বাংলাদেশে কেন জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশন?

আব্দুল কাদের

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অন্যান্য সংগঠনের আপত্তি উপেক্ষা করে বাংলাদেশে বিতর্কিত জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের (ঙঐঈঐজ) কার্যালয় স্থাপন করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার বলছে, ঢাকায় তিন বছরের জন্য ওএইচসিএইচআরের কার্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্তে সম্মতি জানানোর পর নীতিগত অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। এটি স্থাপিত হলে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে ওএইচসিএইচআর ভূমিকা রাখতে পারে। গত ২৯ জুন অন্তর্বর্তী সরকারে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল জানান, জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের ঢাকায় একটি অফিস স্থাপনের প্রস্তাবে নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশে জাতিসংঘের একটি মানবাধিকার কার্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তিন বছরের জন্য এই কার্যালয় চালু থাকবে। কী কাজ জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের? সাধারণভাবে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশন বিভিন্ন দেশ এবং অঞ্চলে অফিস স্থাপন করে। স্থানীয় পর্যায়ের অফিসগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন তৈরি করে। কৌশলগত সহায়তা দেয়, সচেতনতার জন্য অ্যাডভোকেসি করে এবং মানবাধিকার রক্ষার কাজে স্থানীয়দের যুক্ত করে। মানবাধিকারকে স্থানীয়ভাবে আন্তর্জাতিক মানে নেয়ার চেষ্টাও ওএইচসিএইচআরের আওতায় রয়েছে। স্থানীয়ভাবে লিঙ্গ, আবাসন, ভূমি ব্যবস্থাপনা, বৈষম্য, স্বাস্থ্যসেবা ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়াও জাতিসংঘের এই সংস্থার এজেন্ডার মধ্যে রয়েছে। যে যুক্তিতে ঢাকায় এই হাইকমিশন ঢাকায় মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের কার্যালয় খোলার পেছনে যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, এই কার্যালয় হলে তারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো সরাসরি তদন্ত করতে পারবে। এতে বাংলাদেশে মানবাধিকার আরও সুরক্ষিত হবে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক গত বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। সে সময় ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনের কার্যালয় খোলার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বাংলাদেশ সরকারের নীতি-নির্ধারকরা সে সময় কার্যালয় খোলার বিষয়ে সম্মতিও দেন। জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, স্থানীয় পর্যায়ে কার্যালয় স্থাপন হলে মানবাধিকার সুরক্ষা ও প্রসার আরও সহজ হবে। বাংলাদেশের মানবাধিকার রক্ষায় জাতিসংঘ আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং নিরাপত্তা ও কূটনীতি বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এম শহীদুল হক মনে করেন, “গত ১৫ বছরে যে খুন, গুমের ঘটনা ঘটেছে, নারী ও শিশু হত্যা হয়েছে সেগুলো কিন্তু বিশ্বকে জানানোর প্রয়োজনীয়তা আমরা তখন অনুভব করেছি। সেখান থেকেই জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের অফিসের বিষয়টি সামনে এসেছে। কিন্তু এটা নিয়ে কিছু প্রশ্নও আছে। আর সেই প্রশ্নের মূল কথা হলো এটা কি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার হবে? সেটা আসলে বিবেচনা করা দরকার।” বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নানা বিষয় ছাড়াও আঞ্চলিক ইস্যুতে জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়ের কি অবস্থান হবে, এ নিয়েও কথা বলেছেন তিনি। তিনি বলেন, “আমাদের এখানে পার্বত্য চট্টগ্রাম, সংখ্যালঘুসহ নানা ইস্যু আছে। কিন্তু সেটাকে তারা কীভাকে দেখবে