সেই নাগরিক শক্তির নব সংস্করণ এনসিপি
আল কাদেরী জয়
চট্টগ্রামে এনসিপির সমাবেশ দেখলাম ২ নম্বর গেইট, বিপ্লব উদ্যানে। বক্তব্য শুনলাম হাসনাত, আখতার আর নাহিদের, সাথে সারজিসের স্লোগান আর মিটিং পরিচালনা। হতাশ হলাম, বিরক্ত হলাম- ভিন্ন মত আছে বলে নয়, বরং ভিন্নমত আছে বলেই আগ্রহী ছিলাম তাদের বক্তব্য শোনার। কিন্তু বক্তাদের বক্তব্য, দেহভঙ্গিমা, মাইকে আসা স্লোগানে নেই কোনো চিন্তাশীলতা, রুচিশীলতা এবং সর্বোপরি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরিপূরক কোনো রাজনৈতিক উপাদান। বরং ছিল উস্কানিমূলক মন্তব্য, উগ্রতা ও দিশাহীন কথার ফুলঝুরি। এমনকি বক্তাদের গলা কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে কৃত্রিম মাঠ গরমের কথাবার্তা।
শুরতেই সারজিসের স্লোগান ছিলো দুইটা- দিল্লি না ঢাকা এবং ইনকিলাব জিন্দাবাদ। ভারতবিরোধী এইসব স্লোগানই ছিলো পুরো সময়জুড়ে। কিন্তু ভারতবিরোধী বলতে এদের এই স্লোগান ও বক্তৃতায় নাই ভারতের শাসকগোষ্ঠীর বিরোধিতা কিংবা সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের বিরোধিতা। সেটা ছিলো মূলতঃ জাতিগত ও উগ্র সাম্প্রদায়িক উস্কানি। আসলে ‘জয় বাংলা’র বিপরীতে একটা কিছু দাঁড় করানোর প্রয়াস, যেন মুক্তিযুদ্ধের এই স্লোগানকে আওয়ামী নামাবলি দিয়ে বিকল্প কিছু তৈরি করতে হবে। কিন্তু বিকল্প কি এবং কই? তাই তারা ৭১-কে ধারণ না করে করছে ৪৭-এর দেশভাগের সময় ও স্পিরিটটাকে। কিন্তু “হাতমে বিড়ি, মুখে পান- লাড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” এই স্লোগানও দেয়া সম্ভব না, কারণ এটা হলে তো স্বাধীনতাবিরোধী তকমা খাওয়ার ভয় আছে। আবার ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বললে তো বিএনপি’র ট্যাগ খাইতে হয়। ফলে মুসলিম জাতীয়তাবাদের উগ্রতা পরিহার করে এবং কিছুটা বিপ্লবী জোশ আনতেই এই ইনকিলাব। জেনে রাখা দরকার ভারতের উত্তরপ্রদেশের উর্দু কবি ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য মাওলানা হাসরাত মোহানি এই স্লোগানটি তৈরি করলেও মূলত ভগত সিংয়ের বক্তৃতা এবং লেখার মাধ্যমে ১৯২০ এর দশকের শেষের দিকে তা জনপ্রিয় হয়েছিল। ভগত সিং কিংবা মোহানি কেউই যে এনসিপির আদর্শ কিংবা আইকন নয়- সেটা সরকারি মদতপুষ্ট এই দলের নেতাকর্মীদের কার্যকলাপ ও বক্তব্য দেখলে বা শুনলে বুঝতে মোটেই কষ্ট হয় না।
এছাড়াও তাদের স্লোগানে আরও ছিলো ‘কথায় কথায় বাংলা ছাড়- বাংলা কি তোর বাপদাদার?’ এনসিপি এই স্লোগানের ব্যাখ্যা কি? বাস্তবে তাদের ভেতরে জমে থাকা জামাত-শিবিরের যে শক্তি রয়েছে তাকেই সন্তুষ্ট করা, কিংবা তার প্রভাবেই এই স্লোগান।
