৬২-এর শিক্ষা কারিকুলাম এবং বর্তমান প্রেক্ষিত

বিলকিস ঝর্ণা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একটা রাষ্ট্র যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, অবশ্যই সেই সিদ্ধান্তের পেছনে সুদূরপ্রসারী মঙ্গলের উদ্দেশ্য থাকে। নতুন কারিকুলাম বাতিলের দাবি চলছিলো শুরু থেকেই। চলছিলো নানাবিধ সমালোচনা। পিঠ বাঁচানোর জন্য এনসিটিবির প্রজ্ঞাপন জারি হলো। কিন্তু প্রয়োজন আইন জানে না। জানতে চায়ও না কখনও। পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে সচেতন মানুষ ঘুরে দাঁড়াবেই। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে, বিশেষ করে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। পরিবর্তনের মাধ্যমে নিরীক্ষণ চলছে কারিকুলাম, পাঠ্যপুস্তক আর পরীক্ষা পদ্ধতির। আর এই পরিবর্তন এতো ঘন ঘন হচ্ছে যে, মনে হচ্ছে যেনো বিজ্ঞ নীতি নির্ধারকগণ স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছেন না। এবং এই পুরো প্রক্রিয়ার সাথে যারা যুক্ত তারা আসলে কতেটা শিক্ষিত (যথাযথ) বা শিক্ষার সঙ্গে কতোটা সংশ্লিষ্ট বিষয়টা প্রশ্নবিদ্ধ। পড়াশোনা আনন্দময় পরিবেশে হওয়াই উচিৎ। কেননা একজন মানুষকে জীবনের প্রয়োজনেই দীর্ঘ সময় বাধ্যতামূলক একাডেমিক শিক্ষা পদ্ধতির মাঝে অবস্থান করতে হয়। সেই দীর্ঘ সময় পাড়ি দিতে তাকে পুরো ইচ্ছা অনিচ্ছার বিষয়কে বিসর্জন দিয়ে রাষ্ট্র কতৃক নির্ধারিত সিস্টেমের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। তাই প্রতিটা দেশের শিক্ষা কারিকুলাম অবশ্যই সেই দেশের অর্থনৈতিক, আবহাওয়া অন্যান্য পারিপার্শ্বিক সামাজিক প্রেক্ষাপট ইত্যাদি বিবেচনা প্রসূত হওয়া দরকার। পরীক্ষা পদ্ধতি তাদের পছন্দ হোক বা না হোক, যুগযুগ ধরে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হয়েই একাডেমিক শিক্ষার স্তর পার হচ্ছে। কিন্তু এবার পরীক্ষা ঝুঁকি কমাতে যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা পরীক্ষা সিস্টেম বহাল থাকার চেয়েও বেশি শ্বাসরুদ্ধকর বলে মনে করছেন অভিভাবকবৃন্দসহ অনেকেই। নতুন কারিকুলামে একটা ছাত্রকে প্রতিদিনের সমীক্ষায় থাকতে হবে। যা ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক সবাইকে স্কুল কার্যক্রমের জন্য এতটাই ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে যে, পরীক্ষার চেয়েও সেটা অনেক বেশি উদ্বেগের এবং ব্যয়বহুলও। শিক্ষা কারিকুলাম পরিবর্তন আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। রিটেনের পাশাপাশি এমসিকিউ। ডিভিশন থেকে গ্রেডিং। ইয়ার থেকে সেমিস্টার। সনাতনী থেকে সৃজনশীল। পরিবর্তনের এই অব্যাহত ধারায় ক্লান্ত শিক্ষার্থী। ক্লান্ত শিক্ষক এবং অভিভাবকগণও। ব্রিটিশ আমলেও কারিকুলাম পরিবর্তন হয় ৭টি। পাকিস্তান আমলে ৫টি এবং বাংলাদেশ আমলে গত ২০২২ সাল পর্যন্ত ৭টি। অর্থাৎ পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমল মিলে কারিকুলামে এযাবৎ ১২টি পরিবর্তন এসেছে। অথচ শিক্ষাব্যবস্থার বেসিক কোনো পরিবর্তন কি আদৌ সম্ভব হয়েছে? মূল বা বেসিক কোনো পরিবর্তন কোনো কালেই হয়নি। এবং দুঃখজনকভাবে এটাই সত্যি যে ১২টি পরিবর্তিত কারিকুলামের একটিরও সঠিক বাস্তবায়ন হয়নি বা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এবারের মতো অর্থাৎ ২০২৪ সালের মতোই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ, পরিমার্জন ও সংস্কার করার জন্যই ২০০৯ সালে প্রণীত হয়েছিলো কবির চৌধুরী শিক্ষা কমিশন। ২০০৯ সালের এই শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছিলো যে, প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত একটা লেভেল হবে। নবম থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত একটা লেভেল হবে। তারপর ইউনিভার্সিটি। আর প্রাইমারি শিক্ষা হবে বাধ্যতামূলক। অথচ এই সিস্টেমের খবর তেমন কেউ জানলোই না। যদিও প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বাকিটুকু বাস্তবায়ন তো দূরের কথা বরং অপ্রকাশিতই রয়ে গেলো সবটা। মাঝখানে সেই প্যাটার্নকে সামনে রেখে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হলো প্রাইমারি