নয়াউদারবাদী খবরদারি বনাম সুলতানের শিল্প-ইশতেহার

পাভেল পার্থ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

বরেণ্য চিত্রকর এস এম সুলতানকে নিয়ে বহুজনের বিশ্লেষণ তিনি কৃষকের ছবি এঁকেছেন এবং কৃষির ছবি এঁকেছেন। কিন্তু তিনি কী ধরণের কৃষিব্যবস্থার চিত্রভাষ্য নির্মাণ করেছেন? সুলতান মূলত নয়াউদারবাদী কর্তৃত্ব আর জারি থাকা ক্ষমতার ব্যাকরণকে তাঁর চিত্রভাষা দিয়ে প্রশ্ন করেছেন। কৃষিজীবনের চিত্র-প্রমাণ তৈরি করে নয়াউদারবাদের বিরুদ্ধে শিল্প-ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। নয়াউদারবাদী চোখরাঙানির ঘের থেকে মুক্ত কৃষিভুবনের চিত্রভাষ্য নির্মাণ করতে গিয়ে সুলতান নিজেও দেশজ রং, উপকরণ ও লোকায়ত শৈলী বেছে নিয়েছেন। নয়াউদারবাদকে নানাভাবে প্রশ্ন করবার এই সুলতানীয় বয়ান আমাদের জন্য খুব জরুরি। যখন কেবলমাত্র কৃষিকাজ কিংবা শিল্পচর্চা নয়; সামগ্রিক যাপিতজীবন আজ নয়াউদারবাদী কর্তৃত্বের খবরদারিতে বন্দি। পৃথিবীর বহু শিল্পী চারপাশের বাস্তুতন্ত্র থেকে তাদের শিল্পের উপাদান সংগ্রহ করেন। বিশেষ করে ‘লোকশিল্পীদের’ ক্ষেত্রে এই চর্চা বেশি। প্রকৃতিজাত দেশজ উপকরণ এবং চিত্রকর্মে নানা স্থানীয় সমষ্টিগত লোকজ মোটিফের ব্যবহার। এইসব চর্চা একইসাথে বহুজাতিক কোম্পানি নির্ভর বাণিজ্যকে প্রশ্ন করে, প্রকৃতিবান্ধব এবং অবশ্যই রাজনৈতিক। মানুষ, জমিন, ফসল, গৃহ চারধারে একটা মাটিময় রং ছড়াতে পছন্দ করেন সুলতান। সুলতান তাঁর চিত্রকর্মে বহু প্রাকৃতিক উপাদান এবং দেশজ ক্যানভাস ব্যবহার করেছেন এবং এর প্রচলনে সচেষ্ট থেকেছেন। সুলতানের এই প্রচেষ্টাকে নয়াউদারবাদের বিপরীতে এক দৃঢ় শিল্পিত প্রতিবাদ হিসেবে পাঠ করা যায়। নয়াউদারবাদী ব্যবস্থাকে প্রশ্ন না করে, এই কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতাকাঠামো এবং নিপীড়নকে প্রশ্ন না করে কোনোভাবেই কী শিল্পচর্চা এবং কৃষিচর্চার মুক্তি সম্ভব? চিত্রকর্মে ব্যবহৃত দেশজ রং ও ক্যানভাসের উপকরণ তিনি তাঁর চারপাশের প্রকৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিসর থেকেই সংগ্রহ, গবেষণা ও রপ্ত করবার চেষ্টা করেছেন সুলতান। এখানেই তিনি অনন্য, নির্মাতা ও কারিগর। সুলতান মৎস্যজীবীদের গ্রামে ঘুরেছেন এবং তাদের কাছে জালে গাব দেয়ার পদ্ধতি শিখেছেন এবং সেই জ্ঞান নিজের ক্যানভাস তৈরিতে প্রয়োগ করেছেন। বিদেশি দামি ক্যানভাস ব্যবহার না করে তিনি দেশজ পাটের চটকে ক্যানভাসে পরিণত করেছেন। সুলতানের এই দেশজ ক্যানভাস উদ্ভাবন কেবলমাত্র তাঁর দেশজপ্রেম নয় কিংবা প্রতিরোধী বয়ানমাত্র নয়। বরং প্রকৃতিঘনিষ্ঠ শিল্পচর্চার পাশাপাশি শিল্পচর্চার মাধ্যমে দেশীয় অর্থনীতি বিকাশের একটা সৃজনশীল প্রচেষ্টাও। কারণ যখন বিশ্বায়িত ক্ষমতার চাপে একের পর এক পাটকল বন্ধ হয়ে যায়, তখন সুলতান পাটের চটকে তাঁর সৃজনকর্মের ক্যানভাস