অন্য এক সুচিত্রা মিত্র

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা নারী ডেস্ক : সুচিত্রা মিত্রকে চিনি আমরা প্রখ্যাত রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী হিসাবে। কিন্তু তার সংগ্রামী রাজনৈতিক চরিত্রটি আমাদের অজানা। সেই অজানা পরিচয়টি উঠে এসেছে এই লেখায়। একেবারে শৈশব থেকেই রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে সুচিত্রার পরিচয়। কলকাতার বেথুন কলেজিয়েট স্কুলে তিনি লেখাপড়া করেছেন। স্কুল বসার আগে প্রার্থনা সঙ্গীতের মতো করে গাওয়া হতো রবীন্দ্রনাথের গান। এখানে পড়ার সময় গানের চর্চা শুরু হয় দুই শিক্ষক অমিতা সেন এবং অনাদিকুমার দস্তিদারের কাছে। খুব অল্প বয়সে তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখতে শুরু করেন। বাবা ছিলেন রবীন্দ্র সঙ্গীতের বিশেষ অনুরাগী। বাড়িতে সঙ্গীতের নিবিড় আবহ ছিল। মাত্র ১৫ বছর বয়সে সুচিত্রা বাবা, মা, দাদা, দিদি’দের সঙ্গে নিজেদের পারিবারিক সংগঠনে অভিনয় করেছিলেন ‘চিত্রাঙ্গদা’। এটা ১৯৩৭ সালের কথা। মিত্র ইনসটিটিউশনের ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্যেও চিত্রাঙ্গদার নাচ ও গান দুটিই করেছিলেন সুচিত্রা। বড়দি ছিলেন পরিচালনায়, মেজদি ছিলেন অর্জুনের ভূমিকায় আর অর্জুনের গান গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। হেমন্ত তখন মিত্র ইনস্টিটিউশনের ছাত্র এবং মিত্র বাড়ির পারিবারিক বন্ধু। ঠিক সেই সময়েই বিশ্ব রাজনীতিতে এক অন্ধকার সময় ঘনিয়ে আসছিল। নাৎসী জার্মানির যুদ্ধ হুঙ্কারে পৃথিবী কাঁপতে আরম্ভ করেছে। ১৯৩৬-র মাঝামাঝি সময়ে স্পেনে ফ্যাসিস্ট অভ্যুত্থান শুরু হয়, প্রজাতান্ত্রিক স্পেন বিপন্ন হয়ে পড়ে। এদিকে নাৎসী পরাক্রমের প্রতিরোধে নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে তার বাংলা শাখাও গঠিত হয়। এই সময় লেখক শিল্পীরা ফ্যাসীবাদের বিরুদ্ধে পথে নামেন মূলত রবীন্দ্রনাথের দেশাত্মবোধক ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয়তাবাদী গান কন্ঠে নিয়ে। প্রকৃতপক্ষে এই আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের গানের কোন বিকল্প ছিল না। ‘এখন আর দেরী নয়’, ‘একসূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন’, ‘ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবে’, ‘রইল বলে রাখলে কারে’, ‘আমার সোনার বাংলা’, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ’, ‘সার্থক জনম আমার’ ইত্যাদি গানগুলি তখন প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। এসব শুনতে শুনতে এবং গাইতে গাইতে সুচিত্রার বড় হয়ে ওঠা। তখন তিনি ক্লাস এইট কি নাইনের ছাত্রী। ১৯৪১ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ক্লাস টেন-এ পড়ার সময় সুচিত্রা শান্তিনিকেতনের সঙ্গীত ভবন থেকে বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৪২-এ ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার মায়া পরিত্যাগ করে তিনি ১৯৪১-র আগষ্টের শেষ দিকেই শান্তিনিকেতনে চলে যান। তার মাত্র ২০ দিন আগে রবীন্দ্রনাথ প্রয়াত হয়েছিলেন। ১৯৪৩-এ শান্তিনিকেতনে পড়ার সময় প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাশ করেন। ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হিসাবে প্রাইভেটে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেন। একই বছর রবীন্দ্র সঙ্গীতে ডিপ্লোমা লাভ করেন৷ এরপর স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন। এখান থেকেই অর্থনীতিতে সম্মান-সহ বিএ পাস করেন। ১৯৪৫ সালে সুচিত্রা কলকাতায় ফিরে আসেন। তাঁর নিজের কথায়, “১৯৪৬ সালে ‘ইপটা’ বা I.P.T.A-র সঙ্গে যোগসূত্র, ঘনিষ্ঠ হলাম। দুই দিদি ছিল সক্রিয় কর্মী। তাদেরই সূত্রে পরিচয়টা সহজ হয়ে গেল। ছোটবেলায় বাবার দৌলতে বহু গুণীজনকে কাছ থেকে দেখেছি, তাঁদের সংস্পর্শে এসেছি। এখন দিদিদের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে বিষ্ণু দে, সমর সেন, বুদ্ধদেব বসু, প্রতিভা বসু, অজিত দত্ত, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ বিশাল ব্যক্তিত্বের কাছে আসবার সুযোগ মিলল। প্রায় প্রতি সন্ধ্যায়ই যেতাম ৪৬ ধর্মতলা ষ্ট্রীটের চার তলায়। সেখানে নিয়মিত বসত হয় সাহিত্য বৈঠক, নতুন লেখা পড়া, কবিতা পাঠ, নয়তো তরুণ শিল্পীদের আঁকা চিত্র প্রদর্শনী আর নয়তো গানের আসর। এই সূত্রেই মেলামেশা হয়েছে বটুকদা-জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, জর্জ-দেবব্রত বিশ্বাস, বিনয় রায়, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী, হেমন্ত, নির্মলেন্দু চৌধুরী, বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র (তখন ভাদুড়ী) প্রমুখ আরও অনেকের সঙ্গে। ভাবের আদান-প্রদান ঘটেছে, শিখেছি অনেক কিছু, হয়তো বা শিখিয়েছিও। সবচেয়ে বড় কথা যা, তা হল সামাজিক সচেতনতা, দায়িত্ববোধ অর্জিত হয়েছে”। ১৯৪৬-র আগস্টে রক্তাক্ত ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গায় কলুষিত হল কলকাতা। শিল্পী সাহিত্যিকরা বেরিয়ে এলেন রাজপথে দাঙ্গার বিরুদ্ধে মিলনের ডাক নিয়ে। সেই সংকটের সন্ধিক্ষণের বর্ণনা রেখে গেছেন ঐ মিছিলের এক প্রধান সংগঠক চিন্মোহন সেহানবীশ। তাঁর ভাষায়, ‘মনে পড়ে দাঙ্গার বিরুদ্ধে লেখক ও শিল্পীদের সেই অপূর্ব অভিযান। রাস্তার মোড়ে মোড়ে যখন সে মিছিল পৌঁছাচ্ছিল, নিমেষের মধ্যে মিছিলের গাড়িগুলিকে ঘিরে ফেলছিল হাজার হাজার শব্দাতুর মানুষ। তাদের মুখের দিকে চেয়ে ট্রাকের উপর দাঁড়িয়ে সুচিত্রা মিত্র গান ধরলেন “সার্থক জনম আমার”। সুচিত্রা বাংলাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ শিল্পী আর তাঁর কন্ঠের ঐ গান যে কি, যাঁরা শুনেছেন তারাই জানেন। তবু মনে হয়, দাঙ্গাবিধ্বস্ত কলকাতার শ্রীহীন রাস্তায় সেদিন তিনি মনপ্রাণ ঢেলে যে গান গেয়েছিলেন, তার যেন তুলনা নেই”। গৌতম চট্টোপাধ্যায় লিখছেন, ‘১৯৪৭এর শেষে পশ্চিমবঙ্গে জারী হল বিনাবিচারে আটকের কালাকানুন। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর হলেন এ রাজ্যের মানুষ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘লৌহমানব’ সর্দার প্যাটেল কলকাতায় এলেন সমাবেশে বলতে, আন্দোলন দমন করতে। সেদিনই আকাশবাণীতে গান গাইবার কথা সুচিত্রার। নি:শঙ্ক চিত্তে তিনি গান ধরলেন ‘ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবে ততই বাঁধন টুটবে’। কর্তৃপক্ষ সুচিত্রার কন্ঠরোধ করলেন বেতার-কর্মসূচীতে বহুদিন, কিন্তু মাথা নত করলেন না তিনি’। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয় দক্ষিণপূর্ব এশীয় যুব সম্মেলন। তার শেষ দিনে ডিক্সন লেন’এ এক ঘরোয়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সশস্ত্র দুষ্কৃতিকারীরা অতিথিদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তাঁদের প্রাণ রক্ষা পায়, কিন্তু তাঁদের বাঁচাতে গিয়ে শহীদ হন দুই সংস্কৃতিকর্মী-ভবমাধব ঘোষ ও সুশীল সেন। দক্ষিণ কলকাতার এক প্রতিবাদ সমাবেশে আক্রমণের বিপদ আছে জেনেও খোলা মাঠে টেবিলের উপর দাঁড়িয়ে সুচিত্রা আবার গাইলেন রবীন্দ্রনাথের সেই গান ‘সার্থক জনম আমার’। গৌতম চট্টোপাধ্যায় লিখছেন ‘১৯৫১তে বার্লিনে বিশ্বের যৌবনের মহোৎসব হল শান্তি ও মৈত্রীর আদর্শ নিয়ে। দেশে তখন প্রবল দমননীতি, বেশিরভাগ ছাত্র-যুব নেতা হয় কারারুদ্ধ নয় ফেরারী। তাদের সকলের