যতীন সরকারের ‘সক্রিয় আশাবাদ’ এবং “সত্য যে কঠিন”

এম এম আকাশ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

অতি সম্প্রতি সর্বজনশ্রদ্ধেয় বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক যতীন সরকার প্রয়াত হয়েছেন। তার বিপ্লবী মননশীলতার নানাদিক ধারণকারী এই লেখাটি লিখেছেন অধ্যাপক এম এম আকাশ। সাপ্তাহিক একতা পত্রিকার শ্রদ্ধাঞ্জলিস্বরূপ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশিত হলো যতীন সরকার সত্য গোপন করেন নি। ‘সত্য যে কঠিন’ গ্রন্থের নামকরণ ও উৎসর্গলিপি থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় তিনি সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়কে অনিবার্য ভবিতব্য হিসেবে মেনে নেন নি। এখনো তিনি কমিউনিস্টই আছেন। কিন্তু এই বিপর্যয়ের সত্য তাৎপর্যগুলোকে উদ্ধারে ব্রত রয়েছেন। তিনি নিজে সমাজতন্ত্রী ছিলেন। তাই তাঁর প্রিয় সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় তাঁর জন্য যথেষ্ট কঠিন এবং হৃদয়বিদারক সত্য ছিল। কিন্তু সেই সত্য বিপর্যয়ের তাৎপর্য যথার্থভাবে উদঘাটন করার পর তিনি নবোদ্গত সত্যকেই নবায়িতরূপে ভালোবেসেছেন। একেই সম্ভবত তিনি বলেছেন ‘সক্রিয় আশাবাদ’। এ থেকে বোঝা যায়, সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ে তিনি হতাশ হন নি। এ থেকে এটাও বোঝা যায়, তিনি আশা করেন ‘সমাজতন্ত্র’ তার হৃত গৌরব ফিরে পাবে। বিপর্যয়ের কারণগুলি দূর করে সে নতুনভাবে আবার উঠে দাঁড়াবে। কিন্তু এই আশাটুকু যে যথেষ্ট নয়; তা তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা কঠিন হবে এবং এজন্য প্রয়োজন হবে প্রচণ্ড সক্রিয়তার। এজন্যই তিনি গ্রন্থের নামকরণ করেছেন ‘সত্য যে কঠিন’। প্রাচ্য ও রবীন্দ্রনাথের প্রতি যতীন সরকারের স্বাভাবিক পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। আবার মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিনের সাম্যবাদী তত্ত্বেরও তিনি একজন একনিষ্ঠ অনুসারী। এই দুইকে তিনি এক জায়গায় মেলানোর চেষ্টা করেছেন তাঁর প্রথম প্রবন্ধটিতে। তাঁর প্রথম প্রবন্ধের শেষ বাক্যটি হচ্ছে–‘প্রাচ্যের রবীন্দ্রনাথের এই জানার সঙ্গে প্রতীচ্যের মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিনের জানার কোনো পার্থক্য নেই। তা তো থাকবেই না। রবীন্দ্রনাথ তো বলেছেন- ‘যা সত্য তার কোনো জিওগ্রাফি নেই’।’ বোঝা যায়, ‘সত্যের’ যে স্থানিক বা কালীক বিশেষ রূপ থাকে সেটিকে এই সত্যের সংজ্ঞায় উপেক্ষা করা হয়েছে। এই সংজ্ঞানুযায়ী সেই সত্যগুলিকেই ‘সত্য’ বলা হচ্ছে যা স্থান-কাল এর বিচারে ব্যাপকতা বা সর্বজনীনতা অর্জনে সক্ষম। অর্থাৎ ‘সাধারণ সত্যকেই’ এখানে মূলত সত্য হিসেবে ধরা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, এই ‘সাধারণ সত্য’ কিভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়? এর কি কোনো দ্বন্দ্বশূন্য নির্ভেজাল স্থির বা শাশ্বত রূপ রয়েছে? এই জায়গায় যতীন সরকারের সুস্পষ্ট দ্বান্দ্বিক উচ্চারণ–“তবে কি মানুষে মানুষে বৈষম্য, অসাম্য, বিচ্ছিন্নতাই একান্ত সত্য? তাই যদি হয় তবে তো সত্য কেবল কঠিন থাকে না, নিতান্তই কুৎসিত হয়ে পড়ে। কিন্তু সনাতন ভারতীয় ঐতিহ্যের ধারা অনুসরণ করে রবীন্দ্রনাথই তো আমাদের জানিয়েছেন, সত্য কুৎসিত নয়, সত্য সুন্দর, সত্য শিব। বৈষম্য, অসাম্য ও বিচ্ছিন্নতা ঘুচিয়েই তো সত্যের সুন্দর ও শিব রূপের প্রকাশ সম্ভব হতে পারে। অনেক বন্ধুর পথ পেরিয়ে আমৃত্যু দুঃখের তপস্যায় সত্যের দারুণ মূল্য শোধ করতে হয়।” উপরোক্ত উদ্ধৃতি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় কেন অধ্যাপক যতীন সরকার সত্য নির্ধারণের পদ্ধতিকে দ্বান্দ্বিক ও সক্রিয় আশাবাদী পদ্ধতি হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তিনি বলতে চেয়েছেন–সত্য, মিথ্যাকে খণ্ডন করেই প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তা হবেই এটাই তার আশা। একই সাথে এজন্যই তিনি ‘সক্রিয়’। এজন্যই তিনি আশা করেন, ‘বৈষম্য, অসাম্য ও বিচ্ছিন্নতা’ বাস্তবে বিদ্যমান থাকলেও তা দূর হবেই এবং সাম্য ও মৈত্রী প্রতিষ্ঠিত হবেই। এই বক্তব্যের মধ্যে যতটুকু মাত্রায় শাশ্বত নৈতিকতার প্রতি ঝোঁকের বিপদ রয়েছে ততটুকু মাত্রায় অধ্যাপক যতীন সরকারের সঙ্গে মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে বা হবে এবং ততটুকু মাত্রাতেই আবার রবীন্দ্রনাথের মানুষের প্রতি বিশ্বাসের সাথে নৈকট্য সৃষ্টি হয়েছে বা হবে। আবার সত্য-মিথ্যার চিরন্তন দ্বন্দ্বের মাধ্যমে সত্যের অগ্রগতি (এবং কখনো কখনো সাময়িক ঐতিহাসিক পশ্চাদপসারণ) যতটুকু মাত্রায় তিনি বাস্তবে স্বীকার করে নিবেন, যতটুকু মাত্রায় তিনি সত্যের দ্বান্দ্বিক আপেক্ষিকতাকে গ্রহণ করবেন ততটুকু মাত্রায় তিনি সনাতন ভারতবর্ষীয় বা রাবীন্দ্রিক নৈতিক ধারণা (সত্য মাত্রেই সুন্দর ও কল্যাণকর!) থেকে দূরে সরে যাবেন। তাই নিকট বিশ্লেষণে প্রথম প্রবন্ধটিকে রবীন্দ্রনাথ ও মার্কসের প্রতি একজন মনস্বী ব্যক্তির যুগপৎ আকর্ষণ ও বিকর্ষণের সংশ্লেষণ হিসেবে আমরা বিবেচনা করতে পারি। মানবিক আশাবাদটা তিনি নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ থেকে আর বিজ্ঞানটা নিয়েছেন মার্কসের কাছ থেকে। তবে এই দুইয়ের সংযোগটা যান্ত্রিক হলে চলবে না! যতীন সরকার বরীন্দ্রনাথের শুভ বোধ, শাশ্বত কল্যাণের সার্বভৌমত্ব এবং চূড়ান্ত বিজয়ের প্রতি ইতিবাচক বিশ্বাসটি হারাতে চাচ্ছেন না আবার শুভকে তিনি কঠিন বাস্তবের দ্বান্দ্বিকতা প্রসূত কঠিন সত্য হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছেন। ভালো কল্পনাকে যে নিছক ইচ্ছার