বিজ্ঞান শব্দের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে

জন বারডন হলডেন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মূলত গণিতবিদ ও জীববিজ্ঞানী হিসেবে খ্যাত ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জন বারডন হলডেনের জন্ম ১৮৯২ সালে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে। এই ব্রিটিশ মার্কসবাদী বিজ্ঞানী ভারতে ছিলেন ১৯৫৭ সাল থেকে আমৃত্যু। ধুতি-কুর্তা পরিহিত এই বাঙালী সাহেব বিজ্ঞানের গুরুগম্ভীর চেহারাটাকে কাদা-মাটির সারল্যে মেশাতে পেরেছিলেন তাঁর জীবনব্যাপী বিজ্ঞান ও সমাজচর্চার অকৃত্রিম নিষ্ঠায়। সংস্কৃতি ভাবনায় বিজ্ঞানকে সংশ্লেষিত করার উদ্দেশে বিস্তর লিখেছেন তিনি সর্বস্তরের শিক্ষিত মানুষের জন্য। এরকমই একটি সংকলনগ্রন্থ ‘Science and Indian Culture’ প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯৬৫ সালে। এই গ্রন্থেরই একটি প্রবন্ধ হল ওং ‘Science’ a Misnomer। বিজ্ঞান সম্পর্কে খণ্ডিত ও যান্ত্রিক ধারণার বিপরীতে মানুষকে প্রকৃত বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে–এই বিবেচনায় আলোচ্য লেখাটির ভাবানুবাদ প্রকাশ করা হলো। ইউরোপের মাটিতে ইউরোপীয় শিক্ষা-সংস্কৃতির ধারাকে প্রথাগতভাবেই মেনে নিয়েছিলাম–এর সর্বজনীনতা নিয়ে কোনো সংশয় আসেনি বা বিশ্লেষণের অবকাশ হয়নি। কিন্তু প্রবাসে, এই ভারতবর্ষে এসে, সংস্কৃতির তাৎপর্যকে আমি যথাযথভাবে অনুধাবন করতে শুরু করেছি। দেশে চল্লিশ বছর ধরে ছাত্রদের বিজ্ঞান শেখাচ্ছি, অথচ এখানে এসে এক ধাক্কা খেলাম যখন অবিষ্কার করলাম যে শিক্ষাপদ্ধতি সম্পর্কে আমার মৌলিক ধারণাগুলি ভারতের মাটিতে কার্যকরী নয় মোটেই। কোনো এক রবিবার বিকেলে আমি বাড়ির সামনে পায়চারি করছিলাম, হঠাৎই কানে এলো একটানা কীর্তনের মত সুর করে এক পুরুষ কণ্ঠ কিছু আবৃত্তি করছে। আমি অনুমান করলাম–ওটা মন্ত্রোচ্চারণ হচ্ছে এবং আমার সঙ্গীর থেকে জানতে চাইলাম মন্ত্রটা কীসের। কোন একটা ধর্মীয় সূত্র বা ছত্র বারবার উচ্চারণ করার রীতি ভারতের মত ইউরোপেও রয়েছে এবং আমি নিঃসন্দেহ যে এই প্রক্রিয়ায় আবৃত্তিকার তার মনকে একাগ্রভাবে একটি নির্দিষ্ট চিন্তার দিকে চালিত করতে পারে। আমি ঠিক বলতে পারবো না যে এরকম মন্ত্রোচ্চারণ বা একটানা আবৃত্তির মধ্যে দিয়ে সেই ব্যক্তি এক বিশেষ উপলব্ধির জগতে পৌঁছতে পারেন কি না–যে উপলব্ধি সারা পৃথিবীতে কয়েকজন মাত্র মহাপুরুষই আয়ত্ত করেছেন (যদিও তাঁরা বলেন যে সে-উপলব্ধি বা অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না)। কিন্তু, আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার সঙ্গী জানালেন, আবৃত্তির