বুয়া, খালা, মামা এবং মাতৃভাষা

শেখ মিজান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
কয়েক বছর প্রবাসে থাকার পর দেশে ফিরে একটা বিষয় দেখে বেশ প্রীত হলাম- বাসার কাজের মহিলাদের ‘খালা’ বলে ডাকা হচ্ছে। এটাকে বোধহয় বাঙালির সংস্কৃতিও বলা যেতে পারে- আমরা শুধু নাম ধরে ডাকাকে রুক্ষতা মনে করি। বোধকরি তাই, নামের সাথে ভাই, বোন, মামা, খালা, চাচা, ইত্যাদি কোনো প্রীতিকর সম্বোধন জুড়ে দেই। অথবা নাম জানা না থাকলে শুধু অমন সম্বোধনের মাধ্যমেই ডেকে থাকি। মানবিক অন্তরঙ্গতার প্রতি আমাদের এই দুর্বলতা, আমার কাছে ভালই লাগে। বেশ ভাল লাগে। বলা যায় কিছুটা গর্বই অনুভব করি। কয়েক দিন পর, সকাল বেলা একটি হাসপাতালে যাই কন্যাকে ডাক্তার দেখানোর জন্য। অপেক্ষমানদের বসার এলাকায় অপেক্ষা করছি। এমন সময় অভ্যর্থনায় দায়িত্বরত এক কর্মকর্তার দিক থেকে একটি বকার শব্দ কানে আসে, ‘এই খালা, কোথায় ছিলে? তোমাকে খুঁজে পাওয়া যায় না কেন?’ তাকিয়ে দেখি ‘খালাটি’ হন্তদন্ত দৌড়ে আসছেন, বয়স বিশের কোঠায়। হতে পারে ‘খালাটি’ কাজে অবহেলা করেছিলেন, অথবা করেন নি; জানিনা। তবে, চমকে উঠি অন্য কারনে। ‘খালা’ সম্বোধনটি কি অচিরেই ‘বুয়ার’ মতো হয়ে যাবে? এক কালে ‘বুয়া’ গ্রাম বাংলার অতি মিষ্টি একটি সম্বোধন ছিল; অনেকটা ‘বাজান’ বা ‘আম্মাজান’ ধরনের। অনেকেই শুধু ‘বাবা’ ডাকে, বা ‘বাবা’ ডেকে সন্তুষ্ট হতে পারেন না। তাই ‘বাবার’ সাথে ‘জান’ জুড়ে দেন। আমাদের দেশের পশ্চিম এবং উত্তরাঞ্চলে সাধারনভাবে বোনকে ‘বুবু’ বা ‘বু’ বলে ডাকা হয়। ডাকটি আরও মধুর করার জন্য ‘-য়া’ জুড়ে দেওয়া হতো। উপরে বাঙালির যে সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করলাম, সে থেকেই কোনো সহৃদয় ব্যক্তি কাজের মহিলাদের ‘বুয়া’ সম্বোধন করার রেওয়াজ শুরু করেছিলেন, নিঃসন্দেহে। কিন্তু হায় শহুরে সংস্কৃতি, আনুমানিক অর্ধ শতকের ব্যবধানে ‘বুয়া’ শব্দটি প্রায় গালিতে পর্যবসিত হয়ে যায়। এখনও বুকের মাঝে কাঁটার মতো বেঁধে একটি ঘটনা। গত দশকের একটি সময়ে, ২০১৩ সালের শেষ দিকে হবে যদ্দুর মনে হয়, তখন বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের নাম ছিল ‘ড্যান ম্যাজিনা’। দেশের সংকটময় রাজনৈতিক অবস্থায় আমাদের নেতাগণ ইউরোপ-আমেরিকার দূতগণের স্মরণাপন্ন হন। দূতগণ পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ম্যাজিনাও উপযাচক হয়ে আসন্ন সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে কিছু পরামর্শ দিলেন। এমতাবস্থায় একটি দল অমন দূতিয়ালিকে স্বাগত জানাবেন, আর একদল নিন্দা জানাবেন সেটি স্বাভাবিক। সে বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। কিন্তু, আমি মর্মাহত হই তৎকালে দেশের এক প্রখ্যাত ‘সমাজতন্ত্রী’ নেতার ভাষায়। তিনি ম্যাজিনাকে তুচ্ছ করার জন্য বলেছিলেন, কোথাকার কোনো ‘কাজের বুয়া মর্জিনা’, সে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নাক গলানোর সাহস দেখায় কিভাবে। ‘আলিবাবা চল্লিশ চোরের’ গল্পে মর্জিনার ভূমিকা তুচ্ছ ছিল না, তাকে কখনও তুচ্ছ বলে মনে হয়নি। বরং গল্পটি সাধারণ কাজের মানুষের প্রতি ইতিবাচক মূল্যবোধ জাগায় বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু, সমাজতন্ত্রের স্লোগানের ওই নেতা শুধু মর্জিনা নয়, মেহেনতি মানুষের একটি বিশাল শ্রেণিকে তুচ্ছ এবং অবমানিত করলেন। এবং সেই সাথে মাতৃভাষার সুমিষ্ট ‘বুয়া’ শব্দটিকেও। ঘটনাটি প্রায় অবিশ্বাস্য ছিল। তবে এটি ঠিক যে, সেই সময়ের মধ্যে ইতরজনেদের কৃতিত্বে গ্রাম