৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন ও আজকের শিক্ষা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
১৯৬২ সালের পর থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর দিনটি ঐতিহাসিক শিক্ষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। দিবসটি সরকারিভাবে পালিত না হলেও প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলি প্রতিবছর যথাযোগ্য মর্যাদায় এ দিনটি শিক্ষা দিবস হিসেবে পালন করে। শিক্ষার অধিকার আদায়ে ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দিনটিতে ঢাকার রাজপথে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের পুলিশ বাহিনীর বুলেটের আঘাতে জীবন দিতে হয়েছিল গোলাম মোস্তফা, ওয়াজিল্লাহ ও বাবুল প্রমুখ ছাত্রনেতাদের। সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আয়ুব খানের শাসন আমলে শরীফ কমিশনের নেতৃত্বে একটি শিক্ষানীতি প্রদান করা হয়েছিল। শিক্ষানীতির বেশ কিছু বক্তব্য তৎকালীন পাকিস্তানের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় বেমানানই ছিল না শুধু, ছিল অপ্রাসঙ্গিকও। যার মধ্যে উচ্চ শিক্ষা সংকোচন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বছর শেষে পরীক্ষা ব্যবস্থা, ৩ বছর মেয়াদি ডিগ্রি পাস কোর্স চালু এবং ছাত্র বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবনা ছিল অন্যতম। এসব শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ছাত্র ধর্মঘট আহ্বান করা হয়েছিল। সেই ধর্মঘট পালনকালেই পুলিশের বুলেটের মুখে জীবন দেন ছাত্রনেতারা। রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার রাজপথ। পরে আয়ুব খান শরীফ কমিশনের শিক্ষানীতি বাতিল করতে বাধ্য হয়। শিক্ষা সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার হিসেবে পৃথিবীর দেশে দেশে গৃহিত হয়েছে। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা পত্রের ২৬ ধারায় নাগরিকের জন্য শিক্ষা লাভের অধিকার ঘোষণা করা হয়েছে। অন্ততপক্ষে প্রাথমিক ও মৌলিক পর্যায়ে শিক্ষা অবৈতনিক হবে। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সাধারণভাবে সহজলভ্য থাকবে, এবং উচ্চতর শিক্ষা মেধার ভিত্তিতে সকলের জন্য সমভাবে উন্মুক্ত থাকবে। এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণের পর জাতিসংঘ সকল সদস্য রাষ্ট্রকে ঘোষণাপত্রের বিষয়বস্তু প্রচার ও বাস্তবায়নের জন্য আহ্বান জানায়। সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে সবারই দায়িত্ব বর্তায় এগুলি বাস্তবায়নের জন্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানে সেটা কার্যকর হয়নি। বরং ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তান প্রথমেই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের বাংলা ভাষা ধংসের চক্রান্ত করে ১৯৪৮ সালেই পাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুও কথা ঘোষণা করে। ১৯৫০ সালে রাজশাহীর খাপড়া ওয়ার্ডে পুলিশি হামলায় ৭ জন বামপন্থি রাজনীতিককে হত্যা ও ৩২ জনকে আহত করা হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে জীবন উৎসর্গ করেন সালাম, বরকত, রফিক, সফিক ও জব্বারদের মতো চিরঞ্জীবরা। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ৯২ এর ‘ক’ ধারা জারির মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তথাকথিত স্বাধীন পাকিস্তানে ১৯৫৬ সালের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত কোনো সংবিধান প্রণয়ন সম্ভব হয়নি বরং পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের স্বার্থবিরোধী নানা কালাকানুন জারি করতে থাকে পাকিস্তানের শাসকেরা। