নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গণের জটিলতা আরও বাড়তে পারে

ঐশ্বর্য সৌরভ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতরফা নির্বাচনে অভ্যন্তরীণ চাপকে সংকট হিসেবে দেখছে না সরকার৷ অব্যাহত চাপের মুখে বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক দুর এগিয়েও গেছে এবং এইভাবে চাপ কাটিয়ে উঠে লক্ষ্যে পৌছাতে পারবে বলে আওয়ামী লীগ সরকার মনে করছে ৷ তবে আন্তর্জাতিক চাপ থেকে তৈরি সংকটগুলো আরও জটিলতার দিকে অগ্রসর হতে পারে। আগামী ৭ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকাতে একের পর এক অবরোধ কর্মসূচি দিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। পাশাপাশি এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সহিংস ঘটনাও অব্যাহত আছে। এ নির্বাচনে বিএনপি শেষ পর্যন্ত আসতে পারে সরকার ও আওয়ামী লীগ মধ্যে এমন ধারণা এতো দিন থাকলেও এখন বিএনপি আর আসছে না এটা ধরে নিয়েই আওয়ামী লীগ আগাচ্ছে। আর নির্বাচন বানচালে বিএনপির সব তৎপরতা দমন করে নির্বাচন করতে পারবে এ ব্যাপারে সরকার আত্মবিশ্বাসী। ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ ও বিএনপিকে দূর্বল করতে পরেছে বলে সরকার সংশ্লিষ্টরা মনে করছে। তবে শেষ মুহুর্তে বিএনপি ও দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তির সমন্বয়ে বড় ধরণের ধ্বংসাত্বক তৎপরতা চালাতে পারে এমন ধারণারও করছে সরকার। সে ধরনের পরিস্থিতিও দমনে প্রস্তুতি রাখা হয়েছে বলে সরকার সংশ্লিষ্ট সুত্রগুলো বলছে। এদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ্যকে দমন করতে সক্ষম হলেও আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়তে পারে এটা অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎপতা এ স্পষ্টতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষদের মতে, নির্বাচনি ব্যবস্থাকে ধ্বংস ও জোর করে আওয়ামী লীগ সরকারের একতরফা নির্বাচন এবং আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বিএনপির অতি বিদেশ নির্ভরতা এ সুযোগ করেছে দিয়েছে। আর এই সুযোগ নিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনেকটা প্রকাশ্য হস্তক্ষেপে নেমেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক শক্তিগুলো সমস্যা সমাধানে চেষ্টা করতে চাইলেও দেশের রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর উপর নির্ভরতার মাত্রা এমন পর্যায়ে গেছে সেক্ষেত্রে এ সমস্যা সমাধানে ওই শক্তিগুলোর চাওয়া না চাওয়ার বিষয়টিও মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২৮ অক্টোবরের পর থেকে ধারাবাহিক অবরোধ, হরতাল দিয়েও বিএনপি একতরফার নির্বাচন থেকে সরকারকে সরাতে পারেনি। বর্তমান পরিস্থিতিতে দলটি পুরোপরি আন্তর্জাতিক শক্তির উপর নির্ভর করছে। পশ্চিমা কয়েকটি দেশ বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিনিয়তই বিএনপি নেতারা যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধীক সুত্র থেকে জানা গেছে। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রেরও বিভিন্ন দিক থেকে সরকারকে আটকানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ভীসানীতি, শ্রম নীতি, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা যার মধ্যে দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প রয়েছে সব কিছুকে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। আর সরকারের উপর চাপ তৈরির এই প্রক্রিয়া গত বছর আগে থেকেই শুরু হয়েছে। রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মাণাধীন বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি নিয়ে আসা একটি রুশ জাহাজকে গত বছর ডিসেম্বরে মার্কিন আপত্তির কারণে মংলা বন্দরে ঢোকার আগেই ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয় সরকার। জাহাজটি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার উপর দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় বলে ঢাকায় মার্কিন দুতাবাস থেকে সরকারকে জানানো হয়। যদিও এই জাহাজটি ভারতের একটি বন্দরে সে দেশের মালপত্র নামিয়ে তারপর বাংলাদেশে ছিলো। কিন্তু জাহাজটি ভারতে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো আপত্তির কথা জানা