ঢাকায় সিপিবি’র সমাবেশ-মিছিল

আওয়ামী লীগের পাতানো নির্বাচনে পা দিবে না সিপিবি

নীতিনিষ্ঠ অবস্থান থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

তফসিল বাতিল করে, তদারকি সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে রাজধানীতে সমাবেশ পরবর্তী সিপিবির বিশাল মিছিল। সমাবেশ থেকে নেতৃবৃন্দ দেশবাসীকে দুঃশাসনের অবসান ও ব্যবস্থা বদলের সংগ্রাম অগ্রসর করার আহ্বান জানান [ ছবি: রতন কুমার দাস ]
একতা প্রতিবেদক : বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) আয়োজিত সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেছেন, গণদাবি ও জনমত উপেক্ষা করে সরকার আবারো একতরফা নির্বাচনের দিকে এগুচ্ছে। একতরফা তকমা ঘোচাতে বিভিন্ন দল ও ব্যক্তিকে নির্বাচনে অংশ নিতে নানা অপকৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এসব কাজকর্ম যে এক কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হচ্ছে– তা গোপন থাকছে না। এ পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন দেশে চলমান রাজনৈতিক সংকট দূর করবে না। বরং দেশ ও দেশের মানুষ নতুন সংকটে পড়বে। সরকারের স্বৈরাচারী, কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা বাড়বে। অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হবে। এই সুযোগে সাম্রাজ্যবাদী, আধিপত্যবাদী শক্তি দেশের ওপর আরো হস্তক্ষেপ বাড়াবে। অন্ধকারের অপশক্তি অগণতান্ত্রিক অবস্থা তৈরীর প্রচেষ্টা নেবে– যা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশে কাম্য নয়। গত ২৪ নভেম্বর বিকেল ৪টায় পুরানা পল্টনস্থ মুক্তিভবনের সামনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) আয়োজিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম। বক্তব্য রাখেন সিপিবি কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ঢাকা উত্তরের সভাপতি ডা. সাজেদুল হক রুবেল, ঢাকা দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি হাফিজুল ইসলাম। সভা পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক মিহির ঘোষ। সমাবেশে সিপিবি প্রেসিডিয়াম সদস্য শাহীন রহমান ও পরেশ কর সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পার্টি কার্যালয়ে এসে শেষ হয়। সভাপতির বক্তব্যে কমরেড মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, রাষ্ট্র, সরকার এবং দল একাকার হয়ে গেছে। আমাদের দেশের নব্বই ভাগ মানুষ দলীয় সরকারের অধীনে নিজের ভোট নিজে দিতে পারবে বলে মনে করে না। সরকারি দলের মন্ত্রী-এমপি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষকে ভয় দেখিয়ে বলছে, ‘আমরা ক্ষমতায় না থাকলে কারা আসবে?’ এত উন্নয়ন, মেগা প্রকল্প করেছেন তাহলে কেন দল নিরপেক্ষ সরকারের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছেন না। তিনি বলেন, অন্য কোন দল বা জোটের জন্য নয়, জনমত হিসাব করেই আমরা নির্বাচন বর্জন করেছি। এ দুদলের কারণে দেশের গণতন্ত্র আজ নির্বাসনে গেছে। মোহাম্মদ শাহ আলম আরও বলেন, লুটেরা রাজনীতিবিদ, লুটেরা আমলা, লুটেরা ব্যবসায়ীদের স্বার্থ আর জনগণের স্বার্থ সাংঘর্ষিক। এদের বিরুদ্ধে আজ বিকল্প শক্তি গড়ে তুলতে হবে। আমাদের দেশের নির্বাচন নিয়ে আমেরিকা আজ অতি তৎপরতা চালাচ্ছে। অথচ আমেরিকার নীতিতে গণতন্ত্র, মানবতার কোন স্থান নেই। সরকারের ব্যর্থতার কারণেই আমেরিকা আমাদের নির্বাচন নিয়ে নাক গলাতে পারছে। সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, উদ্যোগ নিন, সংঘর্ষের হাত থকে দেশকে বাঁচান। সিপিবির সাধারণ সম্পাদক কমরেড রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের নামে একটা সাজানো নাটক মঞ্চস্থ করতে যাচ্ছে। যা আমরা আরো আগে থেকেই দেখছিলাম। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৮ সালে ভোট করে ক্ষমতায় আসলেও ’১৪ ও ’১৮ সালের নির্বাচনে তাদের ভোটের দরকার হয় নাই, জোর করে ক্ষমতায় আছে। এই এক যুগে তারা দেশে দুঃশাসন কায়েম করেছে। দুঃশাসনের ফলে বাজার পরিস্থিতি ভয়াবহ। মানুষের হাতে টাকা নেই, কাজ নেই। জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে। গরিব মানুষ অসুস্থ হলে চিকিৎসা করাতে পারেন না। অন্যদিকে সরকার উন্নয়নের ফিরিস্তি করছেন। উন্নয়ন করেছেন কিসের? লুটপাটের উন্নয়ন করেছেন তারা। এই দুঃশাসনের অবসান ছাড়া মানুষের মুক্তি নাই। কমিউনিস্টরা এই দুঃশাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তিনি বলেন, সরকার গত দুটি নির্বাচনে শুধু ভোটাধিকার হরণ করে নাই নতুন বছর ২০২৪ সালেও সেই একই খেলা খেলতে চাইছে। তিনি আরোও বলেন, টাকার খেলা-পেশী শক্তি, প্রশাসনিক কারসাজি ও সাম্প্রদায়িকতার প্রভাবমুক্ত ছাড়া নির্বাচনে সমসুযোগ থাকে না। নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক করতে জাতীয় সংসদে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি, ‘না’ ভোট, প্রতিনিধি প্রত্যাহার সহ নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। তিনি বলেন, সরকার একতরফা নির্বাচনের পথ থেকে সরে না আসলে দেশবাসীকে এই নির্বাচন বর্জন করতে হবে ও রুখে দাঁড়াতে হবে। বর্তমান সরকারের দুঃশাসনের অবসানে দৃঢ়তার সাথে আন্দোলন অগ্রসর করতে হবে। রুহিন হোসেন প্রিন্স চলমান সংঘাত-সংঘর্ষ, জ্বালাও-পোড়াও, দমন-নিপীড়ন বন্ধের দাবি জানান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন– আন্দোলন, সভা-সমাবেশ-হরতাল-অবরোধ করা দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। আন্দোলন করার অধিকার সবার আছে, তবে জ্বালাও-পোড়াও এর অধিকার কারোর নেই। আবার আমরা সভা-সমাবেশ আন্দোলন করলে, পুলিশ দিয়ে-লাঠিয়াল বাহিনী নামিয়ে ঐ আন্দোলন দমনের অধিকারও কারোর নেই। গণতান্ত্রিক জোটের কর্মসূচি সফল করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বামপন্থিরা নীতিনিষ্ঠ অবস্থানে থেকে সংগ্রাম করছে। এই সংগ্রামে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষকে শরিক হয়ে জনগণের বিশেষ করে মেহনতী মানুষের রাজনৈতিক শক্তিকে বিকল্প হিসেবে সামনে আনতে হবে। নীতিহীন গণবিরোধী রাজনীতিকে পরাজিত করতে হবে। সিপিবির সাবেক সভাপতি, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, আমরা নির্বাচন চাই। কিন্তু নির্বাচনের নামে ভুয়া, অবৈধ, প্রসনের নির্বাচন আমরা মেনে নিব না। কমিউনিস্ট পার্টি দেশবাসীকে সাথে নিয়ে ষড়যন্ত্রের নির্বাচন রুখে দিবে। তিনি বলেন, দেশের মানুষ নানা সমস্যায় জর্জরিত। কৃষক-ক্ষেতমজুর-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের দুর্দশার কথা সবাই জানেন। মানুষ না খেয়ে মরে তার দিকে তাকানোর কেউ নেই। বর্তমানের যে সংকট চলছে তার জন্য দায়ী লুটেরা ধনীক শ্রেণি ও বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার। সুতরাং এর থেকে মুক্তি থেকে হলে লুটেরা ধনীক শ্রেণিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে হবে, শেখ হাসিনার সরকারকেও গদি থেকে সরিয়ে দিতে হবে। সরকার বলছে-তার রাজনৈতিক দর্শন হলো, দেশের স্থিতিশীলতা রাখতে হবে, সেই কারণে সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। অর্থাৎ তারা ছাড়া আর কেউ যেন ক্ষমতায় না আসতে পারে। চিরদিন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে হবে। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু সকল কিছু তাদের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছে। সুতরাং এই সরকারের অধীনে কোন নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না। তিনি আরো বলেন, জিয়া-এরশাদের আমলে নির্বাচনের সময় লাল মার্ক করে কাদের জিতিয়ে আনতে হবে তার তালিকা দেওয়া হতো। স্বাধীনতার পরের নির্বাচনেও এমন ঘটনা ঘটেছে। দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগ-বিএনপি একই কাজ করছে। তারা যখন বিরোধী দলে থাকে, তখন বলে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাই, আবার সরকারে গেলে বলে শিশু আর পাগল ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়। সংবিধান সংশোধনের বিধান আছে। সংবিধান সংশোধন করে কিভাবে নির্দলীয় তদারকি সরকারের অধীনে নির্বাচন করা যায় সে কাজ করুন। কমিউনিস্ট পার্টি গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে এই প্রহসনের নির্বাচনকে ব্যর্থ করে দিতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানাতে হবে। আমাদের লড়াই ভাত ও ভোটের লড়াই। বিএনপি লুটপাটতন্ত্র জারি রাখার জন্য ক্ষমতা ভাগাভাগি করে সরকারের সাথে নির্বাচনে গেলেও কমিউনিস্ট পার্টি নীতির সঙ্গে আপস করবে না। সমাবেশে অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বলেন, নির্বাচন কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ‘এক শতাংশ ভোট পড়লে নির্বাচন বৈধ’- একথা বলে কমিশন আগামী নির্বাচনে বর্তমান সরকারকে বৈধতা দেওয়ার কথা আগে-ভাগে বলেছে। বিভিন্ন স্থানে বিরোধী নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন, হামলা-মামলা, বিরোধী দলের সদস্য-কর্মীকে না পেলে পরিবারের সদস্যদের গ্রেফতার-হুমকির খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করে নেতৃবৃন্দ বলেন, অতীতে স্বৈরাচারী শাসকরা এ পথে হেটে ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। এ সরকারও পারবে না। সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণহীন, মানুষের আয় কমে গেছে। কাজ নেই, লুটপাট-দুর্নীতিও নিয়ন্ত্রণহীন। বামপন্থীরা ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সাথে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি-লুটপাটসহ প্রচলিত ব্যবস্থা পরিবর্তনের সংগ্রাম করছে। একতরফা নির্বাচনে কেনা-বেচার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এর বিপরীতে সিপিবি নীতিনিষ্ঠ অবস্থান বজায় রেখে দুঃশাসনের অবসান ও ব্যবস্থা বদলের সংগ্রাম অগ্রসর করবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..