তা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। এটাও তাদের জানতে হবে যে কোনো বাঙালি কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে জমি কিনতে পারে না। কিন্তু তারা সারাদেশেই কিনতে পারে।” এম শহীদুল হক বলেন, “তারা (ওএইচসিএইচআর) অফিস স্থাপনের পর তাদের সীমানা ক্রস করেও অনেক কাজ করে। যা অন্যদেশে হয়েছে। সেটাও বিবেচনা করতে হবে। তারা যদি সেভাবে কাজ করে তাহলে তা আমাদের দেশের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। আর মানবাধিকারে ক্ষেত্রে, বাক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা নিয়ে তো প্রশ্ন আছে। তাই সব দিক বিবেচনা করে সরকারের সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার।” কেমন চলছে বিশ্বজুড়ে সংস্থাটি? বর্তমানে বিশ্বের মাত্র ১৬টি দেশে সংস্থাটির কার্যালয় রয়েছে। এই দেশগুলো হচ্ছে- বুরকিনা ফাসো, কম্বোডিয়া, সুদান, ইয়েমেন, শাদ, কলম্বিয়া, গুয়াতেমালা, গিনি, হন্ডুরাস, লাইবেরিয়া, মৌরিতানিয়া, মেক্সিকো, নাইজার, তিউনিসিয়া, ফিলিস্তিন ও সিরিয়া। এসব দেশের বেশিরভাগই গৃহযুদ্ধকবলিত বা সন্ত্রাসবাদে পর্যুদস্ত। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ায় ফিল্ড অফিস ও ইউক্রেনে একটি ছোট আকারে মিশন অফিস আছে। ২০১১ সালের ডিসেম্বরের পর নেপাল সরকার জাতিসংঘের সঙ্গে তাদের চুক্তি আর নবায়ন করেনি। কাঠমান্ডুর ভাষ্যে, নেপালের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটার কারণে জাতিসংঘের সঙ্গে আর চুক্তি নবায়ন করেনি তারা। এছাড়া আরো ৪১টি দেশে সংস্থাটি কার্যালয় খুলতে আগ্রহী হলেও সেসব দেশ এখনও রাজি না হওয়ায় তারা অগ্রসর হতে পারছে না। কেন আপত্তি কার্যালয় চালু করা নিয়ে? বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি এবং সমমনা বাম সংগঠনগুলো ঢাকায় জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের (ঙঐঈঐজ) কার্যালয় স্থাপনের বিরুদ্ধে যৌক্তিক এবং সচেতন আপত্তি জানিয়ে আসছে শুরু থেকেই। যে ১৬টি দেশে এই সংস্থার কার্যালয় আছে সেসব দেশ গৃহযুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমে জর্জরিত। বাংলাদেশে এই দুটি উপাদান না থাকার পরেও এই হাইকমিশনের কার্যালয় স্থাপন করতে চাওয়া কী বার্তা দিচ্ছে সেটাই এখন সচেতন প্রশ্ন। সিপিবির সাধারণ সম্পাদক কমরেড রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “কোনো একটি দেশ যদি দীর্ঘ মেয়াদে সংকটে পড়ে যায় তাহলে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের অফিস প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাংলাদেশ তো এমন কোনো দীর্ঘ মেয়াদে সংকটে পড়ে নাই যে তাদের অফিস লাগবে।” বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তো ঘটছে। তাহলে অফিস করতে সমস্যা কোথায়? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “জাতিসংঘ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছে এমন কোনো প্রমাণ নাই। তারা সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের স্বার্থরক্ষা করছে। মানুষের মধ্যে এই শঙ্কাই আছে। তারা মানবাধিকার নয়, ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে আসতে চায় কি না সেটাই এখন প্রশ্ন।” রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করে এমন সিদ্ধান্ত নেয়ারও বিরোধিতা করছে সিপিবি। তিনি প্রশ্ন করেছেন, “তারা এখানে কী কাজ করবে? টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন কী? কাজের ক্ষেত্র কী? সবার সামনে সরকারের আগে তা প্রকাশ করা উচিত। আমরা মনে করি জাতিসংঘের এখানে অফিস আছে। তারা মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করতে চাইলে এই অবস্থায়ই কাজ করতে পারে।” কি কি প্রভাব পড়তে পারে প্রথমত, জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুন বন্দোবস্তের বাংলাদেশে জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশন কার্যালয় স্থাপনের একটি অর্থ দাঁড়াচ্ছে যে বর্তমানে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আগের চেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে, যা অভ্যুত্থানের স্পিরিটের সাথে সাংঘর্ষিক হবে। দ্বিতীয়ত, গৃহযুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদের উত্থান যেসব দেশকে পর্যুদস্ত করছে সেসব দেশে এই সংস্থাটির কার্যক্রম পরিলক্ষিত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশে এই সংকট দুটি না থাকলেও ভবিষ্যতে ঘটার সম্ভাবনা আছে দেখেই কি এই সংস্থা আগে থেকে কার্যালয় স্থাপন করতে চাচ্ছে? তৃতীয়ত, সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন, লাইবেরিয়া, নাইজার বা অন্যান্য সকল দেশের সংকট নিরসনে এই সংস্থা কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলে এই সংস্থার প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ। চতুর্থত, জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের কার্যালয় ঢাকায় স্থাপনে বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো ক্ষুণ্ন করবে, যা এদেশে বিদেশি বিনিয়োগকে ভয়াবহ আকারে হ্রাস করবে, দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং বৈদেশিক ঋণের তাগিদ বৃদ্ধি করবে। এতে করে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো নিও লিবারেলিজমের প্রহরী সংস্থাগুলো বাংলাদেশকে আরো বেশি দাসত্বে শৃঙ্খলিত করবে। যেখানে বিশ্বজুড়ে ডিডলারাইজেশন ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গ্লোবাল সাউথের শক্তিশালী উত্থান পরিলক্ষিত হচ্ছে তখন সেখানে বাংলাদেশকে আরো বেশি পশ্চিমা দাসত্বে ঢুকতে বাধ্য হতে হচ্ছে। পঞ্চমত, পৃথিবীর যেখানেই এই সংস্থাটির কার্যক্রম আছে সেসব দেশের পাসপোর্ট দুর্বল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে পারস্পরিক কারণে। ফলে জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের কার্যালয় স্থাপনের কারণে এদেশের পাসপোর্ট আরো দুর্বল হবে, যা রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। করণীয় কী? বর্তমানে যে সরকারব্যবস্থা চলমান সেটা গণতান্ত্রিক নয়, কারণ এই সরকারের জনপ্রতিনিধিত্বের ভিত্তি নেই। এই সরকার দায়িত্ব নিয়েছে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কিছু আইনগত সংস্কার করে একটি নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন দিয়ে গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দায়িত্ব শেষ করার জন্য। ফলে জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের কার্যালয়ের অনুমোদন দেয়ার সিদ্ধান্ত এই সরকারের এখতিয়ার বহির্ভূত। রাজনৈতিক সকল পক্ষের কর্তব্য এই সরকারের সকল দায়িত্ব বহির্ভূত সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে নির্বাচন আয়োজনের জন্য চাপ প্রয়োগ করা। এছাড়াও এই সংস্থাটির অতীতে রেকর্ড আছে তার এখতিয়ার বহির্ভূত কার্যকলাপ করতে এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়বস্তুতে নাক গলাতে। ফলে এই সংস্থাটি সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে এদেশে গৃহযুদ্ধ ও প্রক্সিযুদ্ধ ডেকে আনতে চাচ্ছে কি না সেই সন্দেহ উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। যে কোনো দেশের আইন ও বিচারবিভাগকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে পারলে সেই দেশে মানবাধিকার সুরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা থাকে, অতএব একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে একটি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ সুগম হবে। কোনো প্রয়োজন নেই দেশের সার্বভৌমত্ব ও সুনাম ধ্বংস করে এমন কোনো সংস্থাকে কার্যালয় স্থাপনের সুযোগ করে দেয়ার। লেখক : শিক্ষক ও লেখক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..