এরপর হাসনাত যা বললো তা দেখে মনে হয় যেন তারা এখন ক্ষমতায় থাকা দল এবং জাতির উদ্দেশ্যে এই সরকারের পক্ষে থাকবার আহ্বান। একজন এমপির গলর মতোই তিনি বললেন- আমরা একটা ভঙ্গুর ব্যবস্থা, অর্থনীতি, ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা পেয়েছি, আমাদের এখন দেশ গঠন করতে হবে, ঐক্য রাখতে হবে।
এনসিপির বক্তব্যে ভয়াবহ দ্বিচারিতায় ভরপুর। একদিকে তারা বলছে এই মুহূর্তে দরকার- বিচার আর সংস্কার, অন্যদিকে যেখানে পারছে সুযোগ বুঝে নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়ন ও ঘোষণা করছে। তাই আজকে তাদের আরেকটা স্লোগান ছিলো- ‘রাজপথে এনসিপি, সংসদে এনসিপি’। বাস্তবে তলে তলে এই হচ্ছে এদের তথাকথিত নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি।
আখতার ভালো বক্তা কখনোই ছিলো না, ডাকসুতে থাকাকালীন ওকে দেখেছিলাম। আজকেও মেটে বক্তব্য রেখে বক্তৃতা শেষ করলো। হয়তো আরো বলতে পারতো কি বলবে? তাই তালগোল পাকিয়ে শেষে বক্তৃতা বাদ দিয়ে স্লোগান দিয়ে শেষ করলো।
সবচেয়ে ধূর্ত ও চালাকি এবং ধোঁয়াশাপূর্ণ বক্তৃতা রাখছে ছোট ভাই নাহিদ ইসলাম। টিএসসিতে পরিচিত এই ছেলেটার সাথে বিভিন্ন সময় কথা হতো। নূরের দল করা ছেলে, বুদ্ধিমান ও চৌকস। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আদর্শিক রাজনীতির চেয়েও যে সাম্প্রদায়িক, দক্ষিণপন্থার রাজনীতিরই ধারক হয়ে উঠেছে- আজকে তার কথায় সেটাই বোঝা হলো। শুরুতেই বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম বলে বুঝিয়ে দিলো ওর নিজস্ব কৌণিক অবস্থান। এরপর বেশ ঐতিহাসিক আলাপ জুড়ানোর মতই শুরু করছে সিপাহি বিদ্রোহের চট্টগ্রামে হাবিলদার রজব আলী, সূর্যসেন, প্রীতিলতা আর একাত্তরে কালুরঘাটে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা কথা বলে। কিন্তু ঐ পর্যন্তই; তারপর যেটা বললো- “চট্টগ্রাম দিয়ে বাংলায় ইসলাম প্রচার শুরু এবং চট্টগ্রাম হচ্ছে ইসলাম ধর্মের প্রবেশদ্বার!”
অর্থাৎ মুসলিম চিন্তাকে তুষ্ট করে করে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের কাছে আদরণীয়, গ্রহণীয় হতে চায়। তাই হেফাজত ইসলাম, কিংবা চরমোনাই পীরের আস্তানায় বসে আতিথ্যগ্রহণ কিংবা চট্টগ্রামে হাটহাজারী মাদ্রাসা ও শাহ আমানত পীরের মাজারেই ধর্মপ্রাণ ইমেজ গড়ে তোলার চেষ্টা, নতুন কোনো রাজনীতিই নয়। আগের দিনই ঢাকায় স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকারের দল জামায়াতে ইসলামীর মঞ্চে উঠে পরের দিন চট্টগ্রামে এই বিপ্লবী উদ্যানে স্বাধীনতার ঘোষণার কথা বলা সেই পুরাতন স্ট্যান্ডবাজি। ঠিক যেন এরশাদের রাজনীতি, রাষ্ট্রপ্রধান সাইকেলে চড়ে কাজে বের হওয়া কিংবা সাধারণ মুসল্লি সেজে বায়তুল মোকাররমে নামাজের কাতারে দাঁড়িয়ে যখন যেখানে তেমন...!
