দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি : নিয়ন্ত্রণের সংকটে সরকার

আকমল হোসেন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

সাম্প্রতিক সময়ে চাল ডাল আটা ময়দা তেল এবং সবজিসহ বিভিন্ন প্রকার ভোগ্যপণ্যের দামবৃদ্ধির কারণে নিম্নআয়ের মানুষ বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। দেশে অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা, বিরোধীদের বয়কট ও অবরোধ, গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির অন্দোলন চলছে। ৪ জন শ্রমিককে হত্যার ঘটনায় জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় ২ বছরের ব্যবধানে ১০৪ টাকা লিটারের সয়াবিন তেলের দাম হয়েছে ১৬০ টাকা, ৫১ দশমিক ৫০ টাকার চিনি হয়েছে ১৫০ টাকা, ৪০ টাকা কেজির মোটা চাল হয়েছে ৫৬-৬০ টাকা, ৩০ টাকার আটা হয়েছে ৬০-৬৫ টাকা, ৫৫ টাকার মোটা মসুর ডাল হয়েছে ১১০ টাকা, পেঁয়াজ ১৪০ টাকা। বাসভাড়া বেড়েছে ২৭ শতাংশ, লঞ্চভাড়া বেড়েছে ৩৫-৪৬ শতাংশ, রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম ৮৫০ থেকে ১২৪০ টাকা, পানির দাম বেড়েছে ৩১ শতাংশ। দ্রব্যমূল্যের কষাঘাত থেকে সাধারণ মানুষকে রেহাই দিতে খোলাবাজারে ঢাকায় ৩০টি ট্রাকে করে স্বল্প দামে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোটি মানুষের জন্য এ আয়োজন খুবই কম। অতিরিক্ত মূল্যে পণ্য ক্রয়ে যাদের সামর্থ্য নেই তাদের জন্য এবং বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য সরকারের এই পদক্ষেপ। তবে গাছের শিকড় কেটে আগায় পানি ঢাললে যেমন গাছ বাঁচানো সম্ভব নয় তেমনই পুঁজিবাদী অথবা খোলাবাজার তথা লুটপাাটের অর্থনীতি বহাল রেখে টিসিবি’র মাধ্যমে ট্রাকে করে খাদ্য বিতরণের টোটকায়ও এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সরকার সমর্থিত ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে ব্যবসায়ী নৈতিকতার মধ্যে না আনলে এ সমস্যার সমাধান হবে না। মধ্যম আয়ের একটি দেশের এক কোটি মানুষকে সমাজসেবা বিভাগের মাধ্যমে সাহায্য প্রদান, ১০ টাকা কেজিতে চাল প্রদান করার পরও টিসিবির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণে ট্রাকে করে ভোগ্যপণ্য বিক্রি করতে হবে কেন? স্বাধীনতার ৫৩ বছরে মানুষের ডাল-ভাতের সংস্থানের সক্ষমতা অর্জন করার পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে সেই মূল্যায়ন আমাদের করার প্রয়োজন কি না সেটা ভেবে দেখা প্রয়োজন। সময়মতো জনশুমারি না হওয়ায় ভোগ্যপণ্যের চাহিদা নিরূপনের সমস্যা এবং ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটকে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য দায়ী অনেকেই বলছেন। সরকার সমর্থিত এই সিন্ডিকেট না ভাঙতে পারলে দ্রব্যমূল্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে চাঁদে চাঁদে দাম বৃদ্ধির ষড়যন্ত্র থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে চাহিদা ও যোগান দ্বারা পণ্যমূল্য নির্ধারিত হয়। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রব্যের ঘাটতি না থাকার কথা বলা হচ্ছে, যেহেতু যোগানের সংকট নেই তাহলে দাম বাড়ার কথা নয়, তারপরও বাড়ছে। মানুষের সীমিত সম্পদে বহুবিধ অভাব মেটাতে অর্থনীতিতে বিকল্প সম্পদ ব্যবহারের ওপর যেমন গুরুত্বারোপ করা হয়েছে; সেই সাথে জরুরি প্রয়োজনগুলো সবার আগে মেটানোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিকল্প দ্রব্যের দামেরও ঊর্ধ্বগতি থাকলে অর্থনীতির ঐ সূত্রও কাজে আসেনা। আয়ের সাথে ব্যয়ের সঙ্গতি না থাকলে কিছু চাহিদা কাটছাঁট করা যায়, কিন্তু নিত্যব্যবহার্য খাদ্যের অভাব বা চাহিদা কোনোভাবেই কমানো যায় না। পুষ্টি