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতিচর্চার পরিবর্তে পুলিশি রাষ্ট্র কায়েমের প্রক্রিয়া হিসেবে ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করা হয়। এসমস্ত ঘটনার প্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তানের সচেতন জনগণ এবং রাজনৈতিক মহলে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই ১৯৬২ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত হয়ে স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম হলেও পাকিস্থানে ব্রিটিশদের মতই পুঁজিবাদী তথা ধনিক-বণিক নির্ভর লুটেরা অর্থনীতির পথ অনুসরণ করে। ১৯৫৬ সালের গৃহিত সংবিধানে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটায়। প্রগতিশীলতা অবরুদ্ধ হয়, বাঙালি সংস্কৃতি ও বাংলা ভাষাকে ধংসের চক্রান্ত হয়। সব মিলে বাঙালির মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। সামরিক শাসন বলবৎ থাকায় সভা সমাবেশ মিছিল মিটিং বন্ধ হয়ে যায়। ২১ ফেব্রুয়ারি সীমিত পরিসরে প্রভাতফেরী অনুষ্ঠিত হতো? ১৯৬২ সালে ১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-ধর্মঘটের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে ১৭ সেপ্টেম্বর ছাত্র নেতাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। শিক্ষা কী? কেন এবং কীভাবে এটা প্রদান করা যায়? সে বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভোগবাদী সমাজে মুনাফাভিত্তিক এবং পুঁজিবাদী সমাজে যেভাবে সবকিছুকে পণ্য ভাবা হচ্ছে এবং টাকা দিলে পণ্যের মতোই যেভাবে সব হাতে পাওয়া যায় তাকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবতেই হয়। তবে এখনো বিশ্বেও বহু দেশে শিক্ষা সাংবিধানিক এবং মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি আছে। সেই বিবেচনায় শিক্ষার দর্শন নির্ধারিত হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য হওয়ার কথা নয়। এজন্য ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়নের বিষয়েও ভাবনার উন্নতি হওয়া দরকার। ব্যক্তির দেহ ও মনের সকল ক্ষমতা বিকশিত, বিবর্তিত মার্জিত করে, তাকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এর জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান নৈপুণ্য ও দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী করে তোলার ব্যবস্থাদির নাম যদি শিক্ষা হয়, তাহলে মানবতাবাদী এবং কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হলে শিক্ষার দর্শন, অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনা এমন হবে, যেখানে সবার জন্য একই ধরনের অসাম্প্রদায়িক ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা হওয়া দরকার। পৃথিবীর যে সমস্ত দেশ শিক্ষা, সংস্কৃতি আর অর্থনীতিতে এগিয়েছে, তাদের শিক্ষার ইতিহাস এমনটাই। শিক্ষার দর্শন হিসেবে ভাববাদ, যুক্তি, দর্শন সর্বশেষে বিজ্ঞানই অন্যতম মাধ্যম। এই ধারাবাহিকতাকে উপেক্ষা করে শিক্ষার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করলে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যুগের চাহিদা মিটাতে সক্ষম হবে কি? ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে লর্ড মেকলেকে দিয়ে সেই শিক্ষানীতি দেয়া হয়েছিল, যা অক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন ও হিসাব-নিকাশ করার মত একটি জাতি সৃষ্টি ছাড়া সৃজনশীল ও সত্যের পক্ষে অবস্থান গ্রহণকারী বা অন্যায়ের বিপক্ষে দাঁড়ানোর মত চেতনাবোধ ঐ শিক্ষা ব্যবস্থায় সৃষ্টি হয়নি। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি- জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতার আলোকে এবং সংবিধানের ১৭ এর ‘খ’ ধারার আলোকে একই ধারার সর্বজনীন বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। জাতীয় বাজেটে জিজিপির প্রাথমিক ভাবে ৫% এবং পর্যায়ক্রমে ইউনেস্কোকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৭% করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তারই অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধু একবারে ৩৫১৭০ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করেছিলেন, তাঁর কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে আরও ২৬ হাজার প্রাইমারি স্কুল সরকারিকরণ করা হয়েছে। যদিও এখনও ৪ হাজারের মতো প্রাইমারি স্কুল এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে ৯০ ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি রয়ে গেছে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস সেই সাথে শিক্ষা ব্যবস্থাকেও আবার সাম্প্রদায়িক করা হয়েছিল। এখনও সেই ধারা অব্যাহত আছে। সংবিধানে