হিসেবে গ্রহণ করে পাটশিল্প রক্ষার জন্য দাঁড়ান। একইসাথে গ্রামবাংলার পাটচাষী এবং পাটের নিরন্তর দুঃখগাঁথাকে আগলে দাঁড়ান। দেশি গাব এবং তিসির তেল ব্যবহারের ভেতর দিয়ে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য সুরক্ষা এবং শস্যবহুমুখীকরণের বার্তাও সুলতান আমাদের দেন। তো এইসব দেশজ উপকরণের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব কতখানি? দীর্ঘস্থায়িত্ব কিংবা প্রয়োজন ও চিত্রবয়ান নির্মাণের জন্য এদের জরুরিত্ব কতখানি? সুলতানের ব্যবহৃত কিছু দেশজ প্রাকৃতিক উপকরণ নিয়ে আমরা কিছু আলাপ করতে পারি। যেমন, তিসির তেল দীর্ঘ লিনোলেনিক এসিডযুক্ত এক ট্রাইগ্লিসারাইড। এটি দ্রুত শুকানোর কাজে ব্যবহৃত হয় এবং তেলরঙের বাইন্ডার হিসেবে শিল্পীসমাজে বহুল ব্যবহৃত। কিন্তু এই তিসির তেল আসে কোথা থেকে? কৃষকই তিসি চাষ করে। কিন্তু সবুজ বিপ্লব পরবর্তী সময়ে শস্যবৈচিত্র্য যেমন কমেছে, তিসিও হারিয়েছে দেশের নানাপ্রান্ত থেকে। বিশেষ করে চরাঞ্চল, বরেন্দ্র এবং পাহাড়ি এলাকায় তিসিচাষের বহু প্রচলন ছিল। সুলতান হয়তো গ্রাম থেকে তিসির তেল সংগ্রহ করেছেন এবং তাঁর চিত্রকর্মে ব্যবহার করেছেন। বাংলাদেশে প্রতিবছর শিল্পকর্মে কী পরিমাণ তিসির তেল ব্যবহৃত হয় এবং এর অর্থনৈতিক-রাজনীতি বিষয়ে আমি কোনো গবেষণা দলিল পাইনি। শিল্পীসমাজ যদি দেশীয় তিসির তেল বিষয়ে আরো গবেষণা করেন এবং এর একটি স্থানীয় দেশীয় বাজার তৈরিতে ভূমিকা রাখেন তবে শিল্পচর্চার ভেতর দিয়ে তিসিচাষকেও নতুনভাবে উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। যা কৃষকসমাজ এবং শিল্পীসমাজের ভেতর এক যৌথ পরস্পরনির্ভরশীলতা গড়ে ওঠতে সহায়ক হবে। সুলতান এমনই পেশাগত কৌমনির্ভর সমষ্টিগত বহুত্ববাদের চিত্রভাষ্য নির্মাণ করেছেন। সুলতানের পাটের ক্যানভাস নিয়েও গবেষণা হয়েছে না হয়নি আমার জানা নেই। এটি হওয়া জরুরি। প্রশ্ন ওঠতে পারে পাটের ক্যানভাস কতোটা টেকসই হবে? গবেষণা বলছে, তুলা-শণ বা অন্যান্য আঁশের তুলনায় পাটের আঁশের অণুজীবঘটিত সংক্রমণ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। যাহোক সুলতানের ক্যানভাস নিয়ে গবেষণা হতে পারে। সুলতানের ক্যানভাস আমাদের দেশজ শিল্পায়ন এবং শিল্পচর্চা বিকাশে প্রকৃতিবান্ধব বার্তা দিতে পারে। বিশেষ করে জলবায়ু-দুর্গত সময়ে আমাদের সবদিক থেকেই ভাবতে হবে, শিল্পচর্চার ক্ষেত্রেও আমাদের প্রকৃতিবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করা জরুরি, যেসব উৎপাদনে কম কার্বণ নির্গমণ হয়। আবার শিল্পউকরণের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়গুলোও প্রবলভাবে আমাদের খেয়াল করা জরুরি। অ্যাজো-বেজড ডাই কিংবা সীসাদূষিত রং জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, প্রমাণিত হয়েছে ক্যান্সার তৈরি করে। আমরা কোন ধরণের রং ব্যবহার করবো