বাঙালির উৎসব ও নারীর সামাজিক উন্নয়ন

বীরেন মুখার্জী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

রবীন্দ্রনাথ থেকেই শুরু করি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘নারী’ প্রবন্ধে বলেছেন- ‘যে পাখির ডানা সুন্দর ও কণ্ঠস্বর মধুর তাকে খাঁচায় বন্দি করে মানুষ গর্ব অনুভব করে; তার সৌন্দর্য সমস্ত অরণ্যভূমির, এ কথা সম্পত্তিলোলুপরা ভুলে যায়। মেয়েদের হৃদয় মাধুর্য ও সেবানৈপুণ্যকে পুরুষ সুদীর্ঘকাল আপন ব্যক্তিগত অধিকারের মধ্যে কড়া পাহারায় বেড়া দিয়ে রেখেছে। মেয়েদের নিজের স্বভাবেই বাঁধন-মানা প্রবণতা আছে। সেই জন্য এটা সর্বত্রই এত সহজ হয়েছে।’ বলা যেতে পারে ‘নারীর সৌন্দর্যকে প্রধান করে দেখা’ আর ‘বাঁধন-মানা প্রবণতা’ এ দুটি বিষয় সুদীর্ঘকালের চর্চিত সামাজিক-পরম্পরা; ফলে নারীর পদযাত্রা দিকে দিকে উন্মোচিত হলেও সমাজ তাকে কতটা এগিয়ে যেতে দিচ্ছে, সে বিষয়টি বিপুল গবেষণার দাবি রাখে। নারী-পুরুষের কর্মের বিপুল মেলবন্ধন থাকা সত্ত্বেও নারীকে স্থূলভাবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে আমাদের সমাজে। নারীর রূপের প্রশংসা করে কবির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে পুরুষরা যখন বলে-‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’, ‘তুমি কিন্নরী আঙুরবালা’ কিংবা ‘তোমরা বিজলী হাসিতে হাসিতে চাও, আঁধার ছেদিয়া মর্ম-বিধিয়া দাও’; তখন রমণীদল আনন্দে আত্মহারা হয়ে হেসে লুটিয়ে পড়ে- ‘আহা কী সুন্দর, কী অপূর্ব।’ এই অভিব্যক্তি প্রকাশ নারীর চিরন্তন বৈশিষ্ট্য। যেহেতু নমনীয়তা এবং সৌন্দর্য নারীর জন্মগত প্রাপ্তি। বাঙালির সামাজিক ক্রিয়াকাণ্ড, আচার-অনুষ্ঠানাদিতে নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য হলেও সামাজিক ও মানবিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে নারী পিছিয়েই থাকে। এখনো পরিবারে, সমাজে নারীর মতামত অগ্রাহ্য করা হয়। কর্মক্ষেত্র বলি কিংবা পরিবারই বলি, প্রতি পদেই নারী নিরাপত্তাহীন। অথচ চিন্তা-কর্মের অধিকার এবং শক্তিমত্তা যেমন পুরুষে আছে, তেমনই নারীতেও কখনো অপূর্ণ ছিল না- পৃথিবীর ইতিহাস তেমনটাই জানান দেয়। গঠনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে নারী ও পুরুষ হয়ে ওঠে দুই সংস্কৃতির অধিবাসী। তাদের জীবন, জগৎ, অভিজ্ঞতা, স্বপ্নও হয়ে থাকে পৃথক। আবার শৈশব থেকেই বাবা-মা, সমাজ-সংস্কৃতি-সভ্যতা তাদের শেখায় কার মেজাজ কেমন হবে। তারা কীভাবে হাসবে, দাঁড়াবে, বসবে কিংবা সমাজে কে কী ভূমিকা পালন করবে, কার কী মর্যাদা বা অবস্থান হবে। দুটি মানুষকে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় নারী ও পুরুষ করে তোলা হয়। শৈশব থেকেই অভ্যস্ত করে তোলা হয় নারী বা পুরুষের ভূমিকায়। প্রতিটি সংস্কৃতি চায় ছেলেরা হবে সক্রিয়, পেশিশক্তিসম্পন্ন, আক্রমণাত্মক; আর মেয়েরা হবে নিষ্ক্রিয়, অন্তর্মুখী বা আত্মসমর্পণাত্মক। নাম রাখার ক্ষেত্রেও বিশেষ ভাবনা, মেয়ে সন্তানের নাম মেয়েলি শোনাতেই হবে। পরিবার থেকেই নারীর প্রতি এত বৈষম্য কেন? বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গিয়েই নিবন্ধের অবতারণা। নারী উন্নয়ন, নারীকে সামাজিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা কিংবা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা প্রসঙ্গে অনেক বারই আলোচনায় এসেছে যে, নারীর প্রতি প্রবহমান নেতিবাচক সংস্কারকে অতিক্রম করতে হলে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির পুনস্থাপন জরুরি। অস্বীকার করছি না, যেহেতু কালক্রমে পুরুষই সমাজ নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অধিষ্ঠিত; ফলে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানো গেলে সমাজে নারীর অধিষ্ঠান সহজতর হবে। কিন্তু যে পুরুষ দীর্ঘদিন নারীকে শুধু ভোগ্যপণ্য এবং দাস হিসেবে দেখে এসেছে, সেই পুরুষ কি সহসা এতটা উদার হতে পারে! পারে না। আর পারছে না বলে নারী নির্যাতন, নারীর প্রতি সহিংসতা থামানো যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে আইনের ওপর জোর দেয়ার কথা বলেন বিশ্লেষকরা। সত্য যে, দেশে নারীর প্রতি সহিংস ঘটনা প্রতিহত করতে আইনকে শক্তিশালী করা হয়েছে। কিন্তু সেই আইন নারীকে কতটুকু নিরাপত্তা দিতে পারছে, সেটিও ভাবনার বিষয় বৈকি। মানবসন্তান হিসেবে একটি শিশু জন্ম নেয়ার পর থেকে শুরু হয় ছেলে সন্তানকে পুরুষ এবং মেয়ে সন্তানকে নারীরূপে দ্বিতীয়বার জন্ম দেয়ার প্রক্রিয়া। প্রতিটি পরিবারের চলে এ প্রক্রিয়া। যেখানে শুধু পুরুষ নয়, নারীরও প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকে। শৈশব থেকে যে কন্যাশিশুর মানবিক গঠন দুর্বল করে দেয়া হয়, সেই কন্যাশিশু একদিন পরিপূর্ণ নারী হলেও সেই দুর্বলতা থেকে নিজের উত্তরণ ঘটাতে পারে? সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত শারীরিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পুরুষের শরীর পেশল হয়, এটা অনেকটা জৈবিক। কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবেই খাদ্য ব্যায়াম খেলাধুলার ধরন প্রভৃতির সাহায্যে নিজের পেশি গঠনে উৎসাহ দেয়া হয় পুরুষকে, ধরে নেয়া হয় পেশিতে পুরুষের অধিকার জন্মগত। অপরদিকে নারীকে তার স্ফীত মাংস নিয়ে বিব্রত রাখা হয়, তাকে নমনীয় কোমলমতি, লাজুক, বিনয়ী, মৃদুভাষী, সর্বংসহা মৃত্তিকা মনোভাব তার কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে গড়ে তোলা হয়। পেশিশক্তি অর্জন করে নারীর আত্মবিশ্বাসী ও বলিষ্ঠ হয়ে ওঠা পিতৃতন্ত্রের কাম্য নয়। কিন্তু পুরুষাধিপত্য পেশিশক্তির ওপর নির্ভরশীল হওয়া কতটা যৌক্তিক? প্রকৃতপক্ষে আধুনিককালে প্রযুক্তির ব্যবহারে পেশির মূল্য বেশ কমে গেছে, পৃথিবী চলে বুদ্ধিশক্তিতে। বুদ্ধিমান নারীর পরামর্শ স্বাচ্ছন্দ্যে অবহেলা করা হয়, নির্বোধ পুরুষের পরামর্শ শিরোধার্য। অথচ নারী-পুরুষ উভয়ের বুদ্ধিশক্তির সমন্বয় হলে সমাজ, জাতি, দেশ সর্বোপরি বিশ্ব অনেক এগিয়ে যেত। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় আদর্শ নারীর শর্ত, সে পতিপ্রাণগতা, স্বামীসন্তান এবং পরিবারের জন্য আত্মবিসর্জন দেয়া। নারী কাজ করে- তবে নিজের জন্য নয়, সে কাজ করে স্বামী, সন্তান ও পরিবার পরিজনের জন্য। গৃহের চার দেয়ালের মধ্যে নারী উদয়াস্ত যে কঠোর পরিশ্রম করে, তার মেহনতের পরিমাণ পুরুষ অপেক্ষা অনেক বেশি। তবু নারীকে পরগাছা ভাবা হয়; কারণ সংসারে নারীর কর্মের কোনো অর্থনৈতিক মূল্য দেয়া হয় না। কেবল নির্দিষ্ট একটি দেশেই নয়, নারীরা দুনিয়ার সর্বত্রই দরিদ্র ও নিপীড়িত। বিভিন্ন পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পুরুষরা নানাভাবে নারীর অর্থনৈতিক ও উৎপাদনমূলক শ্রমকে আত্মসাৎ করে। নারীকে পরিচয় করানো হয় স্বামী বা সন্তানের পরিচয়ে, তার পৃথক অস্তিত্ব স্বীকার করা হয় না। পুরুষের অধিনতার নাগপাশে আবদ্ধ নারীকে পরিবার আত্মীয়স্বজন বা বাইরের কোনো ব্যাপারে নীতিনির্ধারণ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা দেয়া হয় না। বর্তমান সময়ে বহুসংখ্যক নারী স্বাবলম্বী হয়েও অধিকাংশের উপার্জনে পুরুষের আধিপত্য বিদ্যমান। বুদ্ধিবিবর্জিত, নির্বোধ মেয়েছেলে, ভাবাবেগ তাড়িত অস্থির চিত্ত নারী হিসেবে তুলে ধরে তাকে বশে রাখা পুরুষতন্ত্রের উদ্দেশ্য। ‘নারীকে তার মতামত প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিলে সমাজের অনর্থ ঘটবে’-ধর্মীয় অনুশাসনের