ভাষা হল ইংরেজি আর বিষয়টা–জৈব রসায়ন। আমরা ফিরে এলাম এবং শুনে নিশ্চিত হলাম, হ্যাঁ তাই বটে। পুরুষ কণ্ঠ ‘অ্যালিফ্যাটিক অ্যামিন্স’ (Aliphatic amines)-এর প্রস্তুতপ্রণালী বারবার পড়ে পড়ে মুখস্থ করছিলো। এরকম পুনরাবৃত্তির পদ্ধতি প্রয়োগ করে আমি নিজে অনেক কিছু শিখেছি; এবং প্রায় এগারোটি ভাষায় যথেষ্ট সংখ্যক কবিতা আমার স্মৃতিতে সংগ্রহ করতে পেরেছি এভাবেই। স্পষ্টতই, কবিতা নির্ভুলভাবেই পড়া ও মুখস্থ করা উচিত। কেননা অনেক সময় একটি মাত্র অক্ষরই অনেকখানি পার্থক্য ঘটিয়ে দিতে পারে; যেমন, কোন ইংরেজি ছত্রে ‘battle’ (যুদ্ধ)-এর বদলে যদি ‘bottle’ (বোতল) এসে যায় তাহলে যে পার্থক্যটা হয়। (অবশ্য আমি মনে করি বোতল বা মদের চাইতে যুদ্ধ অনেক বেশি ক্ষতিকারক, তাই এরকম পরিবর্তনের আমি পক্ষপাতী!) কাজেই, এই একঘেয়ে পদ্ধতিতে আমি কবিতা শিখেছি। কিন্তু বৈজ্ঞানিক বিষয় আমি কখনো এভাবে শিখিনি বা পড়িনি। বরং বিজ্ঞানের তথ্যাবলি যত বেশি সংখ্যক উপায়ে সম্ভব আমি শেখার চেষ্টা করি, এবং ছাত্রদের শেখানোরও চেষ্টা করি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। মেডিকেল ছাত্রদের ‘মানুষের হৃদযন্ত্র’ পড়ানোর সময় আমি তাদের চিন্তা করাতে চেষ্টা করি যে নিজের নিজের বুকের ভেতর হার্টের অংশগুলি কোথায় কিভাবে রয়েছে এবং কেমন করে রক্ত বয়ে যাচ্ছে। সংখ্যাতত্ত্ব (Statistics) পড়ানোর সময় আমি ‘মানুষের পরমায়ু’ থেকে লাফ দিয়ে চলে যেতে চাই দাড়ি কাটার ব্লেডের আয়ুষ্কালের আলোচনায় যাতে আমার শ্রোতাদের মনও একইরকম বৈচিত্র্যে তৎপর হতে পারে। কবিতা জানার থেকে বিজ্ঞান জানার ব্যাপারটা একেবারেই পৃথক–কিংবা বলা ভালো, পৃথক হওয়া উচিত। কোন বিষয় অনুধাবন করতে গিয়ে যত বেশি প্রতীক বা উদাহরণ ব্যবহার করা সম্ভব হবে তত বেশি বাস্তব উপলব্ধির কাছাকাছি এগোন যাবে। ধর্মীয় জগতে এর সত্যতা থাকুক বা না থাকুক, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এটি অতীব সত্য। খুব পরিচিত কোন বস্তুকেও যত বেশি প্রকারে ইন্দ্রিয়-চেতনায় অনুভব করা যায় ততই ভালো । ঘরের পাশের চেনা পাখীগুলোকে শুধু কান দিয়ে নয়, চোখ দিয়েও জানা দরকার, যেমন দরকার কুকুর বেড়ালকে তাদের গন্ধ দিয়েও চেনা। ছাত্রাবস্থায় আমরা যখন তুলনামূলক দেহ গঠনতন্ত্রের (Comparative Anatomy) পাঠ নিয়েছি তখন প্রথমে চোখে দেখে অস্থি চেনা হত, তারপর টেবিলের নীচ দিয়ে এক খণ্ড অস্থি সহপাঠীর হাতে দিয়ে স্পর্শানুভূতির সাহায্যে সেটি চেনার চেষ্টা হত। “বিজ্ঞান”-এ সচেতন হতে গেলে যেরূপ জ্ঞানের প্রয়োজন সেটি কিন্তু পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাশ পাওয়ার উপযোগী