমূহের আরেকটি জোট গঠিত হয়েছে। ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃত্বের একাংশের দ্বারা গত বছর গঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপি শামিল হয়েছে ইসলামী দলগুলোর জোটে। মধ্যপন্থার রাজনীতির স্লোগান দিয়ে এরা চরম ডানপন্থি শক্তির সাথে হাত মিলিয়েছে। বিএনপি নিজ দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বহিষ্কার পেরিয়ে ছোট ছোট শরিকদের অল্প কয়েকটি আসন দিয়ে তারা তিনশত আসনে প্রার্থী নির্ধারণ করেছে। কিন্ত ইসলামী দলগুলো এখন পর্যন্ত ঠিক করতে পারেনি জোটের প্রার্থী কারা হবে। জোটের প্রধান দুই দলের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে মনোমালিন্যের খবর পত্রিকায় বেরিয়েছে। অপরদিকে ইসিতে নিবন্ধিত বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, তরিকত ফেডারেশন, তৃণমূল বিএনপি ও বাংলাদেশ জাতীয়বাদী আন্দোলন কোনো প্রার্থী দেয়নি। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত থাকায় তারাও কোনো প্রার্থী দিতে পারেনি। এখন পর্যন্ত তফসিল অনুযায়ী অগ্রসর হলেও নির্বাচন নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে মানুষের যে আগ্রহ ছিল তা দুশ্চিন্তায় পর্যবসিত হচ্ছে। মানুষের আকাঙক্ষা ছিল অধ্যাপক ইউনুস হাসিনা আমলের তিনটি নির্বাচনের কলঙ্ক মুছে দিতে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠ নির্বাচনের আয়োজন করবেন। যেই নির্বাচন হবে কালো টাকা, পেশি শক্তি, ধর্মের অপব্যবহার ও প্রশাসনিক কারসাজিমুক্ত। জনগণ নিজের ম্যান্ডেট দিতে পারবে। মানুষের আশা ছিল এ নির্বাচনটি গুণগতভাবে ভিন্ন হবে। কিন্তু অধ্যাপক ইউনুসের গত দেড় বছরের শাসনে মানুষ হতাশ। অধ্যাপক ইউনুস প্রতিটি ভাষণে আনন্দঘন পরিবেশে একটি ঐতিহাসিক নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু তার নেতৃত্বাধীন সরকার আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারার কারণে একজন প্রার্থী ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড ও হত্যাকারীর নিরাপদে দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে তা ভুয়া প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়েছে। একজন প্রার্থীর হত্যাকাণ্ড নির্বাচনকে শুরুতেই বিষাদময় করে দিয়েছে। ফলে সাড়ে আটশ মানুষের মৃত্যু ও পঁচিশ হাজার মানুষের আহত ও পঙ্গুত্ব বরণের মধ্য দিয়ে পাওয়া এ নির্বাচন অতীতের নির্বাচনের মত পরিণতি বরণ করার সংশয় দেখা দিয়েছে। জনগণের এ সংশয়ের কারণ গত বছর ২০২৫ সালে আইন শৃংখলা বিষয়ে ইউনুস সরকারের ব্যর্থতা। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সদ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালজুড়ে মব সন্ত্রাস আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ‘কোনো ধরনের প্রমাণ, তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে, সন্দেহ, গুজব সৃষ্টি করে মানুষকে মারধর ও হত্যা করা হয়েছে। তৌহিদি জনতার নামে বেআইনিভাবে মব তৈরি করে শিল্প-সংস্কৃতি কেন্দ্র ভাঙচুর, বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, এমনকি কবর থেকে তুলে লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। মুক্তিযোদ্ধাসহ বিরুদ্ধ মতের মানুষকে নানাভাবে হেনস্তা করার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে।’ আসকের হিসাব অনুযায়ী ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মব সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১৯৭ জন নিহত হযেছে। ২০২৪ সালে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছিল ১২৮ জন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে কমপক্ষে ২৯৩ জন মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছে। আসকের একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে কমপক্ষে ১০৭ জন দেশের বিভিন্ন কারাগারে মারা গেছেন। এর মধ্যে ৬৯ জন হাজতি এবং কয়েদি ৩৮ জন। একই সময়কালে অর্থাৎ ২০২৫ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ৩৮টি। এসব ঘটনা সংঘটিত হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে, নির্যাতনে, কথিত ‘গুলিতে’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে। ২০২৫ সালে সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফ ৩৪ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে। ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৭৪৯টি। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৬ জনকে এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে ৭ জন। ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১০২ জন। রবিদাস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৫ আসনে সিপিবি সমর্থিত প্রার্থী শিপন রবিদাসের ভাষ্যানুযায়ী দলিত রবিদাস সমাজের উপর অভিশাপ ছিল ২০২৫ সাল। এ বছর রংপুরের তারাগঞ্জের মবের শিকার হয়ে রুপলাল রবিদাস, মিঠাপুকুরের প্রদীপলাল রবিদাস, নওগাঁর ধাম্ইুরহাটের নিতাই রবিদাস, ময়মনসিংহের তারাকান্দার গার্মেন্ট শ্রমিক দিপু রবিদাস প্রাণ হারিয়েছেন। দিপু রবিদাসকে পিটিয়ে হত্যার পর তার মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রবিদাস পল্লী ভাঙচুর করে তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর সৃষ্ট পরিকল্পিত নৈরাজ্য দমন করার পরিবর্তে সরকার তা সংঘটিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে প্রকাশ্যে দৈনিক প্রথম আলো, ডেইলি স্টার অফিস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলার সুযোগ করে দিয়েছে। উগ্র সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়িয়ে স্বাধীনতার সাংস্কৃতিক শক্তি ও মণন নির্মাণকারী ছায়ানট ও উদীচী কার্যালয় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া এবং হার্মাদদের এখন পর্যন্ত গেপ্তার না করা সরকারের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা উগ্রশক্তিকেই চিনিয়ে দেয়। ফলে মানুষের মনে সংশয় তৈরি হয়েছে, একটা ভাল নির্বাচন হওয়ার পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে তীরোহিত হচ্ছে। একটা গোষ্ঠী নির্বাচন চায় না। কিন্তু সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা রাখতে হবে ঘোষিত সময়ে নির্বাচন সম্পন্ন করার। নির্বাচন না হলে উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর লাভ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফলাফল আত্মসাৎকারী এ শক্তি বিনা নির্বাচনে ক্ষমতা ভোগদখল করতে চায়। তারা জানে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তাদের ক্ষমতায় আসা দূরে থাক, সামান্য ক’টা আসনও তাদের ভাগ্যে জুটবে না। তাই তারা যেনতেন প্রকার নির্বাচন করে ক্ষমতার মসনদে থাকতে চায়। এরা হাসিনা আমলে দলে ঢুকে গুপ্ত ছিল। এখন তারা সম্ভাব্য বিজয়ী দলের কাছে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের মর্যাদা নিশ্চিত করতে অন্তত ত্রিশটি আসনের নিশ্চয়তা চায়। জামাত নেতা ডা. শফিকুর রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর দেশের ফেরার আগ মুহূর্তে লন্ডনে গিয়ে এই আব্দার করে এসেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানাতে গিয়ে ডা. শফিক তারেক রহমান সাহেবের কাছে পুনরায় একই আব্দার করেছেন। এ ধরণের আব্দারে কর্ণপাত করলে বিএনপি পুনরায় ভুল করবে। সিট ভাগাভাগির এ নির্বাচন জাতির জন্য দুর্ভোগ ডেকে আনবে। ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের শত্রু, নারী বিদ্বেষী শক্তি জামাতসহ অন্যান্য উগ্র প্রতিক্রিয়াশীল দল ও গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় না দিয়ে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে হবে। বিএনপির সামনে সে সুযোগ আছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তিকে সাথে নিয়ে তাদের সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। না হলে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..