নাহিদ ঘোষণা করেছিলো তাদের দল চলবে ক্রাউড ফান্ডিং অর্থাৎ জনগণের থেকে সংগৃহীত গণচাঁদার টাকায়। কিন্তু লাখ লাখ টাকা খরচ করে জেলায় জেলায় সফর করার জন্য তারা কোন জনগণের কাছে গিয়েছিলো? গণচাঁদার সংগ্রহ করতে কোন জেলায় টিম নামিয়েছে? মূলতঃ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও ব্যবসায়ীদের টাকায় চলা আরেকটি কর্পোরেট বাণিজ্যের দল ছাড়া আর কিছুই নয়। তা-ও বলছিলো ভালোই, শেষ করার একটু আগে মঞ্চে তুলে বেফাঁস কথা বলা নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী বক্তব্য না রাখলেও, কক্সবাজারে তার বক্তব্যের বৈধতা দিয়ে ধূর্তামির উস্কানিই দিলো শেষ পর্যন্ত।
বাস্তবিকপক্ষে এনসিপি হচ্ছে ড. ইউনূস সরকারের একটা প্রজেক্ট। এদেরকে প্রধান বিরোধীদল হিসেবে দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা রয়েছে, আর হালে যদি পানি না মিলে তাহলে এদের দিয়ে নির্বাচন পেছানোর অজুহাত তৈরি করাটাই হচ্ছে সেকেন্ড টার্গেট। এভাবে সরকারের রাজনৈতিক বাহিনী হিসেবেই এনসিপির এই অগ্রযাত্রা। এনসিপি নিজেদের যতই বাংলাদেশপন্থি বলে ঘোষণা করুক না কেন এই দলটি প্রকৃতপক্ষে একটা সাম্প্রদায়িক ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিনির্ভর দল। তাই মুখে বাগাড়ম্বর থাকলেও কার্যত শোষণ বৈষম্য নিপীড়ন তৈরির এই ব্যবস্থার পক্ষেই তাদের রাজনীতি। ড. ইউনূস ২০০৭-০৮ সালে নাগরিক শক্তির যে এজেন্ডা তৈরি করেছিলো তারই নব সংস্করণ এই এনসিপি। দুর্ভাগ্যের বিষয়- এদের এই ভণ্ডামি, চাতুরির কর্মকাণ্ডের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলো গণঅভ্যুত্থানের স্বপ্নময় আকাঙ্ক্ষা। যে তরুণ সেদিন নিজের প্রাণের বিনিময়ে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পতন চেয়েছিলো এনসিপির কর্মকাণ্ডে তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। গণঅভ্যুত্থান কোনো ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ড ছিলো না। ছিলো জনগণের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের ফল। কিন্তু এদের উস্কানিমূলক ও বিতর্কিত ভূমিকার জন্য সবচেয়ে উপকৃত হচ্ছে সেই পতিত আওয়ামী রাজনীতি। মানুষের সামনে হাসিনার মানুষ খুন, নির্যাতন, দুঃশাসনকালের পক্ষে জনমত তৈরি করছে। কিন্তু এইজন্য তো মানুষ প্রাণ দেয় নাই, বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে নাই।
এনসিপির প্রোগ্রাম শেষে মঞ্চে লেগে গেলো দুপক্ষের মারামারি, হাতাহাতি। সেটা দেখে মনে হলো- যে লড়াইটা হওয়ার কথা ছিলো বৈষম্যের বিরুদ্ধে, মঞ্চে সেই মারামারিটা লাগালো নিজেদের মধ্যে। এসব অখাদ্য দিয়ে ড. ইউনূসের পেট ভরবে কি না জানি না, তবে এদেশের জনগণের যে কোনো স্বপ্নপূরণ হবে না, সেটাই সময়ের ব্যাপার মাত্র।
লেখক : সাবেক সভাপতি, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন