টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি : বাংলাদেশের ঘুমের ঘোরে ভারতের চৌর্যবৃত্তি

রুহুল আমিন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
সম্প্রতি বাংলাদেশ ও ভারতের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ী। আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের নারীদের পছন্দের শীর্ষে অবস্থানরত টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ীকে নিজেদের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ভারত সরকার। এ যটনায় ক্ষোভে ফেঁটে পড়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয়েছে তুমুল বির্তক, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, তাঁতশিল্পী থেকে সাধারণ মানুষ এ যটনায় ভারত সরকারের কুম্ভিলকবৃত্তির দায় যেমন দেখছে, তেমনি বাংলাদেশ সরকারের উদাসীনতা ও ব্যর্থতাকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন। তাঁতশিল্প এদেশের এক চিরায়ত ঐতিহ্যের নাম। সেই ঐতিহ্যের ভেতরেও আছে ক্ষয় হয়ে যাওয়া বা ক্ষয়িষ্ণু আরও ঐতিহ্য জামদানি, মসলিন, টাঙ্গাইল শাড়ি ইত্যাদি। কত হাজার তাঁত বন্ধ হয়ে যায়, কত লাখ তাঁতশ্রমিক বেকার হয়ে যান, কত তাঁতি নিজের পূর্বপুরুষের ভিটা ফেলে ভারতে পাড়ি জমান, সেখানে নতুন করে সাজায় তাঁতঘর, সে হিসেব কে রাখে! এভাবেই আক্ষেপ করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ। সম্প্রতি বাংলাদেশের বিখ্যাত টাঙ্গাইল শাড়িকে নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়। ভারতের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে বলে, ‘টাঙ্গাইল শাড়ি পশ্চিমবঙ্গ থেকে উদ্ভূত। এটি ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা মাস্টারপিস। এর মিহি গঠন, বৈচিত্র্যময় রং এবং সূক্ষ্ম জামদানি মোটিফের জন্য বিখ্যাত। এটি এ অঞ্চলের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক।’ স্বাভাবিকভাবেই ভারতের এ ঘোষণায় বাংলাদেশের মানুষের ক্ষুব্ধ হওয়ার কথা। বাংলাদেশের হাজারো মানুষ ভারতের মন্ত্রণালয়টির ফেসবুক পোস্টের নিচে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সেই প্রতিবাদে বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতের প্রভাব, সীমান্ত হত্যাসহ আরও অনেক বিষয় মিলেমিশে একাকার। সবার একটিই প্রশ্ন, টাঙ্গাইল শাড়ি কীভাবে ভারতের হয়? এ দাবি ভারত করতে পারে কি না? টাঙ্গাইল শাড়ির সঙ্গেই এর নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা ভৌগোলিক অবস্থান যুক্ত। মানে এটি এমন একটি শাড়ি, যার উৎপত্তিই হচ্ছে টাঙ্গাইলে। আর এই টাঙ্গাইল হচ্ছে বাংলাদেশের একটি জেলা। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের সভাপতি চন্দ্র শেখর সাহা বলেন, টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই স্বত্বের দাবি কোনোভাবেই ভারত করতে পারে না। কারণ, ভৌগোলিকভাবে টাঙ্গাইল কোনোকালেই পশ্চিমবঙ্গের ছিল না। তারা অন্য নামে তাদের শাড়ির জিআই স্বীকৃতি দিতে পারে, কিন্তু সেটির সঙ্গে টাঙ্গাইল নাম থাকলে কোনোভাবে যৌক্তিক হবে না। জিআই পণ্য আসলে কি বা কিসের ভিত্তিতে এটি নির্ধারিত হয়? কোনো একটি দেশের নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মাটি, পানি, আবহাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সেখানকার জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি যদি কোনো একটি পণ্য উৎপাদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাহলে সেটিকে সেই দেশের জিআই (জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। দেশে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন পাস হয় ২০১৩ সালে। ২০১৫ সালে আইনের বিধিমালা তৈরির পর জিআই পণ্যের স্বীকৃতি দিয়ে আসছে ডিজাইন, পেটেন্ট ও ট্রেড মার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি)। ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউআইপিও) নিয়ম মেনে পণ্যের স্বীকৃতি ও সনদ দিয়ে থাকে সরকারের এ বিভাগটি। এখন পর্যন্ত দেশে জামদানি, ইলিশ, রাজশাহীর সিল্ক, বগুড়ার দই, বাগদা চিংড়ি, কালিজিরা চালসহ ২১টি পণ্য জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে। কোনো একটি পণ্য চেনার জন্য জিআই স্বীকৃতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জিআই স্বীকৃতি পাওয়া পণ্যগুলো অন্য দেশের সমজাতীয় পণ্য থেকে আলাদাভাবে চেনা যায়। এর ফলে ওই পণ্যের আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। ডিপিডিটি কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় জিআই পণ্য এগিয়ে থাকে। ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত এর বাড়তি দাম পাওয়া যায়। তাদের ব্যবসায়ীরা বলেছেন, জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর পণ্যগুলোর রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, সরকারের কর্তাব্যক্তিরা সব জেনেও কেন টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পকে স্বীকৃতি দিলেন না? যদিও ভারত সরকারের বিতর্কিত স্বীকৃতির পর, জনগণের চাপের মুখে বাংলাদেশ সরকার তা নিয়ে তোড়জোড় শুরু করেছে বলে প্রতিয়মান হচ্ছে। টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই স্বীকৃতি দিতে আনুষ্ঠানিকতা চলছে। সম্প্রতি (৭ ফেব্রুয়ারি) টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসন থেকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাঠানো হয় পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদফতরে। এরপরই সর্বসাধারণের মতামত চাওয়া হয়। অধিদফতরের পরিচালক আলেয়া খাতুন জানিয়েছেন, স্বীকৃতি সংক্রান্ত একটি প্রাথমিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এ বিষয়ে ২ মাসের মধ্যে মতামত দেয়া যাবে। এসব মতামত পর্যালোচনা করে স্বীকৃতি প্রদানের চূড়ান্ত ঘোষণা আসবে। বাংলাদেশের সচেতন জনগোষ্ঠী মনে করেন, ভারতের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের প্রতিফলন এই স্বীকৃতি। একই সাথে বাংলাদেশের চলমান প্রশাসনিক কাঠামোর অবহেলা, জবাবদীহীতার অভাব ও গণতন্ত্রহীন লেজুড়বৃত্তিক মানসিকতাই এর জন্য দায়ী। উল্লেখ্য, প্রাচীন আমল থেকে এ দেশের কৃষির পর গ্রামীণ অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ভিত ছিল তাঁতশিল্প। বিশ্ববিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা তার ভ্রমণবৃত্তান্ত রিহলাতে বাংলার তাঁতবস্ত্রের কথা উল্লেখ করেন। ইবনে বতুতার ভ্রমণবৃত্তান্ত জানা যায়, সেই সময় সুতি কাপড় ছিল বাংলার অন্যতম রপ্তানি পণ্য। সোনারগাঁ থেকে দিল্লির সুলতানের দূত হিসেবে চীন যাওয়ার পথে ইবনে বতুতা কিছু মুসলিম অধিবাসীর দেখা পান, যাঁরা বাংলা অঞ্চল থেকে উন্নত সুতিবস্ত্র এনে নানা জায়গায় বিক্রি করেন। ইবনে বতুতার এ ভ্রমণবৃত্তান্ত ছিল ১৪ শতকের। এ থেকে ধারণা করা যায়, এ অঞ্চলের তাঁতের বয়স কত প্রাচীন। বাংলার এ নিজস্ব পোশাক তৈরির ঐতিহ্যের রক্ষাকবচে প্রথম আঘাত আসে ব্রিটিশ আমলে। সে সময় ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাশায়ারের মেশিনে তৈরি কাপড়ের প্রসার ঘটে এ অঞ্চলে। তবে ১৯০৬ সালে স্বদেশি আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশদের মেশিনে তৈরি কাপড় বর্জনের ডাক দিলে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলার তাঁতবস্ত্র। সে সময়টাতে পুরান ঢাকাসহ সোনারগাঁ ও আশপাশের অঞ্চল থেকে তাঁতশিল্পের প্রসার ঘটে টাঙ্গাইলসহ আরও অনেক জায়গায়। টাঙ্গাইলের মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন গবেষকের ‘স্ট্যাটাস অব হ্যান্ডলুম ওয়ার্কার্স অ্যান্ড কজেস অব দেয়ার মাইগ্রেশন: আ স্টাডি ইন হ্যান্ডলুম ইন্ডাস্ট্রি অব টাঙ্গাইল ডিস্ট্রিক্ট, বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গবেষণাপত্রে টাঙ্গাইলে তাঁতের প্রসার সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে। তবে সুব্রত ব্যানার্জি, মো. মনিরুজ্জামান মুজিব ও সুমনা শারমীনের এ যৌথ গবেষণাটি মূলত টাঙ্গাইলের তাঁতিদের ভারতে অভিবাসী হওয়া নিয়ে একটি মাঠ পর্যালোচনা। এদেশের তাঁতশিল্পীরা কেন অভিবাসী হলেন, সে বিষয় নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা ও আত্মসমালোচনা হওয়া দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। একইসাথে টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পের মতোই দেশের বাকি যেসব ঐতিহ্যবাহী পণ্য এখনও যথাযত স্বীকৃতি না পেয়ে হারিয়ে যেতে বসেছে, সেগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে দেশের প্রকৃত সম্পদে রুপান্তরিত করা জরুরি বলে মনে করেন তারা।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..