‘আই হেইট পলিটিক্স’ ও ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’

ঐশ্বর্য সৌরভ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

‘আমি বাবা কোনো দলে-পার্টিতে নাই’ ‘আমি রাজনীতির ধারের কাছে নাই’ আমাদের সমাজে প্রচলিত এরকম শব্দের সঙ্গে অপরিচিত মানুষ খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। যারা রাজনীতি নিষিদ্ধ ও বি-রাজনীতিকরণের কথা বলে, সুশীল সমাজের মুখোশ পরে, আই হেইট পলিটিক্স স্লোগান দেয় তারাই পরবর্তীতে রাজনীতির হর্তকর্তা হয়ে উঠে। রাজনীতি বিনা মানুষ হয় না; কারণ দার্শনিকেরা বলেছেন- জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পুরোটা সময় আমাদের সঙ্গে যা কিছু ঘটে তা-ই রাজনীতি। চাইলেও আমরা কেউ রাজনীতির বাইরে নই। তাই আমি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না- এসব আলাপ না দেওয়াই শ্রেয়। জুলাই-আগস্টের আন্দোলন পরবর্তী সময়ে দেশের মধ্যে একটি নতুন বয়ান তৈরি হয়, যার নাম ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’। অনেকে এখানে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। কেননা ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ এ কথাটি নানাভাবে এর আগে ডান-বাম-ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতিষ্ঠালগ্নে বলেছেন। কিন্তু আদৌ কি ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ বলে কিছু ঘটেছে আমাদের এই অঞ্চলে। চিরচেনা একই রকম ভোট, দল পরিবর্তন, মার্কা আর দখলবাজির রাজনীতিতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বামপন্থিরা এখনো প্রধানতম দল হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি। তারাও ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’-র কথা বলে আসছেন। দেশের অন্যতম পুরনো ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দল সিপিবি বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তির সমাবেশ গড়ে তোলার দাবিতে সোচ্চার রয়েছে অনেকদিন হলো। বুর্জোয়া ও ক্ষমতাসীন দলের বাইরে বিকল্প শক্তির দাবি তাদের। এরপরও কেন বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির উত্থান- তাও আবার মধ্যমপন্থি রাজনীতির বলয়ে। ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ কথা আমরা ইসলামি দলগুলোর মুখেও শুনেছি। তারা পরিবর্তনের কথা বলে বিভক্তে নতুন নতুন দল প্রতিষ্ঠা করেছে। বামেরাও ঐকই পথে হেটেছে। তারাও বহু অংশে বিভক্ত। যদিও বামেদের লক্ষ্য এক ‘সমাজতন্ত্র’। চব্বিশের আন্দোলন পরবর্তী সময়ে দেশে নতুন নতুন বহুমাত্রিক রাজনৈতিক দল, সংগঠন, ছাত্র সংগঠন ও প্ল্যাটফর্ম এর আবির্ভাব দেখা গেছে। এসবে কিন্তু পুরনো নেতাদের আধিপত্য কম অধিকাংশই তরূণ ও ছাত্র। ২০১৫ সাল পরবর্তী সময়ে দেশে একটি স্লোগান জনপ্রিয় হয়ে উঠে সেটা হচ্ছে ‘আই হেইট পলিটিক্স’। বিশেষ করে ছাত্রদের মাঝে এই স্লোগান খুবই পরিচিত। তবে এই স্লোগান নিয়ে বির্তক ছিল বামপন্থিদের। ছাত্র ইউনিয়ন অপরাজনীতি রুখে দাড়াঁনোর জন্য ক্যাম্পাসগুলো ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠগুলোকে নিয়ে বহুবার আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। কিন্তু ছাত্র ইউনিয়নের এ আন্দোলনকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ‘সাধারণ ছাত্র’ নামক ব্যানার তৈরি হয়, তারা ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের কথা বলে। তখন ছাত্র ইউনিয়ন বলা শুরু করে ‘যারা ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে চাই তারা ধর্মীয় দলের রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। এরা অপরাজনীতির কথা বলে ‘আই হেইট পলিটিক্স’ স্লোগান দিয়ে ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের অন্তরালে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। আই হেইট পলিটিক্স বলে স্লোগান দেয় তারা গুপ্ত রাজনীতি করে। আমরা সুষ্ঠু ধারার রাজনীতি চাই।’ ২০১৫ পরের সময়ে বামপন্থি ছাত্রসংগঠনগুলোর জোরালো আন্দোলনে ২০১৯-এ ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এসময় ছাত্রসংগঠনগুলো এবং কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেয়। প্রশ্ন ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’-র সঙ্গে ডাকসুর সম্পর্ক কোথায়। হে এখান থেকেই ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’-র আসল গল্প শুরু। কারণ ডাকসু পরবর্তী সময়ে ‘আই হেইট পলিটিক্স’ স্লোগান দেওয়া সংগঠনটির নেতারা আজকের রাজনীতিতে সোচ্চার। আপনার মনে হতে পারে, ‘ডাকসু নেতা তৈরির কারখানা। ডাকসু থেকে তো নেতা-ই তৈরি হবে।’ আমিও আপনার সঙ্গে সহমত। তবে, ‘আই হেইট পলিটিক্স’ বলে সাধারণ ছাত্রের ব্যানারে থাকে পরে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়া কতটা যুক্তিযুক্ত? সেই ডাকসু নির্বাচন পরবর্তী সময়ে আমরা দেখলাম- নুরুল হক নুর গণঅধিকার পরিষদ নামে রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করলো। ক্যাম্পাসে লেজুরবৃত্তি ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধের কথা বলে স্লোগান দেওয়া সাধারণ ছাত্রটি নিজে ছাত্র অধিকার পরিষদ বলে লেজুরবৃত্তিক ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠা করলো। পরবর্তীতে লেজুরবৃত্তি ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধের কথা বলে ছাত্র অধিকার পরিষদ ভাঙ্গে গণতান্ত্রিক ছাত্র-শক্তি নামে একটি ছাত্র সংগঠনের আবির্ভাব ঘটে। তবে, তাদের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা লক্ষ্য করা যায় নি। তারাও ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষে নানা বয়ান তৈরি করে সময়ক্ষেপণ করতো। এরপর (২০২৪) চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান। এবারেও ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুলে রাজপথে সোচ্চার সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে স্বৈরচারি হাসিনা সরকারের পতন তারপর রাজনীতি নিষিদ্ধের জোরালো দাবি। কিন্তু চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান শেষে পাঁচ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আমরা কি দেখলাম- যারা ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধের কথা বললো, নিজেদের অ-রাজনৈতিক দাবি করলো, যারা সাধারণ শিক্ষার্থী পরিচয় দিয়ে রাজপথে জীবনপণ লড়াই করলো তাদের অধিকাংশ রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের নেতা। এবং কি ধর্মীয় ও নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠনের নেতাদেরও পরিচয় প্রকাশ্যে এলো। সবমিলিয়ে পাঁচ আগস্ট পরবর্তী সময়ে সাধারণ ছাত্র কিংবা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ব্যানার আর থাকলো না। কারণ পরিচয় প্রকাশ হওয়া অধিকাংশ সমন্বয়ক কিংবা সংগঠক হচ্ছে- শিবির, ছাত্রদল, ছাত্রলীগসহ বামপন্থি ছাত্র সংগঠনের কর্মী। এরপর ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’-র কথা বলে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ নামে দলীয় ছাত্র সংগঠনের আত্মপ্রকাশ। অথচ এই ছাত্র সংগঠনের যারা নেতৃস্থানীয় তারাও ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ এবং ‘আই হেইট পলিটিক্স’ শব্দের হর্তাকর্তা ছিল। আমরা দেখেছি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির ব্যানারে বিভিন্ন স্থান ও ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিতে আন্দোলন, গ্রাফিতি সংবাদ সম্মেলন। তাহলে নতুন রাজনৈতিক দল-ই বা নতুন দলীয় ছাত্র সংগঠন কেন? এমনটাই প্রশ্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। ‘আই হেইট পলিটিক্স’ ও ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ এসব শব্দকে পুঁজি করে যে নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ এবং তাদের দলীয় ছাত্র সংগঠন ‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ’ এর আত্মপ্রকাশ ঘটলো তাদের আসল এজেন্ডাইবা কী? তারা কি জাতীয় রাজনীতিতে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রকাশ হতে চায় নাকি পুরনোদের মতো ‘কিংস পার্টির’ চরিত্র ধারণ করবে–এখন তা-ই দেখার অপেক্ষা। লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..