জ্ঞানের চাইতে অনেক অনেক দূরের ব্যাপার। এটা ঠিক যে এমন বেশ কিছু তথ্য সম্পর্কে আমি বেমালুম অজ্ঞ যেগুলি আমার অনুজ সহকর্মীরা সম্যক জানেন। তবে আমি কিন্তু জানি কোন্ বই বা পত্রিকা খুঁজলে ওই তথ্য জেনে নেওয়া যাবে। আর যেটা আরো গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো কোনটা অজানা সেটা আমি জানি। আমার তরুণ সহকর্মী যখন আমাকে এসে তাঁর পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার ফলের কথা বললেন তখন আমি বললাম যে আমার মনে হয় ওই পর্যবেক্ষণটি একেবারেই মৌলিক, আগে কেউ ওরকম আবিষ্কার করেন নি। আমি তাকে পরামর্শ দিলাম ইওরোপ ও আমেরিকার দুজন বিজ্ঞানীকে লিখতে। পরে জানা গেল, সত্যিই আমার তরুণ বন্ধুর পর্যবেক্ষণটি একেবারে মৌলিক ছিল। আমার গবেষণায় অনেক সাফল্যই এসেছে মানুষের অজ্ঞতা সম্পর্কে আমার জ্ঞান থেকে। আমার যতদূর ধারণা–এই বিশেষ জ্ঞানটি কখনো ক্লাসে শিখিয়ে দেওয়া হয় না। কিন্তু আমার মতে, বিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল–বিজ্ঞানের জ্ঞান নয়, তার পদ্ধতি বা method। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যাখ্যা করা যায় না, কেবল প্রদর্শন করা যায়। গবেষণা হ’ল ঠিক কবিতা রচনার মত। বড় কবি এবং বড় বিজ্ঞানী–উভয়েই নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও নিয়মের প্রতি বিশ্বস্ত কিন্তু প্রয়োজনে সেই দঢ় নিয়মকে ভেঙে ফেলতে তাঁরা কুণ্ঠা বোধ করেন না। তাঁদের এই নিয়মভঙ্গতাই আগামী যুগের শিল্পকলা ও বিজ্ঞানের স্ফূরণ ঘটাতে মনে রাখতে হবে, কোন অভিনব ফলাফল পেতে গেলে বর্তমান নিয়মটা ভাঙতেই হবে যে নিয়মটাকে পূর্বে কেউ আঘাত করেনি। সাধারণভাবে নিজের ক্ষেত্রে বলতে পারি, আমি বিশেষ কোন একটি বৈজ্ঞানিক “সমস্যা” নিয়ে আগ্রহী নই বরং জীব, পশুপাখি, গাছ ও তাদের জগৎ নিয়ে–অথবা বলা যায় এদের পর্যবেক্ষণের প্রক্রিয়ায়, আমার অধিক আগ্রহ। একটি পরীক্ষা অনুসন্ধান, বা পর্যবেক্ষণ থেকে শেষ অবধি কী বেরিয়ে আসবে তা নিয়ে আগে থেকে আমি ভাবি না। অবশ্যই, আমার ছাত্রছাত্রীদেরও ঠিক এইভাবে কাজ করতে বলতে আমি পারি না। কেননা আমার অধীনে গবেষণা করতে এলে তাকে নির্দিষ্ট একটি “প্রবলেম” বা বিষয় দিতে হবে যার ওপর কাজ ক’রে দু’এক বছরের মধ্যে সে নিটোল কিছু ফলাফল পেয়ে যাবে। কার্যক্ষেত্রে এটাই হয়। আমার বাবাও আমার গবেষণাজীবন এভাবেই শুরু করিয়েছিলেন। কিন্তু আমি সবসময় আমার ছাত্রছাত্রীদের তাদের ইচ্ছামত বিষয়ে পড়াশুনা ও পর্যবেক্ষণের কিছু সুযোগ ক’রে দেওয়ার চেষ্টা করি। এবং যারা ‘তিন-চার বছরে সাফল্য’ লাভের সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে না তাদের