জোরে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না সেটাও যতীন সরকার জানেন। এই প্রবন্ধেই কোথাও কোথাও তিনি ‘শাশ্বত’ বলতে নিছক ‘ভালোকে’ বোঝান নি। বুঝিয়েছেন ‘ভালো ও খারাপের চিরন্তন দ্বন্দ্বকে’। আরেকটু অগ্রসর হয়ে নৈর্ব্যক্তিকভাবে তাঁর দ্বান্দ্বিক সূত্রায়নটিও এই প্রবন্ধেই এক জায়গায় তিনি বলেছেন, “অসামঞ্জস্য দূর করার জন্যই ঘটে বিপ্লব, আবার সেই বিপ্লব থেকেই উদ্ভব ঘটে কিছু নতুন অসামঞ্জস্যের”। এই সূত্রটি অবশ্য বরীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠিতে’ এতো সুন্দর ও চমৎকারভাবে বিধৃত আছে যে যতীন সরকারের পক্ষে তা ‘মিস’ (সরংং) করা সম্ভব ছিল না। তবে তাঁর কৃতিত্ব হচ্ছে এই সূত্রটিকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিপর্যয়ের পর ‘রাশিয়ার চিঠি’ গ্রন্থ থেকে খুঁজে বের করে বর্তমান প্রজন্মের দৃষ্টিকে সেদিকে আকর্ষণ করার মহতী কৃতিত্ব। দ্বিতীয় প্রবন্ধটি প্রথম প্রবন্ধটিতে যে ‘টানাপোড়েন’ আমরা দেখেছি তা অতিক্রম করে গেছে। এখানে এসে আমরা দেখতে পাই যতীন সরকারের বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবেই দ্বান্দ্বিক-ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিণতি লাভ করেছে। এখানে তিনি খুব স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, অতীতের বাস্তব ইতিহাস প্রমাণ করে শ্রেণিবিভক্ত সমাজের ইতিহাস হচ্ছে শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস এবং এর অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে শ্রেণিহীন সাম্যবাদী সমাজ। এ কথাও তিনি স্বীকার করেন, বাস্তবে সামজতন্ত্র কোথাও সাম্যবাদে পরিণত হয় নি ঠিকই কিন্তু এরপরও তাঁর কাছে সাম্যবাদই অধিকতর আকর্ষণীয় প্রতিপাদ্য হিসেবে থেকে গেছে। কারণ তা তাঁকে যুক্ত করেছে ‘অসাধারণ’ এক ‘কল্পরাজ্যের’ সঙ্গে, যা তাঁর একার অলস আকাশকুসুম চিন্তামাত্র নয়, বরং ‘এক ধরনের সর্বজনীন মানবিক আকুতি বা আকাঙ্ক্ষারই অভিপ্রকাশ’। তাই সকল নির্যাতিতের মনে মুক্তির জন্য যে আকাঙ্ক্ষা ও প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায় সেটাই যতীন সরকারের সক্রিয় আশাবাদের ভিত্তি। এইভাবে যতীন সরকার একই সঙ্গে গোঁড়া স্থূল সমাজতন্ত্রী এবং ‘উত্তর আধুনিক’ যুগের ‘নেতিবাদীদের’ থেকে তাঁর অবস্থানকে পৃথক করে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি দেখাতে সক্ষম হয়েছেন যে আপেক্ষিকতার মধ্যেও চরম সত্য থাকে এবং আপেক্ষিকতার একটি নিয়ম আছে, গতি আছে, লক্ষ্য আছে। নেতিরও নেতিকরণ আছে। নির্দিষ্ট ধরনের সামজতন্ত্র আপেক্ষিক কিন্তু মানবমুুক্তির দিকে অভিযাত্রা আপেক্ষিক নয়। সমাজতন্ত্রের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মৃত্যু হতে পারে, কিন্তু মানবমুক্তির প্রক্রিয়া নিত্যনতুন রূপে অব্যাহত থাকে, সেজন্যই তা