নারীমুক্তি প্রসঙ্গে কমরেড মাও সেতুং

শাহীন রহমান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

আধুনিক চীনের মহান রূপকার, শতকোটি জনগণের মুক্তি আন্দোলনের নেতা এবং চীনা ধারার সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের পার্টির নির্দেশক, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি। ১৮৯৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর হুনান প্রদেশের শিয়াঙটান কাউন্টির শাওসান গ্রামের এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম। ধানের ব্যবসা করে তাঁর বাবা তখন কিছুটা সচ্ছল। ১৯০০ সালে যখন বক্সার বিদ্রোহ ঘটে বা সানইয়াৎ সেন দ্বিতীয়বারের মতো অভ্যুত্থান ঘটান তখন মাও সেতুং-এর বয়স মাত্র সাত বছর। এর ১০ বছর পর, ১৯১৭ সালে, সানইয়াৎ সেন দায়িত্ব গ্রহণ করেন ক্যান্টনের প্রধান সামরিক শাসক হিসেবে। ৩০ দশকের শেষদিকে মাও সেতুং নির্বাচিত হয়েছিলেন সানইয়াৎ সেন প্রতিষ্ঠিত কওমিন্টা পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে। তখনই চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য এবং কৃষক প্রশ্নে একজন দক্ষ নেতা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। শৈশব থেকে ছিলেন পড়ুয়া প্রকৃতির। গভীর আগ্রহের সঙ্গে পড়া তাঁর বাল্য ও কৈশোরের বেশিরভাগ বইগুলোর বিষয়বস্তু হচ্ছে কৃষক বিদ্রোহ সম্পর্কে লেখা বিপ্লবী-রোমান্টিক লোকগাঁথা। পরবর্তীকালে পিপলস্ ওয়ার বা গণযুদ্ধ পরিচালনার সময় এসকল উপকথার অনেক ঘটনাই যেন পুনরায় মঞ্চস্থ হয়েছে চীন ইতিহাসের নাট্যমঞ্চে। আর সেই জীবন্ত ইতিহাসের নায়ক ও পরিচালকদের মধ্যে প্রধান নেতা হলেন তিনি। প্রায় কয়েকশ বছর ধরে সমগ্র চীন জুড়ে চলা এই সব কৃষক আন্দোলন ও সশস্ত্র সংগ্রামের ঐতিহ্যে সিক্ত ছিলেন। তাঁর সময়ের আরো অনেক যুবকের মতো গভীর অনুসন্ধান করেছেন স্বদেশের মুক্তির পথ। ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় সংগঠিত শ্রমিক-কৃষক এর মহান অক্টোবর বিপ্লবের পরই কেবলমাত্র মার্কসবাদ তথা শ্রমিক শ্রেণীর মতাদর্শ ও রাজনীতি, সমাজতন্ত্র এবং সাম্যবাদের পথ তাঁদের গভীর মনযোগ আকর্ষণ করে। ১৯২১ সালের ৩০ জুন সাংহাই-এ অনুষ্ঠিত চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কমিটিতেও প্রথম নির্বাচিত হন। তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ছিলেন সমগ্র চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ও জনগণের অবিসংবাদিত নেতা। বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে ব্যাপক বিতর্ক ও সংগ্রাম চলতে থাকা অবস্থাতে চীনে দেখা যায় এক নজীরবিহীন গণআন্দোলন। এই আন্দোলন কালচারাল রিভুলেশন বা মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব নামে পরিচিত। এই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মূল নায়ক ছিলেন কমরেড মাও সেতুং। ১৯৭৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর রাজধানী পিকিঙ নগরীতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদকে পরাজিত করে দেশ, জাতি ও জনগণকে মুক্ত করে নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করা এবং পরে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও আধুনিক চীন গঠনের স্থপতি মাও সেতুং। নারীমুক্তি প্রশ্নে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মাও সেতুং-এর দৃষ্টিভঙ্গি এক কথায় প্রকাশ করা হয়ে থাকে এভাবে– “Women are half the sky” (নারী হলো অর্ধেক আকাশ) অর্থাৎ যা কিছু মহৎ তার অর্ধেকের ভাগিদার হচ্ছে নারী। একথাটা বলতে যা বুঝানো হয়েছে তার দার্শনিক তাৎপর্য এবং রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত গুরুত্ব অসাধারণ। মানবতার প্রশ্নটির অর্থেক হচ্ছে নারী, বাকি অর্ধেক পুরুষ। নারী ও পুরুষ এই দুই অংশকে নিয়েই মানবজাতি। পুরুষ বা নারী কেউই অখণ্ড একক নন, দুইটি অংশ একটি সমগ্র একক সত্ত্বা গড়ে তোলে। