আসছে বাজেট

জনআকাঙ্ক্ষার বিপরীতে গুরুত্ব পাচ্ছে আইএমএফের নির্দেশনা

আহমেদ মিঠু

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) খবরদারি অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেড়ে গেছে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বহুজাতিক এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর দেশের নীতি-নির্ধারকদের নির্ভরশীলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ঋণের বিনিময়ে একের পর এক শর্ত চাপিয়ে দিয়ে তা বাস্তবায়নে দেশের অর্থনৈতিক নীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে সংস্থাটি। আগামী (২০২৩-২৪) অর্থবছরের বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে সরকার পুরোপুরিভাবে আইএমএফের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয়তা ও দাবি-দাওয়া উপেক্ষা করে শুধুমাত্র আইএমএফের নির্দেশনা মতো নতুন বাজেট তৈরি হচ্ছে বলে জানা গেছে। অথচ নির্বাচনের আগে এটাই শেষ বাজেট। অতীতে ভোটের আগে গোঁজামিল দিয়ে হলেও বাজেটে ভোটারদের খুশি করার জন্য নানা ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে ভর্তুকি ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়িয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে উল্টোটা। জনআকাঙ্ক্ষার বিপরীতে হাঁটছে নির্বাচনের আগে শেষ বাজেট। এর নেপথ্যে আছে আইএমএফ। আর সাধারণ মানুষকে উপেক্ষা করতে সরকারকে সাহস যোগাচ্ছে বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থা। রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় সকল প্রতিষ্ঠানে অগণতান্ত্রিক কর্তৃত্ব আরোপ করার কারণে এই সরকারকে আর মানুষের ভোটের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না। রাতের অন্ধকারে বা অন্য কোনো কারসাজিতে ব্যালট বাক্স ভরে নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার ব্যবস্থা রপ্ত করেছে তারা। ফলে মানুষের কল্যাণের চেয়ে ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করাই এখন তাদের একমাত্র চিন্তা- যেখানে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ও তাদের নিয়ন্ত্রণকারী পুঁজিবাদী দেশগুলো পালন করছে রক্ষকের ভূমিকা। পুঁজিবাদী শোষণের অন্যতম হাতিয়ার মুক্তবাজার ব্যবস্থার ব্যর্থতায় গত তিন দশকে বিশ্ব জুড়ে একের পর এক অর্থনৈতিক সংকট আঘাত হেনেছে। করোনা মহামারির পর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে ২০২২ সালে বিশ্বজুড়ে চরম মন্দা শুরু হয়- যা এখনো চলছে। আইএমএফসহ পুঁজিবাদের রক্ষকদের নানামুখী দৌঁড়ঝাপেও দেশে দেশে এই সঙ্কটের সমাধান হচ্ছে না। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় শ্রমজীবী মানুষের জীবনে দুঃসহ অবস্থা নেমে এসেছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দ্রব্যমূল্য বাড়তে বাড়তে ইতোমধ্যেই তা মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে তাল মেলাতে না পেরে দেশের কোটি কোটি মানুষ চরম সঙ্কটে দিনযাপন করছে। দেশের ৯৫ ভাগ মানুষের এই সংকট কাটাতে বাজেটে নীতিগত দিকনির্দেশনার পাশাপাশি সহায়ক নানা কর্মসূচি থাকা জরুরি। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, কৃষি উপকরণসহ সাধারণ মানুষের অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম কমাতে ভর্তুকি বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্তের আয় বাড়াতে সরাসরি সহযোগিতামূলক কর্মসূচির আওতা বাড়ানো জরুরি। কিন্তু সেই পথে না গিয়ে আইএমএফের চাপে বিপরীতমুখী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। বাজেট ঘাটতি সামলাতে আইএমএফের কাছে হাত পেতেছে সরকার। সুদাসলে বিদেশি ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশ বেশ সুনামধারী। আর তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে ঋণ দিতে আইএমএফের আগ্রহেরও কমতি নেই। ফলে বাংলাদেশকে কাক্সিক্ষত ঋণ দিতে আপত্তি করেনি তারা। গত ৩০ জানুয়ারি ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে সংস্থাটি। আর বরাবরের মতোই এই ঋণ পাওয়ার জন্য অনেকগুলো শর্ত মেনে নিয়েছে সরকার- যার বেশিরভাগই গণবিরোধী। ঋণচুক্তির আগে সেই শর্ত পূরণ করে আইএমএফের আনুগত্য প্রমাণের জন্য জ্বালানি তেল, সার এবং বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির মতো একের পর এক গণবিরোধী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। ঋণের বিনিময়ে আইএমএফ রাজস্ব, মুদ্রা ও বিনিময় হার, আর্থিক খাত, জলবায়ু পরিবর্তন খাত এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন শর্ত চাপিয়ে দিয়েছে। আইএমএফের এই সংস্কার কর্মসূচির সবচেয়ে খারাপ দিক হলো, এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। প্রতিটি পদক্ষেপই মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে তুলে। বাংলাদেশ এর আগেও বেশ কয়েকবার আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিতে ছিল দেশ। তবে জনগণের জন্য এ কর্মসূচির অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। তাদের সুপারিশে ভ্যাট প্রবর্তনের নামে ধনী-গরিব সব ভোক্তাকে তারা এক কাতারে দাঁড় করিয়েছে। জানা গেছে, আইএমএফের শর্ত পূরণের জন্য আগামী বাজেটে ভর্তুকি কমিয়ে আনতে চাইছে সরকার। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে গ্রাহক পর্যায়ে খুচরা বিদ্যুতের দাম তিন দফা এবং পাইকারিতে এক দফা বাড়ানো হয়েছে। আগামী জুনে বিদ্যুতের দাম আরেক দফা বাড়ানো হবে। এছাড়া গ্যাসের দাম গত বছরের শেষ দিকে এক দফা এবং চলতি বছরের প্রথম দিকে আরো একদফা বাড়ানো হয়। