প্রসঙ্গ : শব্দ দূষণ

মনির তালুকদার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বাতাসের মাধ্যমে সহন ক্ষমতার অধিক তীব্র বা তীক্ষè, বিশেষ করে সুরবর্জিত শব্দের উপস্থিতিতে মানুষ তথা জীব পরিবেশের উপর যে ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি হয়, তাকেই শব্দদূষণ বলা হয়। উপযুক্ত ভাবে উদ্দীপিত হলে যে কোনো স্থিতিস্থাপক কম্পমান বস্তু শব্দের উৎস হিসেবে কম্পিত হয়। শব্দের উৎস বস্তু ও শব্দানুভূতির সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ কম্পাংকই শ্রুতিসীমা, যা ২০ সিপিএস থেকে ২০,০০০ সিপিএস পর্যন্ত হতে পারে। ব্যক্তি ভেদে কম্পাংকসীমা পরিবর্তিত হতে পারে এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে কম্পাংকের এই উর্ধ্বমাত্রা কমতে থাকে। সুস্থ ও স্বাভাবিক শ্রবণ ক্রিয়ার তীব্রতা পরিবর্তনের মান শ্রুতিসীমার মধ্যে থাকা জরুরি। শব্দের উচ্চ শ্রুতিসীমার বেশি তীব্রতা স্বাভাবিক শ্রবণ ক্রিয়ায় বাধার সৃষ্টি করে। ফলে শ্রবণ ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে ধীরে ধীরে কানের শ্রুতি গ্রহণের ক্ষমতা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাছাড়া শব্দের অতিরিক্ত তীব্রতা শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বজ্রপাতের শব্দের মতো দু’য়েকটি ছাড়া শব্দ দূষণের বেশিভাগ কারণই মানুষ্যসৃষ্ট। অপরিণামদর্শী মানুষ তাদের দৈনন্দিন কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত শব্দদূষণ ঘটিয়ে চলেছে। মানব-সভ্যতার বিকাশমান ধারায় অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পের দ্রুত প্রভাব, পরিবহনের অবাধ প্রবাহ প্রতিনিয়ত সুরবর্জিত শব্দের বিস্তার ঘটাচ্ছে। ফলে শব্দ দূষণও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের দেশে শব্দদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস পরিবহন। মাত্রাধিক ডিজেল ইঞ্জনচালিত বাস, ট্রাক, কার, মোটরসাইকেল থেকে উত্থিত অনিয়ন্ত্রিত শব্দ পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ। এ ছাড়া এসব যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ তীব্রতা সম্পন্ন হাইড্রোলিক বা বৈদ্যুতিক হর্ন হচ্ছে শব্দ দূষণের প্রধান উৎস। স্কুল-কলেজে, হাসপাতালের মতো স্পর্শকাতর স্থানেও এসব তীব্র শব্দের রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি নেই। বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি চালানোর শব্দ এলাকায় দূষণের সৃষ্টি করে। এ ধরনের শব্দের মাত্রা সাধারণত ৮০ থেকে ১০০ ডেসিবেল হয়ে থাকে। শিল্পকারখানার ব্যবহৃত সাইরেন থেকে ১৪০ ডেসিবেল মাত্রার তীব্র শব্দ সৃষ্টি হয়। বিমানবন্দর এ লাকায় বসবাসকারীদের কাছে বিমান উড্ডয়ন এবং অবতরণের সময় প্রায় ১১০ ডেসিবেলের শব্দদূষণ হয়ে থাকে। শব্দের উৎসের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষই শব্দদূষণ দ্বারা বেশি আক্রান্ত হয়। সুরবর্জিত উচ্চ তীব্রতা সম্পন্ন শব্দ মানবদেহে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে। শব্দ দূষণের প্রত্যক্ষ প্রভাবে মানুষের শ্রবণশক্তির ওপর অস্থায়ী বা স্থায়ী যেকোনো ধরনের ক্ষতি হতে পারে যা কালক্রমে শ্রবণ শক্তিহীনতা থেকে বধিরত্বে রূপ নিতে পারে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, সুরবর্জিত তীব্র শব্দ পরোক্ষভাবে মানুষের দেহের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। স্নায়ুতন্ত্রের ওপর এ ধরনের সুরবর্জিত উচ্চ মাত্রার শব্দের প্রভাব হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া, রক্তচাপ, শ্বাসক্রিয়া, দৃষ্টিশক্তি, এমন কি মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপে অস্থায়ী বা স্থায়ী প্রভাব ফেলে। উচ্চমাত্রার শব্দ দূষণে হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি পায়। হঠাৎ রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। স্নায়ুতন্ত্রের সক্রিয়তা বেড়ে দেহের রক্ত চলাচলে গতি-প্রকৃতির ক্রিয়া বিঘিœত হতে পারে। হৃৎপিণ্ডের ও মস্তিষ্কের কোষের ওপর অক্সিজেনের অভাবজনিত সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। এমন কি রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। একাগ্রতা হ্রাস পেয়ে হঠাৎ উত্তেজিত হওয়া এবং মাথা ধরার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। শব্দ দূষণে মানবদেহের রক্তের শর্করার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। শব্দ দূষণে রাত্রিকালীন দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পেতে পারে। এমন কি সুরবর্জিত উচ্চমাত্রার শব্দে মানসিক অবসাদ ও স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে পারে। শব্দদূষণ রোধে প্রয়োজন ব্যক্তিগত, প্রযুক্তিগত এবং আইনগত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ। বাড়ি ঘরে বিনোদনে ব্যবহৃত রেডিও, টেলিভিশনের শব্দ যথাসম্ভব কমিয়ে শুনতে হবে। পেশাগত কাজে শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্রপাতিতে শব্দ প্রতিরোধক যন্ত্র লাগিয়ে নিতে হবে। আচার অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত লাউডস্পিকারের শব্দ সীমিত রাখতে হবে। এমনকি বাড়ি ঘরে এবং অফিস-আদালতে উচ্চস্বরে কথা বলা বন্ধ করতে হবে। মূলত যানবাহন, অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ, কল-কারখানা থেকে যে অনাকাঙ্খিত উচ্চশব্দ সৃষ্টি হয় উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে রোধ করা সম্ভব। স্থলপথের পরিবহন এবং বায়ুযানের চলাচলজনিত সামাজিক শব্দ দূষণও প্রযুক্তিগত উপায়ে রোধ করা সম্ভব। সড়ক পরিবহনে ব্যবহৃত যানবাহনে কম শব্দ বেরোয়, এ ধরনের ইঞ্জিনের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা জরুরি। তাছাড়া অহেতুক হর্ণ বাজানো বন্ধ করা দরকার। আতশবাজির মতো উচ্চ মাত্রার শব্দ সৃষ্টিকারী সকল ধরনের আয়োজন বন্ধ করা জরুরি। শব্দদূষণ রোধে সমষ্টিগত উদ্যোগের বিকল্প নেই। আধুনিক বিজ্ঞানসম্মতভাবে নগরায়ন, যানবাহন চলাচলে উচ্চমাত্রার শব্দ নিয়ন্ত্রণ, কলকারখানার উৎপাদনের ক্ষেত্রে কম শব্দসৃষ্টিকারী সুষ্ঠু পরিবেশসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে সুরবর্জিত শব্দ-সঞ্চারণ নিয়ন্ত্রণ করে শব্দ দূষণ অনেকটাই রোধ করা সম্ভব।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..