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে যদি নারী প্রশ্নটিকে অখণ্ড সত্ত্বা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে প্রকৃত নারী মুক্তি আন্দোলন গড়ে তোলা যায় না। বরং সৃষ্টি যে সে পথে বিভ্রান্তি ও বাধা। বৃহৎ সমাজ জীবনের অংশ হিসেবে যৌন ও বিবাহের সমস্যাগুলিকে না দেখা, গৃহকর্মে নারীদের শ্রমের বৈষয়িক মূল্য না থাকার সমস্যাকে দেখা, না বোঝাটা ভুল। শুধু ভুল বলাটাই যথেষ্ট নয় এটি আসলে ক্ষতিকর। অনুরূপভাবে বৃহৎ সামাজিক সমস্যাগুলোকে যৌন সমস্যার এমনকি নারী প্রশ্নের আনুষঙ্গিক হিসেবে, অংশ হিসেবে মনে করা; মূল ব্যাপারটাকে আনুষঙ্গিক হিসেবে ধরা হয়– এটি ক্ষতিকর। ক্লারা জেকিন-এর সাথে নারীপ্রশ্ন নিয়ে এক আলোচনায় লেনিন বলেছেন, নারী প্রশ্নটিকেই পরিষ্কার করে বুঝতে হলে উপরে উল্লিখিত ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে কেবল অসুবিধার সৃষ্টি হয় তাই নয়, এতে সাধারণভাবে সর্বহারা নারীদের শ্রেণী চেতনা ও চিন্তাকে গুলিয়ে ফেলা হয়। নারী প্রশ্নটিকে সামাজিক প্রশ্নের, শ্রমিক সমস্যার অংশ হিসেবেই তিনি দেখেন। এই প্রশ্নটিকে সাধারণ শ্রেণী সংগ্রাম ও বিপ্লবের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত করেই তিনি দেখেছেন। কমিউনিস্ট বা সাম্যবাদী নারীদের আন্দোলনটাকে একটা গণআন্দোলন হিসেবে পরিচালনার সময় তাকে সাধারণ গণআন্দোলনের অংশ হিসেবেই পরিচালনা করতে চেয়েছেন। সরাসরি সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টি দ্বারা পরিচালিত ব্যাপকতর গণসংগ্রাম ছাড়া হাজার হাজার বছরের পুরুষতান্ত্রিক শিকড় থেকে নারীকে মুক্তি দেখা অসম্ভব। মাও নেতৃত্ব নিজেই ‘কেবলমাত্র সমাজের সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নারী-পুরুষের সত্যিকার সমাজাধিকার হাসিল করা যায়।’ তাঁর মানে চীনের নারীরা হলেন জনশক্তির একটা মহান উৎস। একটা মহান সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার সংগ্রামে এই উৎসকে কাজে লাগাতে হবে।’ আর সেজন্য তাঁর মতে– ‘ব্যাতিক্রমহীনভাবে সমস্ত কর্মক্ষম নারীদের সমান শ্রমের জন্য সমান বেতনের নীতির ভিত্তিতে’ ব্যাপক সংখ্যক নারীকে শ্রমফ্রন্টে টেনে নিতে হবে। মাও সেতুং যখন পরিণত মার্কসবাদী হয়ে উঠেননি, তখনও জনৈকা মিস চাং-এর আত্মহত্যা নিয়ে তাঁর ধারাবাহিক ভাবমুর্তিতে তার গণতান্ত্রিক ও অগ্রসর চিন্তা চেতনা ছাপ, নারী প্রশ্নের প্রতি তাঁর গুরুত্বারোপ প্রভৃতি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯২৭ সালের তাঁর বিখ্যাত রচনাটিতে (হুনানের কৃষক আন্দোলনের রিপোর্ট) গ্রামীণ কৃষক জীবনের অভিজ্ঞতার সারসংকলন করতে গিয়ে তিনি দেখান– ‘চীনের পুরুষেরা সাধারণত তিন ধরনের ক্ষমতার ব্যবস্থার দ্বারা [অর্থাৎ রাজনৈতিক ক্ষমতা, গোষ্ঠীগত ক্ষমতা, ধর্মগত ক্ষমতা] শাসিত, নারীর এ তিন ধরনের ক্ষমতা দ্বারা শাসিত হওয়া ছাড়া, তারা পুরুষদের ক্ষমতা দ্বারা শাসিত (স্বামীদের ক্ষমতা দ্বারা)। এ চারটা ক্ষমতা সমগ্র সামন্ততান্ত্রিক পিতৃ-প্রধান মতাদর্শ ও ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করছে, আর এগুলোই হলো চারটা বিশাল মোটা দড়ি, যা চীন জনগণকে, বিশেষ করে কৃষকদের বেধে রেখেছে।’

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..