নির্বাচনের ডামাডোলে বৈদেশিক ঋণ ছাড়িয়েছে ১০ হাজার কোটি ডলার

রুহুল আমিন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
দেশের বৈদেশিক ঋণ ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আইএমএফের হিসাবে রিজার্ভ এসে ঠেকেছে ১৫ বিলিয়ন ডলারে। সরকারি দর ১১১ টাকা হলেও খুচরা বাজারে ডলার বিক্রি হচ্ছে ১২৫ থেকে ১২৮ টাকা পর্যন্ত। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আর্থিক হিসাবে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯৩ কোটি ডলার। বাড়ছে ঋণ খেলাপি, স্থবির হয়ে পড়েছে ব্যাংকিং খাত। ১০০ বিলিয়ন (১০ হাজার কোটি) ডলার বিদেশি ঋণের মধ্যে সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশি ঋণের পরিমাণ ৭৯ বিলিয়ন ডলার। বাকি ২১ বিলিয়ন ডলার বিদেশি ঋণ নিয়েছে দেশের বেসরকারি খাত। বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে নেয়া ঋণের প্রায় ৮৪ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি। বাকি ১৬ শতাংশ বা ১৬ বিলিয়ন ডলারের ঋণ স্বল্পমেয়াদি। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদকৃত বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি ঋণের পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের মোট বিদেশি ঋণের প্রায় ৭০ শতাংশই নেয়া হয়েছে গত ১০ বছরে। ২০১৫-১৬ অর্থবছর শেষেও বিদেশি উৎস থেকে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মোট ঋণ স্থিতি ছিল ৪১ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার। ওই সময় বিদেশি ঋণ ছিল দেশের মোট জিডিপির ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। এরপর থেকে বিদেশি ঋণ ক্রমাগত বেড়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ৪৫ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারে। ২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষে এ ঋণের স্থিতি ৫৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ৬২ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে। বিদেশি ঋণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ২০১৮ সালের পর। ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে বিদেশি ঋণের স্থিতি ৬৮ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকে। ২০২০-২১ অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধি ১৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ওই অর্থবছর শেষে বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ৮১ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারে। ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের প্রবৃদ্ধি হয় ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থবছর শেষে এ ঋণের স্থিতি ৯৫ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে সুদহার বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ থেকে বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠান স্বল্পমেয়াদি ঋণ প্রত্যাহার করে নেয়। এতে বিদেশি ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধিও কমে যায়। ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে বিদেশি ঋণের স্থিতি ৯৮ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক শেষে তথা সেপ্টেম্বরে এসে বিদেশি ঋণের স্থিতি ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্রতি ত্রৈমাসিক শেষে বিদেশি ঋণসংক্রান্ত প্রতিবেদন গভর্নরের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়। সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন এরই মধ্যে গভর্নরের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এখনো অনুমোদন না হওয়ায় ঋণের তথ্য প্রকাশ করা যাচ্ছে না। তবে সেপ্টেম্বরে বিদেশি ঋণ ১০০ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে। গত এক বছরে দেশের বেসরকারি খাতে কমলেও সরকারের বিদেশি ঋণ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দেশের সরকারি-বেসরকারি বিদেশি ঋণ স্থিতি মোট জিডিপির প্রায় ২২ শতাংশ। সরকারি বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি গত এক দশকে বিদ্যুৎ খাতেও বিপুল পরিমাণ বিদেশি ঋণ এসেছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ এসেছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের জন্য ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দিয়েছে রাশিয়া। পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ২ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেয়া হয়েছে চীন থেকে। আর রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ঋণসহায়তা দিয়েছে ভারত। এছাড়া মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ অন্যান্য প্রকল্প ঘিরে জাপান থেকে ৪৩ হাজার ৯২১ কোটি টাকার সমপরিমাণ ঋণসহায়তা নেয়া হচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশি ঋণের স্থিতিও এখন ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ রয়েছে প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী বছর থেকে অনেক মেগা প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে। এতে বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বাড়বে। এমনিতেই দেশে ডলারের তীব্র সংকট চলছে। বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ায় আরো বেশি পরিমাণে ডলারের প্রয়োজন হবে। যদিও রেমিট্যান্স, রফতানি আয়সহ দেশে ডলার সংস্থানের উৎসগুলো সংকুচিত হয়ে এসেছে। বিপরীতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্ষয়ও ক্রমাগত বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (বিপিএম৬) দেশের রিজার্ভ ছিল ১৯ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবে বাংলাদেশের নিট রিজার্ভ এখন ১৫ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রিজার্ভ ছিল ২০২১ সালের আগস্টে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবায়ন পদ্ধতি অনুযায়ী, ওই সময় রিজার্ভের পরিমাণ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। এরপর থেকেই রিজার্ভের ক্ষয় শুরু হয়। গত দুই বছরে প্রতি মাসে গড়ে এক বিলিয়ন ডলার করে রিজার্ভ কমেছে। ২০২২ সালের জানুয়ারিতেও দেশের ব্যাংক খাতে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল সর্বোচ্চ ৮৫ টাকা। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত দর অনুযায়ী প্রতি ডলার ১১১ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। যদিও ঘোষিত দরে দেশের ব্যাংকগুলোয় ডলার মিলছে না। আমদানিকারকদের কাছ থেকে ব্যাংকগুলো ডলারপ্রতি ১২৪-১২৫ টাকাও আদায় করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সে হিসাবে এ সময়ে ডলারের বিনিময় হার বেড়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশ। খুচরা বাজারে প্রতি ডলারের মূল্য ১২৮ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। ডলার সংকট কমাতে ২০২২-২৩ অর্থবছরের শুরু থেকেই আমদানির লাগাম টেনে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার শর্ত কঠোর করা হয়। ব্যাংকগুলোও ডলার সংকটের কারণে নিজেদের এলসি খোলা কমিয়ে দেয়। ফলে অর্থবছর শেষে আমদানির পরিমাণ প্রায় ১৬ শতাংশ কমে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আমদানির পরিমাণ ২৩ দশমিক ৯০ শতাংশ কমেছে। আমদানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমার পরও দেশে যে পরিমাণ ডলার ঢুকছে, বেরিয়ে যাচ্ছে তার চেয়ে বেশি। এ কারণে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট বা আর্থিক হিসাবের ঘাটতি বড় হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আর্থিক হিসাবে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯৩ কোটি ডলার। দেশের ইতিহাসে এ পরিমাণ ঘাটতি এর আগে কখনই দেখা যায়নি। কোনো দেশে আন্তর্জাতিক সম্পদের মালিকানায় হ্রাস-বৃদ্ধির বিষয়টি পরিমাপ করা হয় আর্থিক হিসাবের মাধ্যমে। এ হিসাবে ঘাটতি তৈরি হলে দেশের রিজার্ভ ও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারের ওপর চাপ বাড়ে। চলতি শতকের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বেশির ভাগ সময়ই বাংলাদেশের আর্থিক হিসাব উদ্বৃত্ত ছিল। বিশেষ করে ২০১০ সাল পরবর্তী এক যুগে কখনই আর্থিক হিসাবে ঘাটতি দেখা যায়নি। কিন্তু ডলার সংকট তীব্র হয়ে ওঠায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে আর্থিক হিসাবে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। গত অর্থবছর শেষে এ ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২১৪ কোটি ২০ লাখ ডলারে। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে আর্থিক হিসাবে ১ হাজার ৫৪৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল। একদিকে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নাজুক, অন্যদিকে নির্বাচন কেন্দ্রিক গরম হয়ে উঠছে রাজনৈতিক প্রাঙ্গণ। নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণার পর লাগাতার হরতাল ও অবরোধের মতো কর্মসূচি দিচ্ছে বিরোধী দলগুলো। ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে সরবরাহ ব্যবস্থা। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ী নেতারাও সরকারের কাছে আলোচনা মাধ্যমে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের রাজনৈতিক সংকটের সমাধান না হলে অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে না। উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হলে দরকার বিনিয়োগ, কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বৈদেশিক বিনিয়োগে ভাটা পড়েছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ী নেতারা। এছাড়া, ডলার সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ক্রয় করতে পারছে না অনেক প্রতিষ্ঠান। এসবের প্রত্যক্ষ প্রভাব এসে পড়ছে সাধারণ জনগণের কাঁধে। অনতিবিলম্বে সমস্ত সংকট মোকাবেলা করে সঠিক ও বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি ঝুঁকিমুক্ত হোক, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসুক; এটাই সবার প্রত্যাশা।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..