বস্তু-গতি-স্থান-কাল

লুৎফর রহমান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
প্রাচীনকাল থেকে মানুষ পৃথিবীর বৈচিত্র্যের মূলে প্রবেশের চেষ্টা করছে। পৃথিবীর অস্তিত্বের মূলে যাওয়ার চেষ্টা করে আসছে। এ ক্ষেত্রে ভাববাদীরা জগতের অস্তিত্বের মূল কারণ হিসেবে দেখতে পেয়েছিলেন এক পরমভাবকে। এক অতিপ্রাকৃত শক্তিকে তাঁরা মূল মেনেছিলেন। অন্যদিকে বস্তুবাদীরা জগৎকে দেখেছিলেন যেমন আছে সেভাবে। তাঁরা পৃথিবীর চূড়ান্ত ভিত্তি প্রকাশ করার জন্য বস্তুর ধারণাটি ব্যবহার করেছিলেন। বস্তুর ধারণার বিবর্তন: বস্তু কী? এই প্রশ্নের উত্তর মানবজাতির জ্ঞান ভাণ্ডারের সমৃদ্ধির সাথে সাথে বদলে চলেছে। প্রাচীন দার্শনিকরা জল, বায়ু, আগুন, মাটি এসবকে বস্তু বলেছিলো। পরে বস্তুকে দেখা হতে থাকলো পরমাণু নামক অসংখ্য অদৃশ্য ও অপরিবর্তনীয় উপাদান হিসেবে। ১৮শ শতকের ফরাসি বস্তুবাদীরা, ফয়েরবাখ এবং রাশিয়ান বিপ্লবী গণতন্ত্রীরা বস্তুর একটি বিমূর্ত প্রত্যয় বা ধারণার কাছাকাছি এসেছিলেন। কিন্তু তারা বস্তুর একটা বিজ্ঞানসম্মত সংজ্ঞা ঠিক করতে পারেননি। তাঁরা বস্তুর সারমর্মকে গুলিয়ে ফেলেছিলেন তার গঠনকাঠামো সংক্রান্ত প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ধারণার সাথে। এর ফলে, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্রতিটি নতুন আবিষ্কার বস্তুর উপলব্ধিতে নতুন বিভ্রান্তি ও বিরোধ সৃষ্টি করেছিলো। পরিস্থিতি বিশেষভাবে জটিল হয়ে গিয়েছিলো ইলেকট্রন ও তেজষ্ক্রিয়তা আবিষ্কারের সাথে যুক্ত সংকটের সময়। পূরনো আমলে ডেমোক্রিটাসের সময় বস্তুকে গণ্য করা হতো অবিভাজ্য ও অপরিবর্তনীয় পরমাণুগুলোর এক সমষ্টি হিসেবে। কিন্তু ইলেকট্রন আবিষ্কারের ফলে দেখা গেলো যে পরমাণু চিরন্তন নয়, অপরিবর্তনীয় নয়। এর মধ্যে আছে আরো সূক্ষ্ম কণা ইলেকট্রন। এই ইলেকট্রনের ভর নির্ভর করে তার গতির দ্রুতির উপরে। উচ্চতর গতিতে ভর বাড়ে এবং নিম্নতর গতিতে কমে। অবিভাজ্য ও চিরন্তন পরমাণু এবং অপরিবর্তনীয় ভর এই ধারণাগুলো যখন ভেঙ্গে পড়লো তখন অনেক বিজ্ঞানী মহাবিশ্বের ভিত্তি হিসেবে বস্তুর অস্তিত্বে সন্দেহ পোষণ করতে শুরু করলেন কারণ বস্তু গতিতে পরিবর্তিত হয়। অন্যান্য প্রাথমিক কণা আবিষ্কার এবং ইলেকট্রন ও পজিট্রনের আলোক-কোয়ান্টামে পরিবর্তন আবিষ্কারের ফলে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে সংকট আরো গভীর হয়ে ওঠে। বিপরীত চার্জ-বিশিষ্ট পদার্থের দুটো কণা আলোকে পরিণত হয়। এই ঘটনাটিকে দেখা হয় বস্তুর বিলোপ হিসেবে। এখানে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের আধুনিক আবিষ্কারগুলোর অবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হয়। আর এই সুযোগটা নেয় ভাববাদীরা। তারা বলে বিজ্ঞানই বস্তুবাদকে খণ্ডন করেছে। প্রমাণ হয়েছে বস্তুর অস্তিত্ব নেই এটা বস্তুবাদীদের কল্পনামাত্র। এই বক্তব্যটি