ধেয়ে আসতে পারে বন্যা আগাম প্রস্তুতি জরুরি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : ধেয়ে আসছে বন্যা। এক বিপর্যয়ের মধ্যে আরেক বিপর্যয়। ঘূর্ণিঝড় রেমালের ধাক্কা সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে সরকার। ইতিমধ্যে সিলেটের অনেক এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। রাজশাহীর পদ্মায় পানি বাড়ছে ধীরলয়ে। তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে ব্যারেজের গেট খুলে রাখা হয়েছে। ফলে তিস্তা পাড়ের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। উজানের ঢল বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। যমুনার ভাঙনের কবলে পড়েছে শাহজাদপুর, এনায়েতপুর, চৌহলীসহ আরও কয়েকটি পয়েন্ট। প্রতিদিন নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটাসহ ফসলি জমি। নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার ধনু নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, বাহ্মণবাড়িয়া এই সাত হাওর জেলায় বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কয়েক দিন ধরে উজানের ঢলে বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বেড়েছে। বন্যা একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। নদীর পানি ফুলে-ফেঁপে উঠে চারপাশ প্লাবিত করাকে বলা হয় বন্যা। বন্যা প্লাবিত এলাকার মানুষের দুঃখ-দুর্দশার সীমা-পরিসীমা থাকে না। বন্যা চলে যাওয়ার পরও বেশ কয়েক দিন থাকে এর প্রভাব। বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই বন্যা হয়। এবারও বন্যার আশঙ্কা করছে পানি, নদী ও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এবার বড় আকারের বন্যা হওয়ার আশঙ্কা আছে। নদীগুলোর পানি দুই কুল প্লাবিত করেই ক্ষান্ত হবে না, সঙ্গে নিয়ে আসবে ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, পেটের পীড়াসহ নানা রোগবালাই। ডেঙ্গু এবং মশাবাহিত অন্যান্য রোগ তো আছেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো মেনে নিতেই হবে। তারপরও সাবধানতা অবলম্বন দরকার। আগে থেকে সতর্ক হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। বছরের কোন সময়টায় বন্যা হয় তাও সবার জানা। জানার বিষয়টা নিয়ে সাবধান হওয়া যত সহজ অজানা বিষয় নিয়ে সাবধান হওয়া তত সহজ নয়। বন্যা একটা জানা বিষয়। তাই বন্যার ব্যাপারে আগাম সতর্কতা অবশ্যই নেওয়া যাবে। বিশেষজ্ঞদের কথার গুরুত্ব অনুধাবন করে বন্যা মোকাবিলার জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হবে বুদ্ধিমানের কাজ। সরকারকে তাই সাবধান হতে হবে। ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হবে। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। এ দেশের মানুষ নানা দুর্যোগ মোকাবিলা করে বেঁচে আছে। বিপুল প্রাণের ক্ষয়, ফসলের ক্ষতি, সম্পদের হানি সবকিছুর পরও মানুষ বেঁচে থাকে। নতুন করে গড়ে তোলে বাড়িঘর, জীবনের প্রবাহ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ যখন বিপুল আকারে, প্রচণ্ড রূপে হাজির হয় তখন তার আঘাতে হাজার হাজার মানুষের স্বাভাবিক জীবন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো অতিমাত্রায় ঘনবসতির দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হয়। বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাপ করাই দুরূহ। বন্যার ভয়াবহতা সামলাতে অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়। সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থা মিলেও সামলাতে পারে না। ভয়াবহ বন্যায় দুর্ভোগে পড়ে সাধারণ মানুষ। তাদের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়। জীবন-জীবিকা বাধাগ্রস্ত হয়। বন্যার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত সাধারণ মানুষ অনেকটা দিশাহারা হয়ে যায়। বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় তাদের বাড়িঘর, দোকানপাট, ফসলি জমি। ভাসিয়ে নিয়ে যায় গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি সব। অসহায় মানুষদের হাহাকারে ভারী হয় আকাশ-বাতাস। সাহায্যকারী সরকারি-বেসরকারি সংস্থার দিকে তাকিয়ে থাকে সবাই। ১৯৮৪ ও ১৯৮৮ সালের সর্বনাশা বন্যায় প্রায় ১ কোটি লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ভেঙে পড়েছিল দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় এবং সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে প্রায় দেড় লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। উপকূলীয় অঞ্চলের পাঁচটি জেলার ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, গাছপালা, জমির ফসল নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ২০০৭ সালে দেশের মধ্যাঞ্চলের বন্যায় ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় সোয়া কোটি মানুষ। ভেঙে পড়ে দেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি। এভাবে প্লাবন, বন্যা ও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিভিন্ন সময় লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, ধ্বংস হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ। বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ে এ দেশের দরিদ্র মানুষ। তারা কাঁচা ঘরবাড়ি তৈরি করে কোনোরকম জীবন ধারণ করে। প্লাবন-বন্যায় তাদের ছন-বাঁশের তৈরি কাঁচা ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে যায়, পুরোনো বাঁশের খুঁটি পচে ভেঙে পড়ে। অনেকের ঘর ভেসে যায় প্লাবনের তোড়ে। আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার মানুষ। এ অবস্থায় নারী ও শিশুরাই বিপদে পড়ে বেশি। বহু দরিদ্র পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয় নেয় বেড়িবাঁধে, সড়কের ধারে, স্কুল ঘরে ও মসজিদ-মন্দিরের বারান্দায়। বন্যার প্রবল স্রোতে গ্রামের কাঁচা রাস্তা, সেতু-কালভার্ট ভেঙে পড়ে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় যোগাযোগব্যবস্থা। এ সময় মানুষের কোনো কাজ থাকে না। কর্মহীন হয়ে দুর্ভোগে পড়ে বানভাসি মানুষ। গ্রামের মানুষ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে যায় শহরের দিকে। শহরের বস্তি, ফুটপাথ হয় তাদের আবাসস্থল। বন্যার সময় খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসার অভাবে দুর্গত মানুষ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। দুর্বিষহ জীবন ধারণ করতে হয় তাদের। চারদিকে অথৈ পানি থাকার পরও পান করার মতো একফোঁটা বিশুদ্ধ পানি তারা পায় না। বন্যার দূষিত পানি পান করে তারা পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়। বর্ষাকালে বন্যা হওয়া বাংলাদেশে কোনো নতুন ঘটনা নয়। ভারত ও নেপাল থেকে আগত তিনটি বড় নদীর প্রবাহ বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ে। বর্ষাকালে বেশি বৃষ্টি হলে এই তিনটি নদীতে প্লাবন সৃষ্টি হয়। বিপুল জলরাশির প্রতিক্রিয়ায় বন্যা দেখা দেয়। হিমালয়ের বরফ গলার কারণেও জলস্ফীতি ঘটলে তা বন্যার সৃষ্টি করে। বনাঞ্চল নিধন ও অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট নির্মাণের কারণেও বন্যা দেখা দেয়। তবে বাংলাদেশের বন্যার সবচেয়ে বড় কারণ নদীগুলোর পানি ধারণক্ষমতা কম। যার কারণে ভারতের পানি আসার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক প্লাবিত হয়। ভারতের সঙ্গে ৫৪টি নদীর সীমানা নিয়ে বাংলাদেশের সমস্যা দীর্ঘদিনের। ভারত শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা দেয় না বরং বর্ষা মৌসুমে বিপুল পরিমাণ পানি ছেড়ে দিয়ে পানিতে তলিয়ে দেয় সারা দেশকে। বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলো পানিতে তলিয়ে যায়। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের নদী সমস্যার সমাধান হলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। বাংলাদেশের মানুষ নদীভাঙন, অকাল বন্যা, খরার হাত থেকে রক্ষা পাবে। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে বন্যা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য নদী বিশেষজ্ঞ দ্বারা সুপরিকল্পিত উপায়ে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ভরাট নদীগুলো পুনঃখনন করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জলাধার, স্লুইসগেট, রেগুলেটর ব্যারেজ নির্মাণ করা হচ্ছে। বন্যার কবল থেকে বাঁচার জন্য আগাম সতর্কতা নেওয়া দরকার। সে জন্য সরকারিভাবে পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। দুর্গত মানুষের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠানোর আগাম ব্যবস্থা করতে পারলে সহজে বন্যা মোকাবিলা করা যাবে। বন্যা ও দুর্যোগপূর্ণ এলাকার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর সঠিক পরিচর্যা ও ব্যবহার করতে হবে। বন্যার পর কৃষকদের মাঝে যেন বিনামূল্যে বীজ-সার, কীটনাশক বিতরণ করা যায় সে ব্যবস্থা রাখতে হবে। সভ্যতার শুরু থেকে নানা দুর্যোগ মোকাবিলা করেই মানুষ এ পর্যন্ত এসেছে। চীনের দুঃখ হোয়াংহো নদীর বন্যাকেও নিয়ন্ত্রণ করেছে চীনের মানুষ। বাংলাদেশের মানুষও পারবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে। সুপরিকল্পিত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তারা যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় সফল হতে পারে। বন্যাকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেই এর সুফল ভোগ করা যাবে। বন্যা আসার যে অশনি সংকেত দেখা দিয়েছে তাকে গুরুত্ব দিতে হবে। সংশ্লিষ্টদের বন্যা মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..