গাজার মৃত্যু উপত্যকায় ৪ দিনের যুদ্ধবিরতি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিদেশ ডেস্ক : দীর্ঘদিন ধরে চলমান ইসরায়েলি আগ্রাসনে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে গাজা উপত্যকা। ১৪ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের প্রায় অর্ধেক শিশু। মৃত্যুর প্রহর গুণছে লক্ষ লক্ষ গাজাবাসী। এরূপ পরিস্থিতিতে বিশ্ববাসীর চাপে ও কাতারের মধ্যস্থতায় ৪ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে রাজী হয়েছে হামাস ও ইসরায়েল। যুদ্ধের নিয়ম অনুসারে, বেসামরিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারী ও শিশু সব সময়ই যুদ্ধের বাইরে থাকে। তবে এবার ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধে সবার আগে মৃত্যুর তালিকার ওপরে অবস্থান করছে নারী ও কোমলমতি শিশুরা। যেকোনো নারীর জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দের বিষয় সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের কান্নার আওয়াজ শোনা। তবে ফিলিস্তিনের চিত্র এখন বদলে গেছে। এখন যুদ্ধের কারণে ফিলিস্তিনি মায়ের কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় তাঁর সন্তানের লাশ খুঁজে পাওয়া। তাই সন্তানের লাশ খোঁজার জন্য শরীরে নাম লিখে রাখতেও হয়তো হাত কাঁপছে না তাদের। তবে সেই কম্পন আমাদের অনুভূতিকে স্পর্শ করতে পারছে না। বিশ্বব্যপী অসংখ্য মানুষকে ব্যাপারটি স্পর্শ করলেও, তা ঐক্যের অভাবে পরাশক্তির কাছে হেরে যাচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের জন্য চেনা পৃথিবীই যেন বড্ড অচেনা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের স্বাধীনচেতা মানুষেরা মনে করেন, যারা বোমার আঘাতে মারা গেছে, তারা অনেক বেশি ভাগ্যবান। ওই যে প্রচলিত একটি কথা আছে, ‘বারবার মরার চেয়ে একবারে মরা ভালো।’ বিষয়টা আসলে তাই। প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুকে সঙ্গে নিয়ে ঘোরার চেয়ে হয়তো একবারে মরে যাওয়াই ভালো। এদিকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিরোধের একমাত্র সমাধান দ্বি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা বলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। একই সঙ্গে ইসরায়েল যদি গাজা দখল করে সেটি হবে বড় ভুল বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। সম্প্রতি ওয়াশিংটনে সংবাদ সম্মেলনে জো বাইডেন এই মন্তব্য করেন। ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলপন্থি ও ফিলিস্তিনপন্থিদের কাছে দুটি পৃথক চিঠি পাঠিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। একটি চিঠিতে ইসরায়েলের প্রতি তার অকুণ্ঠ সমর্থন ও অন্য চিঠিতে গাজা উপত্যকায় নিরীহ ফিলিস্তিনিদের রক্ষায় মার্কিন প্রশাসনের চেষ্টার কথা তুলে ধরেছেন তিনি। গত ১ নভেম্বর পাঠানো এক চিঠিতে বাইডেন বলেছেন, ইসরায়েলি জনগণ একটি ভয়ংকর সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে, যা ছিল হলোকাস্টের পর থেকে ইহুদিদের জন্য সবচেয়ে ভয়ানক দিন। অন্যদিকে, গত ৮ নভেম্বর ফিলিস্তিনপন্থিদের উদ্দেশ্যে আরেকটি চিঠি লেখেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সেই চিঠিতে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন বা হলোকাস্টের কোনো কথা উল্লেখ ছিল না। এখন পর্যন্ত একমাত্র স্বস্তির খবর হচ্ছে, সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে সম্মত হয়েছে ইসরায়েল ও হামাস। অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় নির্বিচার হামলা বন্ধের এ প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা। ফলে অন্তত চার দিনের জন্য গাজাবাসী ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা থেকে রেহাই পাবে। ২২ নভেম্বর যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব অনুমোদনের এ খবর জানা গেছে। জানানো হয়েছে, যুদ্ধবিরতির বিষয়ে ইসরায়েল ও হামাসকে সম্মত করতে মধ্যস্থতা করেছে কাতার। এর পরপরই হামাসের পক্ষ থেকে টেলিগ্রামে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। বিবৃতি দিয়েছে