শ্রমিক শ্রেণি এবং শ্রমজীবী জনগণের বিপক্ষে যায়। আর এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন পড়ে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলোর এক বিজ্ঞাসম্মত ব্যাখ্যার। বস্তু নিয়ে ভাবনা: বস্তুর ধারণা নিয়ে আলোচনায় এঙ্গেলসের বক্তব্য সামনে আসে। তাঁর মতে পৃথিবীর সাথে মানুষের একটি ব্যবহারিক সম্পর্ক আছে। বস্তুই প্রধান। বস্তু থেকে চেতনার উদ্ভব। জগৎকে জানা সম্ভব। এটি হচ্ছে দর্শনের বুনিয়াদী প্রশ্নের উত্তর। এই কাঠামোর মধ্যেই কেবল বস্তুর সংজ্ঞা নির্ণয় করা যায়। এঙ্গেলস বলেছিলেন, বস্তুর প্রত্যয় বা ধারণাটি হলো একটি বিমূর্তন, অর্থাৎ বাহ্যিক পৃথিবীর বস্তুসমূহ, প্রক্রিয়াসমূহ, এবং এর সম্পর্কের অসীম বৈচিত্র্যের এক সার্বিক প্রতিফলন বা চেতনায় পুনরায় উপস্থাপন। পরবর্তীতে মার্কস ও এঙ্গেলস কর্তৃক সূত্রায়িত দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মূল নীতিসমূহের ভিত্তিতে এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলো সার্বিকভাবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে লেনিন বস্তুর সংজ্ঞা নির্ণয় করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বস্তু হলো এক দার্শনিক প্রত্যয় বা ধারণা যা দ্বারা বোঝা যায় সেই বিষয়গত বাস্তবকে যা মানুষকে অনুভবের যোগান দেয়, আবার তা অনুভবগুলো থেকে স্বতন্ত্রভাবে বিদ্যমান থাকে এবং বস্তু অনুভবগুলো দ্বারা অনুকৃত (ভড়ষষড়বিফ) আলোকচিত্রিত (ঢ়যড়ঃড়মৎধঢ়যবফ) ও প্রতিফলিত (ৎবভষবপঃবফ) হয়। লেনিনের সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়- (১) বস্তুর অস্তিত্ব থাকে মানুষের চেতনার বাইরে। অর্থাৎ বস্তুর অস্তিত্ব কারো ইচ্ছের ওপর নির্ভর করে না। (২) বস্তু মানুষকে অনুভব বা সংবেদনের যোগান দেয়। আবার বস্তু অনুভবগুলো থেকে স্বাধীনভাবে বিরাজ করে। অর্থাৎ বস্তুই আদি, প্রধান এবং চেতনা-নিরপেক্ষ। (৩) মানুষের ইন্দ্রিয়সমূহ যেমন চোখ-কান-নাক-ত্বক-জিহ্বা দ্বারা বস্তু অনুকৃত (অনুসরণকৃত), আলোকচিত্রিত (ছবিপ্রাপ্ত), প্রতিফলিত (চেতনা-নিত) হয়। মানুষের ইন্দ্রিয়সমূহ পারিপার্শ্বিক বস্তুজগৎকে প্রতিফলিত বা ভাবগতভাবে পুনরায় উপস্থাপনের ক্ষমতা রাখে। এই ক্ষমতাকে বিজ্ঞানে চেতনা বলে। বস্তু ও চেতনার মধ্যে এক পারস্পরিক গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। এ দুটো পরস্পর নির্ভরশীল। বস্তু যে-রূপই ধারণ করুক না কেনো শেষ পর্যন্ত অনুভবের সাহায্যে তাকে জানা যায়। বেতার তরঙ্গ, অতিশাব্দিক কম্পন কানে শোনা যায় না। কিন্তু এসবের অস্তিত্ব নির্ণয় করা যায় যন্ত্রের সাহায্যে। সুতরাং বস্তু হচ্ছে চৈতন্য-নিরপেক্ষ অস্তিত্বশীল এক বিষয়গত বাস্তবতা, মানুষের সংবেদন বা অনুভবের মধ্যে যার অবস্থান। গতি পৃথিবীতে গতিশীল বস্তু ছাড়া কিছুই নেই। সব পদার্থই রয়েছে গতি ও পরিবর্তনের অবস্থায়। এঙ্গেলস বলেছেন, গতি হলো বস্তুর অস্তিত্বের ধরন। গতি ছাড়া কোনো কিছু থাকতে পারে না। (১) বিরাম আপেক্ষিক, গতি অনাপেক্ষিক : পৃথিবীতে বস্তুর গতি ও পরিবর্তন বিরামকে বাতিল করে দেয় না। গতিশীল পদার্থগুলোর কিছু স্থিতিশীলতা থাকে। কিন্তু গতি ও .বিরাম বিচ্ছিন্ন নয়। ধরা যাক একটি মানুষ ঘুমোচ্ছে। মানুষটি আছে বিরামের অবস্থায়। কিন্তু এই বিরাম আপেক্ষিক। মানুষটি, ঘর ও পৃথিবী সমেত গতিতে আছে। তাছাড়া মানুষটির হৃদপি-, ফুসফুস, রক্ত এসব আছে গতিতে। সুতরাং বিরাম আপেক্ষিক। গতি আনাপেক্ষিক। কোনো বস্তু একদিকে বিরামের অবস্থায় থেকে অন্যদিকে গতি ও পরিবর্তনের অবস্থায় থাকে। (২) গতি বস্তুর স্থানিক ও আভ্যন্তরিক পরিবর্তন ঘটায়: প্রাচীন দার্শনিকরা বস্তুর গতির এক সংকীর্ণ ও সীমিত ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তারা গতিকে দেখেছিলেন স্থানিক পরিবর্তনে। কিন্তু গতির কারণে স্বয়ং পদার্থগুলোরই পরিবর্তন হয়। (৩) গতির বহুবিদ রূপ: (ক) যান্ত্রিক রূপ: বস্তুগুলোর পরস্পরের সাথে সম্পর্কিতভাবে স্থানিক পরিবর্তন। (খ) পদার্থবিদ্যাগত রূপ: যেমন- তাপ, ধ্বনি, বিদ্যুৎচৌম্বক, গতির ইত্যাকার রূপ। (গ) রাসায়নিক রূপ: বিভিন্ন পদার্থ গঠনকারী অনুগুলোর গঠন ও পরিবর্তন। (ঘ) জীববিদ্যাগত রূপ: জৈব জীবন, জীবসত্তাগুলোতে চলমান পরিবর্তন। (ঙ) সামাজিক রূপ: মানবসমাজের বিকাশ। এই সব গতির রূপের ওপর এঙ্গেলস বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেছিলেন। (৪) পারস্পরিক সম্পর্ক ও নির্ভরশীলতা: বস্তুর গতির সমস্ত রূপ কঠোরভাবে পরস্পরসংযুক্ত ও পরস্পরনির্ভরশীল। গতির কতকগুলো রূপ হলো অন্যান্য রূপের আত্মপ্রকাশের পূর্বশর্ত। (৫) নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য: বস্তুর গতির প্রত্যেকটি রূপের নিজস্ব সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য আছে। প্রত্যেকটি রূপ পরবর্তী উচ্চতর রূপের আত্মপ্রকাশকে নির্ধারণ করে এবং নিজে উচ্চতর রূপটির অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু উচ্চতর রূপগুলোকে নিম্নতর রূপগুলোতে রূপান্তর করা যায় না। এইভাবে জীবসত্তার মধ্যে যুক্ত থাকে বস্তুর গতির সব পূর্ববর্তী রূপ; যান্ত্রিক, পদার্থবিদ্যাগত ও রাসায়নিক । (৬) শক্তির অক্ষয়তা, পরিবর্তন শুধু রূপে: বিজ্ঞান গতির একটি রূপ আরেকটি রূপে উত্তোরণ আবিষ্কার করেছে। পরিমাণগত দিক থেকেও উত্তেরণ দেখিয়েছে। যেমন শক্তির অক্ষয়তা ও রূপান্তরের নিয়ম অনুযায়ী শক্তির বা গতির সামগ্রিক পরিমাণ একই থাকে, বাড়ে-কমে না। গতি শুধু পরিবর্তন করে তার রূপগুলো। এই নিয়মটি বস্তু ও গতির মধ্যে ঐক্যের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দেখায়। স্থান ও কাল: বস্তুর একটি নির্দিষ্ট আকৃতি আছে, পরিমাণ ও গঠনকাঠামো আছে। বস্তুসমূহ পরস্পরের সাথে একটা সম্পর্কে আবদ্ধ এবং একটা ধারাবাহিকতা তৈরি