বিপ্লবের ব্যাকরণ ও ইতিহাসের ছন্দ

যতীন সরকার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মহান অক্টোবর বিপ্লবের শতবার্ষিকী উদ্যাপিত হয়েছে বছর ধরে। উদ্যাপনকারীদের অনেকেই সেই বিপ্লবের সাফল্য ও ব্যর্থতা এবং ইতি-নেতির নানা বিষয় তাঁদের বক্তব্যে তুলে এনেছেন। সে-সব বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তাঁরা অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন, সুন্দর ও কাক্সিক্ষত ভাবীকালের রূপরেখা অঙ্কনের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে কর্তব্য নির্ধারণে প্রয়াসী হয়েছেন। ‘বিপ্লব স্পন্দিত’ তাঁদের অন্তর। নৈরাশ্যকে দূরে ঠেলে সতর্ক আশাবাদে উদ্দীপ্ত থেকেই তাঁরা পথ চলতে চাইছেন। সেই পথে যে রয়েছে অনেক বাধা ও বিপত্তি, বিছানো রয়েছে অনেক অচিন্তিতপূর্ব ভ্রান্তির জাল– সে-বিষয়েও তাঁদের সচেতন থাকতে হবে বৈকি। বর্তমানে যাঁরা বিপরীত পথের যাত্রী, তাঁদেরও অনেকেই এক সময় বিপ্লবের পথ ধরেই হাঁটছিলেন। কিন্তু বিপ্লবের ব্যাকরণ পাঠে একটুও মনোযোগী ছিলেন না তাঁরা। চূড়ান্ত বিভ্রান্তির মায়াজালে পড়ে এঁদের কেউ কেউ খুব দ্রুতই গন্তব্যে পৌঁছে যেতে চেয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে চলার কথাও তাঁরা ভাবেননি, জনগণের ভাব-ভাবনার প্রকৃতিকে অনুধাবনের প্রয়োজনও তাঁরা বোধ করেননি। অস্থিরচিত্ত দ্রুত বিপ্লব-প্রত্যাশীদের কেউ কেউ তো তাঁদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে জনঘৃণারই প্রকাশ ঘটিয়েছেন, ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের’ ধ্বনি তুলে কেউ কেউ সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক অবিমৃষ্যকারিতার আশ্রয় নিয়েছেন। দ্রুত বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলার মরিয়া তাগিদে আবিষ্ট হয়ে পড়েছিলেন যাঁরা, তাঁরা বোধ হয় বাংলার বাউলের সেই অমর সতর্ক বাণীর কথা জানতেন না, কিংবা জানলেও সেটি তাঁদের বিবেচনায় ছিল বিপ্লববিরোধী প্রতিক্রিয়াশীলদেরই কথা– ‘নিঠুর গরজি! তুই মানস মুকুল ভাজবি আগুনে? তুই ফুল ফুটাবি, বাস ছুটাবি সবুর বিহনে? দেখ্ না আমার পরমগুরু সাঁই- যুগযুগান্তে ফুটায় মুকুল তার তাড়াহুড়া নাই। তোর লোভ প্রচণ্ড ভরসা দণ্ড তোর কী আছে উপায়?’ না, কোনো উপায় নেই। বিপ্লব যখন এই ‘নিঠুর গরজি’দের হাতের মুঠোয় ধরা পড়ল না, বিশেষ করে বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকের গোড়াতেই যখন সমাজতান্ত্রিক শিবিরে অচিন্তিতপূর্ব বিপর্যয় ঘটে গেল, তখনই তাদের মাথার ভাব-ভাবনা সব উল্টে গেল, আর উল্টোপথে হুড়মুড় করে চলতে গিয়ে কে যে কোথায় ছিটকে পড়ল তার কোনো ঠিক-ঠিকানাই খুঁজে পাওয়া গেল না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- “কর্মের তাল যতই দ্রুত হয়, দেহের পক্ষে ততই দ্বিধাবিহীন হওয়া দরকার। ভাবতে মনের যে-সময় লাগে তার জন্যে সবুর করতে গেলেই দ্বিধা ঘটে। বাহিরে কর্মের ফল সেই সবুরের জন্য যদি অপেক্ষা