ক্ষেতমজুর নেতা শহীদ লখাই হাওলাদার

জয়নাল আবেদীন খান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
গত ১৭ নভেম্বর ছিল শহীদ লখাই হাওলাদারের মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮৮ সালের এই দিনে গাজীপুর জেলার হাতিয়ার গ্রামে ক্ষেতমজুর সমিতির নেতৃত্বে পরিচালিত খাস জমি দখলের আন্দোলনে স্থানীয় প্রভাবশালী সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র হামলা প্রতিরোধে প্রত্যক্ষভাবে লড়াই করে বীরের মতো শহীদ হন কমরেড আব্দুল লখাই হাওলাদার। লখাই হাওলাদারের আদি নিবাস শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলায়। নদীভাঙা গরিব কৃষক লখাই হাওলাদার ১৯৭০ সালের দিকে কাজের সন্ধানে এসে গাজীপুর জেলার হাতিয়াব গ্রামে এক টুকরো খাস জমিতে মাথা গোজার ঠাঁই করে নেন। ক্ষেতমজুরি, দিনমজুরি ও খেঁজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন। খেঁজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহের কারণে এলাকায় তিনি লখাই হাওলাদার ‘গাছি’ নামেও পরিচিত ছিলেন। ৮০’র দশকে সারা দেশে যখন ক্ষেতমজুর সমিতির নেতৃত্বে গম চুরি, ন্যায্য মজুরি ও খাস জমির আন্দোলন চলছে তখন গাজীপুর জেলারও সর্বত্রই তীব্র আন্দোলন ও সংগঠন ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করছিল। ঐ সময় গাজীপুর সদর উপজেলার হাতিয়ার গ্রামেও ক্ষেতমজুর সমিতির শক্তিশালী সংগঠন গড়ে ওঠে। শহীদ লখাই হাওলাদার ছিলেন তার অন্যতম নেতা। হাতিয়াব গ্রাম কমিটির উদ্যোগে অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছে। যার পুরোভাগে সাহসিকতার সাথে ভূমিকা রেখেছেন লখাই হাওলাদার। ১৯৮৮ সালের ১৭ নভেম্বর গাজীপুর শহরে ১৭টি কৃষক-ক্ষেতমজুর সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপস্থিতিতে একটি সভা চলছিল। ক্ষেতমজুর সমিতির তৎকালীন সভাপতি জনাব নূরুর রহমানও সভায় উপস্থিত ছিলেন। লখাই হাওলাদারসহ হাতিয়াব গ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দেরও সভায় উপস্থিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু সভায় আসার পূর্বক্ষণে লখাই হাওলাদার খবর পায় যে, আজই ক্ষেতমজুরদের পক্ষ থেকে আবাদ করা দখলকৃত খাস জমির পাকা ধান প্রভাবশালী মহল ভাড়াটিয়া গুণ্ডা ও সন্ত্রাসীদের দিয়ে কেটে নিয়ে যাবে। তাৎক্ষণিকভাবে লখাই হাওলাদার ৮/১০ জন ক্ষেতমজুরকে নিয়ে ঐ জমিতে গেলে সন্ত্রাসীরা মারাত্মক অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে ক্ষেতমজুরদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। লখাই হাওলাদার তার হাতে থাকা কাস্তে নিয়েই সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করে এবং লড়াই করে একাধিক সন্ত্রাসীকে জখম করে নিজে বীরের মতো শহীদ হলেন। ১৭ সংগঠনের সভা চলা অবস্থাতেই লখাই হাওলাদার খুন হওয়ার খবর পেয়ে সাথে সাথে আমি পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে দেখতে পাই দখলমুক্ত খাস জমিতে ক্ষেতমজুরদের আবাদ করা পাকা সোনালী ধানের ক্ষেতে লখাই হাওলাদারের নিথর দেহটি পড়ে আছে। মুষ্ঠিবদ্ধ হাতে শক্ত করে ধরা আছে একটি কাস্তে। অতঃপর পুলিশ লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করে। ময়নাতদন্ত শেষে ১৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় ক্ষেতমজুর নেতা অ্যাড. জেয়াদ আল মালুম লাশ নিয়ে হাতিয়াব গ্রামে পৌঁছুলে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা