লুটেরাদের স্বার্থরক্ষার বাজেট

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
গত এক দশক ধরে সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত সূচকগুলোতে চোখ বুলালে দেশর অর্থনীতির স্বাস্থ্য বেশ মোটাসোটা দেখা যেতো। সরকারের পক্ষ থেকে দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, দারিদ্র্যের হারসহ নানা ক্ষেত্রের সাফল্য ফলাও করে প্রচার করে হতো। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায়ও এর প্রতিফলন দেখা যেতো। সেইসাথে শুরু হয়েছিল অবকাঠামো নির্মানের বিশাল কর্মযজ্ঞ। কিন্তু এসবের আড়ালে দেদারসে চলেছে দুর্নীতি ও লুটপাট। সে লুটের টাকা আবার পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বিদেশে। ফলে মূল অর্থনীতির তুলনায় আড়ালের (আন্ডারগ্রাউন্ড) অর্থনীতি অনেক বড় ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। বিপরীতে আর্থিক খাতে সুশাসন, দুর্নীতি হ্রাস, রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, স্থানীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উৎপাদনশীল খাতের বিকাশ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির কার্যকর কোনো পরিকল্পনা না থাকায় ভেতর থেকে ক্ষয়ে গেছে অর্থনীতি। এ কারণে সব দিক থেকেই মহাবিপদে পড়ে গেছে সরকার। আগামী (২০২৪-২৫) অর্থবছরের বাজেটেও সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এবার মোট আকার ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা- যা চলতি (২০২৩-২৪) অর্থবছরের তুলনায় বাজেটের মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। অথচ গত পাঁচটি অর্থবছরে বাজেটের আকার আগেরটির তুলনায় অন্তত ১১ শতাংশ বেশি ছিল। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আশা করেছেন, আগামী অর্থবছরে সাড়ে ৬ শতাংশে নামবে মূল্যস্ফীতি। সেটা ঠিক হলেও বাজেটের প্রকৃত আকার প্রায় ২ শতাংশ কমে যাচ্ছে। আর বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি পৌনে ৯ শতাংশের উপরে থাকলে সরকারের প্রকৃত ব্যয় (বাজেট) অন্তত ৫ শতাংশ কমে যাচ্ছে। বরাবরের মতো এবারের বাজেটেরও বড় অংশ ব্যয় হবে পরিচালন (বেতন-ভাতা-পেনশন, সুদ, সরকারি অফিসের নিয়মিত কেনাকাটা, ভর্তুকি ইত্যাদি) খাতে— যার পরিমাণ ৫ লাখ ৬ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। আর সরকারের রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় আগামী অর্থবছরে অর্থনীতির পাঁচটি চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছেন। সেগুলো হলো– মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে উচ্চ সুদের হার, টাকার অবমূল্যায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সার্বিক পরিকল্পনা বাজেট বক্তৃতায় উঠে আসেনি। যেটুকুই বা এসেছে তাও গতানুগতিক। এসব করেও রাজস্ব আয় যেটুকু বাড়ানো যাবে তাতে আড়াই লাখ কোটি টাকার ঘাটতি পূরণের সম্ভাবনা নেই। তাই বাজেট বাস্তবায়নে সরকারকে ঋণের উপরই নির্ভর করতে হবে। সেক্ষেত্রে বাজেটের ২০ শতাংশ আসবে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে। আগামী এক বছরে শুধু ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী। পরিকল্পনা মতো রাজস্ব আদায় না হলে ঋণের অঙ্ক আরও বাড়বে। এর ফলে ব্যাংকে তারল্য সংকট তৈরি হবে। আর বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে। প্রস্তাবিত বাজেটে বৈদেশিক উৎস থেকে নিট ৯০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই অঙ্ক ৭৬ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগামী অর্থবছরে বিদেশি ঋণ-নির্ভরতা বাড়ছে ১৪ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা। তবে অতিরিক্ত এই ঋণ পেতে হলে সরকারকে যে ঋণদাতা সংস্থাগুলোর আরো শর্ত পূরণ করতে হবে, তা না বললেও চলে। তার অর্থ হলো, আগামীতে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও সারের দাম এবং করের আওতা আরো বাড়বে। এতে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকবে। এক কথায় বললে, থাকছে না। অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলে একের পর এক পরিকল্পনা ও প্রতিবছর বাজেট ঘোষণা ও বাস্তবায়ন করা হলেও তাতে রাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনেতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব কোনো উদ্যোগ নেই। কাগজে-কলমে জনগণের কল্যাণ, দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসনের কথা বলা হলেও বৈষম্য নিরসনে কার্যকর পরিকল্পনা কখনো দেখা যায়নি। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যতো বেড়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বৈষম্য। অথচ ‘একটি সুষম ও সামাজিক বণ্টন ব্যবস্থায় ন্যায় ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু ধনী-গরীবের মধ্যে পর্বত-প্রমাণ বৈষম্য দূর করে অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে গত ৫০ বছরে কোনো সরকারই পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। বরং তাদের গৃহিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এই বৈষম্যকে দিন দিন প্রকট করে তুলেছে। ফলে বাংলাদেশে একদিকে একশ্রেণির লোক হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছে, অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ দারিদ্র্যেরে সাথে যুদ্ধ করে জীবনাতিপাত করছে। ধনী-দরিদ্রের এই বৈষম্য মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছলেও সরকারের এ নিয়ে মাথাব্যথা নেই। আয়বৈষম্য ও ভোগবৈষম্য দূর করতে এবারো বাজেটে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। উল্টো কালো টাকা সাদা করার সুযোগসহ নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে লুটেরাদের স্বার্থ রক্ষার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..