জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে জনজীবন বিপর্যস্ত

মোহাম্মদ আলতাফ হোসাইন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে দেশের অর্থনৈতিক খাতের প্রতিটি সেক্টরে এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে চলেছে। বিশেষ করে পরিবহন সেক্টরে সীমাহীন ভাড়া বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে এ খাতে কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে পরিবহন যাত্রীদের প্রতিনিয়ত কথা কাটাকাটি, বাকবিতন্ডা- এমনকি শারীরিক লাঞ্ছনার মতো নানা অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার অবতারণার দৃশ্যও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এরইমধ্যেই ছাত্র সমাজের মধ্যে থেকে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের আলামত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ছাত্রদের জন্য এই অস্বাভাবিক হারে বাসভাড়া বৃদ্ধি আর কোনভাবেই কুলিয়ে উঠতে পারা সম্ভব হচ্ছে না। তাই তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছেড়ে রাজপথে নেমে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদ করছে। তারা দাবি জানাচ্ছে তাদের পরিবারের পক্ষে এই মুহূর্তে আকস্মিকভাবে এই ধরনের বর্ধিত ভাড়া বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। ইতিমধ্যেই ভয়াবহ করোনা দুর্যোগের কারণে অনেক পরিবার জীবন ও জীবিকার উপায় ও অবলম্বনগুলি হারিয়ে দিশেহারা অবস্থায় হাবুডুবু খাচ্ছে। ঠিক এই মুহূর্তে পরিবহনে ভাড়া বৃদ্ধি করে “মরার উপর খাড়ার ঘা” চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। তাই তারা অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই দাবি তুলেছে, ছাত্র সমাজের জন্য পরিবহনের ভাড়া অর্ধেক করে দিতে হবে। ইতিমধ্যেই এই দাবি নিয়ে শুধু ঢাকা নয় বিভাগীয় শহরগুলোতেও ছাত্ররা প্রকাশ্য রাজপথে নেমেছে। আগামীতে পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছি। কারণ ইতিমধ্যেই পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির কারণে বাজারে গ্রাম থেকে বয়ে নিয়ে আসা তরকারির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির একটা আলামত পাওয়া যাচ্ছে। অজুহাত হিসেবে ব্যবসায়ীরা মাত্রারিক্ত পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধিকে দায়ী করছে। অচিরেই শিল্পখাতে উৎপাদিত যেসব পণ্য বাজারজাত করা হবে তার মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে হয়তো একই কারণ দাড় করানো হবে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির অজুহাত দিয়ে পণ্য মূল্যবৃদ্ধির নতুন ফর্মুলা রাতারাতি তৈরি করা হবে। যাকে চেলেঞ্জ করা সাধারণ জনগণের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়বে। জ্বালানি তেলের ব্যবহার এখন ব্যপক আকার ধারণ করেছে। আর কিছু দিনের মধ্যেই গ্রামাঞ্চলে ব্যপকভাবে ইরি ও বরো ধানের চাষ আবাদ শুরু হবে। শিল্প , পরিবহন থেকে শুরু করে কৃষিখাতেও এখন জ্বালানি তেলের ব্যবহার দ্রুত বেড়ে চলেছে। কৃষি আধুনিক হচ্ছে আর সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। স্বাভাবিক কারণেই প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্যই কৃষিতেও জ্বালানি তেলের ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। সুতরাং আর অল্প সময়ের মধ্যে কৃষি ক্ষেত্রে ও জ্বালানি তেলের চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকবে। আর ঠিক তখনই জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির এক ভয়াবহ অবস্থা গ্রামাঞ্চলেও সৃষ্টি হবে। শুধু তাই নয়, কৃষিখাতেও এক ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে অনেক জমা জমি আবাদের আওতা থেকে বাদ পড়বে। আর খাদ্য উৎপাদন কমে গেলে তা জনজীবনকে আরো গভীর সংকটে ঠেলে দেবে। সরকার যদি এই সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয় তাহলে আগামীতে তার জন্য এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে বাধ্য হবেন। এবারে ডিজেল ও কেরোসিন তেলের মূল্য যখন বৃদ্ধি করা হলো তখন মনে হলো এটা রীতিমত একটি আকস্মিক ঘটনা। হঠাৎ করে রাতের অন্ধকারে মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেয়া হলো। অথচ জনগণ এতদিন ধরে জেনে আসছে যে, মন্দের ভালো হিসেবে অন্তত জ্বালানি খাতের ক্ষেত্রে সরকারের একটা নীতিমালা আছে। এক্ষেত্রে অন্তত একটা রেগুলেটরি কমিশন আছে যাদের দ্বায়িত্ব হলো জ্বালানি খাতে তেল গ্রাসের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে অন্তত একবার হলেও একটা পাবলিক শুনানি হয়। যদিও সেই সব শুনানি করে জনগণের তেমন একটা সুবিধা হয় না। তারপরও সান্তনা থাকে যে কর্তারা অন্তত ভোক্তাদের কথাগুলো শুনলো। কিন্তু এবারে জনগণ কি দেখলো তার সেই নূন্যতম অধিকারটুকু রাতের অন্ধকারে কেড়ে নেয়া হলো। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে জনগণের মতামতের যেন কোন মূল্যই নেই। সম্প্রতি টেলিভিশনের প্রতিবেদনে দেখলাম- আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের ব্যাপক মজুদ রয়েছে। তাই তারা এখন ক্রমাগতভাবে জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস করে দিচ্ছে। তাই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে জ্বালানি তেলের মূল্য ক্রমান্বয়ে কমিয়ে দিচ্ছে। অথচ আমরা ভারতের এক্কেবারে লাগোয়া একটি দেশ হয়েও জ্বালানি তেলের মূল্য ক্রমাগতভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছি। এ যেন এক ধরনের অক্ষম মানুষের অনাকাক্সিক্ষত চিৎকার। আমরা জানি করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর গত ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে কমতে প্রতি ব্যারেল ৩০ ডলারের নিচে নেমে এসেছিল অথচ তখনও সরকার ডিজেল ও কেরোসিন তেলের মূল্য প্রতি লিটার ৬৫ টাকা বহাল রেখে চুটিয়ে চুটিয়ে ব্যবসা করেছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য মতে এই সময় কালে সরকারের পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। সরকারের তহবিলে এই সেক্টরের শুল্ক, মুসক (ভ্যাট ) ও অন্যান্য কর বাবদ প্রতি বছর আরও চার থেকে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব জমা হয়েছে। সুতরাং এতদিনে এই রাজস্ব ও মুনাফা মিলে সরকারের অর্থ ভান্ডারে যে পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে সেই হিসাব কি সরকার জনগণের সামনে উন্মোচন করেছে। করে নাই। অথচ হঠাৎ করেই এক নিমিষেই লোকসানের অজুহাত তুলে ডিজেল ও কেরোসিন তেলের মূল্যবৃদ্ধি করে একলাফে ২৩ দশমিক ০৮ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়া হলো। আজকে দেশের মানুষ যখন করোনার অভিঘাতে জীবন ও জীবিকা হারিয়ে এক দুঃসহ জীবনযাপন করছে ঠিক সেই মুহূর্তে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করে সরকার জনগণের কাছে কী বার্তা দিতে চাচ্ছে। করোনা ইতিমধ্যেই আমাদের কাছ থেকে দেড় বছরের অধিক সময় কেড়ে নিয়ে গেছে। আমরা এখনও যে একেবারে সম্পূর্ণ ভাবে করোনা মুক্ত হয়েছি এমনটাও না। করোনা ইতিমধ্যেই যা ক্ষতি করার তা করে দিয়ে গেছে। আমরা অনেকেই স্বজনহারা হয়েছি, অনেকেই জীবিকা হারিয়েছে, কর্মহীন মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। সবটা মিলে চারিদিকে একটা দুর্বিসহ অবস্থা বিরাজ করছে। করোনা এখন বিশ্রাম নিচ্ছে। এই ফাঁকে মানুষ একটু উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে সরকার কোন বিবেচনায় জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়িয়ে দিয়ে মানুষের উপরে “মরার উপর খাঁড়ার ঘা” মারার মতো একটা অমানবিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারলো তা ভেবে সত্যি অবাক হচ্ছি। এই রকম একটি গণস্বার্থ বিরোধী সিদ্ধান্তের পরিণতি জনস্বার্থকে আরও কতটা গভীর সংকটে নিয়ে যাবে আমরা জানি না। সামনের একটা ভয়াবহ অবস্থার কথা চিন্তা করে মানুষ স্বার্বজনীন মঙ্গলের কথা বাদ দিয়ে এখন নিজ স্বার্থের কথা নিয়ে বড় বেশি চিন্তিত। আমার এক বন্ধুর সাথে কথা বলে জানতে পারলাম সে ভাড়া বাসায় থাকেন। সে বড় বেশি চিন্তায় আছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণ দেখিয়ে কখন তার বাসার মালিক বাসা ভাড়া বাড়িয়ে দেয়ার নোটিশ দিবে। ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকরাও আতঙ্কে আছেন কখন তার দোকান ঘরের মালিক এসে ঘরের ভাড়া বৃদ্ধির নোটিশ দিবে। চারিদিকে একটা নিরব উদ্ধেক আর উৎকণ্ঠা। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যে এক ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি করবে- তা কি সরকার বুঝতে পারছে না, এমনটা তো নয়। কিন্তু সব জেনে বুঝেই সরকার এই সব জনস্বার্থ বিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ এই সরকার মুখে যতই জনগণের কথা বলুক সরকারের মুল লক্ষ্য হলো তার শ্রেণী স্বার্থ রক্ষা করা। শ্রেণী স্বার্থের বাইরে যাওয়ার তার কোন সুযোগ নেই। সুতরাং একটি বুর্জোয়া রাজনৈতিক ব্যাবস্থায় একটি বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলের পক্ষে তাই ধনীক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করাই হলো তার প্রধান দ্বায়িত্ব ও কর্তব্য। সুতরাং ধনিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষাকারী সরকারের কাছে সাধারণ জনগণের চাওয়া ও পাওয়ার তেমন কোন সুযোগ নেই। এই বাস্তবতা জানা ও বোঝার ক্ষমতা জনগণ যতদিন অর্জন করতে না পারবে ততদিন পর্যন্ত এই অসহনীয় ভোগান্তির হাত থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..