
ভারতীয় উপমহাদেশের সভ্যাতা, পৃথিবীর সব সভ্যতা থেকে প্রাচীন। ভারতীয় উপমহাদেশ বলতে বুঝায় ভারত, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান এবং বার্মাকে। নৃ-তাত্ত্বিকদের মতে আজ থেকে প্রায় ৫ লক্ষ বছর আগে এই উপমহাদেশে মানুষ বাস করত। এই উপমহাদেশেই ত্রিশ হাজার বছর আগে সিন্দু সভ্যতার উন্মেষ ঘটে। যা হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর সভ্যতা নামে পরিচিত। হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর ধ্বংস নিয়ে নানা মত রয়েছে। তবে অনেক ঐতিহাসিকের ধারণা যে, আর্যরা এই সভ্যতা ধ্বংস করে, ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করেছিল। এই অঞ্চলের অনেক মানুষ ঐ সময় বিশ্বের নানা অংশে গমনাগমন করেছিলেন এর জন্য ধরে নেয়া যায় যে, আমেরিকার আলাস্কায় প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার বছর পূর্বে যে এশীয়রা বসতি গড়ে তোলে– তারা ভারতীয় উপমহাদেশেরই মানুষ ছিলেন। যাদেরকে বর্তমানে রেড ইণ্ডিয়ান বলা হয় এবং জাতিতে অভিহিত করা হয় নিগ্রো। বৃটিশরা আমেরিকায় বসতি স্থাপন করার পর কৌশলে এ জনগোষ্ঠীর মানুষগুলির একটা বড় অংশকে দাস বানিয়ে রাখে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভারতীয় উপমহাদেশে অভিবাসন স্থাপন করা প্রাচীন জনগোষ্ঠী হলো সাঁওতালরা। সাঁওতাল আদিবাসীদের মধ্যে রয়েছে অনেকগুলি গোত্র। প্রতিটি গোত্রের আছে নিজস্ব ভাষা, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক ধারা। সাঁওতালরা অস্ট্রিক ভাষাভাষী। অভিবাসন গমনাগমন হিসাবে সাঁওতালরা ভারতীয় উপমহাদেশের পুরাতন বাসিন্দা। অনেক ঐতিহাসিকদের মতে, সাঁওতালদের বসতি গড়ে তোলার পর এই অঞ্চলে দ্রাবিড়দের আবির্ভাব ঘটে। ঐতিহাসিকদের মতে এই অঞ্চলের কৃষি আবাদের প্রচলন শুরু করে সাঁওতালরাই। ভারতীয় উপমহাদেশ নদীবাহিত উর্বর মৃত্তিকা অঞ্চল। আর এখানকার তু চক্রটি ঘটে দুই মাস অন্তর অন্তর। উপমহাদেশের বৈচিত্র্যপূর্ণ আবহাওয়ার জন্য এখানে শুরু হয় বিভিন্ন ধরনের শস্যর আবাদ। আবাদ ও বীজ বন্ন পদ্ধতির শুরুটা আদিবাসী সাঁওতালদের হাত ধরে। বছরের বারো মাসেই কৃষি পণ্য উৎপাদিত হয় এই অঞ্চলে। তবে উপমহাদের বিভিন্ন এলাকায় ফসলের ধরনের ভিন্নতা রয়েছে। অঞ্চলের শস্য মৌসুমকে কেন্দ্র করে তৈরি উৎসবতার। বাংলা অঞ্চলটি ছিল উপমহাদেশের সবচেয়ে বেমী উর্বর। এখানে বারো মাসেই ফসল ফলত। তাই বাংলায় বারো মাসে তেরো পার্বণ উদযাপিত হত। কারণ প্রতিটি শস্য উৎপাদনকে কেন্দ্র করে তখনকার সময়ে এই অঞ্চলের মানুষ উৎসবে মেতে উঠত। সুতরাং শস্য উৎপাদন কে কেন্দ্র করে যে উৎসব হয় তা সার্বজনীন। কারণ জীবন ধারনের জন্য মূল উপকরণ তা- খাদ্য। এই উৎসবগুলোর মধ্যে কারাম একটি প্রাচীন উৎসব যা এখনো সাঁওতাল আদিবাসীরা পালন করে আসছে। এই উৎসবকে এখন বেধে ফেলা হয়েছে ধর্মের ফ্রেমে। শুধুমাত্র আদিবাসীরাই এই উৎসবটা পালন করেন। এই জনপদে আর্যদের আগমনের পর শুরু হয় নানা ধর্মের প্রচলন। উৎসবগুলোর ধরন ধ্যান ধারণার ঘটে বিচ্যুতি। তবে এই জনপদের মানুষ এখনো উপমহাদেশের প্রাচীন সৌর পঞ্জিকাটা মেনে চলা হয়। যার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন অঞ্চলের বর্ষপঞ্জিকা তৈরি হয়েছে।
