চরম নির্যাতনের শিকার প্রবাসী নারী শ্রমিকেরা

ফেরদৌসি রহমান মারিয়া

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছেন। এরমধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। বিশ্বজুড়ে চলমান অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও নারী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিটেন্স ছিল চোখে পড়ার মতো। সৌদি আরবেই প্রায় সাড়ে চার লাখ বাংলাদেশি নারী শ্রমিক কর্মরত আছেন। সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো এই জায়গাতেও নারীর ভূমিকা অনেক বড়। কিন্তু এখানেও নারীকে প্রতিকূলতার শিকার হতে হয় প্রতিনিয়ত। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে পুরুষের সাথে তালে তাল মিলিয়ে কাজ করছেন নারীরা। ১৯৯১ সালে প্রথম বাংলাদেশি নারী শ্রমিকরা বিদেশে কাজ করতে যান। পরিবারের অন্যান্যরা যখন হাল ছেড়ে দিয়েছেন, কোনো কাজ জোগাড় করতে সক্ষম হননি কিংবা বাবা, ভাই, স্বামী যখন পরিবারের সদস্যদের দায়িত্ব ছেড়ে পালিয়েছেন তখন সেই পরিবারের হাল ধরার জন্য নারী পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে। বর্তমানে শুধু সৌদি আরবে কর্মরত নারীরাই প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে বারশো কোটি টাকা পাঠাচ্ছেন। নারীদের এই আয় পরিবার ও দেশকে অর্থনৈতিক সুরক্ষা দিলেও তাদের সুরক্ষা এই রাষ্ট্র বা সমাজ কেউই দিতে পারছে না। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা নারী পোশাক শ্রমিকরাও কর্মস্থলে ও সমাজে চরম অনিরাপত্তায় থাকেন। আর যারা দেশের বাইরে তাদের আর্তনাদ শোনার মতো কাউকে পাবে, বা তাদের আর্তনাদ দেশের হর্তাকর্তাদেও কর্ণকুহরে পৌঁছাবে এই আশাও বোকামি। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত নারী শ্রমিক, গৃহকর্মীরা চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। এখনো হচ্ছে। পুরুষ শ্রমিকরাও সেখানে নির্যাতিত হন। তবে নারীদেও হতে হয় যৌন নির্যাতনের শিকার। দিনে ১৫ থেকে ১৮ ঘণ্টা অমানবিক পরিশ্রম করে মাসের পর মাস খাটনি খেটে খালি হাতে দেশে ফিরতে হয়েছে অনেককে, অনেকে আবার কোনোরকমে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পেরেছে। কেউ কেউ ফেরে লাশ হয়ে। আবার কারও কারও লাশের হদিসও পাওয়া যায় না। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফেরত আসা এরকম কয়েকজন নারী শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায় তাদের সেই দুর্বিষহ দিনগুলোর কথা। রুম্মান আক্তার, বয়স ২৭। আট বছর আগে তিনি ও তাঁর স্বামী লিবিয়ায় যান। সেখানে দুজনেই নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতেন। মাথায় করে দশ-এগারো তলা ওপর পর্যন্ত বোঝা বহন করে নিয়ে যেতে হতো। একদিন কাজ করতে গিয়ে সাত তলা থেকে পড়ে রুম্মানের স্বামী মারা যান। এর কোনো বিচার বা ক্ষতিপূরণ পাওয়া তো দূরে থাক, রুম্মানকে তার মালিক জোরপূর্বক কাজ করায়, শারীরিক নির্যাতন করেন, এমনকি তিনি অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায়ও মাথায় বোঝা নিয়ে ৭-৮ তলা বেয়ে কাজ করতেন। তিনি পরবর্তীতে ওখানকার এক দালালের সহায়তায় দেশে তার বাবা-মায়ের সাথে যোগাযোগ করেন। পরে পাঠানো টাকায় বিমান ভাড়া দিয়ে তাকে দেশে ফেরত আসতে হয়। সেই দুর্বিষহ সময়ের কথা রুম্মান এখনও ভুলতে পারেন না। না খেয়ে মরে গেলেও আর কখনো তিনি বিদেশে কাজের সন্ধানে যেতে চান না। সুফিয়া বানু, বয়স ৩৫। সৌদিতে এক শেখের বাসায় কাজ করতেন। দিনে প্রায় ১৬ ঘণ্টা কাজ করতে হতো। কাজে কোনো ভুল হলে মধ্যযুগীয় কায়দায় মারধর করতো তার মালিক। তার স্বামী যখন দ্বিতীয় বিয়ে করে, তখন তিন সন্তান লালন-পালনের আর কোনো উপায় না দেখে বিদেশে পাড়ি জমান সুদে টাকা নিয়ে। কিন্তু তিন বছরের মধ্যে মাত্র ছয় মাসের বেতন পেয়েছেন তিনি। রুম্মানের মতো