করতে না পারে তাহলেই বিভ্রাট।” সে-রকম ‘বিভ্রাট’ই তো অতিবিপ্লবীদের কর্মফল। তবে আপাতদৃষ্টিতে যাদের অতি-বিপ্লবী বলে মনে হয়, তাদের কেউ বিপ্লবীই নয়। আসলে এরা অভিনয়-নিপুণ প্রতিবিপ্লবী। অতিবিপ্লবীর নিখুঁত অভিনয় করেই বিপুল সংখ্যক সরলপ্রাণ বিপ্লবকামীদের এরা বিভ্রান্তির পথে টেনে নিয়ে যেতে থাকে, এবং বিশেষ বদমতলব নিয়ে বিপ্লবীদের সংগঠনের ভেতরেও অনুপ্রবেশ করে। এভাবেই একপর্যায়ে এই ‘জাতে মাতাল তালে ঠিক’ নিপুণ অভিনেতারা তাদের মতলব হাসিল করে ফেলে-অর্থাৎ সরলপ্রাণ বিপ্লবকামীদের একটা বড় অংশকে এরা পুরোপুরি বিভ্রান্ত ও বিপ্লবের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলতে সক্ষম হয়, এবং এদের নিয়েই বিপ্লববিরোধী কর্তৃত্বশীলদের বিভিন্ন গোষ্ঠীও দলে ঢুকে পড়ে। আমাদের দেশসহ সারা দুনিয়ায় বিগত শতকের নব্বই দশক ও তার পরবর্তী রাজনীতির দিকে তাকালেই ব্যাপারটি স্পষ্ট ধরা পড়ে, স্পষ্টতর করে আর কিছু বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। তাই বলে ‘নিঠুর গরজি’দের বিপরীতপন্থি হয়ে গদাইলস্করি চালে চলা, কিংবা সামনে চলার গরজকে জলাঞ্জলি দিয়ে নিথর নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা,-এর কোনোটাই চলবে না। সবুর না করে মেওয়া ফলানো যায় না বটে, কিন্তু গাছে মেওয়া ফলাতে হলে সেই গাছটির যথাযথ পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করে যেতে হয়, এবং সেই লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত সকর্মক থাকতে হয়। ভাবনাহীন কর্ম নয়, এবং কর্মহীন ভাবনা নয়। বিপ্লবের মেওয়া ফলাতে হলে বিপ্লবীকে অবশ্যই সঠিক ভাবনার সঙ্গে কর্মের তথা প্রকৃত তত্ত্বের সঙ্গে প্রয়োগের মেলবন্ধন ঘটাতে হয়। বিপ্লবের ব্যাকরণশাস্ত্রটির যথাযথ অনুধাবন ও তার যথাবিহিত অনুশীলন ছাড়া তেমনটি করা কোনোমতেই সম্ভব নয়। বিপ্লবের ব্যাকরণশাস্ত্র মানে ‘দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’। সেই শাস্ত্রই আমাদের জানায় যে, সঠিক ক্ষণটি না-এলে কোনোমতেই জোর করে বিপ্লব ঘটানো যায় না। তবে উপযুক্ত ক্ষণ এলে যথাবিহিত পদ্ধতিতে জোর প্রয়োগ না করেও বিপ্লবের ‘ফুল ফুটানো ও বাস ছুটানো’ যায় না। অর্থাৎ জোর খাটানো থেকে নিবৃত্ত থাকা ও জোর খাটানোতে প্রবৃত্ত হওয়া-দুই-ই বিপ্লবসাধনের জন্য অপরিহার্য, এবং দুয়ের জন্যই শাস্ত্রবিহিত বিশেষ বিশেষ বিধান আছে। বিপ্লবীদের অবশ্যই সেই সব শাস্ত্রবিধান জানতে হবে ও মানতে হবে। আবার শাস্ত্রের বিধান মেনে-এবং শাস্ত্রবিধানের দেশকালোপযোগী সংস্কারসাধন ও নবায়ন ঘটিয়ে-বিপ্লবের সঠিক ক্ষণটিকে এগিয়ে আনার ও প্রকৃতিটি চিনে নিয়ে বিপ্লব সংঘটনের জন্য অনুঘটকের কাজটিও করতে হয় বিপ্লবীকেই। সে-কাজটি করতে গিয়েও বিপ্লবীকে অনেক প্রমাদ ও ভ্রান্তির ভেতর দিয়ে যেতে হয়। তেমনটিই যেতে হয়েছিল মহান বিপ্লবী লেনিনকেও। তবে সঠিক শাস্ত্রজ্ঞান, যথার্থ বাস্তবজ্ঞান ও সুতীক্ষ্ম কাণ্ডজ্ঞানের অধিকারী ছিলেন বলেই তিনি সকল প্রমাদ ও