হাসান আজিজুল হক : অকম্পিত অক্ষরমালা ও ভূমিকা

গোলাম কিবরিয়া পিনু

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

হাসান আজিজুল হক গত ১৫ নভেম্বর আমাদের ছেড়ে গেলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি এলাকায় নিজ বাসভবনে তাঁর মৃত্যু হয়। ৮২ বছর বয়সী হাসান আজিজুল হক বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। গত ২১ আগস্ট এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ঢাকায় আনা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসপাতালে দুই সপ্তাহের বেশি সময় চিকিৎসা নেন তিনি। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর ৯ সেপ্টেম্বর তাকে রাজশাহীতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সমাধিস্থ করা হয়। মৃত্যুর পরও তিনি তার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলেন না। ১৯৭৩ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৪ সাল পর্যন্ত একনাগাড়ে ৩১ বছর অধ্যাপনা করেন। এর পর থেকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাশে চৌদ্দপায় আবাসিক এলাকায় বসবাস করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা থেকে অবসর নেওয়ার পরও––বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড থেকে দূরবর্তী থাকেননি, বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রমে আমন্ত্রিত হয়ে ভূমিকা রেখেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে একজন অপরিহার্য মানুষ হিসেবে নিবিড়ভাবে যুক্ত থেকেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেওয়ার পরও––এমন ঘনিষ্ঠভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে বিভিন্ন কার্যক্রমে জড়িয়ে থাকার উদাহরণ কমই দেখা যায়। এক্ষেত্রে হাসান আজিজুল হকের গ্রহণযোগ্যতা এক তুলনারহিত উদাহরণ হয়ে আছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম সত্তুর দশক ও আশির দশকের শুরুতে, তখন তাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাথে তিনি বলিষ্ঠভাবে শুধু জড়িত থাকেননি, প্রকাশ্যে মিছিল ও প্রতিবাদে অংশ নিয়েছেন। তখন দেখেছি––তিনি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে একজন অভিভাবকতুল্য মানুষ হয়ে কী উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছেন, সেই ভূমিকার ধারাবাহিকতা নিয়ে আমৃত্যু তিনি দৃঢ় থেকেছেন। আমাদের আহ্বানে কত অনুষ্ঠানে তাকে পেয়েছি, তখন তার ক্যাম্পাসের বাসায়ও বহুবার গিয়েছি। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে নয়, রাজশাহী শহরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও আমরা তাকে কতভাবে পেয়েছি। মনে পড়ে––শহরে রবিবাসরীয় সাহিত্য আসরে তিনি উপস্থিত থেকে বক্তৃতা দিয়েছেন––তার পাশে আমরা কবিতা পড়েছি। সেই সময়ে ‘গদ্য আেেন্দালন’ নামে একটি সংগঠন তাকে আহ্বায়ক করে গঠন করা হয়েছিল, তাতে আমরা ক’জন সদস্য ছিলাম। হাসান আজিজুল হককে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আমাদের সময় দেখেছি––নাজিম মাহমুদ, আলী আনোয়ার, সনৎ কুমার সাহা, গোলাম মুরশিদ প্রমুখের সাথে নাটক, আবৃত্তি ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুথবদ্ধ হয়ে কী অসাধারণ ভূমিকা রাখতে। হাসান আজিজুল হক ছিলেন এক তুলনাহীন বাগ্মী, তিনি বক্তৃতা যে কত বিষয়ে কতখানে দিয়েছেন, তার হিসেবে নেই। এসব বক্তৃতা শুধু নিছক আলংকারিক বক্তৃতা থাকেনি, মানুষের চেতনাকে নাড়া দিয়েছে, সমসাময়িক ঘটনা সম্পর্কে সচেতন করেছে, মননশীলতা বিকাশেও ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সেসব বক্তৃতার সূক্ষè প্রভাবও রয়েছে। শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নয়, রাজশাহী নগরসহ এ-অঞ্চলেও সেই প্রভাব রয়েছে। তার মতো আড্ডাপ্রিয় শিক্ষক ও মানুষ কমই দেখেছি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমরা লক্ষ করেছি––তার বাসার দোর অবারিতভাবে খোলা থাকত––আগ্রহী সবার জন্য, যে কারো সাথে একান্তে আড্ডায় তিনি নিমগ্ন হয়ে যেতেন। এমনই স্বাক্ষ্য মেলে––হাসান আজিজুল হককে মৃত্যুর আগে যখন চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আনা হয়েছিল তখন তাঁর ছেলে ফেসবুকে লিখেছেন––‘ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি, বাঁচার জন্য আব্বার ভাত-তরকারির সাথে সাথে মানুষের সঙ্গ-হাসি-গল্প-গান দরকার হয়। সংগত কারণেই এ সময় (করোনাকালে) সেটা পাচ্ছেন না।’ সাহিত্য-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের লোকদের সাথে তার যোগাযোগ ছিল কী গভীর। তরুণ লেখকদের সাথেও ছিল গভীর সখ্য। বন্ধুভাগ্য ও মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য এক যাদুকরী গুণ নিয়ে তিনি জন্মেছিলেন বলে আমার মনে হয়। হাসান আজিজুল হক যখন রাজশাহী কলেজে পড়তেন, সেই সময় ১৯৬০ সালে সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’ পত্রিকায় ‘শকুন’ শিরোনামে তার একটি গল্প প্রকাশ হয়। এই একটিমাত্র গল্পের মাধ্যমেই সাহিত্যিক মহলের আগ্রহ তৈরি হয়, সমালোচকদের কৌতুহল সৃষ্টি হয়। তার গল্পগ্রন্থ ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’-এর প্রথম গল্প ‘শকুন’। হাসান আজিজুল হকই এমন লেখক––যাঁর প্রথম লেখা ছাপা হওয়ার পর থেকে মর্যাদার যে উজ্জ্বলতা তৈরি হলো, তা আর কখনো কমেনি। তাঁর ছোটগল্প ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ ব্যাপকভাবে পাঠক সমাদৃত হয়। প্রায় অর্ধশতক ধরে তিনি ছোট গল্প লিখেছেন। ষাটোর্ধ্ব বয়সে এসে তিনি উপন্যাস লেখেন, তরুণ বয়সে উপন্যাস লেখার চেষ্টা ছিল বলে জানা যায় । ‘আগুনপাখি’ নামের উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে। তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’ ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয়। হাসান আজিজুল হক কথাসাহিত্যের বাইরে প্রবন্ধ, নাটক ও শিশুসাহিত্য রচনা করেন। সম্পাদনা করেন কিছু গ্রন্থ। হাসান আজিজুল হকের উল্লেখখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে––গল্পগ্রন্থ : সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য (১৯৬৪), আত্মজা ও একটি করবী গাছ (১৯৬৭), জীবন ঘষে আগুন (১৯৭৩), নামহীন গোত্রহীন (১৯৭৫), পাতালে হাসপাতালে (১৯৮১), আমরা অপেক্ষা করছি (১৯৮৮), রাঢ়বঙ্গের গল্প (১৯৯১), মা মেয়ের সংসার (১৯৯৭) ও বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প (২০০৭) ইত্যাদি। প্রবন্ধ : কথাসাহিত্যের কথকতা (১৯৮১), চালচিত্রের খুঁটিনাটি (১৯৮৬), অপ্রকাশের ভার (১৯৮৮), সক্রেটিস (১৯৮৬), অতলের আধি (১৯৯৮), কথা লেখা কথা (২০০৩), লোকযাত্রা আধুনিক সাহিত্য (২০০৫), একাত্তর : করতলে ছিন্নমাথা (২০০৫), ছড়ানো ছিটানো (২০০৮), কে বাঁচে কে বাঁচায় (২০০৯), বাচনিক আত্মজৈবনিক (২০১১), চিন্তন-কণা (২০১৩) ও রবীন্দ্রনাথ ও ভাষাভাবনা (২০১৪) ইত্যাদি। উপন্যাস : আগুনপাখি (২০০৬) ও সাবিত্রী উপাখ্যান (২০১৩)। শিশুসাহিত্য : লালঘোড়া আমি (১৯৮৪ ), ফুটবল থেকে সাবধান (১৯৯৮) স্মৃতিকথা/আত্মজীবনীমূলক : ফিরে যাই, ফিরে আসি (১ম অংশ, ২০০৯), উঁকি দিয়ে দিগন্ত (২য় অংশ, ২০১১), লন্ডনের ডায়েরি (২০১৩) ইত্যাদি। তিনি একাধারে গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ লিখে বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য কত পুরস্কার পেয়েছেন, তা উল্লেখযোগ্য ও অগণিত । সাহিত্যে অবদানের জন্য হাসান আজিজুল হক ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান, ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে ও ২০১৯ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়। উপন্যাসের জন্য তিনি ২০০৮ সালে কলকাতা থেকে ‘আনন্দ সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন। এসব ছাড়াও––বাংলাদেশ লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩), অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৪), ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮), কাজী মাহবুবউল্লাহ ও বেগম জেবুন্নিসা পুরস্কার (১৯৯৪), খুলনা সাহিত্য মজলিশ সাহিত্য পদক (১৯৮৬), রাজশাহী লেখক পরিষদ পদক (১৯৯৩), মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরস্কার (২০০৭) ইত্যাদি। ২০০৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ পদে মনোনীত হন এবং দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালে হাসান আজিজুল হক বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের সভাপতি নির্বাচিত হন। হাসান আজিজুল হক বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্পের ধারায় তাঁর সৃজনশীলতার সিলমোহর রেখে মর্যাদার আসনে রয়েছেন। বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্পের ধারাকে সম্মুখবর্তী করে আরও উজ্জ্বল করে রেখে গেলেন––ভাষা, বিষয়বস্তু ও নির্মাণশৈলীতে। দেশভাগের বেদনার্ত ছবি ও ঘটনার দৃকপাত তাঁর লেখায় এক গভীর বাস্তবিকতা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। তাঁর কথাসাহিত্যে প্রান্তিক মানুষের যন্ত্রণা, দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, ক্ষুধা, মুক্তিযুদ্ধের রিয়েলিটি ইতিহাসের কণ্ঠলগ্ন হয়ে হয়ে জেগে আছে। ভিন্ন এক গদ্যভাষায় মর্মস্পর্শী বর্ণনাভঙ্গির মধ্যে দিয়ে জনজীবনের অকম্পিত অক্ষরমালা তাঁর গল্প-উপন্যাসের অন্তরস্থিত এক প্রধান-শক্তি। ভবিষ্যতেও––তার প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ আমরা কাছে টেনে নেব––কৌতুহল ও ইশারায় আমাদের বহুদিন হয়তো চৈতন্যোদয় ঘটাবে। কিন্তু হাসান আজিজুল হকের সপ্রাণ উপস্থিত না থাকার জন্য––বিশেষত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজশাহী অঞ্চল––তাঁর বক্তৃতা, জনগণমুখী ভূমিকা ও মননশীল–সাংস্কৃতিক-সাংগঠনিক ভূমিকার অভাবের কারণে বিশেষভাবেই খরা আক্রান্ত হবে––তা নিঃসংশয়ে বলা যায়! লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..