বিজ্ঞানে মানুষের জন্য সুষম খাদ্যের যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, সেটা পূরণে ব্যর্থ বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ, কারণ তাদের ঐ ধরনের খাদ্য ক্রয়ের আর্থিক সামর্থ্য নেই। এরাই প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ২২ শত কিলো ক্যালরির সমপরিমাণ খাদ্য কেনার মত আয় রোজগার করতে না পেরে দরিদ্রের তালিকায় যুক্ত হয়েছে! এরাই নীরব ক্ষুধায় এবং নানা রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সামনে জড়ো হচ্ছে, কর্মক্ষমতা হারিয়ে পরিবার বা সমাজের বোঝা/উপেক্ষার পাত্রে পরিণত হয়েছে। ২০১৫ সালে যে জাতীয় বাজেট দেওয়া হয়েছিলো, এরপর গত ৭ বছরে সকল দ্রব্যের দামই বেড়েছে, কিন্তু বেতন সেই হারে বাড়েনি। সরকারি কর্মচারীদের প্রতি বছর একটা করে ইনক্রিমেন্ট দিলেও মুদ্রাস্ফীতি তার চেয়ে অনেক বেশি। অন্যদিকে বেসরকারি চাকুরেদের এ সুযোগ যেমন নেই সেইসাথে করোনার কারণে চাকরিহারা, ক্ষেত্রবিশেষে বেতন কমিয়ে দেওয়ায় সাধারণ মানুষ চরম সংকটে। দারিদ্র্যসীমার উপরে উঠেছে এমন ভাগ্যবানরা সামাজিকভাবে এবং শ্রেণিচরিত্রে যারা মধ্যবিত্ত শ্রেণি, কখনো কখনো তারা সুবিধাবাদী শ্রেণি হিসেবে বিবেচিত। তাদের ভূমিকা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষের জন্য ইতিবাচক, এমনটা মনে হয় না। যেদিকে বাতাস সেই দিকেই নৌকার পাল ধরে। তাইতো মুক্তিযুদ্ধের পর এই শ্রেণিটা অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত বাংলাদেশ আর বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের স্বপ্ন নিয়ে কাজ শুরু করতে না করতেই সেটা ত্যাগ করে সাবেক পাকিস্থানি আমলে ফিরে গেল। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সংগ্রামী অসংখ্য মানুষের জীবন ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশটি ৫০ বছরে দুর্নীতিতে ৫ বার বিশ্বের প্রথম দেশের খেতাব পেয়েছে। পুঁজিবাদী সমাজ অবাধ বাজারের মতো অবাধ লুটপাট, গণতন্ত্রের স্থানে পরিবারতন্ত্র কায়েম করেছে। আইন, বিচার কোনোটির মুখোমুখি তাদের এতোদিন হতে হয়নি। স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল মানুষ পাবে দু’বেলা ভাত, মোটা কাপড়, শিক্ষা, চিকিৎসা আর মাথা গোঁজার ঠাঁই। কিন্তু আদর্শহীন শাসকশ্রেণির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাসীন হওয়া এবং বাজারমুখী পুঁজিবাদের কারণে আজকের দৈন্যদশার জন্ম দিয়েছে। স্বাধীন দেশ, বহুজাতিক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান আর বিদেশি প্রভুদের অবাধ বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে দেশ। নানা শর্তের জালে আটকে পরেছে বাংলাদেশ। আর তাদের তাঁবেদার এদেশীয় রাজনৈতিক, সামরিক, বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট, সবাই মিলে লুটপাট করে তা দেশের বাইরে পাচার করছে, বিদেশে সেকেন্ড হোম অথবা বেগম পাড়ায় আবাস গড়ছে। বিদ্যুৎ গ্যাস পানির দামও বারবার বাড়িয়ে সাধারণ মানুষগুলোকে করছে সর্বস্বান্ত। যে হারে পণ্যমূল্য বাড়ছে সে হারে বিভিন্ন পেশার চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে না, ফলে সৃষ্টি হচ্ছে অসন্তোষ। অসাধু ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার, ভেজাল এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যসামগ্রী বিক্রেতা/ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই আমদানি কমে যায়, ব্যবসায়ীরা এলসি খোলা বন্ধ করে সরকার ও জনগণকে জিম্মি করে ফেলে। আর এই সকল ব্যবসায়ীরা সরকার বদলের সাথে সাথে তাদের সাইনবোর্ড পরিবর্তন করে সরকারের লোক হয়ে যায়, ফলে সরকারও তাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনা। এ অবস্থায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে পণ্যসামগ্রীর মূল্য বাড়বেই, এটাই অর্থনীতির নিয়ম। আবার সরকারি নিয়ন্ত্রণহীন মুক্তবাজারের নামে বেসরকারি ব্যবসায়ীদের হাতে পণ্যসামগ্রীর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিলে যে কোনো সময় দ্রব্যমূল্য বাড়তে পারে। অতীতে এ প্রমাণ পাওয়া গেছে। ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে মাল মজুদ রেখে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি এবং মানুষকে জিম্মি করে অধিক দামে পণ্য ক্রয়ে বাধ্য করেছিল। ঈদ, পূজাসহ যে কোনো পার্বণের সময় বেনিয়া চক্র এই সুযোগটা কাজে লাগায়। এ সকল অনিয়মের বিপক্ষে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদ না থাকার কারণে এটা বেড়েই চলছে। বামপন্থিরা এ বিষয়ে সোচ্চার থাকলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের শক্তিশালী অবস্থান না থাকায় সরকার ও ব্যবসায়ীরা তাদের ইচ্ছা মতো এ কাজগুলো করছে। নিয়ম-নীতি আর ব্যবসায়ী নৈতিকতা ভুলে শুধুই মুনাফাকে বড় করে দেখছে তারা। এসব সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয় রয়েছে। সাধারণ মানুষ তাদের নিত্যব্যবহার্য পণ্য ক্রয়ে বাড়তি মূল্য গুনতে বাধ্য হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে সরকারি উদ্যোগ জরুরি। বিভিন্ন সময়ে সরকারি উদ্যোগে ওএমএস বা খোলাবাজারে ন্যায্য মূল্যে চাল বিক্রি, বিডিআর বাজার চালু হয়েছিল। বিষয়টি প্রশসংনীয়; তবে যথেষ্ট নয়। পণ্য বাজার স্বাভাবিক রাখার জন্য সরকারি নীতিমালা থাকা এবং তা কার্যকর করা প্রয়োজন। বেসরকারিখাত থাকবে তবে তাদের ওপর সকল ক্ষেত্রে নির্ভরশীল হওয়া সঠিক হবে না, সরকারকে জনতার স্বার্থ গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে, কারণ সরকার জনগণের কর-খাজনার টাকায় চলে, গ্রামীণ প্রবাদে আছে নুন খাই যার গুণ গাই তার। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারি নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন। নিজস্ব মনিটরিং ও রেশনিং ব্যবস্থা থাকলে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাত থেকে ভোক্তাদের রক্ষা করা সম্ভব। একসময় সরকারি সকল কর্মচারীদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা ছিলো, ডিফেন্সে কর্মরতদের জন্য এখনও সেটা চালু আছে। গার্মেন্ট ও বিভিন্ন শিল্প কলকারখানাসহ স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করলে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন অবস্থা মোকাবিলা করা সম্ভব, এছাড়া অন্যপথই বা কী? নাগরিকের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সংবিধানে খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা ও চিকিৎসা মৌলিক অধিকারের মর্যাদা পেলেও বাংলাদেশের সংবিধানে সেই মর্যাদা পায়নি। যদিও রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে সংবিধানের ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদন শক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায়– (ক) অন্ন বস্ত্র আশ্রয় শিক্ষা চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা তার মধ্যে অন্যতম। তবে সংবিধান শাসকের স্বার্থে কখনও বাদাম বিক্রির কাগজ হিসেবে আবার কখনও বেদ বাইবেল কোরানের মতো অপরিবর্তনীয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জনতার স্বার্থে জনগণকেই তার দাবির পক্ষে দাঁড়ানো ছাড়া বিকল্প পথ নেই। লেখক : কলেজ অধ্যক্ষ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাকবিশিস

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..