নামে এমন ধারণা প্রচার করা হয়। বলতে দ্বিধা নেই, প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও তা প্রকাশে নারী দ্বিধাগ্রস্ত, নিজেকে জাহির করার সুবাদে তাকে তিরস্কার পেতে হতে পারে- এমন আশঙ্কা নারীর মনে বিরাজ করে। অথচ এই প্রচলের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত স্বপ্ন দেখেছিলেন- নারীরা সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হবে, রাষ্ট্রের কর্ণধার নারী হবে, বিচারকের আসনে নারী বসবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষা ও যোগ্যতায় নারী বর্তমানে ক্ষমতার অধিকারী হলেও-সামগ্রিকভাবে এবং সামাজিক অবস্থানগত দিক থেকে নারী মর্যাদা পায়নি। কেবল ক্ষুধা নিবৃত্তির উপায়স্বরূপ ঘরের বাইরে কর্মক্ষেত্রে নারীকে কাজ দেয়া হচ্ছে, কিন্তু পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। এখনো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নারীর মতামত মূল্যায়ন করা হয় না। সমাজ এটাও ঠিক করে দেয় নারীর যাতায়াত ব্যবস্থা কেমন হবে। প্রয়োজনের তাগিদে কিংবা সময় স্বল্পতার কারণে কর্মস্থল পৌঁছনোর পথে একজন কর্মজীবী নারী তার পরিচিতজন বা সহকর্মীর বাইকের পেছনে চড়ে বসলে সমাজ কটাক্ষ করে দেখে, অথচ যানবাহনের ভিড়ে যখন কোনো মেয়ে বাস বা টেম্পোতে অধিক যাত্রীর চাপাচাপি সহ্য করে, এবং অপরিচিতের শরীরের ঘেঁষাঘেঁষিতে পিষ্ট হয় সমাজ তা মেনে নেয়। অচেনা ব্যক্তির অনাকাক্সিক্ষত স্পর্শ সমাজ মুখ বুজে গ্রহণ করে। সেক্ষেত্রে প্রতিবাদ করা মেয়েকে নানা বিব্রতকর প্রশ্নে ঝাঁঝরা হতে হয়। ধাক্কাটা ঠিক কোথায় লেগেছে, কেমন করে লেগেছে, ব্যথা পেয়েছে কিনা... এসব তামাসাপূর্ণ প্রশ্নের মাধ্যমে সব পুরুষ যাত্রীর উৎসুক দৃষ্টি পড়ে ওই মেয়েটির ওপর। এটা নারীর প্রতি অহরোজ সমাজ প্রদত্ত মানসিক নির্যাতন, যার প্রতিকার হয়নি, হচ্ছে না। অথচ আমাদের সেই সমাজ কাক্সিক্ষত, যেখানে পুরুষের কর্মকে মূল্যায়নে যেমন নির্মোহভাবে তার প্রতিভা, সামর্থ্য ও সৃষ্টিশীলতাকে বিবেচনায় রাখা হয় তেমনি নারীর অবদানকেও আমরা তার শরীরকে (সাদা বা কালো) সামনে নিয়ে বিচার করব না; মহত্ব ও প্রশংসা চাই কেবল কর্ম ও সৃজনের। নানা সভা-সমাবেশে শোনা যায় নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে-নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে উচ্চমহলে বেশ আলোড়ন চলে। কিন্তু সামাজিক মর্যাদায়? বাঙালির ঐতিহ্যগত কিংবা জাতীয় যেসব উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে, তাতে নারীর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি থাকে। ফলে পারিবারিকভাবেও নারীর মর্যাদা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে পারিবারিকভাবেই। নারী স্বার্থরক্ষা কেবল পুস্তকে লিপিবদ্ধ থাকবে এটা হতে পারে না। মনে রাখা দরকার, নারী ভিন্ন গ্রহের কোনো প্রাণী নয়, নারী এই সমাজের মা, বোন, কন্যা। নারী মানুষ। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র গঠনে সভ্যতা নির্মাণে ঐতিহ্য সৃষ্টিতে নারীরও আছে সমান সংগ্রাম, শ্রম এবং মেধা। ‘সেদিন সুদূর নয়/ যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়।’ কোনো এক মহার্ঘ মুহূর্তে কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘নারী’ শিরোনামের কবিতায় কথাগুলো উচ্চারণ করেছিলেন। কবিকল্পিত সেই অসুদূর আজ বর্তমান হয়েছে। নারীরা এগিয়ে এসেছে তাদের মেধা ও প্রজ্ঞায়। এখন নারীকে মর্যাদা দেওয়ার জন্য নারীর প্রতি অহিংস মনোভাব তৈরির মাধ্যমে সমাজের নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা দিতে, সমাজ এবং রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..