ভাদ্র মাসে এই অঞ্চলে মানুষ আদিকালে যে উৎসব পালন করত তা হলো কারাম পরব বা কারাম পূজা। এই পুজোটি আদিবাসী সাঁওতালদের মাঝে এখনো প্রচলিত। এটি মূলত কৃষিভিত্তিক উৎসব। যা ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে পালিত হয়। একে “ভাতাই” উৎসবও বলা হয়ে থাকে। করম পরব ভারতের ঝাড়খন্ড, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, আসাম, ওড়িশা এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য এবং বাংলাদেশ ও নেপালে পালিত একটি ফসল কাটার উৎসব। এক সময় এই বাংলা জনপদে আউশ ধান চাষ হত। আউশ ধান কাটার সময়টা ভাদ্র মাস। আউশ কাটার পর রোপা আমন চাষ শুরু হয়। প্রাচীন বাংলার মানুষেরা এই উৎসবে করম দেবতার উপাসনা করত, অধিক ফলনের আশায়। করম দেবতা হল শক্তি, যুব ও যৌবনের দেবতা। এখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পুরুলিয়া জেলা, ঝাড়গ্রাম জেলা,বাঁকুড়া জেলা, মুর্শিদাবাদ জেলা, মালদহ জেলা, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার যারা কুড়মি, ভূমিজ, রাজপুত, চন্দ্রবংশীয় ক্ষত্রিয়, রাজপুত বা চাঁই, সরাক, লোহার, বাউরি, বীরহড়, বীরনিয়া, খেরওয়ার, হো, খেড়িয়া, শবর, কোড়া, মাহালি, পাহাড়িয়া, হাড়ি, বাগদি, বেদে, ঘাসি, লোধা ও বৃহৎ জনগোষ্ঠী সাঁওতাল, মুন্ডা, ওঁরাও প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছে তারা কারাম উৎসবকে আরণ্যক ও কৃষিভিত্তিক লোকউৎসব হিসাবে পালন করে থাকে।
কারাম উৎসব একটি গুরুত্বপূর্ণ লোক উৎসব, যা প্রধানত ভাদ্র মাসের শুক্লা একাদশীতে পালিত হয়। এই উৎসবে কারাম গাছের ডাল পুঁতে পূজা করা হয়। নৃত্য-গীতের মাধ্যমে আরাধনা করা হয় প্রকৃতি ও ফসল দেবতার। আর এই উপাসনা করার ফলে অধিক ফসল হবে। এটা ছিল আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে এই অঞ্চলে বসবাস করা মানুষের বিশ্বাস। এই পুজোটি মূলত ফসল বৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির জন্য করা হত। কারাম উৎসব মূলত ভালো ফসল, সমৃদ্ধি এবং বিপদ থেকে মুক্তির জন্য এখন উদযাপন করে আদিবাসীরা। তাই দেখা যায় কারাম উৎসব সাঁওতালদের জীবনযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে আছে। তবে এটাকে পরিবেশ বাঁচানোর উৎসব হিসাবে বিবেচরা করা যায়। কারণ ধরিত্রী রক্ষার মূল উপাদান গাছ, এই গাছ রোপণ কাজটি হয় কারাম উৎসবের মাধ্যমে।
