জাতি মর্মাহত

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বিমান দুর্ঘটনায় আমরা গভীরভাবে মর্মাহত ও শোকাহত। ২১ জুলাই আনুমানিক বেলা একটার পর বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনে বিধ্বস্ত হয়। এ সম্পাদকীয় লেখা পর্যন্ত ৩২ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মাঝে দুইজন শিক্ষক আছেন। দেড় শতাধিক আহতের খবর পাওয়া যায়। প্রতিদিনের মতো সেদিনও ক্লাস শেষে নিষ্পাপ এই শিশুদের ঘরে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ওদের কেউ ফিরল লাশ হয়ে, কেউ ফিরল পোড়া দেহ নিয়ে। হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে বেঁচে যাওয়া ফুলের মতো শিশুরা। কাঁদছে অসহায় বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন। প্রশ্ন জাগে, এই নিষ্ঠুর মৃত্যুর দায় কে নেবে? আহত অনেককে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসা হয়। সেখানে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে তাদের। গোটা জাতি এ দুর্ঘটনায় হতবাক এবং চরমভাবে ক্ষুব্ধ। শুধু দুঃখজনক নয়, এটি রাষ্ট্রের অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার উদাহরণ। বিমানবাহিনীর একটি এফ-সেভেন বিজেআই ফাইটার এয়ারক্র্যাফট মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের উত্তরা শাখার দোতলা স্কুল ভবনে আছড়ে পড়ে। দোতলা ভবনের প্রথম তলায় ছিল তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ক্লাস। দ্বিতীয় তলায় ছিল দ্বিতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস। তার সঙ্গে ছিল প্রিন্সিপালের (অধ্যক্ষ) অফিস রুম। একটা কোচিংয়ের ক্লাসও চলমান ছিল। দুর্ঘটনার সময় স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছিল কিন্তু ওই জায়গায় বাচ্চারা জড়ো হয়েছিল এবং তাদের সঙ্গে কয়েকজন অভিভাবকও ছিলেন। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ফায়ার ফার্ভিস পৌঁছে যায় এবং উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। আমরা মনে করি এ দায় কোনো ক্ষতিপূরণ দিয়েই মেটানো সম্ভব নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো বা জনবহুল স্পর্শকাতর এলাকায় প্রশিক্ষণ ফ্লাইট পরিচালনা করার অনুমতি কীভাবে দেওয়া হয়, তা এখন বড় প্রশ্ন। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেখানে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব, সেখানে আকাশপথে এমন ঝুঁকিপূর্ণ ও দায়িত্বহীন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলতে পারে, তা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। স্কুল-কলেজের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় প্রশিক্ষণ বিমান চলাচল কাদের অনুমতিতে হয়? দুর্ঘটনার কারণ যা-ই হোক না কেন– এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নিয়ম ভাঙা এবং শিশু ও সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতি চরম অবহেলার ফল। একটি প্রশিক্ষণ বিমানের মূল উদ্দেশ্য পাইলটদের নিরাপদে ও নিয়ন্ত্রিতভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া। অথচ এমন বিমান যদি আবাসিক বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে উড়তে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়, তাহলে তা শুধু ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়ংকর বার্তা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে, বিমানটির রুট নির্ধারণ, নিরাপত্তা মান এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হচ্ছিল? এই দুর্ঘটনার জন্য কে দায়ী– বিমান চালক, প্রশিক্ষক, নাকি বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ? অনেকের সরকারের দিকেও আঙ্গুল তুলছেন। এ প্রশ্নের উত্তর এখন সময়ের দাবি। শিশুদের জীবনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছু নেই– এই সত্য অবজ্ঞা করে কেউ যেন আর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ না হয়। বিমান দুর্ঘটনাটি যেন শুধু একটি পরিসংখ্যান হয়ে না যায়– ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। যদিও দুর্ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনের জন্য বিমানবাহিনী কর্তৃক ইতোমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, আমরা চাই শুধু লোক দেখানো নয়, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করতে হবে। একই সঙ্গে স্কুল ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রশিক্ষণ ফ্লাইট নিষিদ্ধ করতে হবে এবং বিকল্প এলাকা নির্ধারণ করতে হবে। আহত শিশুশিক্ষার্থীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে। প্রয়োজনে বিদেশেও পাঠাতে হবে। সেই সঙ্গে শিশুদের মানসিক সহায়তার দিকটিও ভাবা প্রয়োজন। আর ভবিষ্যতে এমন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে জাতীয় পর্যায়ে বিমান প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা নীতিমালায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা জরুরি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..