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মূল্য সমন্বয়ের নামে কয়েক দফায় দাম বাড়ানো হয় জ্বালানি তেলের। বাড়ানো হয়েছে সারের দাম। অন্যদিকে বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য এর আগে বিভিন্ন পণ্যের শুল্ক ও ভ্যাট তুলে দেওয়া হলেও এবার চরম সংকটকালে সেই ব্যবস্থা থেকে সরে এসেছে সরকার। গত এপ্রিলের পর থেকে ভোজ্য তেল ও চিনির ওপর ভ্যাট ছাড়ের সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। সেই সুযোগে বাজারে এসব পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। অন্যদিকে আইএমএফের শর্ত মেনে বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী জুলাইয়ে মুদ্রানীতিতে ঋণ ও আমানতের সুদের হারের সীমা তুলে দিয়ে তা বাজারভিত্তিক ঘোষণা দিবে। তাহলে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ বাড়িয়ে দেবে। এতে বিনিয়োগ কমে যাবে। পণ্য ও সেবা উৎপাদন খরচ বাড়বে। এতে বাজারে পণ্যের দাম আরো বাড়বে– যার ভুক্তভোগী হবেন সাধারণ মানুষ। আইএমএফের ভর্তুকি কমানোর শর্ত বাস্তবায়নের ফলেই দেশ এখন মূল্যস্ফীতির বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে। যা গত ৫২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এতে হাঁপিয়ে উঠেছে মানুষ। বেড়ে গেছে জীবনধারণের ব্যয়। মানুষের কাছে এখন উন্নয়নের বিশাল ফিরিস্তি হাস্যকর মনে হচ্ছে। আইএমএফের শর্ত পূরণে আগামী বাজেটে শিল্প খাতের বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে কর অব্যাহতি সুবিধা তুলে দেয়া হতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হলে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এতে বিদেশে পণ্য রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আবার দেশেও এসব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। গত চার দশকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের অসংখ্য শর্ত পূরণ করেছে বাংলাদেশ। ঋণদাতা সংস্থাগুলো শুধু শর্ত বা পরামর্শ দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, তারাই তৈরি করে দিয়েছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতি, পরিকল্পনা ও কৌশলের দলিল। বিগত রাজনৈতিক সরকারগুলো বিনা বাক্যব্যয়ে তাদের সব নির্দেশনা মেনে নিয়েছে। ‘রাষ্ট্র-সংকোচন’ করে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতকে ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দিয়েছে। সরকারের জনকল্যাণমুখী বিভিন্ন কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছে। দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে জ্¦ালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম। তবে এরপরও সন্তুষ্ট নয় আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। সকল ক্ষেত্রে ভর্তুকি তুলে দিয়ে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি কার্যকর করতে চায় তারা। অর্থাৎ মানুষের জীবন-জীবিকা নয়, মুনাফাই হবে মূল কথা। আর তাদের সব প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্যই হলো বহুজাতিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য বাজার দখলের ক্ষেত্র তৈরি করা। বাংলাদেশ যাতে তাদের চাপিয়ে দেয়া শর্ত পূরণে বাধ্য হয় সেজন্য এখন চলছে আইএমএফের জোর প্রচেষ্টা। আর তাতেই অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে তারা। আগে এসব শর্ত মানাতে শুধু অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাথেই বৈঠক করতো আইএমএফ প্রতিনিধিরা। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর ও আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টদের সরাসরি উপদেশ দেয়া শুরু করে তারা। সেসব ছাপিয়ে এবার সরকারের সব সংস্থা, স্বশাসিত কমিশন ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তাদের নীতি ও কর্মসূচিতে হস্তক্ষেপ করছে আইএমএফ কর্তারা। আইএমএফের একটি দল গত ২৫ এপ্রিল ঢাকায় এসে তিন ভাগে ভাগ হয়ে সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করেছে। এরপর তারা গেছেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর)। এসব বৈঠকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (পিডিবি) ও ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) লোকসানের তথ্য চেয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইনের খসড়া, জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও বাংলাদেশের সমুদয় বিদেশি ঋণের হিসাব চেয়েছে আইএমএফ। সব মিলিয়ে বলতে গেলে সরকারের সমান্তরাল ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে ঋণদাতা সংস্থাটি। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের চাপিয়ে দেয়া মুনাফামুখী বাজার অর্থনীতিই বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থনীতিতে চলমান সঙ্কটের মূল কারণ। অতীতে তাদের চাপিয়ে দেয়া নানা শর্ত মানতে গিয়ে একদিকে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের বোঝা বেড়েছে, অন্যদিকে একের পর এক শিল্প কারখানা বন্ধ ও ছাঁটাইয়ের কারণে বেকার হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সংকুচিত হয়ে আর্থ-সামাজিক বৈষম্য ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ইতোমধ্যে দেশে দেশে ব্যর্থ প্রমাণ হওয়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের চাপিয়ে দেয়া নীতি থেকে সরে এসে যখন গণমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কার্যকর করা জরুরি। কিন্তু তা না করে দেশের সবক্ষেত্রে ঋণদাতাদের খবরদারি মেনে নিয়েছে সরকার– একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের জন্য এটি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..