স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা। অতঃপর জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা। অর্থাৎ পিএসসি ও জেএসসি। নীতি নির্ধারকগণ এভাবেই ছাত্রছাত্রীগণকে ব্যবহার করে প্রণীত ব্যবস্থার নিরীক্ষণ করে যাবেন বারবার। এরকম একটা কারিকুলাম প্রণয়নের পূর্বে অবশ্যই ভেবে দেখা দরকার যে, এই পদ্ধতি বাস্তবায়নের জন্য দেশের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন সবার আগে। অবকাঠামোগত প্রসঙ্গ পূর্ণ হওয়ার পর অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানোর জন্য মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক দরকার। এবং নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে পাঠদানের জন্য উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষক প্রয়োজন। আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে রাতারাতি এতগুলো শিক্ষক নিয়োগ মোটেও সম্ভব নয়। কারিকুলাম কর্তৃপক্ষকে দেশের প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে আরও অনেক নিরীক্ষণ ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে তবে নতুন কোনো সুচিন্তিত পাঠ্যক্রমে হাত দেওয়া দরকার। নয়তো অঙ্কুরেই উন্নত কারিকুলাম বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাবে। কর্তৃপক্ষ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন না হওয়ায় অর্থনীতি এবং পরিস্থিতির সঙ্গে সমন্বয়হীন শিক্ষা কারিকুলাম মুখ থুবড়ে পড়ে প্রতিবার। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, চরাঞ্চল ও পাহাড়ি অঞ্চলের স্কুলগুলোর যথাযথ ভবন পর্যন্ত নেই। নেই প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক। এমন অবস্থায় একটা উন্নত ও অত্যাধুনিক শিক্ষা কারিকুলাম ছাত্রদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো যুক্তিসঙ্গত পরিকল্পনা তো নয়ই বরং গুটিকতক উঁচু শ্রেণির মানুষ এর ফল ভোগ করবে। যা ৬২ সালের শিক্ষা নীতিরই নামান্তর। অনেকেই ৬২ সালের শিক্ষাক্রমের প্রসঙ্গ তুলছেন। কিন্তু কেমন ছিলো ৬২’র নীতি? কী ছিলো সেই শিক্ষাক্রমে? আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসে ১৯৫৮ সালে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক এস এম শরিফকে চেয়ারম্যান করে একটি কমিশন গঠন করেন। এবং শরিফ খান কমিশনকে পাকিস্তানের শিক্ষানীতি সম্পর্কে একটি পরিকল্পনা প্রণয়নের দায়িত্ব প্রদান করেন। ১৯৫৯ সালের আগস্ট মাসে কমিশনের রিপোর্ট সরকারের নিকট হস্তান্তর করা হয়। এবং ১৯৬২ সালে তা প্রকাশিত হয়। কমিশনের রিপোর্টে ৬ষ্ঠ থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত ইংরেজি বাধ্যতামূলক করা হয়। অবৈতনিক শিক্ষার ধারাকে অবান্তর বলে ঘোষণা করা হয়। শরিফ কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সরকার ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের শিক্ষা বিষয়ক কতগুলো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। আর তা হচ্ছে ১) প্রতিটি স্কুলে ৬০ শতাংশ ব্যয় সংগৃহীত হবে ছাত্রদের বেতন থেকে। বাকি ২০ শতাংশ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নির্বাহ করবে। বিলোপ করা হয় অনার্স কোর্সে সময়গত পার্থক্য। শরিফ কমিশনের সুপারিশ ও সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সে সময় ছাত্ররা তথা সকল শ্রেণির মানুষ ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলেন। মূলতঃ ৬২’র শিক্ষানীতিও বাঁকা করতে চেয়েছিলো জাতীর মেরুদণ্ড। আর তাই শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর অজুহাতে জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসেই দু’মাসের মাথায়ই গঠন করে শরিফ খান কমিশন। বাড়িয়ে দেওয়া হয় স্কুল কলেজের ফি। যা সাধারণ আয়ের মানুষদের ক্ষমতার বাইরে। সীমিত করা হয় উচ্চশিক্ষার সুযোগ। ছাত্রদের কোর্সের বোঝা বাড়ে। ডিগ্রি কোর্সের মেয়াদ বাড়ে। যেন ছাত্ররা সহজে পড়াশোনা শেষ করে বেড়িয়ে আসতে না পারে। মূলতঃ সামরিক শাসন জারির পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থাকে সংকুচিত করতেই এই নীতির প্রবর্তন। এমনকি নিষিদ্ধ করা হয় ছাত্র রাজনীতিও। এই