বাংলার প্রিয় ‘বুয়া’ শব্দটি গালিতেই পর্যবসিত হয়েছিল। ওই নেতার উক্তিই তার সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ। তাই বাসার কাজের মহিলাকে সম্বোধন করার জন্য ভিন্ন একটি শব্দ নিয়ে আসার প্রয়োজন আমাদের হৃদয়বান মানুষেরা উপলব্ধি করেছিলেন। সেজন্যই আজ ‘বুয়ার’ স্থলে ‘খালা’! হাসপাতালের উপরোক্ত অভিজ্ঞতায় আমার চমকে ওঠার কারণটা ছিল এই আশঙ্কা থেকে যে, তাহলে কি ‘খালা’ শব্দটিও অদূর ভবিষ্যতে গালিতে পরিণত হয়ে যাবে? আমাদের ছেলে-মেয়েরা তখন মায়ের বোনকে ‘খালা’, ভাইকে ‘মামা’ বলতে লজ্জিত হবে; বলবে ‘আন্টি’ বা ‘আঙ্কেল’। আর বাসার কাজের মহিলার জন্য বরাদ্দ থাকবে ‘খালা’। অচিরে শব্দটি এতটাই তুচ্ছার্থ পাবে যে তাঁরাও অপমানিত বোধ করবেন ‘খালা’ ডাকে। ‘বুয়ার’ মতো হারিয়ে যাবে ‘খালাও’। আমাদের হৃদয়বান ব্যক্তিগণ আবারও কোনো নতুনতর সম্বোধনের শব্দ নিয়ে আসবেন- চলতে থাকবে। এ প্রসঙ্গে ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়ার আমলের কিছু মূল্যবোধের উল্লেখ করা যায়। তৎকালীন ভদ্রসমাজ আচার-আচরণ এবং ভাষার ব্যাপারে খুবই সাবধানি বা শুচিবাইগ্রস্ত ছিলেন। যেমন তাঁরা এক সময় ‘চেয়ার’ শব্দটিকে ‘অসভ্য’ বা ‘অভদ্র’ হিসেবে অনুভব করলেন, কারণ শব্দটি আমাদের একটি ‘অসভ্য’ অঙ্গ, তথা পাছার সাথে সম্পর্কিত। তাই ভদ্রমহোদয়গণ সেটির বদলে ‘কাউচ’ শব্দটি ব্যবহার করা শুরু করলেন। কিন্তু, অঙ্গটিতো কেটে ফেলে দেওয়া যায় না। তাই এই নতুন শব্দটিও অনতিবিলম্বে সংসর্গ দোষে ‘অসভ্য’ হয়ে গেল। আবার একটি নতুনতর শব্দের ব্যবহার শুরু হলো- ‘সোফা’। তবে, বর্তমানে আর তেমনটি মনে করা হয় না; কারণ সভ্যতা-অসভ্যতার ধারণাটি পাল্টে গেছে। ‘পাছার’ অপরিহার্য অস্তিত্বটাকে মানুষ স্বীকার করতে শিখেছে। তাই মনে হয়, ‘বুয়ার’ বদলে ‘খালা’, বা ‘খালার’ বদলে ‘ফুফু’- কোনো শব্দই কাজের মানুষের অবমাননা রোধ করতে পারবে না, মাতৃভাষার প্রিয় শব্দগুলোর অপমৃত্যু ঠেকাতে পারবে না, যদ্দিন না আমাদের শহুরে শিক্ষিত ভদ্রসমাজের মধ্যে কাজের প্রতি, মানুষের প্রতি তাকানোর ভঙ্গি বদলাবে। একটি সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার উল্লেখ করে এই বক্তব্য শেষ করবো। সকলে নিশ্চয়ই লক্ষ্য করে থাকবেন যে আমাদের তরুণ এবং যুবারা প্রায়শই রিকশাওয়ালা, বাসচালক, কনডাক্টরদের ‘মামা’ বলে সম্বোধন করেন। সম্প্রতি আমার এক যুবক আত্মীয়, প্রভাষক হিসেবে ঢাকা শহরের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। তিনি বলেন, যে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র এবং কনিষ্ঠ শিক্ষকগণ পিওন-দারওয়ানদের ‘মামা’ বলে ডাকতেন। সেই প্রেক্ষিতে তাঁদের ‘ভিসি’ একদিন সকল শিক্ষককে সভায় ডেকে নির্দেশ দেন, ‘নিম্নপদস্থ’ কর্মচারিদেরকে ‘মামা’ ‘চাচা’ না বলে নাম ধরে ডাকতে। এবং তাঁদের সাথে ‘আপনির’ বদলে ‘তুমি’ করে কথা বলতে। উক্ত ‘ভিসি’ ইতোপূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন; বরাবর সমাজের উচ্চতম মহলেই তাঁর আনাগোনা। তবে, সকল ক্ষোভ এবং হতাশার মাঝে একটি আলোর রেখা আছে- ছাত্র এবং নবিন শিক্ষকগণের অনেকেই ওই ভিসির নির্দেশ শোনেন নি। অর্থাৎ কাজ এবং শ্রমের প্রতি সম্মানের একটি তীক্ষ্ম তরঙ্গ নবীন প্রজন্মের মধ্যে উপস্থিত। এমন আশা করাটা বোধ হয় অবাস্তব হবে না যে এই তরঙ্গ একদিন ঢেউ এবং জলোচ্ছ্বাস হয়ে সমাজের কলুষিত মূল্যবোধগুলি ডুবিয়ে দেবে, ভাসিয়ে দেবে। রক্ষা পাবে মাতৃভাষার প্রিয় শব্দগুলি। রক্ষা পাবে মানুষ।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..