ভ্রান্তি থেকে নিজেকে ও বিপুলসংখ্যক জনগণকে মুক্ত করে তুলতে ও বিপ্লবের সঠিক ক্ষণটিকে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। এবং সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে ব্যর্থ হতে দেননি বলেই তাঁর নেতৃত্বে সার্থক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। নতুন পঞ্জিকা অনুসারে সেই বিপ্লবের দিনটি ৭ নভেম্বর। তবে রুশদেশে প্রচলিত তখনকার পঞ্জিকায় তা ছিল পঁচিশ অক্টোবর। সে-কারণেই ‘অক্টোবর বিপ্লব’ নামে এর পরিচিতি। ‘বিপ্লবের ব্যাকরণশাস্ত্র’ বলছি যাকে, সেই দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের মতে : পরস্পরবিরোধী শক্তির অবিরাম দ্বন্দ্বে সকল বস্তু ও ঘটনাধারার ভেতরেই ঘটতে থাকে ‘পরিমাণগত পরিবর্তন’, সেই পরিবর্তনের ধারাপ্রবাহে একপর্যায়ে ঘটে যায় ‘গুণগত পরিবর্তন’। অর্থাৎ সৃষ্টি হয় নতুনের, কবিগুরুর ভাষায়-‘পুরাতনের হৃদয় টুটে আপনি নূতন ফুটে’। জার শাসিত রুশ দেশের সমাজ-বিধানে পরিমাণগত পরিবর্তনের প্রবাহ চলছিল দীর্ঘদিন ধরে, অন্তত ঊনিশ শতকের সত্তরের দশক থেকে তো বটেই। সে-সময় থেকেই বিশিষ্ট বিপ্লবী চিন্তক জর্জি ভালেন্তিনোভিচ প্লেখানভ বিপ্লবের ব্যাকরণচর্চা ও চর্যার সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন, অর্থাৎ মার্কসীয় ধ্যানধারণা প্রসারের কর্মকাণ্ড শুরু করেছিলেন। সেই কর্মকাণ্ডে যা সূচিত হয়েছিল, ভবিষ্যৎ বিপ্লবের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে তা যেন ছিল ‘সন্ধ্যা বেলার দীপ জ্বালানোর জন্য সকাল বেলায় সলতে পাকানো’। ঊনিশ শতকে সেই সলতে পাকানোতে হাত পাকিয়েই ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন বিশ শতকে কড়া নজর রেখে বিপ্লবের দীপটি জ্বালিয়ে তুলতে পেরেছিলেন। সে-কারণেই সঠিক দিনে সঠিক ক্ষণে সঠিক পদ্ধতিতে সংঘটিত হতে পেরেছিল সেই দুনিয়া কাঁপানো বিপ্লব। রুশ দেশে বিপ্লব-সাধনের প্রস্তুতিপর্বটি চলছিল মূলত সারা দেশজুড়ে অনেক অনেক ‘সোভিয়েত’ বা বিপ্লবীদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংগঠন গড়ে তোলার মাধ্যমে। সে-সময় দেশটির শাসনকাজ চালাচ্ছিল গণবিরোধী অথচ দুর্বল একটি অস্থায়ী সরকার। সেই সরকার স্থির করেছিল যে তার কংগ্রেস বা অধিবেশন বসবে ১৯৭১-র নভেম্বর মাসের ৮ তারিখে। অন্যদিকে, ‘সকল ক্ষমতা থাকবে সোভিয়েতের হাতে’-লেনিনকৃত এই নীতির ওপর ভর করেই পুরো ভূখণ্ডজুড়ে বিপ্লবের প্রক্রিয়াটি অগ্রসর হচ্ছিল। রুশদেশের সবগুলো সোভিয়েতের একটি যুক্ত অধিবেশন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় বিপ্লব-সংঘটনের আশু লক্ষ্য নিয়েই। স্থির করা হয় যে নভেম্বরের ৭ তারিখে বসবে সেই অধিবেশন। সমস্ত পরিকল্পনাটিই ছিল লেনিনের। বিষয়টিকে স্পষ্ট করার জন্য পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর ‘বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ’ বইয়ের ‘বলশেভিকদের ক্ষমতালাভ’ অধ্যায়ের দুটো অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করছি- “লেনিন পেট্রো গ্রাডের উপকণ্ঠে এসে পৌঁছলেন। বলশেভিকরা স্থির করল, অস্থায়ী সরকারের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেবার সময় এসেছে। এই বিদ্রোহের সমস্ত বন্দোবস্ত করবার ভার দেওয়া হল ট্রটস্কিকে। কোন কোন মর্মস্থল দখল করে নিতে হবে, কখন নিতে হবে, ইত্যাদি সমস্ত পরিকল্পনাই ছক কেটে কেটে স্থির করা হল। ৭ নভেম্বরকে বিদ্রোহের দিন বলে ধার্য করা হল। সেই দিন রাশিয়ার সমস্ত সোভিয়েটের একটি যুক্ত অধিবেশন হবার কথা ছিল। লেনিনই এই দিনটিকে স্থির করলেন; যে যুক্তি দেখালেন সে চমৎকার। তিনি নাকি বলেছিলেন, “৬ নভেম্বর করতে গেলে বেশি তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। বিদ্রোহ করতে হলে সমস্ত রাশিয়াকে একত্র করেই করতে হবে; ৬ তারিখে কংগ্রেসের সমস্ত প্রতিনিধিরা এসে পৌঁছবেন না। আবার ৮ তারিখে করতে গেলেও খুব বেশি দেরি হয়ে যাবে-সেদিন দেখা যাবে কংগ্রেস রীতিমতো সুশৃঙ্খল হয়ে অধিবেশন শুরু করেছে কিন্তু এই রকম খুব বৃহৎ একটা জনসংঘের পক্ষে দ্রুত এবং নিশ্চিত কাজ করা সহজ নয়। অতএব আমাদের কাজ উদ্ধার করতে হবে ৭ তারিখে। কংগ্রেসের সভ্যরা সেই দিনই এসে মাত্র একত্র হবেন। আমরা তাদের গিয়ে বলব, ‘এই-যে, ক্ষমতা হস্তগত করেছি! এখন একে নিয়ে কী করবে তোমরা তাই বলো!” এই ছিল সেই তীক্ষ্মবুদ্ধি কুশলী বিপ্লবীর যুক্তি; তিনি খুব ভালো করেই জানতেন, বাইরের দৃষ্টিতে যেসব ঘটনা অতি তুচ্ছ, অনেক সময় তারই উপরে বিপ্লবের সাফল্য-অসাফল্য নির্ভর করে। ৭ নভেম্বর এল। সোভিয়েটের সৈন্যরা গিয়ে সরকারি বাড়িগুলো দখল করল; বিশেষ করে টেলিগ্রাফ অফিস, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, সরকারি ব্যাংক ইত্যাদি স্থানগুলি। এদের কেউ বাধাই দিল না। একজন ব্রিটিশ চর এর সম্বন্ধে যে সরকারি বিবরণ ইংলন্ডে পাঠালেন তাতে তিনি এর বর্ণনা দিলেন, এই বলে, ‘অস্থায়ী সরকার শুধু শূন্যে মিলিয়ে গেল।” এভাবেই ঘটে গেল সেই অভূতপূর্ব বিপ্লব। ‘অভূতপূর্ব’ বলছি এ-কারণে যে : আগের যুগগুলোতে যে-সব বিপ্লব হয়েছে, সে-সবের ভেতর দিয়ে এক শোষক শ্রেণির বদলে অন্য আরেক শোষক শ্রেণি ক্ষমতা লাভ করেছ, শোষণহীন সমাজ গঠনের কোনো উপাদানই সে-সব বিপ্লব ধারণ করেনি। অক্টোবর বিপ্লবেও পুরোপুরি শোষণহীন ব্যবস্থা বলবৎ হয়ে যায়নি যদিও, তবু এই বিপ্লবেই সে-রকম ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া সূচিত হয়। এ-কারণেই এ-বিপ্লব সম্পূর্ণরূপেই অভূতপূর্ব। কিন্তু হায়, অভূতপূর্ব সেই বিপ্লবের সত্তর বছর অতিক্রান্ত হতে-না-হতেই যা ঘটে গেল তাকে তো ‘অচিন্তিতপূর্ব’ ছাড়া আর কিছুই বলা যাচ্ছে না। আমাদের তো আজ দুশ্চিন্তার অন্ধকূপে পড়ে হাবুডুবু খেতে হচ্ছে। আমরা কি কোনো দিন চিন্তা করেছি যে হঠাৎ করেই একদিন বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক শিবিরে ধস নেমে পড়বে, আজ পুঁজিতন্ত্রীরা উল্লাসের হাসিতে বিশ্বকে কাঁপিয়ে তুলবে? বিশ্বায়নের নামে বিশ্বেশ্বর হয়ে ওঠার