প্রতিনিধি হয়ে বিশ্ব যুব উৎসবে গেলেন সুচিত্রা। গানে গানে ভরিয়ে দিলেন উৎসব, জয় করলেন পৃথিবীর যৌবনের মন। সমাজতন্ত্রের জগতে রবীন্দ্রনাথের গান তার আগে এমন করে কেউ পৌঁছে দিয়েছেন বলে আমার তো মনে পড়ে না’। ১৯৬৪ সালে কলকাতায় হঠাৎ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধল। তার বিরুদ্ধে সংগঠিত হল শান্তি মিছিল-তার সামনের সারিতে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন সুচিত্রা-গাইছিলেন ‘এক সূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন’। সর্বশেষ ১৯৯০এর দশকে ছোট্ট দেশ নিকারাগুয়ার সমর্থনে টাকা তোলা হচ্ছে। এমনই এক অনুষ্ঠানে দু’টি গান গাইবার কথা সুচিত্রার। শরীর একদম ভালো নেই। কিন্তু নিকারাগুয়ার বীর কিশোর কিশোরীদের কথা শুনে একে একে দশটি গান গেয়ে তবে থামলেন। শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ। শরীর অসুস্থ, কিন্তু নিকারাগুয়ার মুক্তিসংগ্রামের তো তর সইবে না। এমনই ছিলেন সুচিত্রা-সারা পৃথিবীর মুক্তি সংগ্রামের সাথী। গণনাট্য সংঘের বেশ কয়েকটি রেকর্ডে কন্ঠদান করেছেন সুচিত্রা। বিশেষ বিশেষ ভাবে সেগুলি স্মরণীয় হয়ে আছে। ১৯৫০ সালে সলিল চৌধুরী রবীন্দ্রনাথের ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’র বৃহত্তর বিস্তৃতি হিসাবে সৃষ্টি করলেন ‘সেই মেয়ে’। রবীন্দ্রনাথের গানের আদলের চরিত্র কিছুটা গ্রহণ করে অসামান্য দক্ষতায় একটি বলিষ্ঠ গণসঙ্গীত হিসাবে জন্ম নিল গানটি। কিন্তু গাইবেন কে। বলাই বাহুল্য এমন বলিষ্ঠ কন্ঠের অধিকারী মহিলা শিল্পী তখন একমাত্র সুচিত্রা। এইভাবেই সলিল সুচিত্রার মণিকাঞ্চনযোগে সৃষ্টি হয়েছিল কালজয়ী এই গান। গান বুকে নিয়ে আজীবন সংগ্রামী সুচিত্রা মিত্রকে তাঁর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে প্রশ্ন করলে বলতেন,“একটা আদর্শ একটা বিশ্বাসের জন্য অল্প বয়সে সক্রিয় রাজনীতি করেছি ঠিকই কিন্তু গান ছাড়িনি - মিছিল, টিয়ার গ্যাস, লাঠি চার্জ ইত্যাদি সবের মধ্য দিয়েই গিয়েছি। গণনাট্য সংঘের সক্রিয় কর্মী ছিলাম, কলেজ সেল মিটিং-এ বক্তৃতাও দিয়েছি, ঘাড়ে ঝান্ডা নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটেছি, হাতে মেমোরেন্ডাম নিয়ে যথাযথ জায়গায় পৌঁছে দিয়েছি। এক কথায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি ঠিকই। কিন্তু তাকে রাজনৈতিক জীবন আখ্যা দিলে যাঁরা সত্যিকারের রাজনীতি করেছেন, এর জন্য জীবন দিয়েছেন, তাদের অসম্মান করা হয়।...তবে একথা আজ জীবনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পথ অতিক্রম করে এসে বলতে পারি - প্রথম জীবনে যেটুকু রাজনীতি করেছি তার ফলেই বোধহয় যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি, অহরহ যুদ্ধ করছি, নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ফেলেছি তা সেই জীবনের প্রথম অধ্যায়েরই আদর্শ এবং বিশ্বাসের জোরে”। তাঁর এই আত্ম উপলদ্ধির মধ্য থেকেই বুঝতে পারা যায় গান প্রকাশের মধ্যে এত বলিষ্ঠতা তিনি কোথায় পেতেন। গণনাট্য সংঘের দিনগুলিতে তিনি অন্যান্যদের সঙ্গে মিলে মাঠে প্রান্তরে শহরে গণসঙ্গীত গাইতেন, কিন্তু সেই সব অনুষ্ঠানেই একক ভাবে গাইবার পালা এলে তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতই গাইতেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতকে তিনি তাঁর গান নির্বাচন ও গায়নের মধ্য দিয়ে এমন এক উচ্চতায় উন্নীত করতেন যে তা গণনাট্যের গানই হয়ে যেত। প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সুচিত্রা মিত্রের অবদান কোনদিন বিলীন হবেনা। তাঁর জন্য রইল শত কোটি অভিনন্দন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..