কয়েক হাজার ক্ষেতমজুরের মধ্যে এক হৃদয় বিধারক দৃশ্যের অবতারণা হয় এবং ক্ষেতমজুররা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। লখাই হাওলাদার ছিলেন অত্যন্ত সৎ, সহজ-সরল ও সাহসী মানুষ। শুধু হাতিয়াব গ্রামেই নয়, মিটিং-মিছিল ও সমাবেশের খবর পেলেই অন্য এলাকাতেও গিয়ে হাজির হতেন। ১৭ নভেম্বর তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষেতমজুরদের পরিকল্পিত ও সংগঠিত শক্তি-সমাবেশ ঘটাতে না পারলেও অল্প কিছু ক্ষেতমজুরকে নিয়ে সাহসিকতার সাথে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করতে ছাড়েননি। এই বিপ্লব-পাগল মানুষটি আন্দোলন সংগ্রাম, মিটিং-মিছিল ও সমাবেশ ছাড়া যেন আর কিছুই বুঝতেন না। কিছুদিন কোনো কর্মসূচি না থাকলেই আমার কাছে চলে আসতেন এবং প্রশ্ন করতে কোনো কর্মসূচি দিচ্ছেন না কেন? উল্লেখ্য, ঐ সময়ে আমি জেলা ক্ষেতমজুর সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলাম। লখাই হাওলাদার শহীদ হওয়ার পর প্রায় ২ মাস পর্যন্ত হাতিয়াব এলাকায় এক ভয়াবহ পরিস্থিতি ও ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি হয়েছিল। দীর্ঘদিন খাস জমি দখলে রাখা এলাকার বড় কৃষক ও কায়েমী স্বার্থবাদী প্রভাবশালী মহল জাতীয় পার্টি ও বিএনপি’র ছত্র-ছায়ায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে ক্ষেতমজুরদের বিরুদ্ধে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের হামলা-মামলা হয়রানী ও সংঘর্ষ চালাতে থাকে। ক্ষেতমজুরদের রাস্তা-ঘাট, কলের পানি বন্ধ করে দেয়। ঐ সময়ে কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদ ক্ষেতমজরদের পক্ষে জোরালো ভূমিকা পালন করে। অবশ্য বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাড. আ.ক.ম. মোজাম্মেল হক, শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারসহ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দরাও ক্ষেতমজুরদের পাশে দাঁয়িড়েছিল। অবশেষে তীব্র লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে ক্ষেতমজুররাই জয়ী হয়। শত্রুপক্ষ ক্ষেতমজুরদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। উল্লেখ্য যে, পরিস্থিতির বাস্তবতায় লখাই হাওলাদার হত্যা মামলাটিও আপস-মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়। লখাই হাওলাদারের মৃত্যুর পর তার পরিবারে নিদারুণ অর্থ সংকট দেখা দিলে ক্ষেতমজুর সমিতি ও কমিউনিস্ট পার্টি সাধ্যমতো তাদের পাশে দাঁড়ায়। লখাই হাওলাদারের সাত ছেলে-মেয়ের মধ্যে উপার্জনক্ষম তেমন কেউ ছিল না। তৃতীয় সন্তান কিশোর সেলিম হাওলাদারকে কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের সাথে আলোচনা করে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিয়ে আসি। পার্টি অফিসে টুকিটাকি কাজের সাথে যুক্ত হওয়ার প্রায় এক বৎসর পর সেলিম হাওলাদার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। সেলিম ভাই আমাকে ডেকে জানালেন- সেলিম হাওলাদারের লিভারে একটি মারাত্মক ছিদ্র ধরা পড়েছে এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসা। যা কোনোমতেই লখাই হাওলাদারের পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব ছিল না। এই জটিল অসুখের কথা শুনে আমি অত্যন্ত হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। অবশেষে সেলিম ভাইয়ের প্রচেষ্টায় তাকে চিকিৎসার জন্য রাশিয়াতে পাঠানো হলো। কয়েক মাসের