করে। একটি অপরটির পূর্বগামী হয় বা একটি অপরটিকে প্রতিস্থাপিত করে। বস্তুসমূহের এসব গুণ-ধর্ম বোঝায়, এগুলোর অস্তিত্ব আছে স্থানে ও কালে। স্থান ও কাল বস্তুর অস্তিত্বের বিশ্বজনীন রূপ। স্থান: স্থানের ধারণাটি বস্তুসমূহের অবস্থানের বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করে। স্থান পদার্থসমূহের বিস্তার, সহাবস্থান প্রকাশ করে। স্থানিক সম্পর্কের মধ্যে বস্তুর যেসব গুণ-ধর্ম যুক্ত থাকে সেগুলো হচ্ছে উচ্চতা, দৈর্ঘ, প্রস্থ, রূপ, গঠনকাঠামো এবং অন্যসব পদার্থের সাথে দূরত্ব। কাল : বস্তুর অবস্থাগুলোর ধারাবাহিকতাকে কাল বোঝায়। ক্রমঘটমান ব্যাপারগুলোর প্রক্রিয়ার মেয়াদকে কাল বলে। কাল বিভিন্ন পদার্থের ইতিহাস অনুসরণ করে। স্থানের মাত্রা : স্থান ত্রি-মাত্রিক, তিনটি গতিমুখ। যথা - (ক) ডানে-বাঁয়ে (খ) সামনে-পেছনে (গ) উপরে-নিচে। এভাবে যে কোনো পদার্থকে স্থানিকভাবে নির্ণয় করা যায়। কাল এক-মাত্রিক : স্থানের সাথে তুলনা করলে কাল এক-মাত্রিক। কাল সব সময় একটি দিকে, সামনের দিকে প্রবাহিত হয়। অতীত থেকে বর্তমানে এবং তারপর ভবিষ্যতে। কাল অপরিবর্তনীয়। একে বিপরীত দিকে প্রবাহিত করা যায় না। স্থান ও কালের পরস্পর সম্পর্ক: সমস্ত পদার্থ নির্দিষ্ট এক-এক দ্রুতিতে চলে। দ্রুতি হলো একটি নির্দিষ্ট কালপর্বে একটি পদার্থ যে দূরত্ব অতিক্রম করে। এখানে স্থান ও কালের পরস্পর সম্পর্ক প্রকাশ পায়। ফুটে ওঠে একটি বস্তুর সাথে কাল ও স্থানের সংযোগ। কাল ও স্থানের অসীমতা: সসীম বস্তুসমূহের মধ্যে অস্তিত্বশীল হয়েও স্থান ও কাল অসীম। প্রতিটি বস্তু অন্যান্য বস্তুর সাথে যুক্ত। সেগুলো আবার আরো অন্যান্য বস্তুসমূহের সাথে সংযুক্ত। এই সংযুক্তি অন্তহীন। এভাবে স্থান অসীমে প্রকাশ পায়। অন্যদিকে প্রতিটি স্বতন্ত্র বস্তুর অস্তিত্বের আদি ও অন্ত আছে, কিন্তু সেটির পূর্বগামী ছিলো এক অসীমসংখ্যক অন্যান্য বস্তু। এবং শেষ পর্যন্ত বস্তুটি প্রতিস্থাপিত হবে অন্যান্য বস্তুর দ্বারা। এই রকম চলবে অন্তহীনভাবে। এভাবে বস্তু স্থানে অসীম এবং কালে অনন্ত। মহাবিশ্বের আদিও নেই অন্তও নেই। এই বিষয়টি ধর্ম ও ভাববাদ মানে না। স্থান ও কালের উপলব্ধির গুরুত্ব: স্থান ও কাল নিয়ে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের উপলব্ধির তত্ত্বগত ও ব্যবহারিক গুরুত্ব অপরিসীম। সব সামাজিক ক্রিয়াকলাপের মানে হলো পারিপার্শ্বিক জগতের সাথে মানুষের মিথষ্ক্রিয়া (রহঃবৎধপঃরড়হ)। সব ব্যাপার ও প্রক্রিয়াসমূহের স্থানিক ও কালগত বৈশিষ্ট্য আছে। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই সামাজিক কর্মপ্রয়োগের ধরন, রূপ, ছন্দ ও গতিকে ঠিক করে। সুতরাং সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনের সর্বক্ষেত্রে স্থানিক ও কালগত বৈশিষ্ট্যগুলোকে গণ্য করা উচিত। লেখক : প্রাবন্ধিক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..