প্রতি বছর ভাদ্র মাসের শুক্ল একাদশী তিথিতে করম পরব পালনের নির্ঘণ্ট নির্ধারিত হয়। উৎসবের সাতদিন আগে মেয়েরা ভোর বেলায় শালের দাঁতন কাঠি ভেঙে নদী বা পুকুরে স্নান করে বাঁশ দিয়ে বোনা ছোট টুপা ও ডালায় বালি দিয়ে ভর্তি করেন। তারপর গ্রামের প্রান্তে একস্থানে ডালাগুলিকে রেখে জাওয়া গান গাইতে গাইতে তিন পাক ঘোরে। এরপর তাতে তেল ও হলুদ দিয়ে মটর, মুগ, বুট, জুনার ও কুত্থির বীজ মাখানো হয়। অবিবাহিত মেয়েরা স্নান করে ভিজে কাপড়ে ছোট শাল পাতার থালায় বীজগুলিকে বুনে দেন ও তাতে সিঁদুর ও কাজলের তিনটি দাগ টানা হয়, যাকে বাগাল জাওয়া বলা হয়। এরপর ডালাতে ও টুপাতে বীজ বোনা হয়। এরপর প্রত্যেকের জাওয়া চিহ্নিত করার জন্য কাশকাঠি পুঁতে দেওয়া হয়। একে জাওয়া পাতা বলা হয়। যে ডালায় একাধিক বীজ পোঁতা হয়, তাকে সাঙ্গী জাওয়া ডালা এবং যে ডালায় একটি বীজ পোঁতা হয়, তাকে একাঙ্গী জাওয়া ডালা বলা হয়। যে সমস্ত কুমারী মেয়েরা এই কাজ করেন, তাদেরকে জাওয়া মা বলা হয়ে থাকে। বাগাল জাওয়া গুলিকে লুকিয়ে রেখে টুপা ও ডালার জাওয়াগুলিকে নিয়ে তারা গ্রামে ফিরে আসেন। দিনের স্নান সেরে পাঁচটি ঝিঙাপাতা উলটো করে বিছিয়ে প্রতি পাতায় একটি দাঁতনকাঠি রাখা হয়। পরদিন গোবর দিয়ে পরিষ্কার করে আলপনা দেওয় হয় ও দেওয়ালে সিঁদুরের দাগ দিয়ে দেওয়া হয় কাজলের ফোঁটা।পুরুষেরা শাল গাছের ডাল বা ছাতাডাল সংগ্রহ করে আনেন। গ্রামের বয়স্কদের একটি নির্দিষ্ট করা স্থানে দুইটি করম ডাল এনে পুঁতে রা তে হয়। যা সন্ধ্যার পরে করম ঠাকুর বা করম গোঁলায় এবং ধরম ঠাকুর হিসেবে পূজিত হন। কুমারী মেয়েরা সারাদিন উপোস করে সন্ধ্যার পরে থালায় ফুল, ফল সহকারে নৈবেদ্য সাজিয়ে এই স্থানে গিয়ে পূজা করেন। এরপর সারারাত ধরে নাচ গান চলে। পরদিন সকালে মেয়েরা জাওয়া থেকে অঙ্কুরিত বীজগুলিকে উপড়ে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়ে বাড়িতে বিভিন্ন স্থানে সেগুলিকে ছড়িয়ে দেন। এরপর করম ডালটিকে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। পূজার পরে মেয়েরা পরস্পরকে করম ডোর বা রাখী পরিয়ে দেয়। এই করম সখীরা, কর্মস্থলে একে অপরকে রক্ষা করে। এই উৎসবে মূলত ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা নেই কারণ এর মূল লক্ষ্যটি হলো : ১. কারাম উৎসবে ভাই বোনের সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং এটি একটি মিলন ও ভালোবাসার উৎসব হিসেবেও পালিত হয়। ২. কারাম উৎসব হলো ফসল কাটার মৌসুমকে ঘিরে একটি উৎসব, যা প্রকৃতি ও ফসলের গুরুত্বের উপর আলোকপাত করে। ৩. কারাম উৎসব হল জীবন ও সমৃদ্ধির প্রতীক। এর মাধ্যমে প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং ভালো ফসলের জন্য প্রার্থনা করা হয়। ৪. কারাম উৎসবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রিত হয় এবং তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ভাগ করে নেয়।
তবে মূল কথা হলো এই উৎসবটি শুধুমাত্র একটি উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রকৃতির সাথে মানুষের গভীর সম্পর্ক এবং ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষার একটি মাধ্যম।