স্পর্ধায় উচ্চকিত হয়ে উঠবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ? এখানে ওখানে দেখা দেবে এমন সব ভুঁইফোঁড় তত্ত্ববিদ, যারা উচ্চকণ্ঠে পুঁজিবাদের চিরস্থায়িত্বের অপতত্ত্ব আওড়াতে আওড়াতে আমাদের কানে তালা লাগিয়ে দেবে? অচিন্তিতপূর্ব বিপর্যয়ের মুখে পড়ে এক সময়কার বিপ্লববাদীদেরও অনেকের চিন্তায় বিপর্যয় ঘটে গেছে। তাঁদেরও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন : ১৯১৭ সনের রুশবিপ্লবের ফলে সাম্যবাদী সমাজের লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে বলে যে মনে করা হতো, সেই রুশবিপ্লবই কি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায়নি? সমাজতান্ত্রিক শিবির রূপে যাকে অভিহিত করা হতো তারও অস্তিত্ব কি আজ শূন্যে মিলিয়ে যায়নি? এরপরও সাম্যবাদী সমাজের স্বপ্নকে ইউটোপিয়া ছাড়া আর কিছু বলা যাবে কি? এ-ধরনের প্রশ্নে তাড়িত হচ্ছেন তাঁরাই, যাঁদের ‘একচক্ষু হরিণ’ ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। সত্যের এক পিঠের ওপরই তাঁদের দৃষ্টি পড়ে, অন্যদিক তাঁদের দৃষ্টির বাইরে থেকে যায়। ইতিহাসের ছন্দ বা নিয়ম সম্পর্কে তাঁরা কিছুই জানেন না, এবং জানেন না যে তাঁরা তাও জানেন না। সে-কারণেই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁদের কণ্ঠে কেবল হতাশাই ঝরে পড়ে। তাঁরা জানেন না যে : যদিও ইতিহাসের গতি সর্বদা সামনের দিকেই, তবু সে-গতি কোনোমতেই সরলরেখা ধরে চলে না। ইতিহাসের গতিপথটি প্যাঁচালো বলেই কখনো কখনো মনে হয় যে, সে বুঝি পেছনেই ঘুরে গেল। আসলে এই পেছনে ঘুরে যাওয়া সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্যই। এটিই ইতিহাসের বিশেষ নিয়ম। সেই নিয়ম কার্যকর ছিল আগেরকার সকল সমাজ-ব্যবস্থাতেও। সমাজতন্ত্রের ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটেছে। সাম্রাজ্যবাদীদের নানা অপকৌশলের মোকাবিলা করতে না-পেরে, এবং সমাজতন্ত্রীদের নিজেদেরও নানা ভুলের কারণেই, সমাজতন্ত্রে আপাত-বিপর্যয় নেমে এসেছে। কিন্তু ভুল বা পরাজয় কিংবা বিপর্যয়ই শেষ কথা হতে পারে না। আপাত বিপর্যকে কাটিয়ে ওঠার পথের সন্ধান পাওয়া যাবেই। মানুষই সেই পথের খোঁজ করছে ও করবে। সেই পথের খোঁজ করতে গিয়েই প্রকৃত বিপ্লবীরা অতি-বিপ্লবী, প্রতিবিপ্লবী ও মেকি বিপ্লবীদের চিনে নিতে বিপ্লবের ব্যাকরণচর্চায় মন দেবে। বিপ্লবের ব্যাকরণ আয়ত্ত করেই তারা ইতিহাসের ছন্দ সম্পর্কে অবহিত হবে। ইতিহাসের ছন্দটি অধিগত হলেই বিপ্লবের পথে চলতে গিয়ে তারা বেপথু হয়ে যাবে না। ‘নিঠুর গরজি’ হয়ে তারা যেমন মানস মুকুলকে আগুনে ভাজবে না, তেমনই চলবে না গদাইলস্করি চালেও। বিপ্লবের ফুল ফোটাবার ও বাস ছোটাবার লক্ষ্যে প্রতিক্ষণ সকর্মক থেকে সঠিক ‘ক্ষণ’টিকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করার-এবং তাকে সার্থক করে তোলার-তাগিদ নিয়েই এসেছিল অক্টোবর বিপ্লবের শতবর্ষ। লেখক : বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..