মৃত্যুপুরী : ভূমিকম্পে মরক্কো ঝড়-বন্যায় লিবিয়া

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিদেশ ডেস্ক : ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে আফ্রিকার দুই দেশ মরক্কো ও লিবিয়া। এর মধ্যে ৬.৮ মাত্রার ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে মরক্কো আর ঘূর্ণিঝড়ের পর বাঁধ ভেঙে তীব্র বন্যায় ক্ষতবিক্ষত হয়েছে লিবিয়া। সরকারি হিসেবে মরক্কোতে তিন হাজারের বেশি এবং লিবিয়ায় ১১ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এই সংখ্যা প্রতিনিয়িতই বাড়ছে। আহতের পাশাপাশি এখনো নিখোঁজ আছেন অসংখ্য মানুষ। গত ১০ সেপ্টেম্বর উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ড্যানিয়েল। এতে দেশটির উপকূলীয় শহরগুলোর শতশত বাড়ি উড়ে যায়, মারা যান শতাধিক। এর মধ্যে রাতেই ভেঙে যায় একাধিক বাঁধ। তার ফলে জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে ভেসে যায় সাগর পাড়ের শহর ডেরনা। ধসে পড়ে শত শত বহুতল ভবন । এর নিচে চাপা পড়ে বহু ঘুমন্ত পরিবার। অনেক মানুষকে সমুদ্রের পানি টেনে নিয়েছে। ডেরনা শহরের মেয়র আবদুল মেনাম আল গাইতি বলেছেন, ভয়ংকর এই দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা ২০, ০০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। কারণ, বন্যায় মাটির সঙ্গে মিশে গেছে সব কিছু। ডেরনা জুড়ে এক ভয়াবহ দৃশ্য। চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। যারা বেঁচে আছেন, স্বজন হারানোর বেদনায় গগণবিদারী চিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলছেন তারা। হাজার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ। কেউ জানেন না প্রিয়জন কোথায় আছেন। কেমন আছেন। শহরে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে। বিদ্যুৎ নেই। জ্বালানি তেল নেই। পুরো শহর মাটিতে মিশে গেছে। সমুদ্রপাড়ে পড়ে আছে মানুষের কাপড়চোপড়, বাচ্চাদের খেলনা, আসবাবপত্র, জুতা ও বিভিন্ন ব্যবহৃত জিনিসপত্র। পুরু কাদায় ঢেকে আছে রাস্তা। গাছগুলো উপড়ে পড়ে আছে। এখানে ওখানে পড়ে আছে নষ্ট গাড়ি। শহরটির বাসিন্দা মাহমুদ আবুল করিম বলেছেন, তিনি মা ও ভাইকে হারিয়েছেন। ড্যাম ভেঙে যাওয়ার পর তাদেরকে তিনি উদ্ধার করতে সক্ষম হননি। তার মা তাকে বলেছিলেন, এটা কিছু না। সাধারণ ঝড়বৃষ্টি। কিন্তু এর তীব্রতা বাড়তে থাকে। এ সময় তার মা ও ভাই বাসা ছাড়তে সিদ্ধান্ত নেন। ততক্ষণে তাদেরকে বন্যার পানি ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এমনিতেই দেশটি কমপক্ষে এক দশকের গৃহযুদ্ধ, বিশৃঙ্খল অবস্থার কারণে বিপন্ন। তার ওপর এতবড় আঘাতে জীবনযাত্রা ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়েছে। লিবিয়া মূলত দুটি সরকারে বিভক্ত। এর পূর্বে আছে খলিফা হাফতারের সরকার। পশ্চিমে আছে আন্তর্জাতিকভাবে

স্বীকৃত সরকার। ফলে কোনো সমন্বিত উদ্যোগ নেই দুর্গত মানুষদের বাঁচাতে। এদিকে ৯ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে মরক্কোর পর্যটন শহর মারাকেশের দক্ষিণে পাহাড়ি গ্রামগুলোতে আঘাত হানে ৬ দশকি ৮ রিখটার স্কেলের শক্তিশালী ভূমিকম্প । গত ৬০ বছরের মধ্যে এটাই সেখানে সবচেয়ে প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প। ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে বাড়িঘর। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সড়ক যোগাযোগ। একের পর এক ভবন বিধ্বস্ত হয়ে চলার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ স্থাপনা মারাকেশ শহরও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভয়ংকর ওই ভূমিকম্পে গত ১৩ সেপ্টেম্বরই মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯০১ জন। আহত ৫ হাজার ৫৩০। জাতিসংঘের হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩ লাখেরও বেশি মানুষ। যার মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই শিশু। ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল পর্যটন শহর মারাকেশ থেকে প্রায় ৭১ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে হাই এটলাস মাউন্টেইনে। মারাকেশ শহরটি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় এক স্থান। কারণ এটি বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। ভূমিকম্পের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, তা রাজধানী রাবাত থেকেও অনুভূত হয়েছে। কম্পন অনুভূত হয়েছে কাসাব্লাঙ্কা, আগাদির এবং ইসোউইরা থেকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছেন আল হাউজ প্রদেশে। এরপরেই রয়েছে তারৌদান্ত প্রদেশ। ভূমিকম্পের পরপরই পুরোদমে শুরু হয়েছে উদ্ধার কার্যক্রম। চলছে এখনো। ধ্বংসস্তূপে এখনও এর নিচে চাপা পড়ে আছেন অসংখ্য মানুষ। তবে দিন যাচ্ছে যারা বেঁচে আছেন, তাদেরকে জীবিত উদ্ধারের আশা ক্রমশ ক্ষীণ হচ্ছে। জীবিত উদ্ধারের আশায় ভাঙা কাদা-ইটের বাড়ির ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে খুঁড়ে দেখছেন দেশ ও দেশের বাইরের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল। উদ্ধারকাজে গ্রামবাসীও খালিহাতে হাত লাগিয়েছেন। তারা আস্ত এক একটা কংক্রিটের স্তর সরিয়ে ফেলছেন। উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে মেশিনারি বহন করতে হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু তাতে কাজ হচ্ছে না। উল্টো যে কয়েক হাজার মানুষ মারা গেছেন, তাদের দাফন করার জন্য কবর খুঁড়তেই এসব মেশিনারি বেশি দরকারি হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে যেসব মানুষ বেঁচে আছেন, তাদের জন্য জরুরি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র প্রত্যন্ত ওইসব এলাকায় পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে। এক গ্রামবাসী বলেছেন, আমাদের আর কিছুই নেই। মানুষ অনাহারে আছে। শিশুরা পানি চাইছে। আমাদের সাহায্য করুন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..