পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম অধিকার নীতি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বিশেষ প্রতিবেদক : যুক্তরাষ্ট্রের পোশাকের বাজারে বাংলাদেশ এখন ৩য় বৃহত্তম সরবরাহকারী দেশ। দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ এখন প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলারের দাম ১১০ টাকা হিসাবে)। বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের স্থিতি ২ হাজার ২৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫০ কোটি ডলার। এদিকে নিম্নতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছিলো পোশাক শ্রমিকরা। ইতিমধ্যে ৪ জন শ্রমিক শহীদ হওয়ার মধ্যদিয়ে আগের চেয়ে সাড়ে ৪ হাজার টাকা বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নিম্নতম মজুরি বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে সরকার ও মালিকপক্ষ। শ্রমিকরা সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। সংসদ নির্বাচন কেন্দ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় স্থিমিত হয়ে আসছে বলে দাবি আন্দোলনকারীদের। এ অবস্থায় বিশ্বজুড়ে শ্রম অধিকার নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নীতি দুশ্চিন্তায় ফেলেছে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের। বিশেষ করে পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা উদ্বেগ জানিয়ে বলেছেন, কোনো কারণে শ্রম অধিকার ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নতুন নীতিটি বাংলাদেশের ওপর কার্যকর করলে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এ দেশের রপ্তানি খাতে। তাই এ বিষয়ে বাংলাদেশের করণীয়গুলো কেমন হবে, তা জানতে কূটনৈতিকভাবে আলোচনার তাগিদ দিয়েছেন তারা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন শ্রমিকদের ক্ষমতায়ন, শ্রম অধিকার ও শ্রমিকদের মানসম্মত জীবন যাপন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি স্মারকে (প্রেসিডেনশিয়াল মেমোরেন্ডাম) সই করেছেন। সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন বলেছেন, বিভিন্ন দেশের সরকার, শ্রমিক, শ্রমিক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন, সুশীল সমাজ ও বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, যাঁরা শ্রমিকদের অধিকারের বিরুদ্ধে যাবেন, শ্রমিকদের হুমকি দেবেন, ভয় দেখাবেন, তাঁদের ওপর প্রয়োজনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। বাংলাদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের পোশাকের বাজারে তৃতীয় বড় সরবরাহকারী দেশ। গত বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ডগুলো যদি পোশাক আমদানির পেছনে ১০০ ডলার ব্যয় করে, তবে তার ১০ ডলারের মতো খরচ করেছে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানিতে। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের উত্থানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের কোটার বড় অবদান ছিল। বাজার নিশ্চিত এটা জেনেই একসময় শিল্পমালিকেরা উৎপাদনে যেতে পারতেন। আর কোটা উঠে গেলেও এই শিল্প পরে নিজের সক্ষমতায় দাঁড়িয়ে যায়। স্বাধীনতার পর মূলত উন্নয়ন সহযোগিতার সম্পর্ক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের। বাণিজ্য, বিনিয়োগ থেকে শুরু করে প্রবাসী আয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখন গভীর। দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ এখন প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলারের দাম ১১০ টাকা হিসাবে)। ২০২১ সালে বাংলাদেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম বাণিজ্যিক অংশীদার। বাংলাদেশের রপ্তানির সবচেয়ে বড় একক বাজার যুক্তরাষ্ট্র। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মোট ৫ হাজার ২০৮ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল, যার মধ্যে ১ হাজার ৪২ কোটি ডলারের পণ্য গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। পরের বছর অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে মোট ৯৭০ কোটি ডলারের পণ্য। গত অর্থবছরে রপ্তানি কিছুটা কমলেও দেশটি এখনো বাংলাদেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য। পোশাকশিল্পের মালিকেরা অবশ্য মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বাড়ানোর বড় সম্ভাবনা থাকলেও সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে রপ্তানি হোঁচট খেতে পারে। কোভিড মহামারির শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি এখন অনেকটাই পাল্টে গেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই বাজারে বাংলাদেশ ভালো করতে পারছে না। ২০২২ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২১৭ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হলেও পরের প্রান্তিকে (চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ) তা নেমে আসে ১৮৫ কোটি ৫০ লাখ ডলারে। এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল তৈরি পোশাকের রপ্তানি কমে যাওয়া। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে সাড়ে ৩ শতাংশ। গত জুলাই-অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে ২৫৮ কোটি ডলারের পোশাক। বাংলাদেশের জন্য সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআইয়ের প্রধান উৎস, এখনো যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত প্রাপ্ত হিসাবে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের স্থিতি ২ হাজার ২৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫০ কোটি ডলার। প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখন দ্বিতীয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে ২ হাজার ১০৩ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় আসে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৫৪ কোটি ডলারের জোগানদাতা ছিলেন সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসীরা। তারপরের স্থানটিই যুক্তরাষ্ট্রের, সেখান থেকে আসে ৩৪৪ কোটি ডলার। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরেও এ ধারা অব্যাহত ছিল। একপর্যায়ে সৌদি আরবকে পেছনে ফেললেও বছর শেষে দ্বিতীয় অবস্থানেই ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই বছরে সৌদি আরব থেকে আসে ৩৭৭ কোটি ডলারের প্রবাসী আয়, বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে ৩৫২ কোটি ডলার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে মোট ৯৭০ কোটি মার্কিন ডলারের বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি হয়েছে। যার মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮৫১ কোটি ডলার। পোশাক খাতে আয় বাড়ছে একইসাথে বাড়ছে আশঙ্কাও। পোশাকশিল্প অনেকাংশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নির্ভরশীল থাকার কারণে তাদের শ্রম অধিকার নীতি এ খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মালিকপক্ষ ও সরকারের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে শ্রমিকরা আন্দোলন চালিয়ে গেলে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন। এর আগে রানা প্লাজা ধস ও তাজরিন গার্মেন্টসে আগুন লাগার ঘটনার পরেও পোশাক শিল্পের শ্রম অধিকার ও পরিবেশ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। শ্রমিকদের হাহাকার ও যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি বিবেচনায় নিয়ে অবিলম্বে মানসম্মত নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করা হোক, এটাই সবার প্রত্যাশা।
শেষের পাতা
সরকার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কর্মসংস্থান উচ্ছেদ শুরু করেছে
ভোটাধিকার হরণ করে সরকার কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েম করছে
ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে
আশুগঞ্জ সেচ প্রকল্পে পানি সরবরাহের দাবি
গাইবান্ধায় আবারও বাম জোটের পথসভায় পুলিশের বাঁধা
চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী ও মদদদাতা পুলিশের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধের ঘোষণা
সারাদেশে সিপিবির শাখা সম্মেলন চলমান
কমরেড দুলাল কুন্ডু সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন দেখতেন
ধর্ষণের সাথে জড়িতদের বিচারের দাবি
নিত্যপণ্যের দাম কমানোর দাবি ক্ষেতমজুরদের
আইনজীবীদের সমস্যা সমাধানে আন্দোলন গড়তে হবে
৭ দিনের সংবাদ...

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..