চাঁদাবাজি বন্ধে দরকার হকার আইন ও নীতিমালা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : সরকারি দল ও ক্ষমতাবানদের ছত্রছায়ায় থাকা একদল মানুষ যারা প্রতিদিনই রাস্তার নতুন নতুন জায়গা দখল করে ভাড়া দিচ্ছে। বসানো হচ্ছে হকার/অস্থায়ী দোকান। তোলা হচ্ছে ভাড়া। এসব দোকান থেকে বছরে ভাড়া (চাঁদা) উঠছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা, যার কানাকড়িও জমা পড়ছে না সরকারের কোষাগারে। কথিত নেতাদের নামে এই টাকা তুলছে লাইনম্যান হিসেবে নিযুক্ত কর্মীবাহিনী। চাঁদাবাজি বড় উৎস হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে কথিত অভিযানেও দখলমুক্ত হয়নি সড়ক ও ফুটপাত। কাজে আসেনি হকারদের পুনর্বাসনে হলিডে মার্কেট করার উদ্যোগও। এদিকে সড়কের পাশে দোকান বসায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বাড়ছে যানজট। ফুটপাত দিয়ে স্বস্তিতে হাঁটতে পারছেন না নগরবাসী। ২০১৬ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের “দ্য স্টেট অব সিটিজ ২০১৬ : ট্রাফিক কনজেশন ইন ঢাকা সিটি– গভর্নেন্স পারসপেক্টিভ” শিরোনামে এক গবেষণায় বলা হয়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে বছরে ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়, যা ছিল ওই সময়ে দুই সিটি করপোরেশনের মোট বাজেটের চেয়ে বেশি। প্রতিদিন চাঁদা আদায় হতো ৬০ কোটি টাকার বেশি। ওই গবেষণায় ঢাকায় তখন মোট হকারের সংখ্যা বলা হয় ৩ লাখেরও বেশি। আর প্রতি হকারের কাছ থেকে গড়ে প্রতিদিন চাঁদা আদায় হতো প্রায় ২০০ টাকা। আর বর্তমানে হকারদের বিভিন্ন সংগঠনের তথ্য বলছে, ঢাকা শহরে হকার আছে সাড়ে ৩ লাখ। এলাকা ও দোকানের আকারভেদে তাদের থেকে দৈনিক সর্বনিম্ন ৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা চাঁদা তোলা হয়। গড়ে প্রায় ৩০০ টাকা চাঁদা আদায় হয় প্রতিদিন একজন হকার থেকে। সেই হিসেবে প্রতিদিন হকারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় হয় ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা বছরে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮৩২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ঈদের আগের এক মাস এই রেট দ্বিগুণ হয়ে যায়। বিভিন্ন সূত্রমতে, ঈদ মৌসুমে শুধু নিউমার্কেটকেন্দ্রিক চাঁদা তোলা হয় দৈনিক ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা, গুলিস্তানকেন্দ্রিক কিছু এলাকা থেকে ১৮ লাখ, মতিঝিলকেন্দ্রিক ২০-২৫ লাখ, উত্তরা এলাকা থেকে ১০-১২ লাখ টাকা। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন খবর থেকে জানা যায়, সম্প্রতি রাজধানীর একটি এলাকায় খাবারের দোকান দিয়েছেন এক তরুণ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, আমার কথা পত্রিকায় লিখলে কাল থেকে আর দোকান দিতে পারব না। দোকানটি দিতে এককালীন ১৫ হাজার টাকা দিয়েছি। প্রতিদিন ১৫০ টাকা দিতে হয় বিদ্যুতের জন্য ও ১০০ টাকা দিতে হয় রাস্তার ভাড়া। দুজন এসে এ টাকা নিয়ে যান। ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও পুলিশের কথা বলে তারা টাকা তোলেন। এদিকে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের ভিতরের সড়কে ডাব ও শরবত বিক্রেতা দুজন জানান, তাদের দৈনিক ১০০ টাকা করে ভাড়া দিতে হয়। এছাড়াও শুধু দৈনিক চাঁদা নয় দিতে হয় মাসিক ভাড়া ও এককালীন অর্থ। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ ও জিপিওর মাঝের সড়কে বসা দোকানদাররা জানান, সেখানে বসতে দোকানের আকার ও অবস্থান অনুযায়ী এককালীন দিতে হয় ২ থেকে ৩ লাখ টাকা। প্রতি মাসে ভাড়া দিতে হয় ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা। দৈনিক চাঁদা দিতে হয় ১৫০ টাকা, যার ১০০ টাকা পুলিশ ও রাজনৈতিক দলের চাঁদা, ৩০ টাকা বিদ্যুৎ বিল ও ২০ টাকা দারোয়ানের খরচ। কাদের টাকা দেন এমন প্রশ্নে এক ব্যবসায়ী বলেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির লোকজনদের হটিয়ে সরকার দলের ১৪/১৫ জন এই সড়কের বিভিন্ন স্থান দখলে নেন। তাদের একজনের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকায় জায়গাটি নিয়েছেন। মাসে ভাড়া দেন ১৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া দিনে দিতে হয় আরও ১৫০ টাকা। সরকার বদল হলে অন্য কেউ দখল নেবে। এভাবে চলে। এদিকে সড়ক ও ফুটপাত হকারমুক্ত করতে দুই সিটির মেয়র একাধিকবার ঘোষণা দিলেও তাতে কাজ হয়নি। বিভিন্ন সময় উচ্ছেদ অভিযান চললেও উল্টো সড়কে হকার বাড়ছে। এসবের পেছনে চাঁদাবাজিকেই দায়ি করছেন খোদ হকাররা। বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার হায়াৎ সাপ্তাহিক একতাকে বলেন, হকাররা ভাড়া দিচ্ছে, চাঁদাও দিচ্ছে। কিন্তু সরকার কিছুই পাচ্ছে না। এ জন্য আমরা অসংখ্যবার দুই সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে একটা হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা চাইছি। বিশ্বের ৩৭টি দেশে এমন নীতিমালার মাধ্যমে ফুটপাতে হকার বসে। নীতিমালার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে ঠিক করে দিক কোন এলাকায় কখন হকার বসবে এবং কোন এলাকায় বসবে না। তাহলে যত্রতত্র হকারের কারণে মানুষের ভোগান্তিও হবে না। গরিব হকারগুলোও বাঁচতে পারবে। সরকারও রাজস্ব পাবে। কিন্তু সিটি করপোরেশন সেই লাইনে যাবে না। কারণ, তাদের লোকজনও টাকার ভাগ পায়। নীতিমালা করে বৈধতা দিলে হকাররাই রাস্তাঘাট পরিষ্কার করে রাখত। মূলত হকারদের বৈধতা কেউই চায় না। কারণ, অবৈধ হকার থাকলে পুলিশের গাড়ির ড্রাইভারও চা-পান খেয়ে টাকা না দিয়ে চলে যেতে পারেন। এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটির (ডিএসসিসি) ভারপ্রাপ্ত প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, হকার উচ্ছেদ কার্যক্রম ডিএসসিসির একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রায় প্রতিদিনই উচ্ছেদ করা হয়। একই সঙ্গে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আর্থিক দন্ড ও কারাগারে পাঠানো হয়। ফুটপাতের শৃঙ্খলা নিয়ে একটি কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটি গুরুত্ব বিবেচনায় ফুটপাতগুলো সবুজ, হলুদ ও লাল চিহ্নিত করেছে। স্থায়ীভাবে কীভাবে হকারমুক্ত করা যায়, তা নিয়েও কাজ করছে কমিটি। কর্মসংস্থানের অভাবে প্রতিদিন হতাশায় মানসিকরোগে আক্রান্ত হচ্ছে হাজারো মানুষ। সরকারের পক্ষ থেকে দেশবাসীর প্রতি উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান জানানো হলেও উদ্যোক্তা হতে গেলে যে পুঁজির দরকার হয়, সে বিষয়ে কিছু বলা হয় না। এ-শহরে কয়েক লাখ পরিবার ফুটপাতে দোকানদারী করে জীবিকা নির্বাহ করে। অবিলম্বে একটি মানসম্মত হকার্স নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে হকারদের সুরক্ষা ও চাঁদাবাজী বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..