এবং সেসব কতোটা প্ররিবেশ ও জনস্বাস্থ্য উপযোগী এসব বিষয়ে আমাদের একটা নীতিমালার প্রশ্নকেও উত্থাপন করে সুলতানের শিল্পচর্চা। দেশে প্রতিবছর আমাদের কী পরিমাণ ক্যানভাস লাগে এবং এই অর্থ কোন কোন ক্যানভাস কোম্পানির কাছে যায় তাও আমাদের জানা জরুরি। যদি পাটসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক আঁশ, কাগজ এবং নানা প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে ‘ক্যানভাস-শিল্প’ গড়ে তোলা যায় তবে বহু বেকার যুবদের এই সৃজনশীল কর্মউদ্যোগে উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত করা সম্ভব। দেশজ রং, ক্যানভাস এবং দেশজ শিল্পচর্চার উপকরণের মাধ্যমে দেশীয় শিল্প-উপকরণের বাজার গড়ে তুলতে পারলে এটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে এক বিশেষ পরিচয় গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। পাটের চটের ক্যানভাস অংকন উপযোগী করে তোলার জন্য প্রলেপ হিসেবে এবং রং তৈরিতে সুলতান দেশি গাবের আঠা ব্যবহার করেছেন। জেলেরাই মূলত জালে এই গাবের আঠা ব্যবহার করে। কিন্তু কেন জেলেরাই পাকাকরণ/প্রক্রিয়াজাতকরণে এই দেশি গাবের এমন এক আদি ব্যবহারের চল ধরে রেখেছেন। ধারণা করছি সুলতান দেশি বুনো গাবের আঠা ব্যবহার করেছেন। পাটের চটে গাবের আঠার বিশেষ সম্মিলনী তাঁর ক্যানভাসকে প্রতিরোধী এবং প্রতিবাদী করে তুলেছে। তবে সুলতানের দেশজ রং, ক্যানভাস এবং শিল্পউপকরণ বিষয়ে আমাদের বহুমুখী গবেষণা জরুরি। দেশে টিকে থাকা দেশজ শিল্পউকরণ বিষয়ে আমাদের পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক নথিভূক্তকরণ জরুরি। কারণ এসব শিল্পউকরণ যেহেতু প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের সাথে জড়িত তাই লাগাতার প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের আঘাতে এমন শিল্পউকরণের সংকটগুলোও জানাবোঝা জরুরি। সুলতান এই জানাবোঝার প্রচেষ্টায় রত ছিলেন, এই প্রচেষ্টাকে জাগিয়ে রাখা আমাদের কাজ। একজন চিত্রকরের শিল্পচর্চার কারণে যদি একটি গাব গাছ বাঁচে, কিছু জমিনে তিসি ও পাট চাষ হয় বা প্রাকৃতিক রংয়ের উৎসগুলো সুরক্ষিত থাকে তবে চিত্রকর হিসেবে এর থেকে বেশি আর কী উদযাপনের হতে পারে এই দুনিয়ায়? সুলতান কৃষিচিত্রকর্মের ভেতর দিয়ে এই পরস্পরনির্ভর উদযাপনের দৃশ্য আমাদের সামনে প্রমাণ হিসেবে রেখে গেছেন। সুলতান নয়াউদারবাদী কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে গ্রামীণ-নিম্নবর্গের প্রতিবাদী চিত্রবয়ান আমাদের সামনে প্রমাণ হিসেবে রেখে গেছেন। দশ হাজার বছর বয়সী কৃষিকর্ম মাত্র কয়েকশত বছরের ইতিহাসের পরিক্রমায় আজ নয়াউদারবাদী উপনিবেশের অংশ হয়ে কোনোরকমে টিকে আছে। কৃষিকর্ম এখন কোনোভাবেই কৃষকের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত, অংশগ্রহণ, চিন্তা, অনুশীলন এবং উপকরণনির্ভরতার