অমর, তার কোনো মৃত্যু নেই। এই প্রবন্ধটি বামপন্থি তরুণ ছাত্রদের জন্য ‘দ্বান্দ্বিক-বস্তুবাদী’ দর্শনের একটি প্রাথমিক পাঠ হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। দ্বন্দ্ববাদ যে ‘অনংড়ষঁঃবষু জবষধঃরাব’ নয়, বরং এটি যে ‘জবষধঃরাবষু অনংড়ষঁঃব’ এই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে এই প্রবন্ধে। যতীন সরকারের বেশিরভাগ রাজনৈতিক জীবন কেটেছে ‘মস্কোপন্থি কমিউনিস্টদের’ ছত্রছায়ায়। জীবন সায়াহ্নে এসে আজ তিনি লক্ষ্য করছেন ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’ ভেঙে টকুরো টুকরো হয়ে গেছে, কিন্তু চীনের সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদী পথে যাত্রা শুরু করলেও সেখানে সমাজতন্ত্র এখনো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় নি। চীনা কমিউনিস্টরা একেই নাম দিয়েছেন ‘বাজার সমাজতন্ত্র’ বা ‘চীনা স্টাইলের সমাজতন্ত্র’। স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন জাগে বর্তমানে চীনা সমাজতন্ত্র আসলেই কতটুকু সমাজতন্ত্র? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে যতীন সরকার কয়েকটি খুব নতুন কিন্তু প্রণিধানযোগ্য কথা বলেছেন। এই কথাগুলি পাঠক খুঁজে পাবেন গ্রন্থটির ৪১ পৃষ্ঠায়। সংক্ষেপে তার বক্তব্যের ধারা নিম্নরূপ– ১। চীনে বিপ্লবের এতো বছর পর পুঁজিবাদের পুনরুজ্জীবন ঘটেছে। ২। বুর্জোয়া বিপ্লবের অসমাপ্ত কাজগুলি চীনে এখন এই পুনরুজ্জীবিত পুঁজিবাদের দ্বারা সম্পন্ন হচ্ছে। (সম্ভবত : এখানে তিনি সামন্ত মূল্যবোধের অবসান, ব্যক্তি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, উৎপাদন শক্তির বিকাশ, আইনের শাসন ইত্যাদি কর্তব্যগুলির কথাই বুঝিয়েছেন।) ৩। যেহেতু বর্তমান যুগ হচ্ছে পুঁজিবাদের নৈতিক পরাজয়ের যুগ, ক্ষয়িষ্ণুতার যুগ, সেহেতু বুর্জোয়ারা তাদের এই ঐতিহাসিক কর্তব্যগুলি সম্পাদনে অক্ষম হয়ে পড়েছেন। তদপুরি চীনে সে ধরনের কোনো বুর্জোয়া শ্রেণিও বর্তমানে উপস্থিত নেই। ৪। সুতরাং চীনের কমিউনিস্ট পার্টিকে নতুন করে শুধু পুঁজিবাদের পুনরুজ্জীবন ঘটাতে হয় নি–তাকে উদ্যোক্তা হিসেবে উৎপাদন শক্তির বিকাশে ব্যক্তিগতভাবে নেতৃত্বও দিতে হচ্ছে। এই অভিনব বিবরণটি আমি যত সরাসরি খাঁটি ও ঋজুভাবে প্রকাশ করলাম–ততটা দৃঢ়ভাবে যতীন সরকার অবশ্য প্রকাশ করেন নি। তিনি চীনকে ‘প্রহেলিকা’ হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছেন, ‘সেই প্রহেলিকার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমার যা মনে হয়–ভয়ে ভয়ে তাই এখন বলে ফেলছি।’ কিন্তু এসব বলার পর সিদ্ধান্তের সময় আবার আমরা দেখতে পাই চীনের এক্সপেরিমেন্টের ব্যাপারে যতীন সরকারের থেকে যায় এক ধরনের আশা ও মমতা। অননুকরণীয় ভাষায় যতীন সরকার লিখেছেন, “আশঙ্কা বিহ্বল ও দ্বিধা-থরথর চিত্তে আমি শুধু কামনা করি: চীন বিপ্লবের সকল বালা মুসিবত দূর হয়ে যাক। সকলের সকল আশঙ্কাকে মিথ্যা প্রমাণিত করে শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে সে বিপ্লব সম্পূর্ণ সার্থক হয়ে উঠুক।” (পৃ :৪১) আর ‘কিউবা’ বিপ্লব সম্পর্কে যতীন সরকারের রয়েছে শতকরা একশতভাগ আস্থা। যদিও এরকম ব্ল্যাঙ্ক চেক প্রদানের ব্যাপারে বিস্তৃত বিশ্লেষণে তিনি যান নি। বর্তমান পৃথিবীতে বিদ্যমান সমাজতান্ত্রিক প্রতিটি দেশেই নানা ধরনের আর্থ-সামাজিক এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে। কেউ কেউ এগুলিকে দেখছেন সন্দেহের চোখে। ভাবছেন, এগুলি পশ্চাদপসারণের লক্ষণ। কেউ কেউ এগুলিকে প্রয়োজনীয় সংস্কার হিসেবে দেখছেন। ভবিষ্যত নিয়ে তাই কেউ আশাবাদী, কেউ হতাশাবাদী। আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, এক্ষেত্রে অধ্যাপক যতীন সরকারের সাধারণ অবস্থানটি কী? যতীন সরকারের নিজের ভাষায় এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে–“হ্যাঁ, সুদৃঢ় কোনো প্রত্যয়ের পরিচয় এতক্ষণের কথায় অবশ্যই আমি দিতে পারে নি। যেসব বিষয়ে আমাকে মন্তব্য করতে বলা হয়েছে, সেসব বিষয়ে আমি তো কোন ছার, অনেক সুবিজ্ঞজনও বারবার ঢোক গিলবেন। তবু নির্দ্বিধায় আমি জানিয়ে দেই : ভাবীকাল সম্পর্কে নৈরাশ্য কখনো আমার মনে বাসা বাঁধতে পারে নি, আমি অসংশোধনীয় আশাবাদী। পুঁজিবাদের পরবর্তী যে সমাজন্ত্র ও সাম্যতন্ত্র, ইতিহাসের যে কখনো সমাপ্তি বা পশ্চাৎগমন ঘটে না, দ্বান্দ্বিক গতিতে তথা আঁকাবাঁকা পথে ইতিহাস যে সামনের দিকেই এগিয়ে চলে–এসব বিষয়ে আমার মনে সামান্যতম সংশয়ও নেই।” কেউ হয়তো সংশয়বাদী ও স্বল্পমেয়াদি বিচারে ইতিহাসের আঁকাবাঁকা পথকেই ইতিহাসের পশ্চাৎগামিতা নামে অভিহিত করতে পারেন, কিন্তু মানুষের অসীম যাত্রা ও অসীম ক্ষমতার প্রতি আস্থা রাখলে যতীন সরকারের কথাই সত্য ধরে অগ্রসর হতে হবে। ব্যক্তির মৃত্যু, পশ্চাৎগতি, সংকট ইত্যাদি সম্ভব, কিন্তু মানবজাতির কোনো মৃত্যু নেই, সকল মানুষের একই সঙ্গে কোনো পশ্চাৎগতি, সংকট, দুঃখ, ধ্বংস বা অবনতি সম্ভব নয়। মানবজাতির ইতিহাসে আজ পর্যন্ত তা ঘটেনি। মৃত্যু থাকলে জীবনও থাকবে, পশ্চাৎগতি থাকলে অগ্রগতিও থাকবে, সংকট থাকলে তার সমাধানও নিশ্চয়ই আছে, দুঃখ থাকলে সুখও থাকে, ধ্বংস হলে সৃষ্টি হবেই এবং প্রতিটি অবনতির অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে উন্নতি। যেহেতু কোনো কিছুই স্থায়ী নয় সেহেতু ‘নেতিবাচক’ অবস্থাগুলিও কখনোই স্থায়ী হতে পারে না। যতীন সরকারের এই চিরন্তন আস্থা ও আশাবাদের প্রতিধ্বনি আমরা শুনতে পাই ইংরেজ কবি শেলীর নিম্নোক্ত অসাধারণ পঙক্তিতে–‘If winter comes, can Spring be far behind’ (শীত এলে বসন্ত কি না এসে পারে) লেখক : বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..