ইসরায়েল সরকারও। এসব বিবৃতি থেকে যুদ্ধবিরতির কিছু শর্তের কথা জানা গেছে। বিবৃতিতে হামাস জানিয়েছে, গাজা উপত্যকায় সব এলাকায় আকাশ ও স্থলপথে যেকোনো ধরনের অভিযান পরিচালনা থেকে বিরত থাকবে ইসরায়েলি বাহিনী। ইসরায়েলি সামরিক যান চলাচল বন্ধ রাখা হবে। চিকিৎসা উপকরণ, জ্বালানিসহ মানবিক সহায়তা নিয়ে শত শত ট্রাক সীমান্ত পেরিয়ে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এসব ট্রাককে গাজায় ঢোকার অনুমতি দেবে। হামাস জানিয়েছে, দক্ষিণ গাজায় চার দিনের জন্য ড্রোন ওড়ানো বন্ধ রাখতে সম্মত হয়েছে ইসরায়েল। উত্তর গাজায় প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা (স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত) ড্রোন ওড়ানো বন্ধ রাখা হবে। সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা অবস্থায় গাজার যেকোনো এলাকা থেকে যে কাউকে আটক করা কিংবা কারও ওপর হামলা না করার বিষয়েও সম্মত হয়েছে ইসরায়েল, এমনটাই জানিয়েছে হামাস। অন্যদিকে ইসরায়েল সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হামাসের হাতে আটক থাকা ৫০ জনের মতো জিম্মিকে (নারী ও শিশু) আগামী চার দিনের মধ্যে মুক্তি দেওয়া হবে। তাঁদের নিরাপদে ইসরায়েলে ফেরত আনার ব্যবস্থা করা হবে। কেননা, ইসরায়েল সরকার সব জিম্মিকে মুক্ত করার বিষয়ে দায়বদ্ধ। এ ছাড়া জিম্মি মুক্তির প্রক্রিয়াটি চলমান থাকবে। অতিরিক্ত ১০ জন করে জিম্মিকে মুক্তি দিলে যুদ্ধবিরতিতে একটি করে অতিরিক্ত দিন যোগ করা হবে বলেও জানিয়েছে ইসরায়েল সরকার। তবে গাজায় সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হলেও হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়নি বলে সতর্ক করে দিয়েছে ইসরায়েল সরকার। এ বিষয়ে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েল সরকার, দেশের সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। সব জিম্মিকে দেশে ফেরানো, হামাসকে পুরোপুরি নির্মূল করা এবং গাজা থেকে ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নতুন করে আর কোনো হুমকি নেই, এমনটা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে। সাময়িক যুদ্ধবিরতির আওতায় ইসরায়েলের কারাগারে বন্দী থাকা কয়েক ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেওয়া হবে বলেও পূর্ব জেরুজালেম থেকে জানিয়েছেন আল-জাজিরার প্রতিনিধি হামদাহ সালহুত। গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় হামাস। ইসরায়েল জানায়, ওই হামলায় প্রাণ হারান ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ। আর ২৪০ জনের মতো মানুষকে জিম্মি করে নিয়ে যায় হামাস। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, জার্মানিসহ বেশ কিছু দেশ হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে। এর পরপরই গাজায় পাল্টা হামলা শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। দেড় মাসের বেশি সময় ধরে চলা হামলায় ফিলিস্তিনে ১৪ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ গেছে। এর বেশির ভাগই শিশু ও নারী। উদ্বাস্তু হয়েছে ১০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি। অবরুদ্ধ গাজায় চরম মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলী বাহিনীর গণহত্যা ও তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ভালোভাবে নেয়নি সারাবিশ্বের শান্তিকামী মানুুষ। খোদ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলেই যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে হাজার হাজার মানুষ। দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশ, জর্ডান, দক্ষিণ আফ্রিকা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান ব্যক্ত করেছে। এদিকে চীন, রাশিয়া ও ব্রিকসভুক্ত আরও কয়েকটি দেশও যুদ্ধ বন্ধে জোরালো প্রদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। আপাতত ৪ দিনের যুদ্ধবিরতি হলেও বিশ্ববাসী ইসরায়েল ফিলিস্তিন সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধান চান।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..