যায়নি। পরে অন্য একটি জাহাজে করে রাশিয়া যন্ত্রপাতিগুলো পাঠায়। এই প্রকল্পের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে নেওয়ার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ নিয়েও জটিলতা দেখা দেয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রাশিয়া তৈরি করলেও এর সঞ্চালন লাইন তৈরি করছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানী অব বাংলাদেশ (বিজিসিবি)। এই লাইন তৈরির যন্ত্রপাতি জার্মানি এবং সুইজারল্যান্ডের দুইটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়। রাশিয়ার উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এই যন্ত্রপাতি সরবারহ করতে গত বছর কোম্পানি দুইটি অস্বীকৃতি জানায়। পরে চীন খেকে এগুলো আনা হচ্ছে। এ বিষয়গুলো সরকারের উপর চাপ তৈরির অংশ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন অবস্থানকে সরাসরি সমালোচনা করে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে রাশিয়া। সরকার বিরোধী রাজনৈতিক সমাবেশের পরিকল্পনায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সম্পৃক্ততারও অভিযোগ তুলেছে। গত ২২ নভেম্বর রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা মস্কোতে এক ব্রিফিংয়ে এ অভিযোগ করে বলেন, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলা হলেও আড়ালে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো। গত অক্টোবরের শেষে বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস সরকারবিরোধী সমাবেশের পরিকল্পনা করতে বিরোধীদলের এক সদস্যের সঙ্গে দেখা করেন। এ ধরনের পদক্ষেপ অভ্যন্তরীণ বিষয়ে চরম হস্তক্ষেপের কম কিছু নয়। এর আগে গত ৮ জুলাই মারিয়া জাখারোভা মস্কোতে আরেকটি ব্রিফিংয়ে বলেছিলেন, ‘আমি আগে কখনো শুনিনি যে বাংলাদেশ ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য। এটা শুনিনি কারণ বাংলাদেশ এর সদস্য নয়। আমি জানতাম না যে বাংলাদেশের নির্বাচন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত। পশ্চিমাদের যুক্তিটা এমন যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তাবিষয়ক উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে প্রাক্-নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য সেখানে একটি নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে কিছু সুপারিশ তুলে ধরবেন। এটা নব্য উপনিবেশবাদ ছাড়া আর কী? এটা নগর এবং পাড়া-মহল্লার প্রতি তাদের আচরণের প্রদর্শন ছাড়া আর কী?’ নির্বাচন ইস্যুতে পশ্চিমা দেশগুলোর তৎপরতা নিয়ে সরকারও কয়েকবার কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বাংলাদেশ নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতদের বক্তব্য ও তৎপরতা সম্পর্কে প্রতিক্রিয়ায় সম্প্রতি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সাংবাদিকদের বলেন, অতীতে কিছু রাষ্ট্রদূতকে তাদের কার্যপরিধি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, আজকে তারা সেটার পুনরাবৃত্তি করলে তার প্রভাব আরও বেশি হবে। সম্প্রতি বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা কল্পনা আক্তারকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে বক্তব্য দিয়েছে তার ব্যাখ্যা চাওয়া হবে বলেও পররাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী গত ২১ নভেম্বর সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন সম্প্রতি বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা কল্পনা আক্তারের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা কল্পনা আক্তারের মতো মানুষদের পাশে থাকতে চাই। যিনি বলেন যে তিনি এখনো জীবিত আছেন কারণ আমেরিকার দূতাবাস তার পক্ষে কাজ করেছে।’ এ প্রসঙ্গে শারিয়ার আলম বলেন, ‘শ্রমিক নেতা কল্পনা আক্তার তার ঝুঁকির কথা কখনোই আমাদের জানাননি। তাকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া মন্তব্যের ব্যাখ্যা চাইব আমরা।’ এদিকে নির্বাচন নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এই অবস্থান দেশের পরিস্থিতিকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাবে তা নিয়ে বড় উদ্বেগের কারণ রয়েছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..