একই ধারার সর্বজনীন বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা বাস্তবায়নের কথা থাকলেও বর্তমানে মাদ্রাসা শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা ও ইংরেজি মাধ্যমের (তিনধারার) শিক্ষা বহাল রয়েছে। শিক্ষায় অর্থায়ন, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাড়েনি, শিক্ষা প্রশাসনে দলীয়করণের ভুত বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডিতে দলীয়করণ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪টি বাদে সবগুলোতে দলীয়করণের ভুত চেপে বসেছে, ফলে দলীয়ভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলায় তুলনামূলক কম যোগ্যতার লোক অগ্রাধিকার পাচ্ছে, ফলে শিক্ষার গুণগত মানের ক্ষেত্রে বিরাট সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজের টাকার কমিশন বণ্টনে সমঝোতা করতে দেখা যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবশালীদের। সৃজনশীল আর এমসিকিউ পরীক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে এ+ আর গোল্ডেনের সংখ্যা বাড়লেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতা প্রদর্শন করতে পারছে না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিও আন্তর্জাতিক মানের দিক থেকে অনেক নিচে অবস্থান করছে। বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়ায় গ্রুপ অব কোম্পানির মালিকরা শিক্ষা ব্যবসা শুরু করে শিক্ষার বারোটা বাজিয়েছে। মৌলিক অধিকার শিক্ষা আজ সুপার মার্কেটের পণ্যের মত যার টাকা আছে সেই সেটা কিনতে পারবে। এটি জীবন দিয়ে স্বাধীন করা একটি দেশের জন্য খুবই দুঃখজনক, তবে এটাই এখন বাস্তব হয়ে উঠেছে। ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে, শিক্ষার দর্শনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ১৯৭২ সালের সংবিধানের বিধান যেমন উপেক্ষিত হয়েছে, সাথে সাথে ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়নের ক্ষেত্রেই কোনও ইতিবাচক অগ্রগতি হয়নি বরং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলটির ক্ষমতাশীল আমলে শিক্ষা কারিকুলামে সাম্প্রদায়িকতা প্রশ্রয় পেয়েছে। আগে-পিছের শিক্ষার একাডেমিক ও কারিকুলামগত স্বীকৃতি না থাকলেও কওমি মাদ্রাসার শেষ পর্যায়ের শিক্ষাকে মাস্টার্সের মর্যাদা শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে হ-জ-ব-র-ল সৃষ্টি করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এই শিক্ষাকে কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। বিজ্ঞানভিত্তিক, যুক্তিনির্ভর, আধুনিক শিক্ষার বিষয়বস্তু হওয়া উচিত মানবিকতা, সৃজনশীলতা, যৌক্তিকতা ও উৎপাদনশীলতা। ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনকে দমন করতে, পুলিশ ব্যবহার হয়েছিল আর আজকের ছাত্র আন্দোলনকে দমন করতে পুলিশ ও দলীয় লাঠিয়াল ও হেলমেট বাহিনী ব্যবহার হচ্ছে। কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মত একটি অরাজনৈতিক সামাজিক আন্দোলন দমন করতে সরকারের পক্ষ থেকে যেভাবে হামলা, গ্রেফতার, রিমান্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছিল তা গণতান্ত্রিক সরকারের আচরণ নয় বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন তহবিল থেকে প্রশাসনের পক্ষে রুলিং পার্টির ছাত্র সংগঠনের নেতাদের যখন বখরা দেওয়া হয়, তখন ঐ ছাত্র সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তল্পিবাহক এবং লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার হওয়া ছাড়া ছাত্র অধিকার আদায়ে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। সেটা অনেক পূর্ব থেকেই দৃশ্যমান। কবে যে ছাত্র রাজনীতির এই দেউলিয়াত্ব ঘুচবে কে জানে? প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই যখন ভর্তি পরীক্ষা ছাড়া কেবলই দলীয় বিবেচনায় ভিসি ও ডিনের চিরকুটে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়, তখন শিক্ষার করুণ অবস্থা বুঝতে আর কোনো বিষয়ের খোঁজ করার প্রয়োজন নেই। তবে আগামী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য এটা সুখকর হবে না।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..