সুচিকিৎসার পর সেলিম হাওলাদার সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলে সেলিম ভাই আবার আমাকে ডেকে জানালেন রাশিয়াতে শহীদ পরিবারের সন্তানদের ফ্রি লেখাপড়া করার জন্য একটি ইনস্টিটিউট রয়েছে, পরিবারের আপত্তি না থাকলে সেলিম হাওলাদারকে ওখানে ভর্তি করে দেয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পরিবারের সাথে আলোচনা না করেই আমি সেলিম ভাইয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়ে পরিবারের পক্ষে মত দিয়ে দিলাম। অবশ্য লখাই হাওলাদারের মৃত্যুর পর থেকে ঐ পরিবারের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব আজ পর্যন্ত আমিই পালন করার চেষ্টা করে আসছি। সেলিম হাওলাদার রাশিয়ার ঐ ইনস্টিটিউটে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে উচ্চ শিক্ষাগ্রহণ করে দেশে ফিরে আসে এবং কিছুদিন বেকার থাকার পর সম্প্রতি বাংলাদেশে রাশিয়ার সহযোগিতায় পরিচালিত একটি আনবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকুরিতে যোগদান করেছে। লখাই হাওলাদারের বড় ছেলে মোখলেছ হাওলাদার ও সেলিম হাওলাদারসহ পরিবারের সদস্যদের সাথে কমিউনিস্ট পার্টি ও ক্ষেতমজুর সমিতির রয়েছে ঘনিষ্ট সম্পর্ক। কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ব্যক্তিগতভাবেও লখাই পরিবারের সাথে প্রায় নিয়মিত যোগাযোগ সম্পর্ক রাখাতে লখাই পরিবারও তাঁর প্রতি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। কমরেড লখাই হাওলাদারের নিজেও ছিলেন নেতৃত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থাশীলতা, বিশেষ করে কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ ও কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের প্রতি ছিলে অপরিসীম শ্রদ্ধাশীল ও ভক্ত। অনেকবার লখাই হাওলাদার আমাকে অনুরোধ করেছিলেন তাকে একবার ফরহাদ ভাই ও সেলিম ভাইয়ের কাছে নিয়ে যেতে। তাদের সাথে কিছু কথা বলতে চেয়েছিলেন। কী কথা বলতে চেয়েছিলেন জানি না, তবে বিষয়টি আমি মোটেও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করিনি। নানা অজুহাত দিয়ে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছি। এখন বিষয়টি মনে হলে খুবই আফসোস ও অপরাধবোধ জেগে উঠে। লখাই হাওলাদার অল্প দিনেই ক্ষেতমজুর শ্রেণির আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রেণি সংগ্রামের বিপ্লবী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিলেন। তার মতো করে সহজভাবেই প্রকৃত শ্রেণি সংগ্রামকে উপলব্ধি করেছিলেন। স্পষ্টভাবে বুঝেছিলেন ধনীদের বিরুদ্ধে গরিব মানুষের এক জোট বেঁধে লড়াই সংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই। লখাই হাওলাদারের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে এলাকার গরিব মানুষ ও ক্ষেতমজুর শ্রেণি তাদের খাস জমিসহ বিভিন্ন অধিকার আদায় ও সামাজিক মর্যাদা লাভের জন্য সকলেই লখাই হাওলাদারের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধাবোধ থেকে প্রতিবছরই তার মৃত্যুবার্ষিকীতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। শহীদ লখাই হাওলাদারের আত্মত্যাগ ও সংগ্রামী জীবন থেকে আমাদের অনেক কিছু শিক্ষণীয় রয়েছে। কমরেড লখাই হাওলাদারের রক্ত বৃথা যাবে না, বৃথা যেতে পারে না। শ্রেণিহীন শোষণমুক্ত সমাজ একদিন প্রতিষ্ঠিত হবেই। কমরেড লখাই হাওলাদার-লাল সালাম।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..