আমি গবেষক হিসেবে অনুমোদনও করি না। আমি অবশ্য জানি যে তাদের মধ্যে আমার আকাক্সিক্ষত সৃজনশীলতা পাওয়া দুষ্কর কেননা গবেষণা কেবল বৃহৎ টেলিস্কোপ, পারমাণবিক চুল্লি আর প্রচুর দামি যন্ত্রপাতির মধ্যেই আটকে থাকলে ছাত্রছাত্রীদের সে মানসিকতা গড়ে উঠতে পারে না। আমি তবু প্রত্যাশা রাখি যে তারা নিজের উদ্যোগে অন্তত কিছু মৌলিক তাত্ত্বিক কাজ করবে। আমার দৃষ্টিকোণ থেকে বিজ্ঞান হলো একটি দৃষ্টিভঙ্গী, কিছু তথ্য-তত্ত্বের সমাবেশ নয়। মনে করুন আপনি কোন ব্যাঙ, জৈব অণু, আকাশের অস্থির জ্যোতিষ্ক বা এরকম কোন বিষয়ে আগ্রহী তাহলে সে বিষয়টি নিয়ে কিছু আপনাকে জানতে-শিখতে হবেই। এ ব্যাপারগুলি সম্পর্কে কিছুই জানা না থাকলে আপনার আগ্রহটাও আর থাকবে না। আবার নাম কা ওয়াস্তে ‘আগ্রহী’ হওয়াটাই যথেষ্ট নয়। আপনার আগ্রহ বা আকর্ষণ থেকে ব্যাঙ নিয়ে কোন কবিতা আপনি লিখে ফেলতে পারেন, যেমন দাস্তে বা ক্লেয়ার করেছিলেন। (কবিতাটা ভালো হলে তা অবশ্যই খারাপ বিজ্ঞানের চাইতে ভালো) কিন্তু আপনার আগ্রহই আবার ব্যাঙ সম্পর্কে কবিতার মাধ্যমে আবেগ প্রকাশের চেয়ে অন্য কিছু করাতে পারতো–ব্যাঙ সম্পর্কে নতুন তথ্যাদির আবিষ্কার বা সৃজন ঘটাতে পারতো। সেরকম কিছু করলেই আপনি হবেন একজন বিজ্ঞানী, কবির থেকে পৃথক। ......অবশ্য আগ্রহ বা ইচ্ছা না থাকলেও আপনি কিছু না কিছু সৃষ্টি করতে পারেন; যেমন অফিসে অনেকগুলো সংখ্যা যোগ করেন রোজ, কারখানায় কাপ-ডিশ বা জুতো তৈরি করেন রোজ। তবে সে সৃজনে সৌন্দর্য আসে না, প্রাণের মিল থাকে না নিজের মেশিনের প্রতি আগ্রহ বা অনুরাগ থাকলে কাজের ধারাও সুন্দর ও সাবলীল হয়। সুতরাং আমার ভাবনার ধারা এরকম সিদ্ধান্তের দিকেই এসে যাচ্ছে যে ‘বিজ্ঞান’ শব্দটির বিরাট রকমের ভুল অর্থ পশ্চিম ইওরোপে করা না-হলেও ভারতবর্ষে করা হয়। আমি জানি না এই শব্দের অর্থ অধিকাংশ ভারতীয় ভাষায় কী করা হয়, তবে আমার মতে ‘বিজ্ঞান’-এর শব্দার্থ হওয়া উচিত “প্রকৃতির প্রতি আগ্রহ”। এটা বললাম কারণ, আমি যা বুঝি, প্রকৃতি শব্দটি মানবমনের সেই বিশেষ ভূমিকার দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করে যে দিকগুলি বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে। আমাদের এই প্রকৃতি বৈচিত্র্যে ভরপুর। এখানে খোলা চোখে বিচিত্র বিষয়ে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়াই বিজ্ঞান শিক্ষার প্রাথমিক পাঠ হতে পারে। বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে পাঠ্য বিষয়ের মিলমিশ ঘটিয়েই আমরা বৈজ্ঞানিক হয়ে ওঠার দিকে এগিয়ে যেতে পারি। ভাবানুবাদ : অশোক বন্দ্যোপাধ্যায়

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..