ব্যয়বহুল শিক্ষানীতি কেবলমাত্র একটা নির্দিষ্ট শ্রেণিকেই প্রতিনিধিত্ব করে। এবারেরও আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মেলানো শিক্ষাব্যবস্থা উচ্চ বিত্তকেই প্রতিনিধিত্ব করে। সাধারণের অবস্থা পূর্ববৎ। বরং শিক্ষা ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সাথে আরও বেড়ে যাচ্ছে বৈষম্য। করোনা-পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক যাতাকলে পিষ্ট। ইউক্রেন যুদ্ধের সরগরমে বেড়ে যাওয়া দ্রব্যমূল্য, অনিয়ন্ত্রিত মুদ্রাস্ফীতি নিম্নআয়ের মানুষের জীবনকে করে দিয়েছে আরও বেশি অসহনীয়। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে দিচ্ছে ধনি দরিদ্রের মধ্যকার সীমানা। শিক্ষার ব্যয়ভারে নুব্জ পিঠে তাদের আরও বেশি পিছু হঠার পথে না নিয়ে যাক এই আধুনিক শিক্ষা মান। মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে বন্দি অর্থনীতির চাকা। সকল উন্নয়ন কেবল পুঁজিবাদীদের স্বার্থকেই সমর্থন করে। শিক্ষানীতিও প্রস্তুত হয় তাদের স্বার্থেই। মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে বন্দি আজ অর্থনীতির চাকা। বর্তমান নতুন কারিকুলাম শিক্ষা কার্যক্রম দেশের সমস্ত অভিভাবকের জন্য এক ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন মহল ও মিডিয়ায় চলছিলো বিভিন্ন নেতিবাচক আলোচনা। বহু আগে থেকেই আমাদের গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ। কেননা অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসরমান মানুষদের ভাগ্য পরিবর্তনের উদ্দেশ্য কোনোকালে কোনো সরকারেরই ছিলো না। ছিলো না ত্রুটি সংশোধনের উদ্দেশ্যও। বরং পূর্বাবস্থার চেয়েও বেশি ত্রুটিপূর্ণ এবং অত্যন্ত নিম্নমানের শিক্ষা কারিকুলামের বোঝা আমাদের সন্তানদের ওপর নির্বিচারে বারবার চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। নিরুপায় ছাত্রছাত্রীরা সেই বোঝা মাথায় নিয়ে পার হচ্ছে শিশু থেকে তরুণ কাল অবধির অগ্নিপরীক্ষার পুলসিরাত। আর এরই ওপর ভিত্তি করে লাভবান হয়েছে নির্দিষ্ট মহল। প্রথমত, নতুন নতুন প্রজেক্ট কতটা ফলপ্রসূ সেই এক্সপেরিমেন্টের জন্য আমাদের সন্তানদের গিনিপিগের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বই ব্যবসায়ীরা এবং ব্যবসায়ীদের থেকে বিরাট অংকের কমিশনের লোভের শিকার আমাদের এই নতুন সম্ভাবনাময় জেনারেশন। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। কেননা উচ্চবিত্তের জন্য নির্ধারিত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ব্রিটিশ কাউন্সিল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। একটা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অথচ প্রতিনিয়ত একটা সিস্টেমে থিতু হতে না হতেই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে নতুন নতুন সিস্টেম, নতুন নতুন বই, নতুন নতুন পদ্ধতি। আমাদের দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা শিশু আর তরুণ। তাদের সাথে সম্পর্কযুক্ত অভিভাবকগণও। প্রতিনিয়ত চাপের মুখে তাদের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত। ম্যাক্সিমাম এই সংখ্যাকে চাপে রেখে মেধা বিকাশতো নয়ই বরং মেধাহীন এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ একটা জেনারেশনই হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ। ইতোমধ্যে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আর পরীক্ষা পদ্ধতিতে। তবে সেই ব্যবস্থায় যেনো রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে, ইতোপূর্বে প্রণয়নকৃত কারিকুলামের মতো যেনো মুখ থুবড়ে না পরে এবং সর্বক্ষেত্রে বাস্তবায়নযোগ্য হয়, সেদিকে দৃষ্টি রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কেননা একটা পরিকল্পনা গ্রহণ করা সহজ। কিন্তু সেটা যথাযথ বাস্তবায়ন না হলে কেবল মুষ্টিমেয় মানুষ সেটার ফলভোগ করবে। সাধারণের অবস্থা তথৈবচ। একটি শোষণমুক্ত বৈষম্যহীন রাষ্ট্র এবং সমাজ ব্যবস্থার জন্য পরিমার্জিত ও উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকা অনস্বীকার্য। লেখক : সাংস্কৃতিক কর্মী

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..