কোনো আখ্যান নয়। এখানে নয়াউদারবাদী কর্তৃত্ব আছে, বহুজাতিক কোম্পানির বাহাদুরি আছে। শিল্পচর্চাও আজ এই নয়াউদারবাদী কর্তৃত্বের বাইরে কী? শিল্পী কী তাঁর চিন্তা, উপকরণে, সিদ্ধান্ত সবকিছু মিলিয়ে সার্বভৌম? নাকি কৃষকের মতো চিত্রকরও আজ কর্পোরট বাজারে নিজের সৃষ্টিকর্ম কী উৎপাদনকে ‘পণ্য’ হিসেবেই বিক্রি করতে বাধ্য হন। সুলতানের চিত্রকর্মে তাহলে আমরা কেন জমিনে কোনো আইল দেখি না, দেখি সর্বজনীন উৎপাদনশীলতা ও সৃষ্টিশীলতার জমিন। দেখি সমবায় এবং বিনিময়ের এক সমিষ্টগত তৎপরতা। সুলতানের চিত্রকর্মে ‘উৎপাদনশীলতা’ কোনো ‘পণ্য’ নয়, বেঁচে থাকা এবং জাগিয়ে রাখার সম্ভবনার শক্তিচক্র। কৃষির উপর নয়াউদারবাদী কর্তৃত্বের মতো শিল্পভুবনে এই কর্তৃত্ব কতখানি তা আমার জানা নাই। বিজ্ঞ শিল্পীসমাজ হয়তো এর একটা ব্যাখা দাঁড় করাতে পারবেন। আমরা সমকালীন শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে দেখতে পাই কোনো না কোনো বহুজাতিক কোম্পানি কিংবা কর্পোরেট কোনো না কোনো শিল্পচর্চাকে নানাভাবে সহায়তা করছে। স্মরণে রাখা জরুরি এসব কর্পোরেট কর্তৃত্বের মাধ্যমেই নয়াউদারবাদী ব্যবস্থা টিকে আছে এবং এই নয়াউদারবাদী ব্যবস্থাকে প্রশ্ন না করে কী কোনো সার্বভৌম শিল্পচর্চা বা কৃষিচর্চা সম্ভব? সুলতানের চিত্রকর্ম আমাদের কাছে নানাভাবে এই প্রশ্নকেই হাজির করেছে। শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কৃত্রিম রাসায়নিক উপাদান নিয়ে আলাপ বহুদিন আড়ালে ছিল। বহুদিন ধরে শিল্পীরা বিভিন্ন কোম্পানির বিপদজনক সীসাদূষিত রং দিয়ে ছবি এঁকেছেন। পরিবেশ ও স্বাস্থ্যসুরক্ষার প্রসঙ্গ আইনত ওঠার ফলে রং থেকে সীসা, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক ও সেলেনিয়ামের মতো ভারি ধাতুকে বাদ দেয়ার প্রচলন শুরু হয়েছে। দেখা যায়, অধিকাংশ সময়ই চিত্রকর্মের ক্রয়-বিক্রয়কে এক বহুজাতিক বিশ্বায়িত ক্ষমতার বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। এমনকি বহুজাতিক কোম্পানিদের প্রবর্তিত বৃত্তি, গবেষণা ফেলোশীপ, অনুদান নিয়েই শিল্পশিক্ষা করতে হয়। প্রাণ-প্রকৃতি সংহারি বহুজাতিক কৃষিবিষ কোম্পানিরা শিল্পসংস্কৃতির পাতানো ‘ধারক’ হিসেবে বহু ‘পুরস্কার’ ও সম্মাননা প্রবর্তন করেছে, এসব পুরস্কার পাওয়ার জন্য বহু শিল্পী তাদের শিল্পকর্ম নিয়ে ‘মুখিয়ে অপেক্ষা’ করে। বৃহৎ কৃষিবিষ কোম্পানি মনস্যান্টো, জার্মান কৃষিবিষ কোম্পানি বায়ার কিংবা সুইস কোম্পানি সিনজেনটা প্রবর্তিত পুরস্কার ও বৃত্তিগুলো এক্ষেত্রে বেশ আলোচিত। সুলতানের কৃষিচিত্রভাষ্য এবং শিল্পভুবন আমাদের নয়াউদারবাদী কর্তৃত্বকে প্রমাণসমেত প্রশ্ন করতে শেখায়। সুলতান কেবল ক্যানভাসে নয়, যাপিতজীবনের ভেতর দিয়েও নয়াউদারবাদের বিরুদ্ধে শিল্পকুসুম টানটান রেখে গেছেন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..