আমানত সংকটে ব্যাংক খাত বাড়ছে সুদের হার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : তারল্য সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের বেশিরভাগ ব্যাংক। ব্যাংকে টাকার টানাটানি সামলাতে প্রতিদিন গড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তা বা ধার দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংকট কাটাতে সাড়ে ৯ শতাংশ পর্যন্ত সুদেও আমানত নিচ্ছে কোনো কোনো ব্যাংক। তবে সংকটে পড়া শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো ১৫ শতাংশ সুদে তহবিল সংগ্রহ শুরু করেছে বলে আলোচনা রয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিলামে বিভিন্ন মেয়াদি বিলের সুদহার ১০ দশমিক ২০ শতাংশ থেকে ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। এর মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ধার নিয়েছে সরকার। জানা গেছে, সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত নিলামে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ছিল ১০ দশমিক ২০ শতাংশ, যা ১৩ নভেম্বর ছিল ১০ শতাংশ। ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ছিল ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ, আগের নিলামে এই হার ছিল ১০ দশমিক ২০ শতাংশ। আর ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ, যা আগের নিলামে ছিল ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ট্রেজারি বিলের সুদহার ১২ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে। এতে ঋণের সুদহারও বাড়বে। জানা গেছে, ১৩ নভেম্বর সরকার ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ৩ হাজার ৩০ কোটি টাকা, ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ৬৪৭ কোটি টাকা ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ৭৮২ কোটি টাকা তোলে। এ ছাড়া ১৫ নভেম্বর ১০ দশমিক ৯৯ শতাংশ সুদে ৫ বছর মেয়াদি বন্ডের মাধ্যমে ৮১৬ কোটি টাকা নিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, দেশে গত অক্টোবর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ, যা ১১ বছর ৯ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। অক্টোবরে সার্বিক মূল্যস্ফীতিও কিছুটা বেড়ে ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ হয়েছে। বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির দায় মেটাতে ব্যাংকগুলো মার্কিন ডলার কেনার চাপে আছে। সে জন্য নগদ টাকায় রপ্তানি ও প্রবাসী আয় কেনার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর একটিকে অন্যটির কাছ থেকে ডলার কিনতে হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারও এখন উচ্চ সুদে টাকা ধার করছে। ফলে ব্যাংকগুলোতে টাকা, তথা তারল্য নিয়ে টানাটানি শুরু হয়েছে। সংকট কাটাতে সাড়ে ৯ শতাংশ পর্যন্ত সুদেও আমানত নিচ্ছে কোনো কোনো ব্যাংক। তবে সংকটে পড়া শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো ১৫ শতাংশ সুদেও তহবিল সংগ্রহ শুরু করেছে বলে শোনা যায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ব্যাংক ঋণের সুদহার যতটা বেড়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি বেড়েছে আমানতের সুদ। এরপরও ব্যাংকগুলো কাক্সিক্ষত আমানত পাচ্ছে না। ব্যাংকে টাকার টানাটানি সামলাতে প্রতিদিন গড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকার সহায়তা বা ধার দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এদিকে তীব্র তারল্য-সংকটের পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। বিশেষ করে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তারা নতুন কোনো প্রকল্পে ঋণ দিচ্ছে না। সুদহার বাড়ানোয় ভোক্তা ঋণ বিতরণও কমে গেছে। ট্রেজারি বিলের সুদহারের ভিত্তিতে এখন ব্যাংক ঋণের সুদের হার নির্ধারিত হচ্ছে। যে পদ্ধতিতে ঋণের সুদহার নির্ধারিত হচ্ছে, সেটাকে বলা হয় স্মার্ট বা সিক্স মান্থস মুভিং অ্যাভারেজ রেট অব ট্রেজারি বিল। প্রতি মাসের শুরুতে এই হার জানিয়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি নভেম্বর মাসের জন্য স্মার্ট রেট নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এর সঙ্গে ব্যাংকগুলো সাড়ে ৩ শতাংশ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাড়ে ৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদহার বাড়াতে পারে। ফলে ব্যাংক ঋণের সুদহার বেড়ে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ঋণের সুদহার বৃদ্ধি পাওয়ায় ও তারল্যে টান পড়ায় আমানতের সুদহার বেড়ে হয়েছে সাড়ে ৯ শতাংশ। সংকটে পড়া কোনো কোনো ব্যাংক আরও বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। এরপরও চাহিদামতো আমানত পাচ্ছে না বেশির ভাগ ব্যাংক। গত আগস্ট-সেপ্টেম্বর সময়ে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে মাত্র ৫ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা, একই সময়ে ঋণ বেড়েছে ১৯ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এদিকে তারল্য-সংকটে পড়ায় শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নগদ জমা (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ জমা (এসএলআর) রাখতে পারছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব ব্যাংককে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি অন্য ব্যাংকগুলোকে রেপো বা বিশেষ সহায়তা হিসেবে টাকা ধার দিয়ে যাচ্ছে। এভাবে ১২ নভেম্বর ১৭ হাজার ৭৭৪ কোটি, ১৩ নভেম্বর ১৩ হাজার ৩৭৭ কোটি, ১৪ নভেম্বর ১৫ হাজার ৪৯৬ কোটি ও ১৫ নভেম্বর ১৯ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা দিয়েছে। ডলারের দাম বাড়ছে, বাড়ছে বৈদেশিক ঋণের সুদহার। ব্যাংকে নগদ টাকার সংকটে কার্যক্রম চালানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। ব্যবসায়ীরা এলসি খুলতে না পেরে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি করতে পারছে না। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হয়ে বরং কমছে। সবকিছুর প্রভাব পড়ছে বাজারে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য থেকে শুরু করে সকল পণ্যের দাম বাড়ছে। অমানবিক জীবনযাপন করতে হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষদের। নানা সংকটে জর্জরিত অর্থনীতির সুদিন ফিরে আসুক, স্বচ্ছলতা আসুক দেশের প্রতিটি ঘরে ও পরিবারে; এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..