তিনিও কোনোরকম জান হাতে নিয়ে দেশে ফিরতে পেরেছেন। তবে তাঁর কোমর আর হাতের হাড় হয়তো কোনোদিনও ঠিক হবে না। মাহফুজা বেগমের বয়স ৪০। তিনি সৌদি আরব আর জর্ডান দুটি দেশে কাজ করে এসেছেন। সৌদিতে তিন বছর কাজ করেন, ৮ মাস এক বাসায় কাজ করে সেখানে যৌন হয়রানির শিকার হয়ে পালিয়ে আসেন, আরেক মালিকের কাছে কাজ নেন। সেখানে দৈনিক ১৫ ঘণ্টা করে কাজ করতে হতো। কিন্তু মাত্র ৬ মাসের বেতন পেয়েছিলেন। এরপর সেখান থেকে পালিয়ে গেলে পুলিশ তাঁকে দেশে ফেরত পাঠান। কিন্তু ঋণ করে বিদেশ যাওয়ায়, ঋণ পরিশোধ আর সংসার চালানোর জন্য তিনি আবার বিদেশমুখী হন। তিনি জর্ডানে দেড় বছর থাকার পর ফিরে আসেন। কারণ, মাত্র ৫ মাসের বেতন ছাড়া আর কিছুই তিনি পাননি। সর্বসান্ত¦ হয়ে তিনি দেশে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সামান্য উপার্জনে বেঁচে আছেন। বিদেশে তার ওপর নানা নির্যাতনের কথা শুনে তার স্বামী বা পরিবারের অন্যরাও তাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে চায়নি। ইয়াসমিন আক্তার সৌদিতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। তার অভিজ্ঞতাও একই রকম। দিনে ১৫ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করেছেন। কিন্তু মজুরি পাননি ঠিক মতো। বরং নির্যাতনের শিকার হয়ে শারীরিক এবং মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আর ঋণের বোঝা তো রয়েই গেছে। তবুও তিনি জীবন নিয়ে ফিরতে পেরেছেন তাতেই সন্তুষ্ট। কারণ তাঁর আশপাশের অনেকেকই ফিরেছেন লাশ হয়ে। সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো প্রবাসে নারীদের কর্মসংস্থান হতে পারতো অন্য এক মাইলফলক। কিন্তু যেখানে তাঁদের বেঁচে থাকারই নিশ্চয়তা থাকছে না সেখানে ভালো কিছুর মাইলফলকে পৌঁছানো তো অসম্ভব। ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ৫০০ এর বেশি নারী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। তাদের সবাই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত ছিলেন। কাজে যোগদানের ১০-১৫ দিনের মাথায়ও অনেকে আত্মহত্যা করেছে বলে জানানো হয়। এইসব মৃত্যুর বেশিরভাগ আত্মহত্যা বা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশেই লাশ দাফন করা হয়। তাই তদন্তের সুযোগও থাকে না। আর যে লাশগুলো দেশে আনা হয় সেগুলোরও ঠিকমতো তদন্ত হয় না। এসব কারণে প্রবাসে নারী শ্রমিকদের মৃত্যুও রহস্যও উদ্ঘাটন হয় না। যারা বেঁচে ফিরে এসেছেন তারাও বিচার পান না। কিংবা দালালদের খপ্পরে পড়ে যাওয়ার কারণে তাঁদের সম্পূর্ণ পাওনা কখনোই বুঝে পান না। কিন্তু দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা, চরম অর্থনৈতিক মন্দার সময়ও রেমিটেন্স পাঠানো এই নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যেখানে নারীরা এগিয়ে এসে নিজ পরিবার, সমাজ ও দেশের কল্যাণে, যেখানে নারীরা পরিবারের হাল ধরছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এনে দিচ্ছে, সেখানে তো তাদের অবহেলিত আর অনিরাপদ অবস্থায় ফেলে রাখা যায় না। বরং নারী শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানো থেকে শুরু করে তাঁরা কোথায় নিয়োগ পাচ্ছে, সেখানে তাদের বেতন-ভাতা নিশ্চিত করা, নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। বেসরকারি সংস্থাগুলোর সরকারের কাছে জবাবদিহিতার পাশাপাশি বিদেশি দূতাবাসগুলোরও জবাবদিহিতা থাকতে হবে। পূর্ণাঙ্গ আইনি সহায়তা নিশ্চিত করে, প্রত্যেক মৃত্যুর সঠিক তদন্ত প্রয়োজন। অন্যথায় রাষ্ট্র তার নিজ দেশের মতো দেশের বাইরেও নারীর জীবনের, শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যর্থতার মাশুল দেবে। এতে নারীদের কর্মসংস্থানের একটা ক্ষেত্রও বিনষ্ট হবে। পরোক্ষভাবে নারীদের, নারী শ্রমিকদের পেছনের দিকে ঠেলে দেওয়া হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..